স্বপ্নদোষ বা নাইটফল (Nocturnal Emission) নিয়ে আমাদের সমাজে বা বয়ঃসন্ধিকালে থাকা কিশোর-তরুণদের মনে হাজারও প্রশ্ন এবং ভীতি কাজ করে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের মতে, স্বপ্নদোষ সম্পূর্ণ একটি স্বাভাবিক শরীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া এবং এর কোনো নির্দিষ্ট বা ধরাবাঁধা সময়সীমা নেই। তবে সাধারণ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বয়ঃসন্ধিকালে বা তরুণ বয়সে সপ্তাহে ১-২ বার অথবা মাসে ৩-৪ বার স্বপ্নদোষ হওয়াকে চিকিৎসকরা সম্পূর্ণ স্বাভাবিক বলে গণ্য করেন। এমনকি যদি এটি আরও বেশিবার হয়, তবুও শারীরিক কোনো সমস্যা না থাকলে ভয়ের কিছু নেই। [International Society for Sexual Medicine] এর তথ্যমতে, এটি পুরুষ প্রজননতন্ত্রের সুস্থতার লক্ষণ।
এই আর্টিকেলে আমরা স্বপ্নদোষের frequency (কতদিন পর পর হয়), এর পেছনের বিজ্ঞান, ভুল ধারণা এবং কখন এটি চিকিৎসার প্রয়োজন হতে পারে—তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।
স্বপ্নদোষ বা নাইটফল আসলে কী?
স্বপ্নদোষ হলো ঘুমের মধ্যে অনিচ্ছাকৃতভাবে বীর্যপাতের ঘটনা। এটি সাধারণত ঘুমের REM (Rapid Eye Movement) পর্যায়ে ঘটে, যখন মানুষ স্বপ্ন দেখে। চিকিৎসা পরিভাষায় একে ‘Nocturnal Emission’ বলা হয়।
বয়ঃসন্ধিকালে শরীরে টেস্টোস্টেরন (Testosterone) হরমোনের প্রভাবে শুক্রাশয়ে প্রতিনিয়ত শুক্রাণু তৈরি হতে থাকে। যখন বীর্য থলিতে (Seminal Vesicle) বীর্য পূর্ণ হয়ে যায় এবং দীর্ঘসময় ধরে যৌন মিলন বা হস্তমৈথুণের মাধ্যমে তা বের হয় না, তখন শরীর ঘুমের মধ্যে নিজে থেকেই সেই অতিরিক্ত বীর্য বের করে দেয়। একে শরীরের ‘সেফটি ভালভ’ (Safety Valve) বা প্রাকৃতিক নিষ্কাশন প্রক্রিয়া বলা যেতে পারে।
বিশেষ দ্রষ্টব্য: স্বপ্নদোষ শুধুমাত্র পুরুষদের হয় এমন নয়, নারীদেরও ঘুমের মধ্যে যৌন উত্তেজনা বা ‘Sleep Orgasm’ হতে পারে, তবে পুরুষদের ক্ষেত্রে বীর্যপাতের কারণে এটি দৃশ্যমান হয়।
স্বপ্নদোষ কতদিন পর পর হয়? (পরিসংখ্যান ও বিশ্লেষণ)
স্বপ্নদোষের কোনো নির্দিষ্ট রুটিন নেই যে এটি প্রতি ৭ দিন বা ১০ দিন পর পর হবে। এটি ব্যক্তিভেদে, বয়সভেদে এবং জীবনযাত্রার ওপর ভিত্তি করে ভিন্ন হয়। এখানে বয়সভিত্তিক একটি সাধারণ ধারণা দেওয়া হলো:
১. বয়ঃসন্ধিকাল (Puberty: ১২-১৮ বছর)
এই সময়ে শরীরে হরমোনের ব্যাপক পরিবর্তন হয়। তাই এই বয়সে স্বপ্নদোষের হার সবচেয়ে বেশি থাকে।
-
স্বাভাবিক মাত্রা: সপ্তাহে ১-২ বার বা মাসে ৪-৮ বার পর্যন্ত হতে পারে।
-
কারণ: হরমোনের তীব্রতা এবং নতুন শুক্রাণু উৎপাদনের উচ্চ হার।
২. প্রাপ্তবয়স্ক (Adulthood: ১৯-৩০ বছর)
বয়স বাড়ার সাথে সাথে হরমোন স্থিতিশীল হতে থাকে এবং অনেকেই যৌন জীবনে সক্রিয় হন।
-
স্বাভাবিক মাত্রা: মাসে ২-৩ বার অথবা অনেকের ক্ষেত্রে আরও কম।
-
কারণ: নিয়মিত যৌন মিলন বা হস্তমৈথুণের ফলে বীর্য জমা থাকে না, তাই স্বপ্নদোষ কমে যায়।
৩. মধ্যবয়স ও তার পরে (৩০+ বছর)
-
স্বাভাবিক মাত্রা: খুবই অনিয়মিত। বছরে কয়েকবার হতে পারে বা নাও হতে পারে।
-
কারণ: টেস্টোস্টেরন লেভেল কিছুটা কমতে থাকে এবং যৌন অভ্যাসের পরিবর্তন হয়।
স্বপ্নদোষ হচ্ছে না? বাবা হতে পারবেন তো? জানুন আসল বৈজ্ঞানিক সত্যিটা!
পরিসংখ্যান কী বলে? (Data & Statistics)
প্রখ্যাত কিনসে রিপোর্ট (Kinsey Reports) এবং আধুনিক ইউরোলজিক্যাল সমীক্ষা অনুযায়ী:
-
প্রায় ৮৩% পুরুষ জীবনের কোনো না কোনো সময় স্বপ্নদোষের অভিজ্ঞতা লাভ করেন।
-
গড়পড়তা হিসেবে, অবিবাহিত পুরুষদের ক্ষেত্রে প্রতি ৩-৪ সপ্তাহে একবার স্বপ্নদোষ হওয়া খুব সাধারণ ঘটনা।
-
যারা যৌনভাবে নিষ্ক্রিয় (Sexually Inactive), তাদের ক্ষেত্রে এই হার বেশি হতে পারে।
| বয়স গ্রুপ | সম্ভাব্য গড় ফ্রিকোয়েন্সি (মাসিক) | মন্তব্য |
| ১২ – ১৫ বছর | ৪ – ৮ বার | হরমোনের পরিবর্তনের কারণে সর্বোচ্চ। |
| ১৬ – ২০ বছর | ৩ – ৬ বার | অত্যন্ত সাধারণ এবং স্বাভাবিক। |
| ২১ – ৩০ বছর | ১ – ৩ বার | যৌন জীবনের ওপর নির্ভর করে। |
| ৩০+ বছর | অনিয়মিত | খুব কম দেখা যায়। |
কেন স্বপ্নদোষ হয়? (বৈজ্ঞানিক কারণসমূহ)
অনেকের মনে প্রশ্ন জাগে, কেন হঠাৎ ঘুমের মধ্যে এমন হয়? এর পেছনে প্রধানত তিনটি কারণ দায়ী:
১. হরমোনের প্রভাব (Hormonal Factors)
পুরুষের শরীরে টেস্টোস্টেরন হরমোনই মূলত যৌন ইচ্ছা এবং বীর্য উৎপাদনের জন্য দায়ী। বয়ঃসন্ধিকালে এই হরমোনের মাত্রা তুঙ্গে থাকে, ফলে শরীর ঘন ঘন বীর্য উৎপাদন করে এবং তা বের করার প্রয়োজন হয়।
২. দীর্ঘকালীন বিরতি (Sexual Abstinence)
যদি কোনো ব্যক্তি দীর্ঘসময় ধরে যৌন মিলন বা হস্তমৈথুন না করেন, তবে শরীরে উৎপাদিত বীর্য জমা হতে থাকে। শরীর তখন প্রাকৃতিক উপায়ে পুরনো বীর্য বের করে দিয়ে নতুন বীর্যের জন্য জায়গা তৈরি করে। একে বলা হয় “Sperm Turnover”।
৩. ঘুমের ধরণ এবং স্বপ্ন (REM Sleep)
গবেষণায় দেখা গেছে, গভীর ঘুমের সময় (REM Cycle) মস্তিষ্ক সক্রিয় থাকে এবং শরীরে রক্ত সঞ্চালন বাড়ে। এই সময়ে যৌনাঙ্গে রক্তপ্রবাহ বাড়ার ফলে লিঙ্গোত্থান (Erection) হয় এবং উত্তেজনাকর স্বপ্নের কারণে বীর্যপাত ঘটতে পারে। অনেক সময় স্বপ্ন মনে না থাকলেও এটি হতে পারে।
৪. বাহ্যিক উদ্দীপনা
ঘুমানোর সময় খুব আঁটসাঁট অন্তর্বাস পরা, বা বিছানার ঘর্ষণে যৌনাঙ্গে উদ্দীপনা সৃষ্টি হলে স্বপ্নদোষ হতে পারে।
স্বপ্নদোষ কি স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর? (Myths vs. Reality)
আমাদের সমাজে, বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ায় স্বপ্নদোষ নিয়ে প্রচুর ভুল ধারণা বা ‘Dhat Syndrome’ (ধাতু সিন্ড্রোম) নামক মানসিক ভীতি কাজ করে। আসুন বৈজ্ঞানিক সত্যটা জেনে নিই।
১. মিথ: স্বপ্নদোষ হলে শরীর দুর্বল হয়ে যায়।
-
সত্য: এটি সম্পূর্ণ ভুল। বীর্যপাত একটি সাধারণ শারীরিক প্রক্রিয়া। একবার বীর্যপাতে যে পরিমাণ ক্যালরি বা পুষ্টি বের হয়, তা এক গ্লাস দুধ বা একটি ডিমের চেয়েও কম। শরীর খুব দ্রুত এই ঘাটতি পূরণ করে নেয়। দুর্বলতা যা অনুভব হয়, তা মূলত মানসিক দুশ্চিন্তার কারণে।
২. মিথ: বীর্য রক্ত থেকে তৈরি, তাই বীর্যপাত মানে রক্তক্ষরণ।
-
সত্য: বীর্য রক্ত থেকে তৈরি হয় না। এটি প্রোটিন, ফ্রুক্টোজ এবং এনজাইমের মিশ্রণ যা শুক্রাশয় এবং প্রোস্টেট গ্ল্যান্ড থেকে নিঃসৃত হয়। এর সাথে রক্তের সরাসরি কোনো সম্পর্ক নেই।
৩. মিথ: স্বপ্নদোষ হলে উচ্চতা কমে বা চোখের জ্যোতি কমে।
-
সত্য: চিকিৎসা বিজ্ঞানে এর কোনো ভিত্তি নেই। স্বপ্নদোষের সাথে চোখের দৃষ্টি বা শারীরিক গঠনের কোনো সম্পর্ক নেই।
৪. মিথ: ঘন ঘন স্বপ্নদোষ মানেই যৌন রোগ।
-
সত্য: ঘন ঘন স্বপ্নদোষ কোনো রোগ নয়। তবে যদি এটি ঘুমের ব্যাঘাত ঘটায় বা যৌনাঙ্গে ব্যথা সৃষ্টি করে, তবে ইউরোলজিস্টের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
Reference: [Mayo Clinic] এবং [NHS UK] স্পষ্টভাবে জানিয়েছে যে স্বপ্নদোষ পুরুষ প্রজননতন্ত্রের একটি সুস্থ ও স্বাভাবিক প্রক্রিয়া।
কখন ডাক্তার দেখানো প্রয়োজন?
যদিও স্বপ্নদোষ স্বাভাবিক, কিছু বিশেষ ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি হতে পারে:
১. অতিরিক্ত ফ্রিকোয়েন্সি: যদি টিনেজ বয়সের পরে সপ্তাহে ৩-৪ বারের বেশি বা প্রতিদিন স্বপ্নদোষ হয় এবং এর ফলে শরীর খুব ক্লান্ত লাগে।
২. ব্যথা বা জ্বালাপোড়া: বীর্যপাতের সময় বা পরে যদি যৌনাঙ্গে ব্যথা হয়।
৩. রক্তপাত: বীর্যের সাথে রক্ত দেখা গেলে।
৪. মানসিক বিপর্যয়: যদি এটি নিয়ে অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা আপনার দৈনন্দিন কাজে ব্যাঘাত ঘটায়।
যৌন শক্তি বাড়াতে প্রাকৃতিক খাবার: সুস্থ জীবনের গোপন রহস্য
স্বপ্নদোষ নিয়ন্ত্রণের উপায় ও লাইফস্টাইল পরিবর্তন
স্বপ্নদোষ পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব নয় এবং এটি করার প্রয়োজনও নেই। তবে যারা অতিরিক্ত স্বপ্নদোষে ভুগছেন, তারা কিছু প্রাকৃতিক নিয়ম মেনে এর মাত্রা কমাতে পারেন।
১. ঘুমের আগে মূত্রত্যাগ
ঘুমানোর আগে প্রস্রাব করে ব্লাডার খালি করে ঘুমালে যৌনাঙ্গে চাপ কম পড়ে, যা স্বপ্নদোষের সম্ভাবনা কমাতে পারে।
২. ঢিলেঢালা পোশাক
রাতে ঘুমানোর সময় আঁটসাঁট আন্ডারওয়্যার বা প্যান্ট না পরে ঢিলেঢালা সুতির পোশাক পরা উচিত। এতে যৌনাঙ্গে ঘর্ষণ কম হয় এবং তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে থাকে।
৩. খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন
-
রাতে ঘুমানোর ঠিক আগে অতিরিক্ত মশলাদার বা গুরুপাক খাবার এড়িয়ে চলুন।
-
রাতে কফি বা চা পান করা থেকে বিরত থাকুন, কারণ ক্যাফেইন স্নায়ু উত্তেজিত করতে পারে।
-
প্রচুর পরিমাণে পানি পান করুন এবং জিঙ্ক ও ভিটামিন সমৃদ্ধ খাবার (যেমন: বাদাম, ডিম, সবুজ শাকসবজি) খান।
৪. মানসিক প্রশান্তি ও যোগব্যায়াম
-
মানসিক চাপ বা স্ট্রেস হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে। নিয়মিত মেডিটেশন বা যোগব্যায়াম করুন।
-
কেগেল ব্যায়াম (Kegel Exercise) পেলভিক ফ্লোরের পেশী শক্তিশালী করতে সাহায্য করে, যা বীর্যপাতের ওপর নিয়ন্ত্রণ আনতে পারে।
৫. ঘুমানোর ভঙ্গি
উপুড় হয়ে বা পেটের ওপর ভর দিয়ে ঘুমালে যৌনাঙ্গে চাপ পড়ে এবং উদ্দীপনা বাড়ে। তাই চিৎ হয়ে বা একপাশে কাত হয়ে ঘুমানোর অভ্যাস করুন।
৬. পর্নোগ্রাফি বা অতিরিক্ত যৌন চিন্তা পরিহার
ঘুমানোর আগে উত্তেজনাপূর্ণ বই পড়া বা ভিডিও দেখা থেকে বিরত থাকুন। মনকে শান্ত রাখতে ভালো বই পড়া বা হালকা গান শোনা যেতে পারে।
মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ও সমাধান
স্বপ্নদোষের শারীরিক ক্ষতির চেয়ে মানসিক প্রভাব বেশি দেখা যায়। অনেক তরুণ অপরাধবোধে ভোগেন বা মনে করেন তারা কোনো পাপ কাজ করেছেন।
-
পিতামাতার ভূমিকা: কিশোরদের এই বিষয়ে সঠিক যৌন শিক্ষা (Sex Education) দেওয়া জরুরি। তাদের বোঝাতে হবে যে এটি শরীরের একটি স্বাভাবিক পরিবর্তনের অংশ।
-
কাউন্সেলিং: যদি কেউ অতিরিক্ত হীনম্মন্যতায় ভোগেন, তবে একজন সাইকোলজিস্ট বা সেক্সোলজিস্টের সাথে কথা বলা উচিত।
নারীদের কি স্বপ্নদোষ হয়?
অনেকেই মনে করেন এটি শুধু পুরুষদের বিষয়। কিন্তু [Journal of Sex Research] এর একটি গবেষণায় দেখা গেছে, প্রায় ৩৭% নারী তাদের জীবনে অন্তত একবার ঘুমের মধ্যে অর্গাজম বা যৌন সুখ অনুভব করেছেন। নারীদের ক্ষেত্রে বীর্যপাত না হওয়ায় এটি বোঝা কঠিন, কিন্তু শারীরিক প্রক্রিয়াটি অনেকটা একই রকম (যেমন: যোনিপথ পিচ্ছিল হওয়া বা হৃদস্পন্দন বেড়ে যাওয়া)।
উপসংহার (Conclusion)
পরিশেষে বলা যায়, স্বপ্নদোষ কতদিন পর পর হয়—এর কোনো নির্দিষ্ট গণিত নেই। মাসে ৪ বার হওয়া যেমন স্বাভাবিক, তেমনি মাসে ২০ বার হওয়াও বয়ঃসন্ধিকালে অস্বাভাবিক নয়, আবার একেবারে না হওয়াও কোনো রোগ নয়। এটি শরীরের নিজস্ব পরিস্কার প্রক্রিয়া।
মূল কথা:
-
স্বপ্নদোষ কোনো রোগ নয়, এটি স্বাস্থ্যের লক্ষণ।
-
এর কারণে শরীর ক্ষয় হয় না বা ভবিষ্যতে যৌন অক্ষমতা তৈরি হয় না।
-
ভুল ধারণা বা কুসংস্কারে কান না দিয়ে সঠিক চিকিৎসা বিজ্ঞানকে জানুন।
আপনার যদি মনে হয় এটি আপনার জীবনযাত্রায় সমস্যা তৈরি করছে, তবে সংকোচ না করে একজন চর্ম ও যৌন রোগ বিশেষজ্ঞের (Dermatologist & Venereologist) বা ইউরোলজিস্টের পরামর্শ নিন। সুস্থ থাকুন, দুশ্চিন্তামুক্ত থাকুন।











