নলেন গুড় ও পাটালি গুড়ের আসল রহস্য: আপনি কি ভুল গুড় কিনছেন?

শীতের সকাল মানেই বাঙালির পাতে এক ফোটা নলেন গুড় আর গরম রুটি বা লুচি। কিন্তু আপনি কি জানেন, নলেন গুড় এবং পাটালি গুড়—দুটোই খেজুর রস থেকে তৈরি হলেও এদের মধ্যে…

Riddhi Datta

 

শীতের সকাল মানেই বাঙালির পাতে এক ফোটা নলেন গুড় আর গরম রুটি বা লুচি। কিন্তু আপনি কি জানেন, নলেন গুড় এবং পাটালি গুড়—দুটোই খেজুর রস থেকে তৈরি হলেও এদের মধ্যে রয়েছে আকাশ-পাতাল পার্থক্য? অনেকে মনে করেন কেবল তরল বা কঠিন অবস্থাই এদের একমাত্র তফাৎ, কিন্তু পুষ্টিগুণ, তৈরির পদ্ধতি এবং ব্যবহারের ক্ষেত্রে এদের নিজস্বতা সম্পূর্ণ আলাদা । এই নিবন্ধে আমরা জানব এই দুই ধরণের গুড়ের বৈজ্ঞানিক ও গঠনগত পার্থক্য, যাতে এই শীতে আপনি ঠকে না যান এবং সঠিক গুড়টি বেছে নিতে পারেন।

নলেন গুড় আসলে কী?

নলেন গুড়, যার আক্ষরিক অর্থ হলো ‘নতুন গুড়’ (New Jaggery), হলো খেজুর গাছের রস জ্বাল দেওয়ার একদম প্রাথমিক পর্যায়। শীতকালে খেজুর গাছ থেকে যে টাটকা রস সংগ্রহ করা হয়, তা মাটির হাঁড়িতে বা কড়াইতে নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় ফোটানোর পর যখন ঘন, সোনালী-বাদামী রঙের তরল আকার ধারণ করে, তখন তাকে নলেন গুড় বা ‘ঝোল গুড়’ বলা হয় ।

এর প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এর স্বতন্ত্র সুগন্ধ (Aroma)। নলেন গুড়ের গন্ধ অনেক বেশি তীব্র এবং ধোঁয়াটে (smoky) হয়, যা কৃত্রিমভাবে তৈরি গুড়ে পাওয়া অসম্ভব। এটি সাধারণত শীতের মাত্র ২-৩ মাস (নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি) পাওয়া যায় এবং এর শেলফ লাইফ বা স্থায়িত্ব খুবই কম ।

পাটালি গুড় কী?

পাটালি গুড় হলো নলেন গুড়ের পরবর্তী এবং কঠিন রূপ। নলেন গুড়কে যখন আরও দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ তাপমাত্রায় জ্বাল দেওয়া হয়, তখন তা আরও ঘন ও গাঢ় রং ধারণ করে। এই ঘন মিশ্রণটিকে নির্দিষ্ট ছাঁচে (যেমন ছোট বাটি, চৌকোনা বাক্স বা নারকেলের মালা) ঢেলে ঠান্ডা করলে তা জমে শক্ত পাথরের মতো হয়ে যায়—এটাই পাটালি গুড় ।

পাটালি গুড়ের রঙ সাধারণত গাঢ় খয়েরি বা কালচে লাল হয়। এর স্থায়িত্ব নলেন গুড়ের চেয়ে অনেক বেশি; সঠিক ভাবে সংরক্ষণ করলে এটি ৬-৮ মাস পর্যন্ত ভালো থাকে। তাই সারা বছর ব্যবহারের জন্য পাটালি গুড়ই সেরা বিকল্প ।

খেজুর খাওয়া কি ওজন বাড়ায়? জেনে নিন সুস্বাদু ফলের সুফল-কুফল

তৈরির পদ্ধতি: রস থেকে গুড়

এই দুই গুড়ের মূল পার্থক্য লুকিয়ে আছে এদের তৈরির প্রক্রিয়ায় বা ‘প্রসেসিং’-এ।

  • রস সংগ্রহ: শিউলিরা (গাছি) শীতের বিকেলে খেজুর গাছের ডগা কেটে হাড়ি বসিয়ে দেন। সারা রাত ফোঁটা ফোঁটা রস জমা হয়।
  • জ্বাল দেওয়া (প্রথম ধাপ): ভোরবেলায় সেই রস বড় কড়াইতে জ্বাল দেওয়া হয়। রস কিছুটা ঘন হয়ে যখন সোনালী ও আঠালো হয়, তখন সেই পর্যায়টিই হলো নলেন গুড় বা ঝোল গুড় ।
  • সলিডিফিকেশন (দ্বিতীয় ধাপ): নলেন গুড়কে আরও সময় নিয়ে জ্বাল দিলে তা অত্যন্ত ঘন হয়ে যায়। এই পর্যায়ে অভিজ্ঞ কারিগররা বুঝতে পারেন কখন তা নামাতে হবে। এরপর গরম অবস্থাতেই ছাঁচে ঢেলে ঠান্ডা করলেই তৈরি হয় পাটালি গুড়

নলেন গুড় বনাম পাটালি গুড়: এক নজরে পার্থক্য

নিচে একটি তুলনামূলক ছকের মাধ্যমে দুই ধরণের গুড়ের প্রধান পার্থক্যগুলো তুলে ধরা হলো:

বৈশিষ্ট্য নলেন গুড় (Liquid/Semi-liquid) পাটালি গুড় (Solid Block)
অবস্থা তরল বা আধা-তরল (সিরাপের মতো)। কঠিন এবং শক্ত ব্লকের মতো।
প্রস্তুতি রস জ্বাল দিয়ে ঘন করার প্রাথমিক পর্যায়। নলেন গুড়কে অতিরিক্ত জ্বাল দিয়ে জমাট বাঁধানো হয়।
সুগন্ধ অত্যন্ত তীব্র, ‘স্মোকি’ এবং সতেজ ঘ্রাণ। সুগন্ধ আছে, তবে নলেন গুড়ের চেয়ে কিছুটা কম তীব্র।
স্থায়িত্ব (Shelf Life) কম (সাধারণ তাপমাত্রায় কয়েক দিন, ফ্রিজে ২-৩ মাস)। বেশি (সাধারণ তাপমাত্রাতেই ৬-৮ মাস রাখা যায়)।
ব্যবহার পিঠে, পায়েস, আইসক্রিম বা রুটির সাথে সরাসরি খাওয়ার জন্য। নাড়ু, মোয়া, চা বা মিষ্টি তৈরিতে বেশি ব্যবহৃত হয়।
মৌসুম শুধুমাত্র শীতকালে পাওয়া যায়। সংরক্ষণ করে সারা বছর খাওয়া যায়।
রঙ সোনালী-বাদামী (Golden Brown)। গাঢ় খয়েরি বা কালচে লাল (Dark Brown)।

পুষ্টিগুণ ও স্বাস্থ্য উপকারিতা

খেজুরের গুড় কেবল স্বাদে নয়, পুষ্টিগুণেও চিনির চেয়ে যোজন যোজন এগিয়ে। এতে প্রচুর পরিমাণে খনিজ উপাদান থাকে যা শীতকালে শরীর সুস্থ রাখতে সাহায্য করে।

প্রতি ১০০ গ্রাম খেজুর গুড়ের পুষ্টিমান (গড় অনুমান)

উপাদান পরিমাণ কাজ
সুক্রোজ ৬৫-৬৮ গ্রাম তাৎক্ষণিক শক্তি যোগায়।
আয়রন ১০-১১ মি.গ্রা. রক্তাল্পতা দূর করে ও হিমোগ্লোবিন বাড়ায়।
ম্যাগনেসিয়াম ৭০-৯০ মি.গ্রা. স্নায়ুতন্ত্র ভালো রাখে।
পটাশিয়াম ১০৫০ মি.গ্রা. (প্রায়) রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে।
প্রোটিন ০.৪ গ্রাম কোষ গঠনে সহায়তা করে।

লেপের লাল কাপড়: ইতিহাসের রহস্য উন্মোচন

স্বাস্থ্য উপকারিতা:

  • হজম শক্তি বৃদ্ধি: খাবার পর সামান্য পাটালি গুড় খেলে হজম উৎসেচকগুলো সক্রিয় হয়, যা কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে সাহায্য করে ।

  • ইমিউনিটি বুস্টার: এতে থাকা জিঙ্ক এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট শীতকালীন সর্দি-কাশি প্রতিরোধে সাহায্য করে ।

  • লো গ্লাইসেমিক ইনডেক্স: সাদা চিনির তুলনায় খেজুর গুড় রক্তে শর্করা মেশার গতি কিছুটা ধীর করে, ফলে এটি ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য চিনির চেয়ে কিছুটা ভালো বিকল্প (তবে পরিমিত মাত্রায়) ।

খাঁটি গুড় চেনার উপায়: আপনি কি ভেজাল খাচ্ছেন?

বাজারে এখন কৃত্রিম সুগন্ধি ও চিনি মেশানো ভেজাল গুড়ের ছড়াছড়ি। আসল গুড় চেনার কিছু সহজ উপায়:

  1. স্বাদ পরীক্ষা: একটু গুড় মুখে দিলে যদি নোনা বা তিতকুটে ভাব লাগে, তবে বুঝবেন এতে সোডা বা রাসায়নিক মেশানো হয়েছে। আসল গুড় মিষ্টি এবং গাঢ় স্বাদের হবে।
  2. গন্ধ: নলেন গুড়ের গন্ধ হবে খুব সতেজ। যদি কোনো উগ্র রাসায়নিক গন্ধ পান বা গন্ধ একেবারেই না থাকে, তবে সাবধান।
  3. রঙ: খুব বেশি চকচকে বা উজ্জ্বল হলুদ রঙের গুড় এড়িয়ে চলুন। আসল খেজুর গুড়ের রঙ একটু কালচে বা মলিন বাদামী হয়। অতিরিক্ত কেমিক্যাল দিলে গুড় অস্বাভাবিক ফর্সা দেখায় ।
  4. দ্রবণীয়তা: এক গ্লাস জলে এক টুকরো গুড় ফেললে যদি তা ধীরে ধীরে গলে যায় তবে তা খাঁটি। ভেজাল গুড় অনেক সময় নিচে তলানি ফেলে বা রঙের রেখা তৈরি করে।

বর্তমান বাজার দর ও ট্রেন্ড (২০২৫)

২০২৪-২৫ শীতের মৌসুমে পশ্চিমবঙ্গের বাজারে নলেন গুড় ও পাটালি গুড়ের দামে কিছুটা তারতম্য লক্ষ্য করা যাচ্ছে। প্রিমিয়াম কোয়ালিটির “টিউব নলেন গুড়” বা ব্র্যান্ডেড লিকুইড গুড় অনলাইনে প্রতি ৫০০ গ্রামের দাম প্রায় ৩৫০-৪৫০ টাকার মধ্যে ঘোরাফেরা করছে । লোকাল বাজারে বা গ্রাম্য হাটে অবশ্য এর দাম কিছুটা কম হতে পারে, তবে জয়নগরের মোয়া বা অরিজিনাল জয়নগরের গুড়ের চাহিদা ও দাম সবসময়ই উর্ধ্বমুখী থাকে। বিশেষ করে অর্গানিক এবং জিআই ট্যাগ (GI Tag) যুক্ত গুড়ের চাহিদা বিশ্বজুড়ে বাড়ছে ।

শেষ কথা

পরিশেষে বলা যায়, নলেন গুড় এবং পাটালি গুড়—উভয়ই বাংলার ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ। নলেন গুড় তার তরল মাধুর্য এবং তীব্র সুগন্ধের জন্য সেরা, যা শীতের পিঠে-পুলির স্বাদ দ্বিগুণ করে তোলে। অন্যদিকে, পাটালি গুড় তার দীর্ঘস্থায়ীত্ব এবং ঘন মিষ্টি স্বাদের জন্য সারা বছর বাঙালির রান্নাঘরে রাজত্ব করে। আপনার প্রয়োজন অনুযায়ী সঠিক গুড়টি বেছে নিন এবং এই শীতে ভেজাল মুক্ত, খাঁটি খেজুর গুড়ের স্বাদ উপভোগ করুন। মনে রাখবেন, স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের জন্য সাদা চিনি বর্জন করে প্রাকৃতিক এই মিষ্টি উপাদানটি গ্রহণ করা অনেক বেশি বুদ্ধিমানের কাজ।

About Author
Riddhi Datta

ঋদ্ধি দত্ত কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রসায়নবিদ্যায় স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেছেন। তিনি একজন উদীয়মান বিজ্ঞান লেখক ও গবেষক, যিনি জটিল বৈজ্ঞানিক ধারণাগুলিকে সাধারণ পাঠকদের জন্য সহজবোধ্য করে তোলেন। তাঁর লেখায় রসায়ন, পরিবেশ বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তির সমসাময়িক বিষয়গুলি প্রাধান্য পায়। ঋদ্ধি নিয়মিতভাবে এই ওয়েবসাইটে বিজ্ঞান-ভিত্তিক প্রবন্ধ, গবেষণা সারসংক্ষেপ এবং বিশেষজ্ঞদের সাক্ষাৎকার প্রকাশ করেন।

আরও পড়ুন