Oldest Fair in West Bengal: পশ্চিমবঙ্গের সবচেয়ে প্রাচীন এবং ঐতিহ্যবাহী মেলা হলো গঙ্গাসাগর মেলা, যার ইতিহাস প্রায় ১৫০০-২০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ পর্যন্ত প্রসারিত । মহাভারতের বনপর্ব এই তীর্থস্থানের অস্তিত্বের প্রমাণ বহন করে, যা এই মেলাকে ভারতের প্রাচীনতম ধর্মীয় সমাবেশগুলির মধ্যে একটি করে তুলেছে । প্রতি বছর মকর সংক্রান্তিতে পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ ২৪ পরগণা জেলার সাগরদ্বীপে গঙ্গা ও বঙ্গোপসাগরের সঙ্গমস্থলে এই মেলা অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে লক্ষ লক্ষ তীর্থযাত্রী পবিত্র স্নান করতে আসেন ।
গঙ্গাসাগর মেলার ঐতিহাসিক পটভূমি
গঙ্গাসাগর মেলার ইতিহাস প্রাচীন ভারতীয় সভ্যতার সাথে গভীরভাবে জড়িত। মহাভারতের বনপর্বে এই পবিত্র স্থানের উল্লেখ পাওয়া যায়, যেখানে পাণ্ডবরা কৌশিক নদীর তীর থেকে গঙ্গাসাগর সঙ্গমে পৌঁছেছিলেন । এই ঐতিহাসিক উল্লেখ প্রমাণ করে যে এই তীর্থস্থান খ্রিস্টপূর্ব ১৫০০-২০০০ অব্দ থেকেই বিদ্যমান ছিল । বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ থেকে ১৯৩৩ সালে প্রকাশিত ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের “সংবাদপত্রে সেকালের কথা” বই অনুসারে, ৪৩৭ খ্রিস্টাব্দে গঙ্গাসাগরে প্রথম কপিল মুনি মন্দির নির্মিত হয় ।
মহাকবি কালিদাসের পঞ্চম শতাব্দীর সাহিত্যিক কীর্তি “রঘুবংশম”-এও এই তীর্থযাত্রার বিবরণ পাওয়া যায় । উনিশ শতকের বাংলা সংবাদপত্র “হরকরা পত্রিকা”-য় ১৮৩৭ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি গঙ্গাসাগর মেলা সম্পর্কে একটি নিবন্ধ প্রকাশিত হয়, যাতে উল্লেখ করা হয়েছিল যে সাগরদ্বীপের এই মন্দির ১৪০০ বছর ধরে মানুষের কাছে পরিচিত । পাল রাজবংশের রাজা দেবপাল একটি শিলালিপিতে উল্লেখ করেছেন যে তিনি গঙ্গাসাগরের সঙ্গমে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান সম্পাদন করেছিলেন ।
কপিল মুনির কিংবদন্তি ও পৌরাণিক তাৎপর্য
গঙ্গাসাগর মেলার পৌরাণিক গুরুত্ব সাংখ্য দর্শনের প্রতিষ্ঠাতা মহর্ষি কপিল মুনির সাথে সম্পর্কিত। বিশ্বাস করা হয় যে কপিল মুনি এই স্থানে তপস্যা করেছিলেন এবং তাঁর আশ্রম পরবর্তীতে হিন্দুদের জন্য একটি পবিত্র স্থানে পরিণত হয় । মহাভারত অনুসারে, ভীষ্মকে গঙ্গাসাগরে স্নানের গুরুত্ব ব্যাখ্যা করা হয়েছিল, যে কারণে শতাব্দী ধরে এই ঐতিহ্য অব্যাহত রয়েছে এবং প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ তীর্থযাত্রী আকর্ষিত করে ।
হিন্দু পুরাণ অনুসারে, রাজা সগরের ষাট হাজার পুত্র কপিল মুনির ক্রোধে ভস্মীভূত হয়েছিলেন। পরে রাজা ভগীরথ গঙ্গাকে স্বর্গ থেকে পৃথিবীতে আনেন তাঁদের আত্মার মুক্তির জন্য, এবং গঙ্গা সাগরে মিলিত হয়। এই পৌরাণিক কাহিনীর কারণে গঙ্গাসাগরে স্নানকে অত্যন্ত পবিত্র ও পাপমোচনকারী বলে মনে করা হয়। প্রবাদে বলা হয়, “সব তীর্থ বার বার, গঙ্গাসাগর একবার” – যা এই তীর্থস্থানের সর্বোচ্চ গুরুত্ব নির্দেশ করে।
মেলার বিবর্তন ও আধুনিক রূপ
অষ্টাদশ শতাব্দীতে নদীয়ার মহারাজার সমর্থন ও উৎসাহের মাধ্যমে গঙ্গাসাগর মেলা আরও প্রসিদ্ধি লাভ করে । মহারাজার সহায়তায়, এই তীর্থযাত্রা একটি বিশাল বার্ষিক অনুষ্ঠানে পরিণত হয় যা লক্ষ লক্ষ ভক্তদের আকর্ষিত করে । বর্তমানে এটি কুম্ভমেলার পরে ভারতের দ্বিতীয় বৃহত্তম ধর্মীয় সমাবেশ হিসেবে বিবেচিত হয় ।
প্রতি বছর জানুয়ারি মাসের মাঝামাঝি সময়ে, মকর সংক্রান্তির সময় এই মেলা শুরু হয় । মকর সংক্রান্তির আগের দিন থেকে শুরু করে দুই দিন ব্যাপী এই মেলা চলে, যদিও তীর্থযাত্রা আরও আগে থেকে শুরু হয় । মকর সংক্রান্তির দিন সূর্যোদয়ের সময় গঙ্গার পবিত্র জলে ডুব দেওয়া সবচেয়ে শুভ বলে মনে করা হয় ।
বর্তমানে প্রতি বছর গঙ্গাসাগর মেলায় দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে লক্ষাধিক তীর্থযাত্রী অংশগ্রহণ করেন । কড়া নিরাপত্তার মধ্যে, হাজার হাজার মানুষ মকর সংক্রান্তিতে গঙ্গা ও বঙ্গোপসাগরের সঙ্গমস্থলে পবিত্র স্নান এবং আচার-অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেন ।
পশ্চিমবঙ্গের অন্যান্য ঐতিহাসিক মেলা
জয়দেব কেঁদুলি বাউল মেলা
গঙ্গাসাগর মেলার পরে, পশ্চিমবঙ্গের আরেকটি প্রাচীন ও ঐতিহাসিক মেলা হলো জয়দেব কেঁদুলি বাউল মেলা। বীরভূম জেলার কেঁদুলি গ্রামে অনুষ্ঠিত এই মেলা পাঁচ থেকে ছয় শতাব্দী পুরোনো । দ্বাদশ শতাব্দীর কবি-সাধক জয়দেবকে সম্মান জানাতে এই মেলা শুরু হয়, যিনি তাঁর ভক্তিমূলক মহাকাব্য “গীতগোবিন্দ”-এর জন্য বিখ্যাত ।
জয়দেব কেঁদুলি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেছিলেন বলে বিশ্বাস করা হয় এবং তাঁর স্মৃতিতে মকর সংক্রান্তির সময় এই মেলা অনুষ্ঠিত হয় । অজয় নদীতে পবিত্র স্নান দিয়ে শুরু হওয়া এই সাধারণ শ্রদ্ধাঞ্জলি মধ্যযুগীয় সময় থেকে প্রাচীন ঐতিহ্য বজায় রেখে বেঁচে থাকা রহস্যময় গায়ক বাউলদের বাংলার বৃহত্তম সমাবেশে পরিণত হয়েছে ।
প্রতি বছর বাংলা পৌষ মাসের শেষ দিন থেকে মাঘ মাসের দ্বিতীয় দিন পর্যন্ত এই মেলা চলে । বীরভূম জেলা, যা লাল মাটির দেশ হিসেবে পরিচিত, এখানে পাওয়া লাল মাটির কারণে এই অঞ্চল বিশেষভাবে চিহ্নিত । ১৯৮২ সালে বীরভূম জেলার কর্তৃপক্ষ মেলার দায়িত্ব নেয়, যার ফলে স্যানিটেশন ব্যবস্থা, পানযোগ্য জল, আলো, নিরাপত্তা এবং আত্মাপূর্ণ সঙ্গীত শোনার জন্য একটি উপযুক্ত পরিবেশের উন্নতি হয় ।
পৌষ মেলা, শান্তিনিকেতন
শান্তিনিকেতনের পৌষ মেলা বীরভূমের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বার্ষিক মেলা এবং শান্তিনিকেতনের প্রতিষ্ঠা দিবস উদযাপনের জন্য শান্তিনিকেতন মেলা প্রাঙ্গণে বিশাল আড়ম্বরের সাথে উদযাপিত হয় । ১৮৪৩ সালের ২১ ডিসেম্বর মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পিতা, ব্রাহ্ম ধর্ম গ্রহণ করেন, যা পৌষ মেলার গল্পের সূচনা চিহ্নিত করে । রামচন্দ্র বিদ্যাবাগীশের নির্দেশনায়, তিনি অন্য বিশজন অনুসারীর সাথে এই নতুন আধ্যাত্মিক দর্শন গ্রহণ করেন ।
এই অনুষ্ঠানের স্মরণে ২১ ডিসেম্বর, ১৮৯১ সালে ব্রহ্ম মন্দির (ব্রাহ্ম মন্দির) প্রতিষ্ঠিত হয় । মন্দিরের বার্ষিকী উদযাপনের জন্য একটি ছোট অনুষ্ঠান একটি বিশাল মেলায় সম্প্রসারিত হয়েছে যা ভারত এবং বিদেশ থেকে হাজার হাজার পর্যটককে আকর্ষিত করে । প্রথম পৌষ মেলা বাংলা ১৭৬৭ সালের পৌষ ৬ তারিখে পালটার গোরিটি বাগানে অনুষ্ঠিত হয়েছিল ।
সপ্তাহব্যাপী এই উৎসব বাংলার মহান সংস্কৃতির সারমর্ম প্রকাশ করে এবং সংস্কৃতি, স্থানীয় সঙ্গীত ও নৃত্য এবং বাংলা গ্রামাঞ্চলের সমৃদ্ধ ঐতিহ্যের বৈচিত্র্যময় মিশ্রণ অনুভব করতে সারা বিশ্ব থেকে হাজার হাজার পর্যটককে আকর্ষিত করে । পৌষ মাসের ৭ম দিনে শুরু হওয়া এই কার্নিভাল ফসল কাটার মৌসুমের সূচনা চিহ্নিত করে ।
দক্ষিণ বিষ্ণুপুরের ভাঙাচোরা মেলা
দক্ষিণ ২৪ পরগনার দক্ষিণ বিষ্ণুপুরে একটি অনন্য মেলা অনুষ্ঠিত হয় যা প্রায় ৫০০ বছরের পুরোনো বলে মনে করা হয় । ১৫২০ সালে শ্রী চৈতন্যদেব যখন পুরী যাচ্ছিলেন, তখন তিনি এই জায়গায় অর্থাৎ দক্ষিণ ২৪ পরগণার দক্ষিণ বিষ্ণুপুরে থেমেছিলেন, এবং সেই স্মৃতিতে এই মেলার সূচনা বলে বিশ্বাস করা হয় ।
প্রতি বছর পৌষ সংক্রান্তিতে শুরু হয়ে প্রায় এক মাস চলে এই মেলা । এই মেলার বিশেষত্ব হলো এখানে পুরোনো, ভাঙাচোরা এবং এন্টিক জিনিসপত্র বিক্রি হয় । হাজার হাজার আইটেম এখানে পাওয়া যায় যা এন্টিক সংগ্রাহকদের জন্য একটি স্বর্গ । এই মেলায় শত শত বছরের প্রাচীন মুদ্রা, বাসন, যন্ত্র এবং ইতিহাসের অমূল্য নিদর্শন পাওয়া যায় ।
রাসযাত্রা মেলা, কোচবিহার
কোচবিহারের রাসযাত্রা মেলাও পশ্চিমবঙ্গের একটি প্রাচীন উৎসব। ১৮১২ সালে কোচ শাসকরা ভগবান মদন মোহনের (ভগবান কৃষ্ণের একটি রূপ) সম্মানে এই উৎসব শুরু করেছিলেন । রাজকীয় শাসনের সময় থেকে এই এলাকায় রাসযাত্রা উদযাপনের রীতি একটি প্রথা হয়ে উঠেছে ।
এই মেলা বা উৎসবের বৈশিষ্ট্য হলো অন্যান্য রাজ্য থেকে দর্শনার্থীদের বিশাল সমাগম এবং এলাকার স্থানীয় পণ্য বিশেষত হস্তশিল্পের বিক্রয় । ভারত জুড়ে বিশিষ্ট শিল্পীরা এই মেলায় পরিবেশন করতে আসেন ।
কলকাতা বইমেলা: ভারতের প্রাচীনতম বইমেলা
পশ্চিমবঙ্গের মেলার ইতিহাসে কলকাতা বইমেলারও একটি বিশেষ স্থান রয়েছে। ১৯১৮ সালে কলকাতার কলেজ স্ট্রিটে ভারতের প্রথম বইমেলা অনুষ্ঠিত হয়েছিল । রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, লালা লাজপত রায়, গুরুদাস ব্যানার্জি, বিপিনচন্দ্র পাল এবং অরবিন্দ ঘোষের মতো বিশিষ্ট ব্যক্তিরা এই অনুষ্ঠানের তত্ত্বাবধান করেছিলেন ।
ন্যাশনাল কাউন্সিল অফ এডুকেশন (NCE) দ্বারা আয়োজিত, যা ইভেন্টটিকে একটি বই প্রদর্শনী হিসাবে উল্লেখ করেছিল, মেলাটি বো বাজারের সেই স্থানে হয়েছিল যেখানে আজ গোয়েঙ্কা কলেজ অফ কমার্স রয়েছে । ১৯০৬ সালে প্রতিষ্ঠিত, NCE বাংলা বিভাগের ব্রিটিশ সিদ্ধান্তের প্রতিক্রিয়ায় উদ্ভূত হয়েছিল এবং স্বদেশী আন্দোলনের অংশ হিসেবে যুবকদের বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত শিক্ষা প্রদানের জন্য ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ উদ্যোগ প্রচারকারী প্রথম প্রতিষ্ঠানগুলির মধ্যে অন্যতম ছিল ।
আধুনিক কলকাতা বইমেলা ১৯৭৬ সালে ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের কাছে শুরু হয়েছিল, যখন ৩৪টি প্রকাশক ৫৬টি স্টল স্থাপন করেছিলেন । ৫ মার্চ উদ্বোধন করা এবং ১৪ মার্চ সমাপ্ত ১০ দিনের অনুষ্ঠানটি বইপ্রেমীদের আকর্ষিত করেছিল যারা ৫০ পয়সা প্রবেশ মূল্য প্রদান করেছিলেন ।
গঙ্গাসাগর মেলার সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব
গঙ্গাসাগর মেলা শুধুমাত্র একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, এটি পশ্চিমবঙ্গের সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক জীবনে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। মেলার সময় স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্য, পরিবহন, হস্তশিল্প এবং খাদ্য শিল্পে ব্যাপক প্রাণচাঞ্চল্য দেখা যায়। সাগরদ্বীপ এবং আশেপাশের এলাকার অর্থনীতি এই মেলার উপর অনেকাংশে নির্ভরশীল।
পশ্চিমবঙ্গ সরকার এই মেলার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করে, যার মধ্যে রয়েছে অস্থায়ী আবাসন, চিকিৎসা সুবিধা, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং পরিবহন সুবিধা। কলকাতা থেকে সাগরদ্বীপ পর্যন্ত বিশেষ বাস ও ফেরি সেবা চালু করা হয়। মেলার সময় হাজার হাজার স্বেচ্ছাসেবক এবং পুলিশ সদস্য তীর্থযাত্রীদের সহায়তার জন্য মোতায়েন করা হয়।
মেলায় বিভিন্ন প্রকার ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজিত হয়। সাধু-সন্ন্যাসীরা তাদের শিবির স্থাপন করেন এবং ধর্মীয় আলোচনা ও উপদেশ প্রদান করেন। কীর্তন, ভজন এবং অন্যান্য ভক্তিমূলক সঙ্গীত পরিবেশিত হয়। মেলার প্রাঙ্গণে অস্থায়ী দোকানে স্থানীয় হস্তশিল্প, খাবার, ধর্মীয় সামগ্রী এবং স্যুভেনির বিক্রি হয়।
মেলার আধুনিক চ্যালেঞ্জ ও উন্নয়ন
বর্তমান যুগে গঙ্গাসাগর মেলা বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। লক্ষ লক্ষ তীর্থযাত্রীর জন্য পর্যাপ্ত পরিকাঠামো, পরিচ্ছন্নতা, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করা একটি বড় কাজ। সাগরদ্বীপ একটি সংবেদনশীল পরিবেশগত অঞ্চল হওয়ায়, মেলার কারণে পরিবেশের উপর প্রভাব একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগের বিষয়।
সরকার এবং বিভিন্ন সংস্থা মেলার পরিকাঠামো উন্নয়নে ক্রমাগত কাজ করছে। আধুনিক স্যানিটেশন সুবিধা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পরিষ্কার পানীয় জল সরবরাহ এবং চিকিৎসা সুবিধার উন্নতি করা হচ্ছে। ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার, যেমন অনলাইন নিবন্ধন, মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন এবং জিপিএস ট্র্যাকিং, তীর্থযাত্রীদের অভিজ্ঞতা উন্নত করতে সাহায্য করছে।
পরিবেশ সংরক্ষণের জন্য প্লাস্টিক মুক্ত মেলা করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। জৈব-পচনশীল পণ্য ব্যবহার উৎসাহিত করা হচ্ছে এবং বর্জ্য পুনর্ব্যবহারের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। সমুদ্র ও নদীর জল দূষণ রোধে বিশেষ পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
তুলনামূলক বিশ্লেষণ: পশ্চিমবঙ্গের প্রাচীন মেলাসমূহ
| মেলার নাম | প্রতিষ্ঠাকাল | অবস্থান | প্রধান আকর্ষণ | সময়কাল |
|---|---|---|---|---|
| গঙ্গাসাগর মেলা | খ্রিস্টপূর্ব ১৫০০-২০০০ | সাগরদ্বীপ, দক্ষিণ ২৪ পরগনা | পবিত্র স্নান, কপিল মুনি মন্দির | মকর সংক্রান্তি (জানুয়ারি) |
| জয়দেব কেঁদুলি বাউল মেলা | ৫-৬ শতাব্দী পূর্বে | কেঁদুলি, বীরভূম | বাউল সঙ্গীত, লোকসংস্কৃতি | পৌষ সংক্রান্তি-মাঘ |
| দক্ষিণ বিষ্ণুপুর মেলা | প্রায় ১৫২০ সাল | দক্ষিণ বিষ্ণুপুর, দক্ষিণ ২৪ পরগনা | এন্টিক ও পুরোনো জিনিস | পৌষ সংক্রান্তি (১ মাস) |
| রাসযাত্রা মেলা | ১৮১২ | কোচবিহার | রাসলীলা, হস্তশিল্প | নভেম্বর-ডিসেম্বর |
| পৌষ মেলা | ১৮৯১ (আধুনিক রূপ) | শান্তিনিকেতন, বীরভূম | সংস্কৃতি, সঙ্গীত, হস্তশিল্প | পৌষ মাস (ডিসেম্বর) |
পর্যটন ও তীর্থযাত্রীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ তথ্য
গঙ্গাসাগর মেলায় যোগদানের জন্য তীর্থযাত্রীদের কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখা উচিত। কলকাতা থেকে সাগরদ্বীপের দূরত্ব প্রায় ১০০ কিলোমিটার এবং যাত্রায় সড়ক ও জলপথ উভয়ই ব্যবহার করতে হয়। কলকাতা থেকে বাসে কাকদ্বীপ বা হরউড পয়েন্ট পর্যন্ত যেতে হয় এবং তারপর ফেরিতে সাগরদ্বীপে পৌঁছাতে হয়।
মেলার সময় অত্যধিক ভিড় হওয়ায়, তীর্থযাত্রীদের যথেষ্ট ধৈর্য্য ধরতে হয়। আগে থেকে আবাসনের ব্যবস্থা করা উচিত, যদিও সরকার অস্থায়ী শিবির স্থাপন করে। জরুরি যোগাযোগের নম্বর, প্রয়োজনীয় ওষুধ এবং উষ্ণ পোশাক সাথে রাখা জরুরি কারণ জানুয়ারি মাসে আবহাওয়া বেশ ঠান্ডা থাকে।
স্থানীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সম্মান করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পরিবেশ রক্ষায় প্লাস্টিক ব্যবহার এড়ানো এবং নির্ধারিত স্থানে বর্জ্য ফেলা উচিত। সাগরে স্নানের সময় নিরাপত্তা নির্দেশাবলী মেনে চলা এবং গভীর জলে না যাওয়া বাঞ্ছনীয়।
ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা ও সংরক্ষণ
গঙ্গাসাগর মেলার ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল কিন্তু এর সংরক্ষণ এবং টেকসই উন্নয়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই প্রাচীন ঐতিহ্যকে আধুনিক যুগে বাঁচিয়ে রাখার জন্য যুগোপযোগী পরিকল্পনা প্রয়োজন। সরকার, বেসরকারি সংস্থা এবং স্থানীয় সম্প্রদায়কে একসাথে কাজ করতে হবে যাতে মেলার ঐতিহ্য রক্ষা করার পাশাপাশি আধুনিক সুবিধা প্রদান করা যায়।
ডিজিটাল যুগে মেলার প্রচার ও প্রসার আন্তর্জাতিক পর্যায়ে করা সম্ভব। বিদেশী পর্যটকদের আকর্ষণ করার জন্য বহুভাষিক তথ্য এবং আধুনিক পর্যটন সুবিধা প্রদান করা যেতে পারে। ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্য তালিকায় অন্তর্ভুক্তির জন্য প্রচেষ্টা চালানো যেতে পারে, যা মেলার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি বৃদ্ধি করবে।
গবেষণা ও ডকুমেন্টেশনের মাধ্যমে মেলার ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং সাংস্কৃতিক গুরুত্ব সংরক্ষণ করা উচিত। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলি এই বিষয়ে অধ্যয়ন পরিচালনা করতে পারে এবং নতুন প্রজন্মের কাছে এই ঐতিহ্য তুলে ধরতে পারে।
সামাজিক ও আধ্যাত্মিক তাৎপর্য
গঙ্গাসাগর মেলা শুধুমাত্র একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, এটি ভারতীয় সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষকে একত্রিত করার একটি মাধ্যম। ধনী-দরিদ্র, শহুরে-গ্রামীণ, শিক্ষিত-অশিক্ষিত সবাই এখানে সমান ভাবে পবিত্র স্নানে অংশগ্রহণ করেন। এই সামাজিক সমতা ও একতার বার্তা মেলার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক।
আধ্যাত্মিক দিক থেকে, মেলা মানুষকে তাদের আধ্যাত্মিক শিকড়ের সাথে পুনঃসংযুক্ত হওয়ার সুযোগ দেয়। পবিত্র জলে স্নান, পূজা-অর্চনা, দান-ধ্যান এবং ধর্মীয় আলোচনায় অংশগ্রহণ মানুষের আধ্যাত্মিক চাহিদা পূরণ করে। সাধু-সন্ন্যাসীদের সাথে সাক্ষাৎ এবং তাদের উপদেশ শ্রবণ অনেকের জীবনে প্রভাব ফেলে।
মেলা পরিবার ও সম্প্রদায়ের বন্ধন দৃঢ় করার একটি উপলক্ষ। অনেক পরিবার প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে একসাথে গঙ্গাসাগর যাত্রা করেন। এই যৌথ অভিজ্ঞতা পারিবারিক ঐতিহ্য ও মূল্যবোধ সংরক্ষণে সহায়তা করে।
পশ্চিমবঙ্গের সবচেয়ে প্রাচীন মেলা গঙ্গাসাগর মেলা শুধুমাত্র একটি ধর্মীয় সমাবেশ নয়, এটি ভারতীয় সভ্যতার প্রাচীনতম ঐতিহ্যের একটি জীবন্ত প্রমাণ। খ্রিস্টপূর্ব ১৫০০-২০০০ অব্দ থেকে চলে আসা এই মেলা আজও লক্ষ লক্ষ মানুষকে আকর্ষিত করে, যা এর স্থায়ী প্রাসঙ্গিকতা ও গুরুত্ব প্রমাণ করে। মহাভারত, রামায়ণ এবং অন্যান্য প্রাচীন গ্রন্থে উল্লিখিত এই পবিত্র স্থান ভারতীয় আধ্যাত্মিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসের একটি অমূল্য অংশ। আধুনিক যুগে এই প্রাচীন ঐতিহ্যকে সংরক্ষণ ও উন্নয়ন করা আমাদের সকলের দায়িত্ব। পরিবেশ সংরক্ষণ, টেকসই উন্নয়ন এবং তীর্থযাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মাধ্যমে আমরা নিশ্চিত করতে পারি যে ভবিষ্যৎ প্রজন্মও এই ঐতিহ্যবাহী মেলার অভিজ্ঞতা লাভ করতে পারবে।











