আমেরিকার নর্থওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরা বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষুদ্র পেসমেকার তৈরি করেছেন, যা চালের একটি দানার চেয়েও ছোট। মাত্র ১ মিলিমিটার পুরু এবং ৩.৫ মিলিমিটার লম্বা এই ক্ষুদ্র যন্ত্রটি একটি সিরিঞ্জের ডগায় অনায়াসে ঢুকে যায়। এটি অস্থায়ী হৃদস্পন্দন নিয়ন্ত্রণের জন্য ডিজাইন করা হয়েছে এবং প্রয়োজন শেষ হলে শরীরের ভিতরেই দ্রবীভূত হয়ে যায়।
বায়োইলেকট্রনিক্স বিশেষজ্ঞ জন এ. রজার্সের নেতৃত্বে এই গবেষণা পরিচালিত হয়েছে। “আমরা যতদূর জানি, বিশ্বের সবচেয়ে ছোট পেসমেকার তৈরি করেছি,” মন্তব্য করেছেন রজার্স। “বিশেষ করে শিশুদের হৃদয় সার্জারির ক্ষেত্রে অস্থায়ী পেসমেকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োজন রয়েছে, যেখানে আকার ছোট করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শরীরে যন্ত্রের ভার যত কম, তত ভাল”।
প্রচলিত অস্থায়ী পেসমেকারগুলি হৃদপিণ্ডের পেশীতে ইলেকট্রোড সেলাই করার জন্য সার্জারি প্রয়োজন করে, যেখানে তারগুলি রোগীর বুকে থাকা একটি বাহ্যিক পেসিং ডিভাইসের সাথে সংযুক্ত থাকে। যখন পেসমেকারের আর প্রয়োজন হয় না, তখন তারগুলি টেনে বের করে নেওয়া হয়, যা কখনও কখনও ক্ষতির কারণ হতে পারে। এমনকি চাঁদে প্রথম পদচারণাকারী নীল আর্মস্ট্রং ২০১২ সালে তার অস্থায়ী পেসমেকার অপসারণের পর অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণে মারা গিয়েছিলেন।
নতুন উদ্ভাবিত এই পেসমেকারটি সম্পূর্ণ তারবিহীন। এর একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য হল এটি রোগীর বুকে লাগানো একটি ছোট, নরম, নমনীয়, তারবিহীন, পরিধানযোগ্য ডিভাইসের সাথে যুক্ত থাকে। যখন পরিধানযোগ্য ডিভাইসটি অনিয়মিত হৃদস্পন্দন সনাক্ত করে, তখন এটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে আলোর পালস প্রেরণ করে পেসমেকারকে সক্রিয় করে। এই সংক্ষিপ্ত আলোর পালসগুলি রোগীর ত্বক, বুকের হাড় এবং পেশীগুলির মধ্য দিয়ে প্রবেশ করে পেসিং নিয়ন্ত্রণ করে।
এই ক্ষুদ্র যন্ত্রটি কীভাবে কাজ করে তা আরও বিস্ময়কর। এটি একটি গ্যালভানিক সেল দ্বারা শক্তি পায়, যা শরীরের তরল পদার্থ ব্যবহার করে রাসায়নিক শক্তিকে বৈদ্যুতিক স্পন্দনে পরিণত করে, যা হৃদয়কে নিয়ন্ত্রণ করে।গবেষকরা এই পেসমেকারের কার্যকারিতা ইঁদুর, বড় ইঁদুর, শূকর, কুকুর এবং মৃত অঙ্গ দাতাদের মানব হৃদয়ের টিস্যুতে সফলভাবে পরীক্ষা করেছেন।
ছোট শিশুদের জন্য এই উদ্ভাবনটি বিশেষভাবে উপযোগী। শিশুবিশেষজ্ঞ কার্ডিওলজিস্ট ইগর এফিমভ জানিয়েছেন, “প্রায় ১% শিশু জন্মগত হৃদরোগে জন্মগ্রহণ করে, কিন্তু সার্জারির পর অধিকাংশের কেবল অস্থায়ী পেসিংয়ের প্রয়োজন হয়। প্রায় সাত দিনের মধ্যে, তাদের হৃদয় নিজেই মেরামত হয়ে যায়”। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি বছর প্রায় ৪০,০০০ শিশু হৃদয় ত্রুটি নিয়ে জন্মগ্রহণ করে, যার মধ্যে প্রায় এক-চতুর্থাংশের প্রথম বছরের মধ্যে সার্জারি বা অন্যান্য পদ্ধতির প্রয়োজন হয়।
যদিও এই উদ্ভাবনী পেসমেকারটি মানুষের উপর পরীক্ষা করতে এখনও কয়েক বছর সময় লাগবে, বিজ্ঞানীরা এটিকে একটি “রূপান্তরকারী সাফল্য” হিসেবে দেখছেন যা চিকিৎসার অন্যান্য ক্ষেত্রেও অগ্রগতি আনতে পারে। গবেষণার প্রধান লেখক জন রজার্স জানিয়েছেন যে, পেসমেকারটি প্রায় দুই থেকে তিন বছরের মধ্যে মানুষের উপর পরীক্ষা করা হতে পারে এবং এর জন্য তার ল্যাব একটি স্টার্ট-আপ চালু করেছে।
প্রযুক্তির এই আশ্চর্যজনক উন্নতি শুধুমাত্র শিশুদের জন্যই নয়, প্রাপ্তবয়স্কদের জন্যও উপকারী হতে পারে। হৃদয় সার্জারি থেকে পুনরুদ্ধার করতে থাকা প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে স্বাভাবিক হৃদস্পন্দন পুনরুদ্ধার করতেও এটি সাহায্য করতে পারে। এর ক্ষুদ্র আকারের কারণে, চিকিৎসকরা হৃদয়ের বিভিন্ন অংশে একাধিক পেসমেকার স্থাপন করতে পারেন, যা বর্তমান ডিভাইসগুলির তুলনায় হৃদয়ের ছন্দগুলিকে আরও ভালভাবে সমন্বয় করতে সাহায্য করে।
উল্লেখযোগ্যভাবে, এই প্রযুক্তির ব্যবহার শুধু হৃদরোগের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। রজার্স বলেন, “এই প্রযুক্তি অনেক সম্ভাবনা খুলে দেয়। এটি শুধুমাত্র হৃদয়ের অবস্থার জন্য নয়, স্নায়ু, হাড়, এবং এমনকি ব্যথা ব্যবস্থাপনার জন্যও ব্যবহার করা যেতে পারে”।
স্পেনে প্রতি বছর ৪০,০০০-এরও বেশি পেসমেকার প্রতিস্থাপন করা হয়। বিশ্বব্যাপী লাখ লাখ মানুষ স্থায়ী পেসমেকার ব্যবহার করেন, যা হৃদয়কে বৈদ্যুতিক স্পন্দন দিয়ে উদ্দীপিত করে এবং নিশ্চিত করে যে হৃদয় স্বাভাবিকভাবে স্পন্দিত হয়। কিন্তু এই নতুন উদ্ভাবনটি স্থায়ী পেসমেকারের ধারণাকেই বদলে দিতে পারে, বিশেষ করে যেসব রোগীর অস্থায়ী পেসিংয়ের প্রয়োজন।
সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশনের তথ্য অনুসারে, যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি বছর প্রায় ৪০,০০০ শিশু হৃদরোগ নিয়ে জন্মগ্রহণ করে, যাদের মধ্যে প্রায় এক-চতুর্থাংশের প্রথম বছরের মধ্যে সার্জারি বা অন্যান্য পদ্ধতির প্রয়োজন হয়। সার্জারির পর, এই শিশুদের সাধারণত তাদের হৃদয় পুনরুদ্ধারের সময় প্রায় এক সপ্তাহের জন্য একটি পেসমেকারের প্রয়োজন হয়।
বিজ্ঞানীরা এই ছোট যন্ত্রটি সাধারণ সিরিঞ্জের মাধ্যমে শরীরের ভিতরে অনায়াসে প্রবেশ করাতে পারেন, যা পূর্বের জটিল সার্জারি পদ্ধতির তুলনায় অনেক সহজ। এর তারবিহীন প্রযুক্তি এবং স্বতঃস্ফূর্ত দ্রবণীয় প্রকৃতি এটিকে অনন্য করে তোলে, কারণ এটি সার্জারি ছাড়াই রোগীর শরীর থেকে অপসারণ করা সম্ভব।
নেচার জার্নালে প্রকাশিত গবেষণায় এই আবিষ্কারের বিস্তারিত বর্ণনা করা হয়েছে। এই গবেষণায় দেখানো হয়েছে যে পেসমেকারটি বিভিন্ন প্রাণীর মডেল এবং মৃত অঙ্গ দাতাদের মানব হৃদয়ে কার্যকরভাবে কাজ করতে পারে। এই ধরনের সাফল্য ভবিষ্যতে মানব পরীক্ষার জন্য একটি শক্ত ভিত্তি তৈরি করে।
এই ধরনের চিকিৎসাগত আবিষ্কারগুলি আধুনিক মেডিকেল বিজ্ঞানের অগ্রগতির উজ্জ্বল উদাহরণ। স্পেনের বিশেষজ্ঞ জুলিয়ান পেরেজ-ভিলাকাস্টিন বলেন, “এই প্রোটোটাইপটি চমৎকার, তবে কেউ যেন ভুলে না যায় যে এটি একটি পরীক্ষামূলক প্রোটোটাইপ। ধারণাটি চমৎকার, কিন্তু এই প্রযুক্তি পর্যাপ্ত গ্যারান্টি সহ মানুষে প্রয়োগ করতে বছরের পর বছর লাগবে”। তবুও, এই ধরনের উদ্ভাবনগুলি হৃদরোগীদের জীবনে আশার আলো নিয়ে আসে এবং ভবিষ্যতে আরও উন্নত চিকিৎসার পথ উন্মুক্ত করে।