বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে স্থায়ী উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন প্রবীর কুমার ঘোষ। এই নিয়োগের মাধ্যমে প্রায় দেড় বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা অনিশ্চয়তা কাটলো। প্রবীর কুমার ঘোষ, যিনি এই বিশ্ববিদ্যালয়েরই প্রাক্তন ছাত্র, এবার তাঁর প্রিয় প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বে এসেছেন। গত ১৮ মার্চ, ২০২৫-এ এই ঘোষণা করা হয়েছে, এবং তিনি আগামী পাঁচ বছরের জন্য এই গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করবেন। এই সংবাদ বিশ্বভারতীর শিক্ষক, ছাত্র এবং স্থানীয়দের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার করেছে।
ঘটনার বিবরণে যাওয়ার আগে জানা দরকার, বিশ্বভারতীতে স্থায়ী উপাচার্যের পদটি ২০২৩ সালের নভেম্বর থেকে শূন্য ছিল। তৎকালীন উপাচার্য বিদ্যুৎ চক্রবর্তীর মেয়াদ শেষ হওয়ার পর থেকে বিশ্ববিদ্যালয়টি অস্থায়ী নেতৃত্বের ওপর নির্ভর করছিল। এই সময়ে বিভিন্ন প্রশাসনিক সমস্যা এবং বিতর্কের মধ্যে দিয়ে প্রতিষ্ঠানটি চলছিল। অবশেষে, ১৮ মার্চ রাষ্ট্রপতি ভবন থেকে প্রবীর কুমার ঘোষের নাম ঘোষণা করা হয়। তিনি এর আগে ছত্তীসগঢ়ের রায়পুরে ভারতীয় কৃষি গবেষণা কেন্দ্রের (আইসিএআর) ডিরেক্টর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁর নিয়োগের খবর ছড়িয়ে পড়তেই বিশ্বভারতীর ক্যাম্পাসে উৎসাহের আবহ তৈরি হয়েছে।
প্রবীর কুমার ঘোষের শিক্ষাগত ও পেশাগত জীবন বেশ সমৃদ্ধ। তিনি বিশ্বভারতী থেকে পড়াশোনা শেষ করে পরবর্তীতে কৃষি গবেষণার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছেন। আইসিএআর-এর প্রাক্তন ডিরেক্টর হিসেবে তিনি গবেষণা ও প্রশাসনিক দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। এছাড়াও, তিনি বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গুরুত্বপূর্ণ পদে কাজ করেছেন, যা তাঁকে এই দায়িত্বের জন্য উপযুক্ত করে তুলেছে। তাঁর নিয়োগের কথা ঘোষণার পর থেকে সামাজিক মাধ্যমে অনেকেই তাঁর অতীত কাজের প্রশংসা করেছেন। বিশেষ করে, তাঁর প্রাক্তন ছাত্র হিসেবে বিশ্বভারতীর প্রতি তাঁর গভীর সংযোগ এই নিয়োগকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে।
এই নিয়োগের পেছনে কিছু প্রাসঙ্গিক তথ্যও উল্লেখযোগ্য। বিশ্বভারতী, যিনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্বপ্নের প্রতিষ্ঠান, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিভিন্ন বিতর্কে জড়িয়ে পড়েছিল। শিক্ষক-ছাত্র আন্দোলন থেকে শুরু করে প্রশাসনিক অস্থিরতা—এই সবকিছুই প্রতিষ্ঠানটির সুনামকে প্রশ্নের মুখে এনেছিল। ২০২৩ সালে ইউনেস্কো শান্তিনিকেতনকে ‘ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ’ তকমা দিয়েছে, যা বিশ্বভারতীর গৌরব বাড়ালেও প্রশাসনিক স্থিতিশীলতার অভাব অনেকের মনে প্রশ্ন তুলেছিল। প্রবীর কুমার ঘোষের নিয়োগের মাধ্যমে এই সমস্যাগুলো মেটানোর একটি সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। তিনি যে বিশ্বভারতীর সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচিত, তা তাঁর পক্ষে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সুবিধা হয়ে উঠতে পারে।
নতুন উপাচার্যের সামনে অনেকগুলো কাজ অপেক্ষা করছে। বিশ্বভারতীতে শিক্ষার মান উন্নত করা, গবেষণার পরিধি বাড়ানো এবং ক্যাম্পাসের পরিবেশ শান্তিপূর্ণ রাখা তাঁর প্রধান লক্ষ্য হতে পারে। এছাড়া, স্থানীয়দের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পর্ক জোরদার করাও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। উদাহরণস্বরূপ, বসন্ত উৎসবের মতো ঐতিহ্যবাহী অনুষ্ঠানগুলো গত কয়েক বছর ধরে শুধু শিক্ষক-ছাত্রদের মধ্যে সীমাবদ্ধ রয়েছে। অনেকে চান এটি আবারও সবার জন্য উন্মুক্ত হোক, যাতে শান্তিনিকেতনের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য পুনরুজ্জীবিত হয়। প্রবীর কুমার ঘোষের অভিজ্ঞতা এই ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।
স্থানীয়দের প্রতিক্রিয়াও এই ঘটনায় যোগ করেছে নতুন মাত্রা। বোলপুরের বাসিন্দারা মনে করেন, প্রাক্তন ছাত্র হিসেবে প্রবীর কুমার ঘোষ শান্তিনিকেতনের প্রতি একটি বিশেষ ভালোবাসা রাখেন। তাঁর নেতৃত্বে বিশ্বভারতী আবারও তার পুরনো গৌরব ফিরে পেতে পারে বলে অনেকে আশা করছেন। একইসঙ্গে, শিক্ষক ও ছাত্রদের একাংশ তাঁর প্রশাসনিক দক্ষতার ওপর ভরসা রেখেছেন। তবে, কিছু সংশয়ও আছে। কেউ কেউ বলছেন, তিনি বাইরের প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘদিন কাজ করেছেন, তাই বিশ্বভারতীর অভ্যন্তরীণ সমস্যাগুলো বোঝার জন্য তাঁকে সময় নিতে হবে।
শেষ কথা হিসেবে বলা যায়, প্রবীর কুমার ঘোষের নিয়োগ বিশ্বভারতীর জন্য একটি নতুন শুরুর সুযোগ। তাঁর হাতে এখন রবীন্দ্রনাথের স্বপ্নের এই প্রতিষ্ঠানকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব। তিনি যদি তাঁর অভিজ্ঞতা ও দূরদর্শিতার মাধ্যমে প্রশাসনিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে পারেন, তাহলে বিশ্বভারতী আবারও শিক্ষা ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে অনন্য উচ্চতায় পৌঁছতে পারবে। এখন শুধু অপেক্ষা করা ছাড়া উপায় নেই, তাঁর কাজের ফল দেখার জন্য।