Nipah Virus Symptoms: পশ্চিমবঙ্গ এবং কেরালায় নিপাহ ভাইরাসের নতুন সংক্রমণ শনাক্ত হওয়ার পর সারাদেশে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে পশ্চিমবঙ্গের বারাসাতের একটি বেসরকারি হাসপাতালের দুই নার্স এই মারাত্মক ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন বলে পুনে থেকে জাতীয় ভাইরোলজি ইনস্টিটিউট নিশ্চিত করেছে। একই সময়ে, কেরালার মালাপ্পুরম জেলায় একজন ১৮ বছর বয়সী মহিলা নিপাহ সংক্রমণে মারা গিয়েছেন এবং আরেকজন রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এই ভাইরাসের মৃত্যুহার অত্যন্ত বেশি—ভারতে ৮২.৭% থেকে ৯১.৭% পর্যন্ত—যা একে একটি গুরুতর জনস্বাস্থ্য সমস্যা করে তুলেছে।
নিপাহ ভাইরাস কী এবং কোথা থেকে এসেছে
নিপাহ ভাইরাস (NiV) হল একটি জুনোটিক রোগ যা প্রথম ১৯৯৮-১৯৯৯ সালে মালয়েশিয়ায় শনাক্ত হয়েছিল। ফলাহারী বাদুড় (Pteropus প্রজাতি) এই ভাইরাসের প্রাকৃতিক বাহক। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) নিপাহ ভাইরাসকে উচ্চ-অগ্রাধিকার রোগজীবাণু হিসাবে তালিকাভুক্ত করেছে কারণ এর মৃত্যুহার অত্যন্ত উচ্চ এবং বর্তমানে কোনো অনুমোদিত চিকিৎসা বা টিকা নেই। ভারতে, ২০০১ সালে পশ্চিমবঙ্গে এবং ২০১৮ সাল থেকে কেরালায় নিয়মিতভাবে প্রাদুর্ভাব দেখা যাচ্ছে।
২০২৬ সালের জানুয়ারিতে, পশ্চিমবঙ্গ সরকার ব্যাপক সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। বারাসাতের দুই নার্সের নমুনা AIIMS কল্যাণীতে প্রাথমিকভাবে পজিটিভ আসার পর পুনে থেকে পুনরায় নিশ্চিত করা হয়েছে। স্বাস্থ্য বিভাগ ১২০ জনেরও বেশি ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের চিহ্নিত করেছে যারা এখন হোম আইসোলেশনে রয়েছেন।
নিপাহ ভাইরাসের প্রাথমিক লক্ষণ: কখন সতর্ক হবেন
নিপাহ ভাইরাসের প্রাথমিক লক্ষণগুলো সাধারণ ফ্লু বা জ্বরের মতোই মনে হতে পারে, যা রোগ নির্ণয়কে জটিল করে তোলে। ভাইরাসের সংস্পর্শে আসার পর সাধারণত ৪ থেকে ১৪ দিনের মধ্যে লক্ষণ দেখা দেয়। প্রাথমিক পর্যায়ে যেসব লক্ষণ দেখা যায়:
-
জ্বর: হঠাৎ করে উচ্চ জ্বর আসা নিপাহ সংক্রমণের প্রথম এবং সবচেয়ে সাধারণ লক্ষণ
-
তীব্র মাথাব্যথা: সাধারণ মাথাব্যথার চেয়ে অনেক বেশি তীব্র, প্রায়ই মাথা ঘোরা বা তন্দ্রাভাব সহ
-
পেশীতে ব্যথা এবং ক্লান্তি: সারা শরীরে তীব্র ব্যথা এবং দুর্বলতা অনুভব করা
-
বমি এবং গলাব্যথা: পরিপাকতন্ত্রে সংক্রমণের লক্ষণ
-
শ্বাসকষ্ট: কাশি, শ্বাস নিতে অসুবিধা বা দম খাটো হয়ে আসা
WHO-এর তথ্য অনুসারে, সংক্রমিত ব্যক্তিরা প্রাথমিকভাবে জ্বর, মাথাব্যথা, মায়ালজিয়া (পেশী ব্যথা), বমি এবং গলাব্যথায় আক্রান্ত হন। এরপর মাথা ঘোরা, তন্দ্রাভাব, পরিবর্তিত চেতনা এবং স্নায়বিক লক্ষণ দেখা দিতে পারে যা তীব্র এনসেফালাইটিস নির্দেশ করে।
মারাত্মক লক্ষণ: জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজন
নিপাহ ভাইরাস সংক্রমণ দ্রুত গুরুতর আকার ধারণ করতে পারে এবং কিছু ক্ষেত্রে মাত্র ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে রোগী কোমায় চলে যেতে পারে। যেসব লক্ষণ দেখা মাত্রই অবিলম্বে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া প্রয়োজন:
-
এনসেফালাইটিস বা মস্তিষ্কের প্রদাহ: এটি নিপাহ সংক্রমণে মৃত্যুর প্রধান কারণ, যা ৯৫% মৃত্যুর জন্য দায়ী
-
বারবার বমি এবং খিঁচুনি: মস্তিষ্কে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার লক্ষণ
-
পরিবর্তিত মানসিক অবস্থা বা কোমা: বিভ্রান্তি, কথা জড়িয়ে যাওয়া, বা অচেতন হয়ে পড়া
-
তীব্র শ্বাসকষ্ট: অ্যাটিপিক্যাল নিউমোনিয়া এবং তীব্র শ্বাসতন্ত্রের সমস্যা
-
শ্বাসযন্ত্রের ব্যর্থতা: যা ভেন্টিলেশন সাপোর্ট প্রয়োজন করে
টেলিগ্রাফ ইন্ডিয়ার রিপোর্ট অনুসারে, ডাক্তাররা জোর দিয়েছেন যে বারবার বমি, খিঁচুনি, পরিবর্তিত মানসিক অবস্থা বা কোমা হল প্রধান সতর্কতা সংকেত। যদি কেউ সম্ভাব্য সংস্পর্শের পরে জ্বর, মাথাব্যথা, খিঁচুনি বা পরিবর্তিত চেতনা অনুভব করেন, তাহলে অবিলম্বে চিকিৎসা সহায়তা নেওয়া উচিত।
নিপাহ ভাইরাসের মৃত্যুহার: ভারতে সবচেয়ে বিপজ্জনক
একটি সাম্প্রতিক মেটা-অ্যানালাইসিস (২০২৪) দেখিয়েছে যে ২০১৪-২০২৩ দশকে বিশ্বব্যাপী নিপাহ ভাইরাসের মৃত্যুহার ৮০.১% ছিল, যা পূর্ববর্তী দশক (২০০৪-২০১৩) এর ৫৪.১% থেকে ২৪% বৃদ্ধি পেয়েছে। ১৯৯৪-২০২৩ সাল পর্যন্ত বিশ্লেষণ করা দেশগুলোর মধ্যে ভারতে সর্বোচ্চ মৃত্যুহার রয়েছে—৮২.৭% (৯৫% CI: ৭৪.৬-৮৮.৬%)। সাবগ্রুপ বিশ্লেষণে দেখা গেছে যে ভারত গত দুই দশক ধরে ধারাবাহিকভাবে সর্বোচ্চ মৃত্যুহার বজায় রেখেছে (৯১.৭% এবং ৮৯.৩%)।
অন্যান্য দেশের তুলনায়:
| দেশ | মৃত্যুহার (১৯৯৪-২০২৩) |
|---|---|
| ভারত | ৮২.৭% |
| বাংলাদেশ | ৬২.১% |
| ফিলিপাইন্স | ৫২.৯% |
| মালয়েশিয়া | ২৮.৯% |
| সিঙ্গাপুর | ২১% |
এই উচ্চ মৃত্যুহার নিপাহ ভাইরাসকে একটি গুরুতর জনস্বাস্থ্য চ্যালেঞ্জ করে তোলে, বিশেষ করে ভারতীয় উপমহাদেশে। মৃত্যুর প্রধান জটিলতা হল এনসেফালাইটিস, যা ৯৫% ক্ষেত্রে দায়ী।
নিপাহ ভাইরাস কীভাবে ছড়ায়: সংক্রমণের পথ
নিপাহ ভাইরাস বিভিন্ন উপায়ে মানুষের মধ্যে ছড়াতে পারে, যা রোগ নিয়ন্ত্রণকে জটিল করে তোলে:
বাদুড় থেকে মানুষে সংক্রমণ
ফলাহারী বাদুড় (ফ্লাইং ফক্স) নিপাহ ভাইরাসের প্রাকৃতিক আধার। মানুষ নিম্নলিখিত উপায়ে সংক্রমিত হতে পারে:
-
দূষিত খেজুরের রস পান করা: বাদুড় খেজুর গাছের রসে প্রস্রাব, মল বা লালা দিয়ে দূষিত করে
-
কাঁচা ফল খাওয়া: বাদুড়ের কামড়ের চিহ্নযুক্ত বা দূষিত ফল খাওয়া
-
বাদুড়ের থাকার এলাকায় যাওয়া: যেখানে বাদুড়ের কলোনি রয়েছে সেখানে ঘোরাফেরা করা
WHO-এর নির্দেশনা অনুসারে, তাজা সংগৃহীত খেজুরের রস অবশ্যই ফুটিয়ে নেওয়া উচিত এবং ফল খাওয়ার আগে ভালোভাবে ধুয়ে খোসা ছাড়িয়ে নিতে হবে। বাদুড়ের কামড়ের চিহ্নযুক্ত ফল ফেলে দেওয়া উচিত।
মানুষ থেকে মানুষে সংক্রমণ
নিপাহ ভাইরাসের একটি উদ্বেগজনক দিক হল এটি মানুষ থেকে মানুষে ছড়াতে পারে, বিশেষ করে স্বাস্থ্যসেবা পরিবেশে। পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক ঘটনায় এটি স্পষ্ট যেখানে দুই নার্স সংক্রমিত হয়েছেন, সম্ভবত একজন সহকর্মী বা রোগী থেকে। সংক্রমণ ঘটতে পারে:
-
সরাসরি শারীরিক যোগাযোগ: সংক্রমিত ব্যক্তির সাথে নিকট যোগাযোগ
-
শ্বাসতন্ত্রের ড্রপলেট: কাশি বা হাঁচির মাধ্যমে
-
দূষিত পৃষ্ঠতল: সংক্রমিত তরল স্পর্শ করা
স্বাস্থ্যকর্মী এবং রোগীদের পরিচর্যাকারীরা উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছেন, তাই কমপক্ষে ২১ দিনের জন্য মাস্ক পরা এবং রোগী আইসোলেশন কার্যকর ব্যবস্থা।
পশু থেকে মানুষে সংক্রমণ
যদিও শূকর নিপাহ ভাইরাসের পরিবর্ধক হোস্ট হতে পারে (মালয়েশিয়ার প্রাথমিক প্রাদুর্ভাবে দেখা গেছে), ভারতের বর্তমান প্রাদুর্ভাবগুলোতে এটি একটি প্রধান কারণ নয়। তবে, সংক্রমিত পশুর সাথে যোগাযোগ এড়ানো গুরুত্বপূর্ণ।
নিপাহ ভাইরাস থেকে নিজেকে রক্ষা করার উপায়
যেহেতু কোনো অনুমোদিত টিকা নেই, প্রতিরোধই হল নিপাহ ভাইরাস থেকে সুরক্ষার একমাত্র উপায়। নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলো মেনে চলুন:
খাদ্য সুরক্ষা ব্যবস্থা
-
তাজা খেজুরের রস কাঁচা পান করবেন না; সর্বদা ফুটিয়ে নিন
-
সমস্ত ফল খাওয়ার আগে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে ধুয়ে এবং খোসা ছাড়িয়ে খান
-
বাদুড়ের কামড়ের চিহ্নযুক্ত বা আংশিকভাবে খাওয়া ফল এড়িয়ে চলুন
-
কাঁচা খাবার সংগ্রহ এবং সংরক্ষণের সময় সতর্ক থাকুন
পরিবেশগত সতর্কতা
-
বাদুড়ের থাকার এলাকা এড়িয়ে চলুন যেখানে বাদুড়ের কলোনি জানা আছে
-
আপনার বাড়ির চারপাশ পরিষ্কার রাখুন এবং বাদুড় আকৃষ্ট হতে পারে এমন ফলের গাছ থেকে দূরত্ব বজায় রাখুন
-
খেজুর গাছের সুরক্ষা নিশ্চিত করুন যাতে বাদুড় রস দূষিত করতে না পারে
ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যবিধি
-
নিয়মিত হাত ধোয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষ করে রোগীদের যত্ন নেওয়ার পরে
-
সংক্রমিত বা সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের সাথে নিকট অরক্ষিত শারীরিক যোগাযোগ এড়িয়ে চলুন
-
জনাকীর্ণ স্থানে বা হাসপাতালে মাস্ক পরুন
স্বাস্থ্যসেবা পরিবেশে সুরক্ষা
স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য WHO নিম্নলিখিত সুপারিশ করেছে:
-
সন্দেহজনক বা নিশ্চিত সংক্রমণের রোগীদের যত্ন নেওয়ার সময় সর্বদা স্ট্যান্ডার্ড ইনফেকশন কন্ট্রোল প্রিকশনস প্রয়োগ করুন
-
স্ট্যান্ডার্ড প্রিকশনগুলোর পাশাপাশি কন্টাক্ট এবং ড্রপলেট প্রিকশন ব্যবহার করুন
-
নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে এয়ারবর্ন প্রিকশন প্রয়োজন হতে পারে
-
রোগীদের কমপক্ষে ২১ দিনের জন্য আইসোলেশনে রাখুন
নিপাহ ভাইরাসের চিকিৎসা: বর্তমান অবস্থা
বর্তমানে নিপাহ ভাইরাসের কোনো নির্দিষ্ট অ্যান্টিভাইরাল চিকিৎসা অনুমোদিত নেই। চিকিৎসা মূলত সাপোর্টিভ কেয়ারের উপর নির্ভরশীল:
সাপোর্টিভ কেয়ার
-
ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট (ICU) সাপোর্ট: গুরুতর রোগীদের জন্য
-
ভেন্টিলেশন সাপোর্ট: শ্বাসযন্ত্রের ব্যর্থতার জন্য
-
জটিলতা ব্যবস্থাপনা: এনসেফালাইটিস, খিঁচুনি এবং অন্যান্য স্নায়বিক সমস্যার চিকিৎসা
-
পুষ্টি এবং হাইড্রেশন: রোগীর স্বাস্থ্য বজায় রাখার জন্য
২০২৫ সালের একটি গবেষণা অনুসারে, NiVD কেয়ার উন্নত করার জন্য চারটি মূল কৌশল প্রস্তাবিত: ১) প্রাথমিক কেস শনাক্তকরণ বাড়ানো, ২) ফলাফল উন্নত করতে সাপোর্টিভ কেয়ার অপ্টিমাইজ করা, ৩) এনসেফালাইটিসকে কেন্দ্র করে একটি সিনড্রোমিক পদ্ধতি গ্রহণ করা, এবং ৪) কম কেস সংখ্যার জন্য উপযুক্ত উদ্ভাবনী ট্রায়াল ডিজাইন অন্বেষণ করা।
প্রতিশ্রুতিশীল চিকিৎসা
মনোক্লোনাল অ্যান্টিবডি m102.4 ফেজ ১ ট্রায়াল সফলভাবে সম্পন্ন করেছে এবং প্রাথমিক লক্ষণযুক্ত রোগী এবং ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের মৃত্যু প্রতিরোধে উল্লেখযোগ্য সম্ভাবনা রাখে। তবে, এটি এখনও পরীক্ষামূলক পর্যায়ে রয়েছে এবং ব্যাপকভাবে উপলব্ধ নয়।
টিকা উন্নয়ন: আশার আলো
যদিও বর্তমানে কোনো অনুমোদিত নিপাহ ভ্যাকসিন নেই, বেশ কয়েকটি প্রতিশ্রুতিশীল ক্যান্ডিডেট ক্লিনিকাল ট্রায়ালে রয়েছে:
PHV02 ভ্যাকসিন
জানুয়ারি ২০২৬-এ, CEPI (Coalition for Epidemic Preparedness Innovations) বাংলাদেশে ফেজ II ট্রায়ালের জন্য Public Health Vaccines-কে US$17.3 মিলিয়ন প্রদান করেছে। PHV02 ভ্যাকসিন অনুমোদিত ইবোলা ভ্যাকসিনের মতো একই rVSV প্রযুক্তির উপর ভিত্তি করে তৈরি। প্রাথমিক ক্লিনিকাল ট্রায়ালে এটি একটি ভাল নিরাপত্তা প্রোফাইল এবং ইমিউনোজেনিসিটি প্রদর্শন করেছে। গবেষকরা বাংলাদেশে প্রায় ৫০০ প্রাপ্তবয়স্ক এবং ৭৫ শিশু অংশগ্রহণকারী নিয়োগের লক্ষ্য রাখছেন।
অক্সফোর্ড ChAdOx1 NipahB
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে বিশ্বের প্রথম ফেজ II নিপাহ ভাইরাস ভ্যাকসিন ট্রায়াল চালু করেছে। এই ভ্যাকসিনটি অক্সফোর্ড/অ্যাস্ট্রাজেনেকা COVID-19 ভ্যাকসিনের মতো একই ভাইরাল ভেক্টর প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে তৈরি, যা প্রথম বছরে আনুমানিক ৬ মিলিয়ন জীবন বাঁচিয়েছে। জুন ২০২৫-এ ইউরোপীয় মেডিসিনস এজেন্সি এই ভ্যাকসিনকে PRIME (PRIority MEdicines) পদবী দিয়েছে।
অন্যান্য ক্যান্ডিডেট
-
HeV-sG-V: ফেজ I ক্লিনিকাল ট্রায়ালে
-
mRNA-1215: উন্নয়নাধীন
-
বিভিন্ন গ্লাইকোপ্রোটিন-ভিত্তিক ভ্যাকসিন (F এবং G প্রোটিন লক্ষ্য করে)
নিপাহ ভাইরাস পরীক্ষা এবং নির্ণয়
প্রাথমিক নির্ণয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কারণ সম্ভাব্য থেরাপিউটিক এজেন্ট, যেমন স্মল-মলিকিউল অ্যান্টিভাইরাল, প্রাথমিকভাবে দেওয়া হলে সবচেয়ে কার্যকর। ল্যাবরেটরি টেস্টিং পদ্ধতি অন্তর্ভুক্ত:
মলিকিউলার টেস্ট
-
RT-PCR: সিরিব্রোস্পাইনাল ফ্লুইড, মূত্র, সোয়াব এবং টিস্যুতে ভাইরাল নিউক্লিক অ্যাসিড সনাক্ত করে
-
সিকোয়েন্সিং: ভাইরাস আইসোলেটের দ্রুত শনাক্তকরণ সহজ করে
-
নেস্টেড PCR: মিথ্যা নেগেটিভ ফলাফল কমায় এবং সনাক্তকরণের নির্ভুলতা উন্নত করে
সেরোলজিকাল টেস্ট
-
ELISA: IgM এবং IgG অ্যান্টিবডি সনাক্তকরণের জন্য দ্রুত, নিরাপদ এবং কম খরচ
-
ইমিউনোফ্লুরেসেন্স অ্যাসে: অ্যান্টিবডি প্রতিক্রিয়া সনাক্ত করে
-
ভাইরাস নিউট্রালাইজেশন টেস্ট: পজিটিভ নমুনা যাচাই করার জন্য
ভারতে, AIIMS কল্যাণী এবং জাতীয় ভাইরোলজি ইনস্টিটিউট, পুনে নিপাহ ভাইরাস টেস্টিংয়ের জন্য নির্দিষ্ট কেন্দ্র।
পশ্চিমবঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতি: সরকারের প্রতিক্রিয়া
২০২৬ সালের জানুয়ারিতে পশ্চিমবঙ্গে নিপাহ ভাইরাসের দুটি নিশ্চিত ঘটনা রাজ্য এবং কেন্দ্রীয় সরকারকে দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানাতে প্ররোচিত করেছে:
সরকারি ব্যবস্থা
-
কেন্দ্রীয় দল: কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় পশ্চিমবঙ্গে একটি প্রতিক্রিয়া দল পাঠিয়েছে
-
যোগাযোগ ট্র্যাকিং: ১২০ জনেরও বেশি ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের চিহ্নিত করা হয়েছে এবং হোম আইসোলেশনে রাখা হয়েছে
-
নজরদারি বৃদ্ধি: স্বাস্থ্য বিভাগ সক্রিয়ভাবে নতুন ঘটনার জন্য পর্যবেক্ষণ করছে
-
হাসপাতাল প্রস্তুতি: বেলিয়াঘাটা আইডি হাসপাতাল এবং বারাসাত হাসপাতাল সম্পূর্ণ প্রোটোকল মেনে চলছে
কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী জগৎ প্রকাশ নাদ্দা বলেছেন যে কেন্দ্রীয় সরকার দৃঢ়ভাবে রাজ্য সরকারের সাথে দাঁড়িয়ে আছে এবং প্রাদুর্ভাবের কার্যকর ব্যবস্থাপনা এবং প্রতিরোধের জন্য ব্যাপক প্রযুক্তিগত, লজিস্টিক্যাল এবং অপারেশনাল সহায়তা প্রদান করছে। তিনি পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাথে কথা বলেছেন এবং এই দিকে কেন্দ্র-রাজ্য সমন্বয়ের উপর জোর দিয়েছেন।
পরিস্থিতি মূল্যায়ন
প্রাথমিক তদন্ত থেকে জানা যায় যে দুই নার্স পূর্ব বর্ধমানে কর্মসূত্রে সফরের সময় ভাইরাসে সংক্রামিত হয়েছেন। সূত্র জানিয়েছে যে তারা বারাসাত হাসপাতালের একজন সহকর্মীর কাছ থেকে ভাইরাস পেয়ে থাকতে পারেন, যিনি কয়েক সপ্তাহ আগে নিপাহের লক্ষণ দেখানোর পর মারা গিয়েছিলেন। উভয় রোগী ভেন্টিলেশনে রয়েছেন এবং মহিলা নার্স কোমায় রয়েছেন।
সংক্রমণের উৎস এখনও অস্পষ্ট—এটি মানুষ থেকে মানুষে সংক্রমণ হতে পারে বা তারা দূষিত ফল বা তাজা খেজুরের রস থেকে ভাইরাস পেয়ে থাকতে পারেন। রোগীদের রাজ্যের বাইরে কোনো উল্লেখযোগ্য ভ্রমণের ইতিহাস নেই, কিন্তু তারা অসুস্থ হওয়ার কয়েক দিন আগে পূর্ব মেদিনীপুর এবং কাটোয়ায় বাড়িতে গিয়েছিলেন।
কেরালার অভিজ্ঞতা এবং শিক্ষা
কেরালা ২০১৮ সাল থেকে নিপাহ ভাইরাসের বারবার প্রাদুর্ভাবের সম্মুখীন হয়েছে এবং রাজ্যটি রোগ ব্যবস্থাপনায় উল্লেখযোগ্য দক্ষতা অর্জন করেছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে মালাপ্পুরমে দুটি নতুন ঘটনা ঘটেছে—একজন ১৮ বছর বয়সী মহিলা মারা গিয়েছেন এবং আরেকজন চিকিৎসাধীন। রাজ্যের শক্তিশালী স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা এবং ২০২৩ সাল থেকে উন্নত ইনফেকশন কন্ট্রোল পদক্ষেপ থাকা সত্ত্বেও, এই প্রাদুর্ভাবগুলো নিরন্তর সতর্কতার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে।
কেরালার কৌশল
-
দ্রুত সনাক্তকরণ এবং প্রতিক্রিয়া: সক্রিয় নজরদারি এবং দ্রুত পরীক্ষা
-
যোগাযোগ ট্র্যাকিং: ব্যাপক যোগাযোগ সনাক্তকরণ এবং আইসোলেশন
-
আইসোলেশন সুবিধা: নিবেদিত আইসোলেশন ওয়ার্ড এবং ICU সুবিধা
-
স্বাস্থ্যকর্মী প্রশিক্ষণ: নিপাহ ব্যবস্থাপনায় স্বাস্থ্যকর্মীদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ
-
জনসচেতনতা: ঝুঁকি ফ্যাক্টর এবং প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার উপর সম্প্রদায়ের শিক্ষা
WHO দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া (SEARO) নিপাহের জন্য আঞ্চলিক কৌশল (২০২৩-২০৩০) প্রভাবিত দেশগুলোতে ক্লিনিকাল ব্যবস্থাপনা নির্দেশিকা প্রতিষ্ঠার পক্ষে এবং NiVD-এর জন্য প্রমাণ-ভিত্তিক সাপোর্টিভ কেয়ারের প্রয়োজনীয়তার উপর জোর দেয়।
নিপাহ ভাইরাস বনাম COVID-19: পার্থক্য বোঝা
অনেকে নিপাহ ভাইরাসকে পরবর্তী COVID-19 হিসেবে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন, কিন্তু ডাক্তাররা ব্যাখ্যা করেছেন যে দুটি রোগের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে:
সংক্রমণ হার
নিপাহ ভাইরাস COVID-19-এর মতো সহজে ছড়ায় না। এটি মূলত ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের মাধ্যমে সংক্রমিত হয় এবং মহামারী হওয়ার সম্ভাবনা অনেক কম।
মৃত্যুহার
যদিও নিপাহের মৃত্যুহার COVID-19-এর তুলনায় অনেক বেশি (৮০% বনাম ~১-২%), সংক্রমণের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কম।
প্রাদুর্ভাবের প্যাটার্ন
নিপাহ প্রাদুর্ভাবগুলো সাধারণত স্থানীয় এবং সীমাবদ্ধ থাকে, যখন COVID-19 একটি বৈশ্বিক মহামারী হয়ে উঠেছিল। দৃঢ় জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থা দিয়ে নিপাহ প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
আন্তর্জাতিক ঝুঁকি
WHO বর্তমানে নিপাহ ভাইরাসের আন্তর্জাতিক রোগ বিস্তারের ঝুঁকি কম বলে মূল্যায়ন করেছে। এই ঘটনায় আন্তর্জাতিকভাবে NiV-এর মানুষ থেকে মানুষে সংক্রমণের কোনো প্রমাণ নেই।
কে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে
নির্দিষ্ট গ্রুপগুলো নিপাহ ভাইরাস সংক্রমণের উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে:
-
স্বাস্থ্যকর্মী: যারা নিপাহ রোগীদের সরাসরি যত্ন নেন
-
পরিবার সদস্য এবং পরিচর্যাকারী: যারা সংক্রমিত ব্যক্তিদের সাথে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগে থাকেন
-
খেজুরের রস সংগ্রহকারী: যারা তাজা খেজুরের রস সংগ্রহ এবং বিক্রয় করেন
-
গ্রামীণ এলাকার বাসিন্দারা: যেখানে ফলাহারী বাদুড় সাধারণ এবং খেজুরের রস খাওয়া হয়
-
পশুখামার কর্মী: যদিও শূকর-মধ্যস্থ সংক্রমণ ভারতে বিরল
ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুতি
নিপাহ ভাইরাসের বারবার প্রাদুর্ভাব দীর্ঘমেয়াদী কৌশলের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে:
নজরদারি শক্তিশালীকরণ
-
বাদুড়ের জনসংখ্যায় ভাইরাসের উপস্থিতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ
-
সেন্টিনেল এবং কমিউনিটি-ভিত্তিক নজরদারি সিস্টেম
-
ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় প্রাথমিক সতর্কতা সিস্টেম
স্বাস্থ্যসেবা ক্ষমতা নির্মাণ
-
স্বাস্থ্যকর্মীদের নিপাহ ব্যবস্থাপনায় প্রশিক্ষণ
-
আইসোলেশন সুবিধা এবং ICU ক্ষমতা উন্নত করা
-
দ্রুত ডায়াগনস্টিক পরীক্ষার প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা
গবেষণা এবং উন্নয়ন
-
ভ্যাকসিন উন্নয়ন ত্বরান্বিত করা এবং ক্লিনিকাল ট্রায়াল
-
অ্যান্টিভাইরাল চিকিৎসা বিকল্প অন্বেষণ
-
মৃত্যুহার কমাতে ক্লিনিকাল কেয়ার প্রোটোকল উন্নত করা
সম্প্রদায় সম্পৃক্ততা
-
ঝুঁকি কারণ এবং প্রতিরোধ সম্পর্কে জনসচেতনতা প্রচার
-
নিরাপদ খাদ্য অনুশীলন উৎসাহিত করা
-
কুসংস্কার এবং ভয় কমাতে সম্প্রদায়ের সাথে কাজ করা
সতর্কতার সাথে এগিয়ে যাওয়া: উপসংহার
পশ্চিমবঙ্গ এবং কেরালায় নিপাহ ভাইরাসের সাম্প্রতিক প্রাদুর্ভাব এই মারাত্মক জুনোটিক রোগ সম্পর্কে ক্রমাগত সতর্কতার প্রয়োজনীয়তার একটি গুরুতর স্মরণ করিয়ে দেয়। যদিও ভারতে নিপাহ ভাইরাসের মৃত্যুহার আশঙ্কাজনকভাবে উচ্চ (৮২.৭-৯১.৭%), সঠিক সতর্কতামূলক ব্যবস্থা, প্রাথমিক শনাক্তকরণ এবং উপযুক্ত চিকিৎসা সেবার মাধ্যমে সংক্রমণ এড়ানো সম্ভব। জ্বর, তীব্র মাথাব্যথা, শ্বাসকষ্ট এবং বিশেষত স্নায়বিক লক্ষণ যেমন বিভ্রান্তি, খিঁচুনি বা পরিবর্তিত মানসিক অবস্থা দেখা মাত্রই অবিলম্বে চিকিৎসা সহায়তা নিতে হবে।
প্রতিরোধের মূল চাবিকাঠি হল তাজা খেজুরের রস এড়ানো, ফল ভালোভাবে ধোয়া, সংক্রমিত ব্যক্তিদের সাথে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ এড়ানো এবং স্বাস্থ্যবিধি বজায় রাখা। স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য, সঠিক সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা মেনে চলা অপরিহার্য। যদিও বর্তমানে কোনো অনুমোদিত টিকা নেই, ফেজ II ক্লিনিকাল ট্রায়ালে প্রতিশ্রুতিশীল ভ্যাকসিন ক্যান্ডিডেট আশার আলো দেখাচ্ছে। সম্প্রদায়, স্বাস্থ্যসেবা সিস্টেম এবং সরকারের সমন্বিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে আমরা নিপাহ ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব কার্যকরভাবে পরিচালনা এবং ভবিষ্যত প্রাদুর্ভাবের প্রভাব কমাতে পারি। সচেতনতা এবং সতর্কতা এই মারাত্মক ভাইরাসের বিরুদ্ধে আমাদের সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র।











