New Delhi rail hub updates: ভারতীয় রেলওয়ে বিশ্বের বৃহত্তম রেল নেটওয়ার্কগুলির মধ্যে অন্যতম এবং দেশের অর্থনীতির একটি মূল চালিকা শক্তি। দেশের রাজধানী নিউ দিল্লিতে অবস্থিত নিউ দিল্লি রেলওয়ে স্টেশন ২০২৩-২৪ অর্থবছরে প্রায় ৩,৩৩৭ কোটি টাকা রাজস্ব উৎপাদন করে ভারতের সবচেয়ে ধনী রেলস্টেশনের মর্যাদা অর্জন করেছে। এই বিশাল রাজস্ব উৎপাদনের পেছনে রয়েছে এর কৌশলগত অবস্থান, দৈনিক ৫ লাখেরও বেশি যাত্রী পরিবহন ক্ষমতা, এবং বিভিন্ন ব্যবসায়িক উদ্যোগ।
নিউ দিল্লি রেলওয়ে স্টেশন (স্টেশন কোড: NDLS) ভারতীয় রাজধানীর মূল রেল হাব হিসেবে পরিচিত। সেন্ট্রাল দিল্লিতে অবস্থিত, কনট প্লেস থেকে মাত্র ২ কিলোমিটার উত্তরে এই স্টেশনটি অবস্থিত। ১৬টি প্ল্যাটফর্ম বিশিষ্ট এই স্টেশনে দুটি প্রধান প্রবেশদ্বার রয়েছে – পাহারগঞ্জ (প্ল্যাটফর্ম ১) এবং আজমেরি গেট (প্ল্যাটফর্ম ১৬)। প্রতিদিন গড়ে ৩৫০টিরও বেশি ট্রেন এই স্টেশন দিয়ে যাতায়াত করে, যা এই স্টেশনকে ভারতের অন্যতম ব্যস্ততম রেলস্টেশন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
যাত্রী পরিষেবা ও সুবিধা
নিউ দিল্লি রেলওয়ে স্টেশন প্রতিদিন প্রায় ৫০০,০০০ যাত্রীকে পরিষেবা প্রদান করে, যা উৎসব মৌসুমে ৭০০,০০০ পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়। এটি একটি NSG-1 (নন-সাবার্বান গ্রেড-১) স্টেশন হিসেবে শ্রেণীবদ্ধ, যা পূর্বে A1 শ্রেণীর স্টেশন ছিল। বিভিন্ন যাত্রী সুবিধা যেমন আধুনিক খাবারের ব্যবস্থা, প্রতীক্ষালয়, লাগেজ ফ্যাসিলিটি, এবং অন্যান্য পরিষেবাগুলি এই স্টেশনকে একটি সম্পূর্ণ আধুনিক রেল হাব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
২০২৩-২৪ অর্থবছরে নিউ দিল্লি রেলওয়ে স্টেশন ৩,৩৩৭ কোটি টাকা রাজস্ব উৎপাদন করে ভারতের সবচেয়ে বেশি আয় করা রেলস্টেশনের মর্যাদা অর্জন করেছে। এই বিশাল রাজস্ব উৎপাদনের কারণে নিউ দিল্লি রেলওয়ে স্টেশন ভারতীয় রেলওয়ের অর্থনৈতিক কাঠামোতে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে।
রাজস্বের প্রধান উৎস
নিউ দিল্লি রেলওয়ে স্টেশনের রাজস্বের প্রধান উৎসগুলি হল:
অতিরিক্ত রাজস্ব উৎস
উপরোক্ত প্রধান উৎসগুলি ছাড়াও, নিউ দিল্লি রেলওয়ে স্টেশন বিভিন্ন অতিরিক্ত উৎস থেকে রাজস্ব সংগ্রহ করে, যেমন:
যদিও নিউ দিল্লি রেলওয়ে স্টেশন ভারতের সর্বাধিক রাজস্ব উৎপাদনকারী রেলস্টেশন, দেশের অন্যান্য প্রধান রেলস্টেশনগুলিও উল্লেখযোগ্য রাজস্ব উৎপাদন করে। এই শীর্ষ রেলস্টেশনগুলির মধ্যে রয়েছে:
নিউ দিল্লি রেলওয়ে স্টেশনের ইতিহাস বেশ পুরনো। ১৯২৬ সালে নির্মিত এই স্টেশনটি ১৯৫৬ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয়। প্রাথমিকভাবে একটি মাত্র প্ল্যাটফর্ম নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল এই স্টেশন। পাহারগঞ্জে অবস্থিত স্টেশন ভবনটি ভারতের প্রথম এমন স্টেশন ছিল যেখানে সব শ্রেণীর যাত্রীদের জন্য একই প্রবেশ ও বহির্গমন পথ সহ সাধারণ সুবিধাদি প্রদান করা হয়েছিল।
ক্রমবিকাশ
১৯৫০-এর দশক পর্যন্ত, পুরানো দিল্লি রেলওয়ে স্টেশন ছিল দিল্লির প্রধান রেলওয়ে স্টেশন। ১৯৭০-এর দশকে, স্টেশনটি তার ধারণক্ষমতায় পৌঁছে যাওয়ার পর, স্টেশন এবং রেল ট্র্যাফিক উভয়কেই ডিকনজেস্ট করার জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়।
১৯৮০-এর দশকে, স্টেশনটি ৭টি প্ল্যাটফর্ম পর্যন্ত প্রসারিত হয়, যা ১৯৯৫ সালে ১০টিতে এবং অবশেষে ২০১০ সালের পুনর্নির্মাণের সময় ১৬টিতে বৃদ্ধি পায়। এই পুনর্নির্মাণের অংশ হিসেবে আজমেরি গেট মুখী নতুন স্টেশন ভবনও আপগ্রেড করা হয়। এছাড়াও, স্টেশনটি দিল্লি মেট্রো নেটওয়ার্কের সাথে নিউ দিল্লি মেট্রো স্টেশনের মাধ্যমে সংযুক্ত করা হয়।
১৯৯৯ সাল থেকে, নিউ দিল্লি রেলওয়ে স্টেশন বিশ্বের বৃহত্তম রুট রিলে ইন্টারলকিং (RRI) সিস্টেমের জন্য গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ড ধারণ করে আসছে। এই ইঞ্জিনিয়ারিং অসাধারণত্ব প্রতিটি রেলওয়ের দক্ষ পরিচালনার জন্য ভিত্তি প্রদান করে।
RRI সিস্টেম কি এবং কেন গুরুত্বপূর্ণ?
রুট রিলে ইন্টারলকিং (RRI) সিস্টেম হল একটি নিরাপত্তা ব্যবস্থা যা সিগন্যাল এবং পয়েন্টগুলির ইন্টারলকিং নিশ্চিত করে, যাতে ট্রেনগুলি নিরাপদে চলাচল করতে পারে। এটি ট্রেনের গতিপথ নিয়ন্ত্রণ করে এবং দুর্ঘটনা এড়াতে সাহায্য করে। নিউ দিল্লি রেলওয়ে স্টেশনের RRI সিস্টেম দিনে ৩৫০টিরও বেশি ট্রেনের চলাচল নিয়ন্ত্রণ করে, যা এর অপারেশনাল দক্ষতা ও নিরাপত্তার প্রমাণ।
নিউ দিল্লি রেলওয়ে স্টেশন ১৬টি প্ল্যাটফর্ম এবং ২০টি ট্র্যাক নিয়ে গঠিত, যেখানে প্রতিদিন ২৫০টিরও বেশি ট্রেন শুরু, শেষ বা অতিক্রম করে। এর কৌশলগত অবস্থান এবং আধুনিক সুবিধাগুলি এটিকে যাত্রীদের জন্য একটি পছন্দসই স্টেশন করে তুলেছে।
স্টেশনের বৈশিষ্ট্য
নিউ দিল্লি রেলওয়ে স্টেশন বিভিন্ন প্রয়োজনীয় সুবিধা প্রদান করে:
নিউ দিল্লি রেলওয়ে স্টেশন ক্রমাগত উন্নয়ন ও বিকাশের পথে রয়েছে। স্টেশনের ভিড় কমাতে এবং রেল ট্র্যাফিক উন্নত করতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। এসব উদ্যোগের মধ্যে রয়েছে:
নিউ দিল্লি রেলওয়ে স্টেশন শুধুমাত্র একটি পরিবহন হাব নয়, বরং একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক কেন্দ্রও বটে। এটি সরাসরি এবং পরোক্ষভাবে বিভিন্ন চাকরি সৃষ্টি করে, যা ক্যাটারিং ও খুচরা ব্যবসার মতো সম্পর্কিত পরিষেবাগুলির মাধ্যমে হয়।
দৈনিক যাত্রী ও আয়
২০১১ সালে স্টেশনের দৈনিক রাজস্ব ছিল প্রায় ৭৫ লাখ টাকা (৮৬,০০০ মার্কিন ডলার)। ২০০৯ সালের একটি অধ্যয়ন অনুসারে, রাজধানী অঞ্চলে প্রধান স্টেশনগুলি থেকে দৈনিক যাত্রীর সংখ্যা প্রায় ৭২০,০০০। সাবার্বান রেল পরিষেবার ক্ষেত্রে, নিউ দিল্লি রেলওয়ে স্টেশন প্রায় ৩৮,০০০ দৈনিক অসংরক্ষিত যাত্রীকে আবাসন দেয়।
২০১৬-২০১৮ সাল পর্যন্ত, রোহিত আনন্দ একটি গবেষণা পরিচালনা করেন যেখানে অনুমান করা হয় যে নিউ দিল্লি রেলওয়ে স্টেশনে প্রায় ৪৮২,০০০ দৈনিক যাত্রী আসেন। উৎসবের সময়, দৈনিক যাত্রীর সংখ্যা ৭০০,০০০ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে।
নিউ দিল্লি রেলওয়ে স্টেশন শুধু একটি পরিবহন হাব হিসেবেই নয়, বরং সামাজিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি জাতীয় রাজধানীর শহুরে গতিশীলতা ও অর্থনৈতিক কাঠামোতে একটি অপরিহার্য ভূমিকা পালন করে। প্রতিদিন অর্ধ মিলিয়ন যাত্রী পরিচালনার মাধ্যমে, এটি বিভিন্ন সেক্টরে অর্থনৈতিক কার্যকলাপ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে অবদান রাখে।
শেখ হাসিনা এখন লুটিয়েন্স দিল্লির নিরাপদ আবাসে, জানুন এই অভিজাত ঠিকানায় কারা থাকেন
নিউ দিল্লি রেলওয়ে স্টেশনের অর্থনৈতিক প্রভাব ব্যাপক:
নিউ দিল্লি রেলওয়ে স্টেশন শুধু ভারতের সর্বাধিক রাজস্ব উৎপাদনকারী রেলস্টেশন হিসেবেই নয়, বরং দেশের রেল নেটওয়ার্কের একটি অপরিহার্য অংশ হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত। এর ৩,৩৩৭ কোটি টাকা বার্ষিক রাজস্ব উৎপাদন ভারতীয় রেলওয়ের অর্থনৈতিক কাঠামোতে এর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা প্রমাণ করে।নিউ দিল্লি রেলওয়ে স্টেশনের সাফল্য তার কৌশলগত অবস্থান, উন্নত সুবিধা, এবং ক্রমাগত বিকাশের প্রচেষ্টার প্রতিফলন। এটি প্রমাণ করে যে ভারতীয় রেলওয়ে দেশের অর্থনীতির একটি মূল চালিকা শক্তি হিসেবে কার্যরত। যেহেতু ভারত ক্রমশ আধুনিকায়ন ও বিকাশের পথে এগিয়ে যাচ্ছে, নিউ দিল্লি রেলওয়ে স্টেশনের মত রেল হাবগুলি দেশের পরিবহন অবকাঠামোর শক্তিশালী ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে, যা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও সামাজিক উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করবে।