দেশের রাজনীতি

ভারতে অবৈধ থাকলে ৭ বছর পর্যন্ত জেল আর ১০ লক্ষ টাকা জরিমানা, নতুন আইনে কঠোর শাস্তির বিধান

মঙ্গলবার ১ সেপ্টেম্বর থেকে ভারতে কার্যকর হয়েছে ইমিগ্রেশন অ্যান্ড ফরেনার্স অ্যাক্ট ২০২৫। এই নতুন আইনে অবৈধভাবে ভারতে বসবাসকারীদের জন্য কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। ভুয়ো পাসপোর্ট বা ভিসা ব্যবহার করে দেশে প্রবেশ বা অবস্থানের জন্য সর্বনিম্ন ২ বছর থেকে সর্বোচ্চ…

avatar
Written By : Srijita Ghosh
Updated Now: September 4, 2025 12:15 AM
বিজ্ঞাপন

মঙ্গলবার ১ সেপ্টেম্বর থেকে ভারতে কার্যকর হয়েছে ইমিগ্রেশন অ্যান্ড ফরেনার্স অ্যাক্ট ২০২৫। এই নতুন আইনে অবৈধভাবে ভারতে বসবাসকারীদের জন্য কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। ভুয়ো পাসপোর্ট বা ভিসা ব্যবহার করে দেশে প্রবেশ বা অবস্থানের জন্য সর্বনিম্ন ২ বছর থেকে সর্বোচ্চ ৭ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড এবং ১ লক্ষ থেকে ১০ লক্ষ টাকা পর্যন্ত জরিমানার বিধান রয়েছে।

নতুন আইনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো যে কোনো বিদেশি নাগরিক বৈধ নথি ছাড়া ভারতে প্রবেশ করলে তার বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ ৫ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড বা ৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত জরিমানা অথবা উভয় সাজা হতে পারে। ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও যারা ভারতে থেকে যাবেন, তাদের ক্ষেত্রে ৩ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড এবং ৩ লক্ষ টাকা পর্যন্ত জরিমানার বিধান রয়েছে।

কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক নিতেশ কুমার ব্যাস-এর স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, এই আইনের বিধানগুলো ১ সেপ্টেম্বর ২০২৫ থেকে কার্যকর হবে। বিলটি এ বছরের বাজেট অধিবেশনে পাস হয় এবং রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু ৪ এপ্রিল এতে সম্মতি দেন।

পুরনো চারটি আইনের বিলুপ্তি

এই নতুন আইনটি ভারতের অভিবাসন ক্ষেত্রে একটি যুগান্তকারী পরিবর্তন নিয়ে এসেছে। পাসপোর্ট আইন (১৯২০), বিদেশি নাগরিক নিবন্ধন আইন (১৯৩৯), বিদেশি নাগরিক আইন (১৯৪৬) এবং অভিবাসন আইন (২০০০) – এই চারটি পুরনো আইনের পরিবর্তে একটি একক আধুনিক আইনি কাঠামো তৈরি করা হয়েছে। সরকারের যুক্তি হলো, এই আইনগুলো মূলত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে প্রণীত হয়েছিল এবং বর্তমান আন্তর্জাতিক অভিবাসন পরিস্থিতির সঙ্গে তাল মিলাতে পারছিল না।

ডিটেনশন ক্যাম্প গঠনের নির্দেশ

নতুন আইনের অধীনে সব রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলকে অবৈধ বিদেশিদের জন্য ডিটেনশন ক্যাম্প বা আটক শিবির তৈরি করার নির্দেশ দিয়েছে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক। অবৈধভাবে ভারতে বসবাসকারীদের তাদের নিজ দেশে ফেরত না পাঠানো পর্যন্ত এই আটক শিবিরে রাখা হবে। ইতিমধ্যে অসমে ছয়টি ডিটেনশন সেন্টার চালু রয়েছে ডিব্রুগড়, শিলচর, তেজপুর, জোরহাট, কোকরাঝাড় ও গোয়ালপাড়া জেলায়।

ফরেনার্স ট্রাইব্যুনালকে নতুন ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে যে, কোনো ব্যক্তির নাগরিকত্ব নিয়ে সন্দেহ থাকলে এবং তিনি আদালতে হাজিরা দিতে ব্যর্থ হলে ট্রাইব্যুনাল সরাসরি তাকে ডিটেনশন ক্যাম্পে পাঠানোর নির্দেশ দিতে পারবে। এছাড়াও ট্রাইব্যুনালে সর্বোচ্চ তিনজন সদস্য থাকবেন, যাদের আইনি অভিজ্ঞতা থাকতে হবে এবং কেন্দ্র তাদের যোগ্য বলে বিবেচনা করবে।

নিয়ন্ত্রণ ও নজরদারি বৃদ্ধি

নতুন আইনে বিদেশিদের উপর নজরদারি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করা হয়েছে। হোটেল, বিশ্ববিদ্যালয়, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল এবং নার্সিংহোমগুলোকে বাধ্যতামূলকভাবে বিদেশিদের তথ্য প্রশাসনকে জানাতে হবে। এর উদ্দেশ্য হলো ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ার পরও কেউ ভারতে থেকে যাচ্ছেন কি না তা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা।

আন্তর্জাতিক বিমান ও জাহাজ সংস্থাগুলোকেও যাত্রী এবং ক্রু সদস্যদের তথ্য আগে থেকেই ইমিগ্রেশন অফিসারদের কাছে জমা দিতে হবে। এছাড়াও প্রতিটি বিদেশি যিনি ভিসার জন্য আবেদন করবেন, তাকে বায়োমেট্রিক তথ্য প্রদান করতে হবে।

বিশেষ শ্রেণির জন্য ছাড়

তবে নতুন আইনে কিছু বিশেষ শ্রেণির মানুষের জন্য ছাড় রাখা হয়েছে। বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ যারা ধর্মীয় উৎপীড়নের কারণে ভারতে এসেছেন, তাদের ক্ষেত্রে এই নিয়ম প্রযোজ্য হবে না। হিন্দু, শিখ, বৌদ্ধ, জৈন, পার্সি ও খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের যারা ৩১ ডিসেম্বর ২০২৪ এর আগে ভারতে প্রবেশ করেছেন, তারা এই ছাড়ের আওতায় পড়বেন।

নেপাল ও ভুটানের বাসিন্দারা বিনা ভিসায় শুধুমাত্র পাসপোর্ট দেখিয়ে ভারতে প্রবেশ করতে পারবেন। ২০০৩ সালের আগে আসা তিব্বতিরা এবং নিবন্ধিত শ্রীলঙ্কান তামিল জাতীয়তার মানুষও এই আইনের ব্যতিক্রম।

নিষেধাজ্ঞা ও বিধিনিষেধ

নতুন আইনে কঠোর প্রবেশ নিষেধাজ্ঞার বিধান রাখা হয়েছে। যে কোনো বিদেশি যার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রবিরোধী কার্যকলাপ, গুপ্তচরবৃত্তি, ধর্ষণ, খুন, সন্ত্রাসবাদী কর্মকাণ্ড, শিশু পাচার বা নিষিদ্ধ সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগ রয়েছে, তাকে ভারতে প্রবেশ বা থাকার অনুমতি দেওয়া হবে না।

বিদেশিরা সরকারের অনুমতি ছাড়া বিদ্যুৎ, জল সরবরাহ বা পেট্রোলিয়াম খাতের কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতে পারবেন না। চলচ্চিত্র, ডকুমেন্টারি, ওয়েব সিরিজ তৈরি করলে তা প্রদর্শনের আগে সরকারের লিখিত অনুমতি নিতে হবে। পর্বতারোহণের ক্ষেত্রেও কেন্দ্রের পূর্বানুমতি প্রয়োজন হবে।

ব্যুরো অব ইমিগ্রেশন গঠন

নতুন আইনে ব্যুরো অব ইমিগ্রেশন নামে একটি বিশেষ সংস্থা গঠনের প্রস্তাব রয়েছে। এই সংস্থা দেশের অভিবাসন সংক্রান্ত যাবতীয় নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন, বিদেশি নাগরিকদের প্রবেশ-নিবন্ধন সেবা প্রদান, রাজ্য সরকারগুলোর সঙ্গে সমন্বয় এবং তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পালন করবে।

ইমিগ্রেশন অফিসারদের বিনা পরোয়ানায় গ্রেপ্তারের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। তারা নিয়মিত ইমিগ্রেশন পোস্টের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ, ইমিগ্রেশন জালিয়াতির মামলা তদন্ত এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয়ের কাজ করবেন।

পরিবহন সংস্থাদের দায়বদ্ধতা

নতুন আইনে পরিবহন সংস্থাগুলোর দায়বদ্ধতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। যে কোনো পরিবহন সংস্থা বৈধ নথি ছাড়া বিদেশিদের বহন করলে তাদের বিরুদ্ধে ৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত জরিমানার বিধান রয়েছে। জরিমানা পরিশোধ না করলে সংশ্লিষ্ট যানবাহন আটক করা যেতে পারে।

কোনো বিদেশির প্রবেশ প্রত্যাখ্যান হলে সংশ্লিষ্ট পরিবহন সংস্থাকে তাকে ফেরত নিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব পালন করতে হবে। এছাড়াও সরকার প্রয়োজনে বিদেশিদের তাদের নিজ দেশে পাঠানোর জন্য পরিবহন সংস্থাগুলোকে বাধ্য করতে পারে।

রাজনৈতিক বিতর্ক ও আশঙ্কা

নতুন আইনটি নিয়ে রাজনৈতিক মহলে তীব্র বিতর্ক দেখা দিয়েছে। বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ, এই আইন মূলত বাংলাদেশি মুসলিমদের টার্গেট করার জন্য এবং আগামী নির্বাচনের আগে হিন্দু মেরুকরণের হাওয়া তোলার উদ্দেশ্যে আনা হয়েছে। কংগ্রেস এই আইনকে মৌলিক অধিকার ক্ষুণ্ণকারী বলে অভিহিত করেছে।

তৃণমূল কংগ্রেসের আশঙ্কা, এই আইনের ফলে বৈধ বাঙালি পরিযায়ী শ্রমিকরাও হয়রানির শিকার হতে পারেন। সম্প্রতি বিভিন্ন বিজেপি শাসিত রাজ্যে বাংলায় কথা বলার কারণে পশ্চিমবঙ্গের শ্রমিকদের বাংলাদেশি বলে দাগিয়ে দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে।

আন্তর্জাতিক তুলনা

বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতের এই নতুন ইমিগ্রেশন আইন আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে তৈরি করা হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের “ক্যাচ অ্যান্ড রিভোক” সিস্টেমের অধীনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের ভিসা বাতিল করে। অস্ট্রেলিয়া নিরাপত্তা ঝুঁকি হিসেবে বিবেচিত অ-নাগরিকদের আটক করার অধিকার রাখে।

তবে আইনি বিশেষজ্ঞ কেতন মুখিজা মনে করেন, এই আইন ভারতের ইমিগ্রেশন ব্যবস্থাকে আধুনিকীকরণ এবং জাতীয় নিরাপত্তা বৃদ্ধি করবে, কিন্তু বাস্তবায়নে কিছু চ্যালেঞ্জ থাকতে পারে। তিনি ইমিগ্রেশন অফিসারদের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল ব্যবস্থার উন্নতি এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা যাতে বৈধ ভ্রমণকারীদের বিপদে না ফেলে সেদিকে নজর দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।

ভবিষ্যৎ প্রভাব

ইমিগ্রেশন অ্যান্ড ফরেনার্স অ্যাক্ট ২০২৫ ভারতের অভিবাসন নীতিতে একটি বড় পরিবর্তনের সূচনা করেছে। এই আইনের মাধ্যমে ভারত তার সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ ও জাতীয় নিরাপত্তা জোরদার করার পাশাপাশি আধুনিক ডিজিটাল পদ্ধতি ব্যবহার করে বিদেশিদের চলাচল নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। যদিও এর সঠিক বাস্তবায়ন এবং মানবাধিকার রক্ষার বিষয়ে এখনও প্রশ্ন রয়ে গেছে, এই আইনটি নিঃসন্দেহে ভারতের ভবিষ্যৎ অভিবাসন নীতির মূল ভিত্তি হয়ে দাঁড়াবে।