ওফুরান এসআর (Ofuran SR) হলো একটি বহুল ব্যবহৃত অ্যান্টিবায়োটিক, যার জেনেরিক নাম নাইট্রোফিউরান্টইন (Nitrofurantoin)। চিকিৎসকরা মূলত মূত্রনালীর সংক্রমণ বা ইউরিনারি ট্র্যাক্ট ইনফেকশন (UTI)-এর চিকিৎসা এবং প্রতিরোধের জন্য এই ওষুধটি সুপারিশ করে থাকেন। এটি “SR” বা “Sustained Release” ফর্মেটে আসে, যার অর্থ হলো ওষুধটি খাওয়ার পর তা ধীরে ধীরে শরীরে নির্গত হয়। এর ফলে দিনে কমবার ওষুধ খেয়েও সারাদিন ধরে রক্তে এবং মূত্রে এর কার্যকারিতা বজায় থাকে। এটি সরাসরি মূত্রাশয় এবং মূত্রনালীতে সংক্রমণ সৃষ্টিকারী ব্যাকটেরিয়াকে আক্রমণ করে ও তাদের বংশবৃদ্ধি রোধ করে, যার ফলে ইউটিআই-এর লক্ষণগুলি (যেমন প্রস্রাবে জ্বালা, ঘন ঘন প্রস্রাব) দ্রুত উপশম হয়।
গুরুত্বপূর্ণ দ্রষ্টব্য: এই আর্টিকেলটি সম্পূর্ণরূপে তথ্য প্রদানের উদ্দেশ্যে লেখা। Ofuran SR বা যেকোনো ওষুধ শুরু করার আগে অবশ্যই একজন রেজিস্টার্ড চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। বিশেষজ্ঞের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ সেবন স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
Ofuran SR (Nitrofurantoin) কী এবং এটি কীভাবে কাজ করে?
ওফুরান এসআর হলো নাইট্রোফিউরান্টইন নামক একটি অ্যান্টিবায়োটিকের ব্র্যান্ড নাম। এটি অ্যান্টিবায়োটিকের একটি বিশেষ শ্রেণীভুক্ত যা প্রাথমিকভাবে মূত্রনালীর নির্দিষ্ট কিছু ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে অত্যন্ত কার্যকরী।
ওফুরান এসআর-এর কাজের পদ্ধতি (Mechanism of Action)
ওফুরান এসআর-এর কাজের প্রক্রিয়াটি বেশ জটিল এবং অনন্য, যা একে অন্যান্য অনেক অ্যান্টিবায়োটিক থেকে আলাদা করে।
- ব্যাকটেরিয়ার কোষে প্রবেশ: যখন রোগী ওফুরান এসআর সেবন করেন, তখন এটি রক্তপ্রবাহে শোষিত হয় এবং দ্রুত কিডনি দ্বারা ফিল্টার হয়ে মূত্রে ঘনীভূত (Concentrated) হয়।
- সক্রিয়করণ (Activation): মূত্রাশয়ে উপস্থিত সংবেদনশীল ব্যাকটেরিয়া (যেমন E. coli) ওষুধটিকে শোষণ করে। ব্যাকটেরিয়ার ভেতরে থাকা ‘নাইট্রোরিডাকটেস’ (Nitroreductase) নামক বিশেষ এনজাইম নাইট্রোফিউরান্টইনকে সক্রিয় করে একাধিক প্রতিক্রিয়াশীল যৌগে (Reactive Intermediates) রূপান্তরিত করে।
- কোষীয় ধ্বংস: এই সক্রিয় যৌগগুলি ব্যাকটেরিয়ার কোষের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ উপাদানকে আক্রমণ করে। আমেরিকার ন্যাশনাল লাইব্রেরি অফ মেডিসিন (NLM) অনুসারে, এটি ব্যাকটেরিয়ার ডিএনএ (DNA), আরএনএ (RNA) এবং রাইবোজোমাল প্রোটিন (Ribosomal Proteins) ধ্বংস করে দেয়।
- বংশবৃদ্ধি রোধ: ডিএনএ এবং প্রোটিন তৈরির প্রক্রিয়া ব্যাহত হওয়ায় ব্যাকটেরিয়া আর নতুন কোষ তৈরি করতে পারে না বা বংশবৃদ্ধি করতে পারে না। এটি ব্যাকটেরিয়ার কোষ প্রাচীরের গঠনকেও দুর্বল করে দেয়। ফলে, ব্যাকটেরিয়ার মৃত্যু ঘটে এবং সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আসে।
“SR” (Sustained Release) ফর্মুলার গুরুত্ব
সাধারণ নাইট্রোফিউরান্টইন ট্যাবলেটের তুলনায় “SR” বা “Sustained Release” ফর্মুলাটির বিশেষ সুবিধা রয়েছে।
- ধীর নিঃসরণ: এটি পেট বা অন্ত্রে ধীরে ধীরে ভাঙে এবং দীর্ঘ সময় ধরে ওষুধ নিঃসরণ করতে থাকে।
- কম ডোজ: সাধারণ ট্যাবলেটের ক্ষেত্রে দিনে ৪ বার পর্যন্ত খাওয়ার প্রয়োজন হতে পারে, কিন্তু এসআর ফর্মুলার (সাধারণত ১০০ মিগ্রা) ক্ষেত্রে দিনে মাত্র ২ বার খেলেই চলে।
- পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া হ্রাস: ওষুধটি ধীরে ধীরে নির্গত হওয়ায় হুট করে রক্তে এর মাত্রা বেড়ে যায় না। এর ফলে, এনএইচএস (NHS) ইউকে অনুযায়ী, বমি বমি ভাব বা পেটের সমস্যার মতো সাধারণ পার্শ্ব প্রতিক্রিয়াগুলি তুলনামূলকভাবে কম হয়।
- মূত্রে উচ্চ ঘনত্ব: এটি দীর্ঘ সময় ধরে মূত্রে উচ্চ ঘনত্ব বজায় রাখে, যা ইউটিআই চিকিৎসার জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।
ওফুরান এসআর-এর প্রধান ব্যবহার: ইউটিআই (UTI) চিকিৎসা
ওফুরান এসআর-এর প্রধান এবং প্রায় একচেটিয়া ব্যবহার হলো মূত্রনালীর সংক্রমণ বা ইউটিআই (UTI)-এর চিকিৎসা।
ইউটিআই (UTI) কী?
ইউটিআই হলো একটি সংক্রমণ যা মূত্রতন্ত্রের (Urinary System) যেকোনো অংশে ঘটতে পারে, যার মধ্যে রয়েছে কিডনি, ইউরেটার (মূত্রনালী), ব্লাডার (মূত্রাশয়) এবং ইউরেথ্রা (মূত্রনালী)। বেশিরভাগ সংক্রমণই মূত্রাশয় (যাকে সিস্টাইটিস বা Cystitis বলা হয়) এবং মূত্রনালীতে (ইউরেথ্রাইটিস) সীমাবদ্ধ থাকে।
সাধারণ লক্ষণ:
- প্রস্রাব করার সময় জ্বালা বা ব্যথা (Dysuria)।
- ঘন ঘন প্রস্রাবের বেগ আসা।
- তলপেটে ব্যথা বা চাপ অনুভব করা।
- ঘোলাটে বা দুর্গন্ধযুক্ত প্রস্রাব।
- প্রস্রাবের সাথে রক্ত যাওয়া (Hematouria)।
পুরুষদের মধ্যে কেন দ্রুত বাড়ছে ইউটিআই-এর সমস্যা? জরুরি সতর্কতা এবং সুরক্ষার উপায়
কেন ওফুরান এসআর ইউটিআই-এর জন্য প্রথম পছন্দ?
ওফুরান এসআর-কে প্রায়শই Uncomplicated Cystitis বা জটিলতাহীন মূত্রাশয়ের সংক্রমণের জন্য “প্রথম সারির চিকিৎসা” (First-line therapy) হিসেবে গণ্য করা হয়। এর পেছনে বেশ কিছু বৈজ্ঞানিক কারণ রয়েছে:
- লক্ষ্যভেদী কার্যকারিতা: ওফুরান এসআর রক্তপ্রবাহে খুব বেশি ঘনীভূত হয় না, কিন্তু এটি কিডনি দ্বারা ফিল্টার হয়ে সরাসরি মূত্রে অত্যন্ত উচ্চ ঘনত্বে পৌঁছায়। যেহেতু ইউটিআই সংক্রমণটি মূত্রাশয় বা মূত্রনালীর ভেতরের অংশে হয়, তাই এই উচ্চ ঘনত্ব সরাসরি ব্যাকটেরিয়ার ওপর কাজ করতে পারে।
- নিম্ন টিস্যু অনুপ্রবেশ: এটি শরীরের অন্যান্য টিস্যু বা কলায় খুব বেশি প্রবেশ করে না। এই কারণেই এটি কিডনি সংক্রমণ (Pyelonephritis) বা প্রোস্টেট সংক্রমণের জন্য কার্যকরী নয়, তবে মূত্রাশয়ের (Bladder) সংক্রমণের জন্য আদর্শ।
- নিম্ন রেজিস্ট্যান্স রেট: অনেক অ্যান্টিবায়োটিকের (যেমন সিপ্রোফ্লক্সাসিন) বিরুদ্ধে ব্যাকটেরিয়ার প্রতিরোধ ক্ষমতা (Antibiotic Resistance) বিশ্বব্যাপী বৃদ্ধি পাচ্ছে। তুলনামূলকভাবে, ইউটিআই সৃষ্টিকারী প্রধান ব্যাকটেরিয়া E. coli-এর বিরুদ্ধে নাইট্রোফিউরান্টইনের প্রতিরোধ ক্ষমতা এখনো অনেক কম। সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (CDC) অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্সকে একটি বৈশ্বিক স্বাস্থ্য হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করেছে, তাই কম রেজিস্ট্যান্স রেট থাকা ওষুধগুলো বেশি পছন্দনীয়।
কোন ধরনের ইউটিআই-এর জন্য এটি ব্যবহৃত হয়?
- অজটিল মূত্রাশয় সংক্রমণ (Uncomplicated Cystitis): এটিই এর প্রধান ব্যবহার। সাধারণত মহিলাদের মধ্যে এটি বেশি দেখা যায়।
- ইউটিআই প্রতিরোধ (UTI Prophylaxis): যেসব ব্যক্তির বারবার ইউটিআই হয় (Recurrent UTI), তাদের ক্ষেত্রে চিকিৎসক অনেক সময় সংক্রমণের পুনরাবৃত্তি রোধ করতে দীর্ঘমেয়াদে খুব কম ডোজে ওফুরান এসআর সুপারিশ করতে পারেন।
পরিসংখ্যান ও ডেটা: ইউটিআই এবং অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার
ইউটিআই কতটা সাধারণ এবং কেন ওফুরান এসআর-এর মতো কার্যকরী ওষুধের প্রয়োজন, তা বুঝতে পরিসংখ্যানের দিকে নজর দেওয়া প্রয়োজন।
- বৈশ্বিক প্রভাব: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) (অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স সংক্রান্ত তথ্যে) উল্লেখ করেছে যে, ইউটিআই হলো বিশ্বব্যাপী সবচেয়ে সাধারণ ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণগুলির মধ্যে একটি। প্রতি বছর প্রায় ১৫ কোটি মানুষ ইউটিআই-এ আক্রান্ত হন।
- মহিলাদের ঝুঁকি: মহিলাদের ইউটিআই-এ আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি পুরুষদের তুলনায় অনেক বেশি। প্রায় ৫০% থেকে ৬০% মহিলা তাদের জীবদ্দশায় অন্তত একবার ইউটিআই-এর অভিজ্ঞতা পান।
- প্রধান কারণ: প্রায় ৮০% থেকে ৯০% মূত্রাশয় সংক্রমণের জন্য দায়ী ব্যাকটেরিয়া হলো ইশ্চেরিচিয়া কোলাই (Escherichia coli বা E. coli)। ওফুরান এসআর এই E. coli-এর বিরুদ্ধে অত্যন্ত সক্রিয়।
| পরিসংখ্যানের বিষয় | তথ্য | উৎস |
| বৈশ্বিক ইউটিআই কেস (বার্ষিক) | প্রায় ১৫ কোটি | বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) |
| মহিলাদের ঝুঁকি (জীবদ্দশায়) | ৫০% – ৬০% | ন্যাশনাল লাইব্রেরি অফ মেডিসিন (NLM) |
| প্রধান দায়ী ব্যাকটেরিয়া | E. coli (৮০% – ৯০% ক্ষেত্রে) | সিডিসি (CDC) / এনএলএম (NLM) |
| নাইট্রোফিউরান্টইনের কার্যকারিতা (E. coli) | উচ্চ (সাধারণত রেজিস্ট্যান্স কম) | বিভিন্ন ক্লিনিক্যাল স্টাডি |
ওফুরান এসআর গ্রহণের সঠিক নিয়মাবলী
ওষুধের সম্পূর্ণ কার্যকারিতা পেতে এবং পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া কমাতে সঠিক নিয়মে এটি সেবন করা অপরিহার্য।
ডোজ এবং সময়কাল
- চিকিৎসার জন্য: প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে, সাধারণ ডোজ হলো ১০০ মিগ্রা এসআর (SR) ক্যাপসুল দিনে দুবার (প্রতি ১২ ঘণ্টা অন্তর)। এটি সাধারণত ৫ থেকে ৭ দিন পর্যন্ত চালিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।
- প্রতিরোধের জন্য: বারবার সংক্রমণ রোধ করার জন্য, চিকিৎসক প্রতিদিন রাতে একবার ৫০ মিগ্রা বা ১০০ মিগ্রা এসআর ডোজ দীর্ঘমেয়াদে (কয়েক মাস) সুপারিশ করতে পারেন।
গুরুত্বপূর্ণ: আপনার চিকিৎসক আপনার বয়স, ওজন, সংক্রমণের তীব্রতা এবং কিডনির কার্যকারিতা পরীক্ষা করে সঠিক ডোজ নির্ধারণ করবেন। নিজে থেকে ডোজ পরিবর্তন বা কোর্স সম্পূর্ণ না করে ওষুধ বন্ধ করা অত্যন্ত বিপজ্জনক। কোর্স সম্পূর্ণ না করলে সংক্রমণ ফিরে আসতে পারে এবং অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স তৈরি হতে পারে।
খাওয়ার নিয়ম: যা অবশ্যই মানতে হবে
ওফুরান এসআর-এর সর্বোচ্চ কার্যকারিতা এবং সর্বনিম্ন পার্শ্ব প্রতিক্রিয়ার জন্য এটি খাবার বা দুধের সাথে গ্রহণ করা উচিত।
মেয়ো ক্লিনিক (Mayo Clinic) স্পষ্টভাবে উল্লেখ করে যে, খাবারের সাথে এটি সেবন করলে তা পাকস্থলীর অস্বস্তি (যেমন বমি ভাব, পেট ব্যথা) কমাতে সাহায্য করে। শুধু তাই নয়, খাবারের সাথে খেলে ওষুধটি অন্ত্র থেকে ভালোভাবে শোষিত হয়, যার ফলে মূত্রে এর ঘনত্ব বৃদ্ধি পায় এবং কার্যকারিতা বাড়ে।
যদি একটি ডোজ মিস হয়?
যদি আপনি একটি ডোজ নিতে ভুলে যান, তবে মনে পড়ার সাথে সাথে সেটি গ্রহণ করুন। কিন্তু যদি পরবর্তী ডোজের সময় কাছাকাছি হয়ে যায় (যেমন, ৩-৪ ঘণ্টার কম বাকি থাকে), তবে ভুলে যাওয়া ডোজটি এড়িয়ে যান এবং পরবর্তী নির্দিষ্ট সময়ে নির্ধারিত ডোজটি গ্রহণ করুন। কখনোই দুটি ডোজ একসাথে গ্রহণ করবেন না।
সম্ভাব্য পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া: কখন সতর্ক থাকবেন?
যেকোনো ওষুধের মতোই ওফুরান এসআর-এরও কিছু পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া থাকতে পারে। বেশিরভাগই মৃদু এবং ওষুধ বন্ধ করার পর চলে যায়, তবে কিছু ক্ষেত্রে গুরুতর সমস্যাও দেখা দিতে পারে।
সাধারণ পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া (Common Side Effects)
- বমি বমি ভাব (Nausea)
- বমি (Vomiting)
- ক্ষুধামন্দা বা খিদে কমে যাওয়া (Loss of appetite)
- মাথাব্যথা (Headache)
- পেটের অস্বস্তি বা ডায়রিয়া
টিপস: এই সমস্যাগুলি কমাতে ওষুধটি অবশ্যই খাবারের সাথে খাবেন।
একটি বিশেষ কিন্তু নিরীহ পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া
ওফুরান এসআর সেবন করার সময় আপনার প্রস্রাবের রঙ গাঢ় হলুদ বা বাদামী হয়ে যেতে পারে। এটি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক এবং নিরীহ একটি পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া। ওষুধটি শরীর থেকে নির্গত হওয়ার সময় এই রঙ পরিবর্তন ঘটায়। ওষুধ বন্ধ করে দিলে প্রস্রাবের রঙ আবার স্বাভাবিক হয়ে যাবে।
গুরুতর পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া (Serious Side Effects): অবিলম্বে চিকিৎসকের সাথে যোগাযোগ করুন
যদিও বিরল, তবে কিছু গুরুতর পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া দেখা দিলে সঙ্গে সঙ্গে ওষুধ সেবন বন্ধ করতে হবে এবং চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে:
- ফুসফুসের সমস্যা (Pulmonary Reactions): এটি সবচেয়ে গুরুতর পার্শ্ব প্রতিক্রিয়াগুলির মধ্যে একটি। লক্ষণগুলির মধ্যে রয়েছে:
- হঠাৎ শ্বাসকষ্ট (Difficulty breathing)
- বুকে ব্যথা (Chest pain)
- শুকনো কাশি (Persistent cough)
- জ্বর
- (দীর্ঘমেয়াদী ব্যবহারে ফুসফুসের ফাইব্রোসিস হতে পারে, যা স্থায়ী ক্ষতি করে)।
- যকৃত বা লিভারের সমস্যা (Hepatotoxicity):
- চোখ বা ত্বক হলুদ হয়ে যাওয়া (জন্ডিস)
- পেটের উপরের ডানদিকে তীব্র ব্যথা
- তীব্র ক্লান্তি
- গাঢ় রঙের প্রস্রাব (বাদামী রঙের চেয়ে আলাদা)।
- স্নায়ুতন্ত্রের সমস্যা (Neurological Issues):
- হাত বা পায়ে অসাড়তা, ঝিঁ ঝিঁ ধরা বা তীব্র ব্যথা (Peripheral Neuropathy)। ডায়াবেটিস বা কিডনির সমস্যা থাকলে এই ঝুঁকি বেশি থাকে।
- অ্যালার্জিক প্রতিক্রিয়া (Allergic Reaction):
- চামড়ায় ফুসকুড়ি (Rash), চুলকানি
- মুখ, গলা বা জিহ্বা ফুলে যাওয়া
- মাথা ঘোরা, শ্বাস নিতে তীব্র কষ্ট হওয়া (Anaphylaxis)।
সতর্কতা এবং কাদের ওফুরান এসআর এড়িয়ে চলা উচিত?
ওফুরান এসআর সবার জন্য উপযুক্ত নয়। কিছু নির্দিষ্ট শারীরিক অবস্থা বা ওষুধের সাথে এটি সেবন করলে মারাত্মক জটিলতা তৈরি হতে পারে।
প্রধান সতর্কতাসমূহ (Contraindications)
নিম্নলিখিত ক্ষেত্রে ওফুরান এসআর সেবন করা উচিত নয়:
- কিডনির গুরুতর সমস্যা: যাদের কিডনির কার্যকারিতা মারাত্মকভাবে কমে গেছে (Severe Renal Impairment) বা ক্রিয়েটিনিন ক্লিয়ারেন্স (CrCl) একটি নির্দিষ্ট মাত্রার নিচে, তাদের ক্ষেত্রে এই ওষুধ ব্যবহার করা উচিত নয়। কারণ, কিডনি ঠিকমতো কাজ না করলে ওষুধটি মূত্রে ঘনীভূত হতে পারে না (ফলে অকার্যকর) এবং রক্তে জমা হয়ে বিষক্রিয়া (Toxicity) তৈরি করতে পারে।
- G6PD ডেফিসিয়েন্সি (G6PD Deficiency): এটি একটি বংশগত এনজাইমের অভাব। G6PD ডেফিসিয়েন্সি আছে এমন রোগীদের নাইট্রোফিউরান্টইন দিলে তাদের লোহিত রক্তকণিকা (Red Blood Cells) ভেঙে যেতে পারে, যার ফলে ‘হেমোলাইটিক অ্যানিমিয়া’ (Hemolytic Anemia) নামক মারাত্মক রক্তাল্পতা দেখা দেয়।
- গর্ভাবস্থার শেষ পর্যায়: গর্ভাবস্থার প্রথম দিকে প্রয়োজনে ব্যবহার করা গেলেও, গর্ভাবস্থার একেবারে শেষ পর্যায়ে (৩৬ সপ্তাহের পর) বা প্রসবের সময় এটি দেওয়া হয় না। কারণ এটি নবজাতকের G6PD ডেফিসিয়েন্সি থাকলে তার দেহে হেমোলাইটিক অ্যানিমিয়া করতে পারে।
- এক মাসের কম বয়সী শিশু: একই কারণে এক মাসের কম বয়সী শিশুদের এই ওষুধ দেওয়া নিষিদ্ধ।
- লিভারের রোগের ইতিহাস: যাদের পূর্বে নাইট্রোফিউরান্টইন ব্যবহারের ফলে লিভারের সমস্যা বা জন্ডিস হয়েছে, তাদের পুনরায় এটি ব্যবহার করা উচিত নয়।
anfree 0.5 এর কাজ কি? দুশ্চিন্তা ও অবসাদ দূর করার কার্যকরী সমাধান
গর্ভাবস্থা এবং স্তন্যদান (Pregnancy and Lactation)
- গর্ভাবস্থা: গর্ভাবস্থায় ইউটিআই-এর চিকিৎসায় এটি প্রায়শই ব্যবহৃত হয়, তবে তা অবশ্যই চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে হতে হবে। গর্ভাবস্থার শেষ পর্যায়ে (Term) এটি এড়িয়ে চলা হয়।
- স্তন্যদান: নাইট্রোফিউরান্টইন সামান্য পরিমাণে বুকের দুধে নিঃসৃত হয়। যদি শিশু সুস্থ থাকে এবং তার G6PD ডেফিসিয়েন্সি না থাকে, তবে এটি সাধারণত নিরাপদ বলে মনে করা হয়। তবে, অবশ্যই চিকিৎসকের সাথে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
অন্যান্য ওষুধের সাথে মিথস্ক্রিয়া (Drug Interactions)
ওফুরান এসআর কিছু ওষুধের সাথে প্রতিক্রিয়া করতে পারে, যা এর কার্যকারিতা কমিয়ে দেয় বা পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া বাড়িয়ে তোলে।
- অ্যান্টাসিড (Antacids): ম্যাগনেসিয়াম ট্রাইসিলিকেট (Magnesium Trisilicate) যুক্ত অ্যান্টাসিড (যা গ্যাস্ট্রিকের ওষুধে থাকে) ওফুরান এসআর-এর শোষণ কমিয়ে দেয়, ফলে এর কার্যকারিতা হ্রাস পায়।
- প্রোবেনিসিড (Probenecid): গাউট বা গেঁটেবাতের এই ওষুধটি কিডনি থেকে নাইট্রোফিউরান্টইন নিঃসরণে বাধা দেয়। এর ফলে মূত্রে ওষুধের ঘনত্ব কমে যায় (ফলে ইউটিআই সারে না) এবং রক্তে ঘনত্ব বেড়ে গিয়ে বিষক্রিয়া তৈরি হয়।
- কিছু ভ্যাকসিন: যেমন লাইভ টাইফয়েড ভ্যাকসিন (Oral Typhoid Vaccine)-এর কার্যকারিতা কমিয়ে দিতে পারে।
Zoleta 2.5 mg-এর কাজ কি? স্তন ক্যান্সার ও বন্ধ্যাত্বের চিকিৎসায় এর ব্যবহার জানুন
ওফুরান এসআর বনাম অন্যান্য অ্যান্টিবায়োটিক
ইউটিআই-এর চিকিৎসায় অন্যান্য অ্যান্টিবায়োটিক (যেমন সিপ্রোফ্লক্সাসিন, লিভোফ্লক্সাসিন, ট্রাইমেথোপ্রিম) ব্যবহৃত হলেও, ওফুরান এসআর-এর কিছু বিশেষ সুবিধা রয়েছে।
- ফ্লুরোকুইনোলোনস (Ciprofloxacin/Levofloxacin): এই শক্তিশালী অ্যান্টিবায়োটিকগুলো অনেক রেজিস্ট্যান্স সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে এবং এগুলোর গুরুতর পার্শ্ব প্রতিক্রিয়াও (যেমন টেন্ডন ফেটে যাওয়া) রয়েছে। তাই সাধারণ ইউটিআই-এর জন্য এগুলো এখন প্রথম পছন্দ নয়।
- ট্রাইমেথোপ্রিম (Trimethoprim): এটিও কার্যকরী, কিন্তু E. coli-এর বিরুদ্ধে এর রেজিস্ট্যান্স রেট নাইট্রোফিউরান্টইনের চেয়ে কিছু অঞ্চলে বেশি দেখা যাচ্ছে।
ওফুরান এসআর-এর একটি বড় সুবিধা হলো এটি “Collateral Damage” বা পার্শ্ববর্তী ভালো ব্যাকটেরিয়ার ক্ষতি কম করে। এটি যেহেতু প্রধানত মূত্রেই ঘনীভূত হয়, তাই এটি অন্ত্রের উপকারী ব্যাকটেরিয়াগুলিকে অন্যান্য ব্রড-স্পেকট্রাম অ্যান্টিবায়োটিকের মতো ততটা ধ্বংস করে না।
একটি কার্যকরী তবে সতর্কতার সাথে ব্যবহারের ওষুধ
ওফুরান এসআর (নাইট্রোফিউরান্টইন) নিঃসন্দেহে মূত্রাশয়ের সংক্রমণ বা ইউটিআই-এর বিরুদ্ধে একটি অত্যন্ত কার্যকরী এবং গুরুত্বপূর্ণ অ্যান্টিবায়োটিক। এর অনন্য কার্যপদ্ধতি, মূত্রে উচ্চ ঘনত্ব এবং তুলনামূলকভাবে কম অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স রেট একে অনেক চিকিৎসকের প্রথম পছন্দ করে তুলেছে।
তবে, এটি কোনো সাধারণ ব্যথানাশক ওষুধ নয়। এটি একটি শক্তিশালী অ্যান্টিবায়োটিক যার ভুল ব্যবহার বা অপ্রয়োজনীয় সেবন গুরুতর পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া, বিশেষত ফুসফুস, লিভার বা স্নায়ুর ক্ষতি করতে পারে। কিডনির সমস্যা বা G6PD ডেফিসিয়েন্সি থাকলে এটি সেবন মারাত্মক হতে পারে।
সর্বদা মনে রাখবেন, প্রস্রাবের জ্বালা বা ইউটিআই-এর লক্ষণ দেখা দিলে নিজে থেকে ওষুধ না কিনে বা পুরোনো প্রেসক্রিপশন দেখে ওষুধ শুরু না করে, অবশ্যই একজন চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। তিনিই আপনার প্রকৃত প্রয়োজন, রোগের তীব্রতা এবং শারীরিক অবস্থা বিচার করে সঠিক ওষুধ এবং ডোজ নির্ধারণ করবেন।











