ওমাস্টিন ১৫০ (Omastin 150) হলো একটি অত্যন্ত কার্যকরী অ্যান্টিফাঙ্গাল বা ছত্রাকবিরোধী ওষুধ, যা মূলত শরীরের বিভিন্ন ধরনের ছত্রাকজনিত সংক্রমণের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়। বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড (Beximco Pharmaceuticals Ltd.) এর প্রস্তুতকৃত এই ওষুধের মূল উপাদান হলো ফ্লুকোনাজল (Fluconazole)। এটি সাধারণত ভ্যাজাইনাল ক্যান্ডিডিয়াসিস (যোনিপথে ছত্রাক সংক্রমণ), মুখের ঘা বা ওরাল থ্রাশ, এবং ত্বকের দাউদ বা রিংওয়ার্ম নিরাময়ে চিকিৎসকরা পরামর্শ দিয়ে থাকেন। ফ্লুকোনাজল গ্রুপের এই ওষুধটি ছত্রাকের কোষের ঝিল্লি বা সেল মেমব্রেন তৈরিতে বাধা দিয়ে জীবাণুকে ধ্বংস করে এবং সংক্রমণের বিস্তার রোধ করে। বিশ্বস্ত মেডিকেল সূত্র এবং সাম্প্রতিক বাজার দর অনুযায়ী, এটি বাংলাদেশের অন্যতম বহুল ব্যবহৃত অ্যান্টিফাঙ্গাল ক্যাপসুল।
ওমাস্টিন ১৫০ (Omastin 150) কী এবং এর মূল উপাদান
ওমাস্টিন ১৫০ হলো ট্রায়াজোল (Triazole) শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত একটি শক্তিশালী অ্যান্টিফাঙ্গাল ওষুধ। প্রতিটি ক্যাপসুলে ১৫০ মি.গ্রা. (mg) ফ্লুকোনাজল সক্রিয় উপাদান হিসেবে থাকে। এটি শরীরের অভ্যন্তরীণ এবং বাহ্যিক উভয় ধরনের ফাঙ্গাল ইনফেকশনের বিরুদ্ধে দ্রুত কাজ করতে সক্ষম। বিশেষ করে যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম বা যারা দীর্ঘমেয়াদী অ্যান্টিবায়োটিক সেবন করছেন, তাদের ক্ষেত্রে ছত্রাক সংক্রমণের ঝুঁকি কমাতে এটি অত্যন্ত কার্যকর।
এক নজরে ওমাস্টিন ১৫০ (Omastin 150)
| তথ্য | বিবরণ |
| ব্র্যান্ড নাম | Omastin 150 (ওমাস্টিন ১৫০) |
| জেনেরিক নাম | Fluconazole (ফ্লুকোনাজল) |
| প্রস্তুতকারক | Beximco Pharmaceuticals Ltd. |
| ধরণ | ক্যাপসুল (Capsule) |
| মূল কাজ | ছত্রাক বা ফাঙ্গাল ইনফেকশন নিরাময় |
| FDA ক্যাটাগরি | প্রেগন্যান্সি ক্যাটাগরি ‘C’ (সতর্কতা প্রয়োজন) |
ওমাস্টিন ১৫০ এর বিস্তারিত কাজ ও ব্যবহারসমূহ
ওমাস্টিন ১৫০ শরীরের বিভিন্ন অঙ্গে বাসা বাঁধা ক্ষতিকর ছত্রাক নির্মূলে ব্যবহৃত হয়। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী এর ব্যবহারের ক্ষেত্রগুলো নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
১. ভ্যাজাইনাল ক্যান্ডিডিয়াসিস (Vaginal Candidiasis)
নারীদের যোনিপথে ইস্ট বা ছত্রাকের সংক্রমণে এটি সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়। এর লক্ষণগুলো হলো তীব্র চুলকানি, জ্বালাপোড়া এবং সাদা স্রাব। ওমাস্টিন ১৫০ এর একটি একক মাত্রা (Single Dose) সাধারণত এই সমস্যা নিরাময়ে যথেষ্ট।
২. ওরোফ্যারিঞ্জিয়াল ক্যান্ডিডিয়াসিস (Oropharyngeal Candidiasis)
এটি সাধারণত “ওরাল থ্রাশ” নামে পরিচিত, যেখানে জিহ্বা বা গলার ভেতরে সাদা আস্তরণ পড়ে। যারা ইনহেলার ব্যবহার করেন বা যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম, তাদের এই সমস্যা বেশি হয়। এই ক্ষেত্রে ওমাস্টিন ১৫০ বেশ কার্যকরী।
খাবার খাওয়ার কতক্ষণ পরে ওষুধ খাওয়া উচিত? সম্পূর্ণ গাইড
৩. টিনিয়া বা দাউদ (Tinea Infections)
শরীরের বিভিন্ন স্থানে, বিশেষ করে কুঁচকি (Tinea cruris), পা (Athlete’s foot) বা শরীরের অন্যান্য ভাজে গোল চাকা বা দাউদ হলে চিকিৎসকরা এই ওষুধটি দীর্ঘমেয়াদী কোর্সে সেবন করতে দেন।
৪. নখের সংক্রমণ (Onychomycosis)
নখে ছত্রাকের আক্রমণে নখ হলুদ বা ভঙ্গুর হয়ে গেলে ওমাস্টিন ১৫০ দীর্ঘমেয়াদে (কয়েক সপ্তাহ বা মাস) ব্যবহার করা হয়। এটি নখের গোড়া থেকে নতুন সুস্থ নখ গজাতে সাহায্য করে।
৫. গুরুতর সিস্টেমিক সংক্রমণ
রক্তে বা শরীরের অভ্যন্তরীণ অঙ্গে (যেমন ফুসফুস বা খাদ্যনালী) ছত্রাক ছড়িয়ে পড়লে (Systemic Candidiasis), জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসা হিসেবে ফ্লুকোনাজল ব্যবহৃত হয়।
ওমাস্টিন ১৫০ কীভাবে কাজ করে? (Mechanism of Action)
ওমাস্টিন ১৫০ বা ফ্লুকোনাজল মূলত ছত্রাকের “সাইটোক্রোম পি-৪৫০” (Cytochrome P-450) এনজাইমের কার্যকারিতাকে বাধাগ্রস্ত করে। এই এনজাইমটি ছত্রাকের কোষের দেয়াল তৈরির প্রধান উপাদান আরগোস্টেরল (Ergosterol) উৎপাদনের জন্য দায়ী।
-
যখন ওমাস্টিন সেবন করা হয়, তখন আরগোস্টেরল উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়।
-
এর ফলে ছত্রাকের কোষের ঝিল্লি দুর্বল ও ছিদ্রযুক্ত হয়ে পড়ে।
-
কোষের ভেতরের উপাদান বাইরে বেরিয়ে আসে এবং ছত্রাকটি মারা যায়।
এটি মানবদেহে দীর্ঘক্ষণ কার্যকর থাকে, তাই অনেক ক্ষেত্রে মাত্র একটি ডোজেই সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়।
সেবনবিধি ও সঠিক মাত্রা (Dosage & Administration)
সতর্কতা: ওমাস্টিন ১৫০ অবশ্যই রেজিস্টার্ড চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী সেবন করতে হবে। রোগের ধরন ও তীব্রতার ওপর ভিত্তি করে এর মাত্রা পরিবর্তিত হতে পারে। নিচে সাধারণ নির্দেশিকা দেওয়া হলো:
-
ভ্যাজাইনাল ক্যান্ডিডিয়াসিস: সাধারণত ১৫০ মি.গ্রা. এর একটি মাত্র ক্যাপসুল (Single dose) খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।
-
ওরাল থ্রাশ বা মুখের ঘা: প্রথম দিন ২০০ মি.গ্রা., এরপর প্রতিদিন ১০০ মি.গ্রা. করে অন্তত ১৪ দিন। তবে ওমাস্টিন ১৫০ ক্যাপসুল হলে চিকিৎসকরা সাধারণত অল্টারনেটিভ ডোজিং শিডিউল দিতে পারেন।
-
ত্বকের দাউদ বা টিনিয়া: সপ্তাহে একটি করে ১৫০ মি.গ্রা. ক্যাপসুল ৪ থেকে ৬ সপ্তাহ পর্যন্ত খেতে হতে পারে।
-
নখের সংক্রমণ: সপ্তাহে একটি করে ১৫০ মি.গ্রা. ক্যাপসুল, যতক্ষণ না নতুন নখ গজায় (সাধারণত ৩ থেকে ৬ মাস)।
খাবার গ্রহণের নিয়ম: এই ক্যাপসুলটি ভরা পেটে বা খালি পেটে খাওয়া যায়। তবে গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা এড়াতে ভরা পেটে খাওয়াই উত্তম। প্রচুর পরিমাণে পানি পান করা উচিত।
পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া (Side Effects)
ওমাস্টিন ১৫০ সাধারণত সুসহনীয়, তবে কিছু রোগীর ক্ষেত্রে মৃদু থেকে মাঝারি পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে। ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল ও ব্যবহারকারীদের তথ্যমতে সাধারণ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াগুলো হলো:
-
বমি বমি ভাব বা বমি: ওষুধ সেবনের পর পেটে অস্বস্তি হতে পারে।
-
পেট ব্যথা ও ডায়রিয়া: কারো কারো ক্ষেত্রে হজমে গন্ডগোল দেখা দেয়।
-
মাথা ব্যথা: এটি একটি সাধারণ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া।
-
ত্বকে র্যাশ: এলার্জিজনিত কারণে শরীরে লাল চাকা বা র্যাশ হতে পারে।
কখন ডাক্তার দেখাবেন?
যদি শ্বাসকষ্ট হয়, ঠোঁট বা মুখ ফুলে যায়, বা চোখের সাদা অংশ হলুদ হয়ে যায় (জন্ডিসের লক্ষণ), তবে অবিলম্বে ওষুধ বন্ধ করে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে।
সতর্কতা ও প্রতিনির্দেশনা (Precautions & Contraindications)
গর্ভাবস্থা ও স্তন্যদানকালে ব্যবহার
ইউএস এফডিএ (US FDA) অনুযায়ী ফ্লুকোনাজল ‘ক্যাটাগরি সি’ ভুক্ত ওষুধ। অর্থাৎ, গর্ভাবস্থায় এটি সেবন করা সাধারণত নিরাপদ নয়, যদি না চিকিৎসকের মতে এর উপকারিতা ঝুঁকির চেয়ে বেশি হয়। বিশেষ করে গর্ভাবস্থার প্রথম তিন মাসে উচ্চ মাত্রায় ফ্লুকোনাজল ভ্রূণের ক্ষতি করতে পারে। স্তন্যদানকারী মায়েদের ক্ষেত্রেও সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরি, কারণ এটি মাতৃদুগ্ধের মাধ্যমে শিশুর শরীরে প্রবেশ করতে পারে।
লিভার ও কিডনি রোগী
যাদের লিভার বা কিডনির দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা আছে, তাদের ক্ষেত্রে ওমাস্টিন ১৫০ এর ডোজ কমিয়ে বা সমন্বয় করে দিতে হয়। এই ওষুধটি লিভার এনজাইম বাড়িয়ে দিতে পারে, তাই দীর্ঘমেয়াদী ব্যবহারের ক্ষেত্রে লিভার ফাংশন টেস্ট (LFT) করানোর পরামর্শ দেওয়া হয়।
হার্টের সমস্যা
যাদের হৃদস্পন্দনের অনিয়ম (Arrhythmia) বা কিউ-টি প্রলঙ্গেশন (QT Prolongation) এর সমস্যা আছে, তাদের ক্ষেত্রে এটি সতর্কতার সাথে ব্যবহার করতে হবে।
ওষুধের মিথস্ক্রিয়া বা ড্রাগ ইন্টারঅ্যাকশন (Drug Interactions)
কিছু নির্দিষ্ট ওষুধের সাথে ওমাস্টিন ১৫০ সেবন করলে মারাত্মক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হতে পারে। আপনার যদি নিচের কোনো ওষুধ চলমান থাকে, তবে ডাক্তারকে অবশ্যই জানান:
১. ওয়ারফারিন (Warfarin): রক্ত তরল করার এই ওষুধের কার্যকারিতা বাড়িয়ে রক্তপাতের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
২. ডায়াবেটিসের ওষুধ: সালফোনাইলইউরিয়া গ্রুপের ওষুধের (যেমন- গ্লিপিজাইড) সাথে খেলে রক্তে সুগার অতিরিক্ত কমে যেতে পারে (Hypoglycemia)।
৩. রিফাম্পিসিন (Rifampicin): যক্ষ্মার এই ওষুধটি ওমাস্টিন ১৫০ এর কার্যকারিতা কমিয়ে দেয়।
৪. থিওফাইলিন (Theophylline): হাঁপানির এই ওষুধের বিষক্রিয়া বাড়াতে পারে।
ওমাস্টিন ১৫০ এর বর্তমান দাম (বাংলাদেশ বাজার দর – ২০২৬)
বাংলাদেশের বাজারে বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস এর ওমাস্টিন ১৫০ ক্যাপসুলটি সহজলভ্য। বিভিন্ন অনলাইন ফার্মেসি (যেমন- আরোগ্য, ই-ফার্মা) এবং স্থানীয় ফার্মেসির বর্তমান তথ্য অনুযায়ী এর দাম নিচে দেওয়া হলো:
-
প্রতি ক্যাপসুলের দাম: ২২.০০ টাকা (লিখন বা মুদ্রণভেদে সামান্য কম-বেশি হতে পারে)।
-
১০ টির স্ট্রিপের দাম: ২২০.০০ টাকা।
(দ্রষ্টব্য: ওষুধের দাম পরিবর্তনশীল। কেনার সময় প্যাকেটের গায়ের মূল্য বা এমআরপি দেখে নিন।)
ওষুধের পাতায় লাল দাগ: জীবন বাঁচাতে পারে এই ছোট্ট সতর্কতা!
কেন ওমাস্টিন ১৫০ বা ফ্লুকোনাজল সেরা অ্যান্টিফাঙ্গাল? (বিশ্লেষণ)
মেডিকেল গবেষণায় দেখা গেছে, অন্যান্য অ্যান্টিফাঙ্গাল ক্রিম বা মলমের চেয়ে মুখে খাওয়ার ফ্লুকোনাজল (ওমাস্টিন ১৫০) অনেক ক্ষেত্রে বেশি কার্যকর, বিশেষ করে যখন সংক্রমণটি বারবার ফিরে আসে।
-
গভীরভাবে কাজ করে: এটি রক্তের মাধ্যমে শরীরের সব জায়গায় পৌঁছায়, যেখানে ক্রিম পৌঁছাতে পারে না।
-
সুবিধাজনক ডোজ: প্রতিদিন একাধিকবার লাগানোর ঝামেলার চেয়ে সপ্তাহে একটি বা একবার একটি ক্যাপসুল খাওয়া অনেক সহজ।
-
উচ্চ নিরাময় হার: ভ্যাজাইনাল ক্যান্ডিডিয়াসিসে এর নিরাময় হার ৮০-৯০% এর বেশি।
ওমাস্টিন ১৫০ (Omastin 150) ছত্রাকজনিত যেকোনো জটিল সংক্রমণে একটি নির্ভরযোগ্য সমাধান। এর সঠিক ব্যবহার আপনাকে দ্রুত আরোগ্য লাভ করতে সাহায্য করবে। তবে মনে রাখবেন, অ্যান্টিফাঙ্গাল ওষুধের অসম্পূর্ণ কোর্স বা অপ্রয়োজনীয় ব্যবহার পরবর্তীতে ওষুধের কার্যকারিতা নষ্ট করে দিতে পারে (Drug Resistance)। তাই কখনোই নিজের ইচ্ছায় এটি সেবন করবেন না এবং চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে পূর্ণ কোর্স সম্পন্ন করবেন। সুস্থ জীবনযাপনের জন্য ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা এবং সঠিক চিকিৎসা গ্রহণ করা অপরিহার্য।
এই সম্পর্কে সাধারণ কিছু প্রশ্ন (FAQ)
১. ওমাস্টিন ১৫০ কি অ্যান্টিবায়োটিক?
না, এটি একটি অ্যান্টিফাঙ্গাল বা ছত্রাকবিরোধী ওষুধ। এটি ব্যাকটেরিয়া বা ভাইরাসের বিরুদ্ধে কাজ করে না।
২. আমি কি পিরিয়ডের সময় ওমাস্টিন ১৫০ খেতে পারবো?
হ্যাঁ, পিরিয়ডের সময় এটি সেবন করা যায়। ভ্যাজাইনাল ইনফেকশনের চিকিৎসায় এটি মাসিক চক্রের যেকোনো সময় শুরু করা যেতে পারে।
৩. কতদিন পর পর ওমাস্টিন ১৫০ খাওয়া যায়?
এটি সম্পূর্ণ রোগের ধরনের ওপর নির্ভর করে। যোনিপথের সংক্রমণে একবার, কিন্তু দাউদ বা নখের সংক্রমণে সপ্তাহে একবার করে কয়েক সপ্তাহ খেতে হয়। চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন ছাড়া বারবার খাওয়া উচিত নয়।











