‘সুশাসন বাবু’-র দশম ইনিংস: নীতীশ কুমারের ১৫ বছরের শাসনে বিহারের পালাবদল ও চ্যালেঞ্জ

বিহারের রাজনীতিতে নীতীশ কুমার এক অপরিহার্য নাম, যিনি আজ, বৃহস্পতিবার, পাটনার ঐতিহাসিক গান্ধী ময়দানে দশম বারের জন্য রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিচ্ছেন, যা তাঁর রাজনৈতিক জীবনে একটি নতুন মাইলফলক। 'সুশাসন…

Chanchal Sen

 

বিহারের রাজনীতিতে নীতীশ কুমার এক অপরিহার্য নাম, যিনি আজ, বৃহস্পতিবার, পাটনার ঐতিহাসিক গান্ধী ময়দানে দশম বারের জন্য রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিচ্ছেন, যা তাঁর রাজনৈতিক জীবনে একটি নতুন মাইলফলক। ‘সুশাসন বাবু’ (Sushasan Babu) হিসেবে পরিচিত জনতা দল (ইউনাইটেড)-এর এই বরিষ্ঠ নেতা বিগত প্রায় দুই দশকে (প্রথম শপথ ২০০০ সালে হলেও, দীর্ঘমেয়াদী শাসন শুরু ২০০৫ থেকে) তাঁর জোট বদলের ঘনঘন সিদ্ধান্তের কারণে সমালোচিত হলেও, সুশাসন, অবকাঠামো উন্নয়ন, এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রতি তাঁর অবিচল অঙ্গীকার বিহারের রাজনীতি ও সমাজকে আমূল পরিবর্তন করেছে, যদিও রাজ্যের অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ ও বেকারত্বের সমস্যা এখনও গভীর।

 কী কী হয়েছে: এক নজরে নীতীশ কুমারের ১৫ বছর (২০০৫-২০২৫)

  • রেকর্ড শপথ: নীতীশ কুমার (Nitish Kumar) তাঁর রাজনৈতিক জীবনে মোট ১০ম বার বিহারের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিচ্ছেন।

  • অর্থনৈতিক গতি: ২০০৫-০৬ থেকে ২০২১-২২ সালের মধ্যে বিহারের জিএসডিপি (GS-DP) প্রবৃদ্ধি ছিল প্রায় ১০.৬%, যা জাতীয় গড়ের চেয়ে বেশি।

  • উন্নয়ন ও আইন-শৃঙ্খলা: রাজ্যের সড়ক যোগাযোগ, বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং আইন-শৃঙ্খলার উল্লেখযোগ্য উন্নতি, যা ‘জঙ্গল রাজ’-এর ধারণা থেকে মুক্তির পথে একটি বড় পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত।

  • নারীর ক্ষমতায়ন: মহিলাদের জন্য পঞ্চায়েত ও নগর সংস্থার নির্বাচনে ৫০% সংরক্ষণ এবং ‘মুখ্যমন্ত্রী মহিলা রোজগার যোজনা’র মাধ্যমে ৭৫ লক্ষের বেশি মহিলাকে সহায়তা ।

  • রাজনৈতিক কৌশল: ঘন ঘন জোট বদলের মাধ্যমে রাজ্যের রাজনৈতিক ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় রাখা এবং নিজের দলের গুরুত্ব ধরে রাখা, যদিও এটি ‘পল্টুরাম’ তকমা এনে দিয়েছে।

পটভূমি ও যাত্রাপথ: ক্ষমতার কেন্দ্রে অবিচল

বিহারের রাজনীতিতে নীতীশ কুমারের প্রভাব শুরু হয় মূলত ২০০৫ সালে, যখন তিনি রাষ্ট্রীয় জনতা দল (RJD)-এর দীর্ঘদিনের শাসনকে উৎখাত করে ভারতীয় জনতা পার্টি (BJP)-এর সঙ্গে জোট বেঁধে ক্ষমতায় আসেন। সেই সময় থেকেই ‘সুশাসন’ (Good Governance) প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতিকে তিনি তাঁর রাজনীতির মূল স্তম্ভ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন।2 বিশেষত, আইন-শৃঙ্খলার উন্নতি (যা পূর্বে ‘জঙ্গল রাজ’ নামে পরিচিত ছিল), গ্রামীণ সড়ক নির্মাণ এবং মহিলাদের জন্য সামাজিক কর্মসূচি তাঁর দীর্ঘমেয়াদী সমর্থনের ভিত্তি তৈরি করেছে।

বিগত প্রায় ১৫ বছরের শাসনকালে (মাঝে স্বল্প সময়ের ব্যবধান বাদ দিয়ে), নীতীশ কুমার একাধিকবার জোট পরিবর্তন করেছেন—বিজেপির সঙ্গে আবার আরজেডি-কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন মহাগঠবন্ধনের সঙ্গেও হাত মিলিয়েছেন। তবে প্রতিটি পালাবদলের পরও তিনি নিজেকে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী পদে ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছেন। এই ক্ষমতা ধরে রাখার কৌশলই তাঁকে বিহারের রাজনীতির ‘দশম বারের মুখ্যমন্ত্রী’-র আসনে বসিয়েছে।

Delhi CM Atishi: অতিশি শপথ নেবেন আজ, হবেন দিল্লির সর্বকনিষ্ঠ মুখ্যমন্ত্রী

সুশাসনের ধারণা ও বাস্তব চিত্র

নীতীশ কুমারের শাসনামলে বিহারের দুটি প্রধান পরিবর্তন পরিলক্ষিত হয়: আইন-শৃঙ্খলা এবং অবকাঠামো উন্নয়ন (Infrastructure Development)

১. আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি

নীতীশ কুমার সরকার ২০০৫ সালে ক্ষমতায় আসার পর অপরাধ দমনে একটি কঠোর অবস্থান নেয়। ফাস্ট-ট্র্যাক কোর্ট তৈরি করে দ্রুত বিচার প্রক্রিয়া শুরু করা হয়।

  • পরিসংখ্যান ১ (প্রমাণিত): ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরো (NCRB) এর তথ্য অনুযায়ী, ২০০৫ সালের তুলনায় ২০২০ সালে বিহারে গুরুতর অপরাধের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছিল। যদিও সর্বশেষ প্রকাশিত তথ্য (২০২২) অনুসারে, হত্যার ঘটনায় বিহার এখনও দেশের শীর্ষ রাজ্যগুলোর মধ্যে একটি, তবে অপহরণ এবং দাঙ্গার মতো অপরাধের সংখ্যা আগের তুলনায় হ্রাস পেয়েছে।

  • আইন-শৃঙ্খলা ফেরাতে পুলিশের আধুনিকীকরণ ও পরিকাঠামোগত উন্নয়ন করা হয়।

২. অর্থনৈতিক অগ্রগতি ও অবকাঠামো

নীতীশ কুমারের প্রথম দিকের শাসনকালে রাজ্যের অর্থনীতির দ্রুত বৃদ্ধি হয়। ‘বিমারু’ (BIMARU) রাজ্যগুলির তালিকা থেকে বেরিয়ে আসার জন্য বিহার কঠোর চেষ্টা করে।

  • পরিসংখ্যান ২ (প্রমাণিত): বিহারের অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০২১-২২ অনুযায়ী, ২০০৫-০৬ থেকে ২০২১-২২ পর্যন্ত রাজ্যের জিএসডিপি (Gross State Domestic Product) প্রায় ১০.৬% হারে বৃদ্ধি পেয়েছিল, যেখানে দেশের জাতীয় জিডিপি বৃদ্ধির হার ছিল প্রায় ৬.৯% (Source: Bihar Economic Survey 2021-22)। এই উচ্চ প্রবৃদ্ধি মূলত সড়ক ও বিদ্যুৎ ক্ষেত্রে সরকারি বিনিয়োগের ফল।

  • সড়ক যোগাযোগ: গ্রামের সঙ্গে শহরের যোগাযোগ বাড়াতে গ্রামীণ সড়ক প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন করা হয়। কেন্দ্রীয় সরকারের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০-২১ সাল নাগাদ প্রধানমন্ত্রী গ্রাম সড়ক যোজনার আওতায় বিহারে ৫২,০০০ কিলোমিটারের বেশি রাস্তা নির্মাণ করা হয়েছে, যা প্রত্যন্ত অঞ্চলে মানুষের জীবনযাত্রা সহজ করেছে।

  • বিদ্যুৎ সরবরাহ: একসময় বিহারে বিদ্যুৎ ছিল এক বিলাসিতা। নীতীশ সরকারের অন্যতম প্রধান সাফল্য হলো রাজ্যের প্রতিটি বাড়িতে বিদ্যুৎ সংযোগ পৌঁছে দেওয়া এবং বিদ্যুতের সরবরাহ উন্নত করা।

ভোটের আগে বড় চমক! বিহারের সব পরিবারকে ১০ হাজার টাকা দিচ্ছেন নীতীশ, চালু হল নতুন প্রকল্প

৩. সামাজিক ন্যায়বিচার ও মহিলাদের ক্ষমতায়ন

মহিলা ও পিছিয়ে পড়া শ্রেণির মানুষের জন্য একাধিক জনকল্যাণমূলক প্রকল্প নীতীশ কুমারের অন্যতম বড় সাফল্য।

  • পঞ্চায়েত এবং নগর সংস্থার নির্বাচনে মহিলাদের জন্য ৫০% আসন সংরক্ষণ একটি যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত ছিল, যা তৃণমূল স্তরে মহিলাদের রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে সহায়তা করে।

  • ‘সাইকেল যোজনা’ (Cycle Yojana): স্কুলগামী মেয়েদের বিনামূল্যে সাইকেল দেওয়ার প্রকল্পটি শিক্ষার ক্ষেত্রে মেয়েদের অংশগ্রহণ বাড়াতে বড় ভূমিকা রাখে। এই প্রকল্পের সাফল্যের কারণে মাধ্যমিক স্তরে মেয়েদের স্কুল ছাড়ার হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসে।

  • পরিসংখ্যান ৩ (প্রমাণিত): সেপ্টেম্বর ২০২৫-এ চালু হওয়া ‘মুখ্যমন্ত্রী মহিলা রোজগার যোজনা’র মাধ্যমে ৭৫ লক্ষ মহিলাকে প্রথম দফায় ১০,০০০ টাকা করে সরাসরি তাদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে স্থানান্তর করা হয়েছে। এই স্কিমটি স্ব-কর্মসংস্থান (Self-Employment) এবং অর্থনৈতিক স্বাধীনতার উপর জোর দেয় ।

 প্রতিক্রিয়া ও বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ

নীতীশ কুমারের শাসনামলের মূল্যায়ন মিশ্র। একদিকে, ‘জঙ্গল রাজ’ থেকে মুক্তি ও অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য তিনি প্রশংসিত, অন্যদিকে, রাজ্যের বড় চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করতে না পারার জন্য সমালোচিত।

আমূল পরিবর্তনগুলি নিয়ে প্রাক্তন আইএএস কর্মকর্তা এবং প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ ডঃ শ্যামল মিশ্র বলেন:

“নীতীশ কুমারের আমলে বিহারের সামাজিক-অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে একটি মৌলিক পরিবর্তন এসেছে। বিশেষ করে গ্রামীণ অর্থনীতিতে রাস্তা এবং বিদ্যুতের প্রবেশাধিকার একটি নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে। কিন্তু গত পাঁচ বছরে সেই গতি কিছুটা শ্লথ হয়েছে, বিশেষ করে উচ্চশিক্ষা এবং বৃহৎ শিল্পায়নে রাজ্য এখনও পিছিয়ে। সরকারের ঘন ঘন জোট বদলও দীর্ঘমেয়াদী নীতি বাস্তবায়নে স্থিতিশীলতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।”

সম্প্রতি, পাটনার একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী শ্রীমতী আরতি দেবী বলেন

“আগে সন্ধের পর ঘর থেকে বেরোনো কঠিন ছিল, চুরি-ডাকাতির ভয় ছিল। এখন রাতেও কাজ করে ফিরতে পারি, রাস্তায় আলো থাকে। বিদ্যুৎটাও নিয়মিত পাওয়া যায়। তবে আমাদের ছেলেমেয়েদের জন্য ভালো চাকরি নেই, বাইরে যেতে হচ্ছে।”

প্রধান চ্যালেঞ্জ: বেকারত্ব ও শিল্পায়ন

নীতীশ কুমারের দীর্ঘ শাসনকালে সবচেয়ে বড় ব্যর্থতাগুলির মধ্যে একটি হল ব্যাপক বেকারত্ব (Unemployment) এবং বড় আকারের শিল্পায়ন নিশ্চিত করতে না পারা।

  • প্রতি বছর বিপুল সংখ্যক যুবক-যুবতী কর্মসংস্থানের জন্য রাজ্যের বাইরে যেতে বাধ্য হন। সরকারি নিয়োগ প্রক্রিয়াও ধীর গতিতে চলে।

  • স্বাস্থ্য ও শিক্ষাব্যবস্থার নিম্নমান, বিশেষত গ্রামীণ অঞ্চলে, এখনও একটি বড় মাথাব্যথার কারণ। প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা এবং উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিতে পরিকাঠামো ও প্রশিক্ষিত কর্মীর অভাব প্রকট।

ভবিষ্যতে কী হতে পারে

দশম বারের জন্য শপথ গ্রহণের পর, নীতীশ কুমারের সামনে এখন মূল চ্যালেঞ্জ হলো—তাঁর ‘সুশাসন বাবু’ ভাবমূর্তি বজায় রেখে রাজ্যের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে আরও ত্বরান্বিত করা। নতুন এনডিএ সরকারের প্রাথমিক ফোকাস থাকবে রাজ্যের বেকারত্ব মোকাবিলা করা এবং কেন্দ্রীয় প্রকল্পের সাহায্যে বৃহৎ আকারের অবকাঠামো প্রকল্পগুলি দ্রুত শেষ করা। বিশেষ করে, সম্প্রতি সমাপ্ত বিধানসভা নির্বাচনের সময় দেওয়া তরুণদের কর্মসংস্থান এবং কৃষি উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি পূরণে দ্রুত পদক্ষেপ আশা করা হচ্ছে।

নীতীশ কুমারকে বিহারের রাজনীতির ‘১০ডুলকার’ হিসেবেও অভিহিত করা হচ্ছে – বারবার কঠিন পরিস্থিতিতে ফিরে আসার ক্ষমতার জন্য। এই নতুন ইনিংস বিহারের জন্য কেমন হবে, তার উত্তর সময়ই দেবে।

 

About Author
Chanchal Sen

চঞ্চল সেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতক। তিনি একজন অভিজ্ঞ লেখক এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষক, যিনি পলিটিক্স নিয়ে লেখালিখিতে পারদর্শী। চঞ্চলের লেখায় রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের গভীর বিশ্লেষণ এবং সমসাময়িক ঘটনাবলীর সঠিক উপস্থাপন পাঠকদের মুগ্ধ করে। তার নিবন্ধ এবং মতামতমূলক লেখা বস্তুনিষ্ঠতা ও বিশ্লেষণধর্মিতার কারণে পাঠকমহলে ব্যাপকভাবে সমাদৃত। চঞ্চল সেনের তীক্ষ্ণ দৃষ্টিভঙ্গি এবং গভীর গবেষণা তাকে রাজনৈতিক সাংবাদিকতার জগতে একটি স্বতন্ত্র স্থান প্রদান করেছে। তিনি তার লেখনীর মাধ্যমে পাঠকদের রাজনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধি করতে এবং সমাজে পরিবর্তন আনতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে চলেছেন।