পারকিনিল ট্যাবলেট কেন খায়? পারকিনসন রোগের চিকিৎসায় কার্যকর ওষুধ যা জানা জরুরি

পারকিনিল ট্যাবলেট একটি প্রেসক্রিপশন ওষুধ যা প্রাথমিকভাবে পারকিনসন রোগ এবং ওষুধ-জনিত অস্বাভাবিক শারীরিক নড়াচড়ার চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়। এই ওষুধটিতে প্রোসাইক্লিডিন হাইড্রোক্লোরাইড নামক সক্রিয় উপাদান থাকে যা মস্তিষ্কে অ্যাসিটাইলকোলিনের অতিরিক্ত কার্যকলাপ…

Debolina Roy

 

পারকিনিল ট্যাবলেট একটি প্রেসক্রিপশন ওষুধ যা প্রাথমিকভাবে পারকিনসন রোগ এবং ওষুধ-জনিত অস্বাভাবিক শারীরিক নড়াচড়ার চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়। এই ওষুধটিতে প্রোসাইক্লিডিন হাইড্রোক্লোরাইড নামক সক্রিয় উপাদান থাকে যা মস্তিষ্কে অ্যাসিটাইলকোলিনের অতিরিক্ত কার্যকলাপ কমিয়ে পেশীর নিয়ন্ত্রণ উন্নত করে এবং শক্ততা হ্রাস করে। ভারতে পারকিনসন রোগের ক্রমবর্ধমান প্রবণতা উদ্বেগজনক – গবেষণা অনুসারে ২০৫০ সালের মধ্যে ভারতে পারকিনসন রোগীর সংখ্যা ১৬৮% বৃদ্ধি পেয়ে ২.৮ মিলিয়ন হতে পারে, যা বিশ্বব্যাপী পারকিনসন রোগীর ১০% প্রতিনিধিত্ব করবে। বর্তমানে ভারতে প্রতি ১,০০,০০০ জনসংখ্যায় ১৫ থেকে ৪৩ জন পারকিনসন রোগে আক্রান্ত।

পারকিনিল ট্যাবলেট কী এবং এর উপাদান

পারকিনিল একটি অ্যান্টিপারকিনসোনিয়ান ওষুধ যার প্রধান সক্রিয় উপাদান হল প্রোসাইক্লিডিন হাইড্রোক্লোরাইড। এটি মূলত দুটি শক্তিতে পাওয়া যায় – ৫ মিলিগ্রাম ট্যাবলেট এবং ১০ মিলিগ্রাম ইনজেকশন ফর্ম। প্রোসাইক্লিডিন হাইড্রোক্লোরাইড একটি সিন্থেটিক অ্যান্টিকোলিনার্জিক এজেন্ট যা ১৯৫৭ সালে প্রথম চালু করা হয়েছিল। এই ওষুধটি অ্যান্টিমাসকারিনিক শ্রেণীর অন্তর্গত এবং মাসকারিনিক রিসেপ্টরে অ্যাসিটাইলকোলিনের উত্তেজক প্রভাবগুলিকে ব্লক করে কাজ করে।

প্রোসাইক্লিডিনের আণবিক ওজন ৩২৩.৯ গ্রাম/মোল এবং এটি একটি সাদা স্ফটিক পদার্থ যা পানিতে দ্রবণীয়। এর গলনাঙ্ক ৮৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং এতে একটি কাইরাল সেন্টার রয়েছে। ওষুধটির রাসায়নিক গঠনে বেনজিন, পাইরোলিডিন এবং সাইক্লোহেক্সেন রিং রয়েছে।

পারকিনিল ট্যাবলেট কেন খায়: প্রধান ব্যবহার

পারকিনসন রোগের চিকিৎসা

পারকিনিল ট্যাবলেটের প্রধান ব্যবহার হল পারকিনসন রোগের লক্ষণগুলি নিয়ন্ত্রণ করা। পারকিনসন রোগ একটি প্রগতিশীল স্নায়বিক ব্যাধি যা মূলত চলাচলকে প্রভাবিত করে। এই রোগটি তখন বিকশিত হয় যখন মস্তিষ্কে ডোপামিন উৎপাদনকারী নিউরনগুলি ক্ষয়প্রাপ্ত হতে শুরু করে বা মারা যায়। ডোপামিন শারীরিক কার্যকলাপের সমন্বয়ের জন্য অপরিহার্য এবং এর হ্রাস কম্পন, পেশী শক্ততা, ধীর নড়াচড়া এবং ভারসাম্য সমস্যার মতো লক্ষণগুলির ফলস্বরূপ হয়।

পারকিনিল ট্যাবলেট পারকিনসন রোগের বিভিন্ন উপসর্গ কমাতে সাহায্য করে যেমন পেশীর শক্ততা, অতিরিক্ত ঘাম এবং লালা নিঃসরণ। এটি হাঁটার ক্ষমতা উন্নত করে এবং রোগীদের দৈনন্দিন কাজকর্ম আরও সহজে করতে সক্ষম করে। ওষুধটি শক্ত পেশীগুলিকে শিথিল করে এবং ভারসাম্য হারানো ছাড়াই সহজ চলাচলে সহায়তা করে।

ওষুধ-জনিত অস্বাভাবিক নড়াচড়া নিয়ন্ত্রণ

পারকিনিল ট্যাবলেটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবহার হল ওষুধ-জনিত এক্সট্রাপিরামিডাল লক্ষণ (ইপিএস) নিয়ন্ত্রণ করা। নিউরোলেপ্টিক ওষুধ যেমন অ্যান্টিসাইকোটিক্স গ্রহণের ফলে কিছু রোগীর শরীরে অনিচ্ছাকৃত পেশী নড়াচড়া, খিঁচুনি, অস্থিরতা এবং ডিস্টোনিয়া দেখা দিতে পারে। পারকিনিল এই সমস্যাগুলি কার্যকরভাবে কমাতে পারে।

এক্সট্রাপিরামিডাল উপসর্গের মধ্যে রয়েছে সিউডোপারকিনসোনিজম, তীব্র ডিস্টোনিক প্রতিক্রিয়া এবং অ্যাকাথিসিয়া। অ্যাকাথিসিয়া অস্থিরতা এবং উদ্বেগের বিষয়গত অনুভূতি এবং মোটর ক্রিয়াকলাপের বস্তুনিষ্ঠ লক্ষণ দ্বারা চিহ্নিত করা হয়, যেমন স্থির বসতে অক্ষমতা। পারকিনিল এই লক্ষণগুলি নিয়ন্ত্রণ করতে এবং রোগীদের আরও স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতে সহায়তা করে।

পারকিনিল ট্যাবলেট কীভাবে কাজ করে

পারকিনিল ট্যাবলেটের কার্যপ্রণালী মস্তিষ্কে রাসায়নিক ভারসাম্যের সাথে সম্পর্কিত। প্রোসাইক্লিডিন কেন্দ্রীয় কোলিনার্জিক রিসেপ্টরগুলিকে ব্লক করে কাজ করে বলে মনে করা হয়, এবং এইভাবে বেসাল গ্যাংলিয়াতে কোলিনার্জিক এবং ডোপামিনার্জিক কার্যকলাপের ভারসাম্য বজায় রাখে। পারকিনসন রোগে ডোপামিনের ঘাটতি থাকে এবং অ্যাসিটাইলকোলিনের আপেক্ষিক বৃদ্ধি ঘটে। প্রোসাইক্লিডিন অতিরিক্ত অ্যাসিটাইলকোলিনকে ব্লক করে এই ভারসাম্যহীনতা সংশোধন করে।

এই ওষুধটি মাসকারিনিক অ্যাসিটাইলকোলিন রিসেপ্টর M3 এবং M5-এ প্রতিপক্ষ হিসাবে কাজ করে। এটি অ্যাডেনাইলেট সাইক্লেসের বাধা, ফসফোইনোসাইটাইডের ভাঙ্গন এবং G প্রোটিনের ক্রিয়াকলাপের মাধ্যমে পটাসিয়াম চ্যানেলগুলির মডুলেশন সহ বিভিন্ন সেলুলার প্রতিক্রিয়াকে প্রভাবিত করে। প্রোসাইক্লিডিন মসৃণ পেশীতে অ্যান্টিস্পাসমোডিক প্রভাব প্রয়োগ করে এবং মাইড্রিয়াসিস (পিউপিল প্রসারণ) এবং লালা নিঃসরণ হ্রাস করতে পারে।

ওষুধটি গ্যাস্ট্রোইনটেস্টাইনাল ট্র্যাক্ট থেকে শোষিত হয় এবং টিস্যু থেকে দ্রুত সাফ হয়ে যায়। এর অনেক প্রভাব অ্যাট্রোপিনের সাথে এর ফার্মাকোলজিকাল মিলের কারণে।

পারকিনিল ট্যাবলেটের ডোজ এবং ব্যবহারবিধি

প্রস্তাবিত মাত্রা

পারকিনিল ট্যাবলেটের ডোজ রোগীর অবস্থা এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী পরিবর্তিত হয়। সাধারণত প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য মুখে সেবনের ডোজ দিনে ২.৫ মিলিগ্রাম থেকে শুরু হয় এবং ধীরে ধীরে বৃদ্ধি করা হয়। রক্ষণাবেক্ষণ ডোজ সাধারণত দিনে ৩ বার ৫-১০ মিলিগ্রাম হয়।

জরুরি ক্ষেত্রে প্যারেন্টারাল (ইনজেকশন) ব্যবহারের জন্য, প্রাপ্তবয়স্কদের ইন্ট্রাভেনাস (আইভি) প্রশাসনে ৫-১০ মিলিগ্রাম দেওয়া হয়, উচ্চ মাত্রার প্রয়োজন হতে পারে। ইন্ট্রামাসকুলার (আইএম) প্রশাসনে একক ডোজ হিসাবে ৫-১০ মিলিগ্রাম দেওয়া হয়, প্রয়োজনে ২০ মিনিট পরে পুনরাবৃত্তি করা যেতে পারে, দৈনিক সর্বোচ্চ ২০ মিলিগ্রাম। বয়স্ক রোগীদের জন্য কম ডোজ প্রয়োজন।

সেবনের নিয়ম

পারকিনিল ট্যাবলেট খাবারের সাথে বা খাবার ছাড়াই নেওয়া যেতে পারে, তবে এটি একটি নির্দিষ্ট সময়ে নেওয়া ভাল। ওষুধটি পুরো গিলে খেতে হবে, চিবিয়ে, চূর্ণ করে বা ভেঙে নয়। নিয়মিত সময়ে ওষুধ সেবন করলে রক্তে ওষুধের স্থিতিশীল মাত্রা বজায় রাখতে সাহায্য করে এবং চিকিৎসার কার্যকারিতা বৃদ্ধি পায়।

চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ডোজ বাড়ানো বা কমানো উচিত নয়। হঠাৎ করে ওষুধ বন্ধ করলে উপসর্গ আরও খারাপ হতে পারে। ডোজ পরিবর্তন সবসময় চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে ধীরে ধীরে করা উচিত।

পারকিনসন রোগ: ভারতের পরিস্থিতি এবং পরিসংখ্যান

ভারতে পারকিনসন রোগের পরিস্থিতি ক্রমশ উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। সাম্প্রতিক গবেষণা এবং স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে ভারত একটি “নিউরোলজিক্যাল সুনামির” মুখোমুখি হতে চলেছে। ২০৫০ সালের মধ্যে ভারতে পারকিনসন রোগের ক্ষেত্রে ১৬৮% বৃদ্ধি প্রত্যাশিত, যা ২০২১ সালের স্তর থেকে নাটকীয়ভাবে বেড়ে আনুমানিক ২.৮ মিলিয়ন ক্ষেত্রে পৌঁছাবে।

বিশ্বব্যাপী, পারকিনসন রোগ ২৫.২ মিলিয়ন মানুষকে প্রভাবিত করবে বলে আশা করা হচ্ছে – যা ২০২১ সালের তুলনায় ১১২% বৃদ্ধি। ভারতে বর্তমানে প্রতি ১,০০,০০০ জনসংখ্যায় ১৫ থেকে ৪৩ জন পারকিনসন রোগে আক্রান্ত, যা ভারতকে এই স্নায়বিক অবস্থার রোগীদের একটি প্রধান কেন্দ্র হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করছে।

ভারতে পারকিনসন রোগের বৈশিষ্ট্য

পরামিতি ভারতের ডেটা বৈশ্বিক তুলনা
বর্তমান প্রাদুর্ভাব ১৫-৪৩ প্রতি ১,০০,০০০ পরিবর্তনশীল
২০৫০ সালের পূর্বাভাস ২.৮ মিলিয়ন ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাপী ১০%
বৃদ্ধির হার ১৬৮% (২০২১ থেকে) ১১২% (বিশ্বব্যাপী)
গড় সূচনা বয়স ৫১.০৩ ± ১১.৩২ বছর ৬০+ বছর
প্রাথমিক সূচনা (২২-৪৯ বছর) ৪০-৪৫% রোগী কম শতাংশ
ভারতে পারকিনসন রোগের একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হল প্রাথমিক সূচনা। প্রায় ৪০-৪৫% ভারতীয় রোগীরা ২২ থেকে ৪৯ বছর বয়সের মধ্যে মোটর লক্ষণগুলির প্রাথমিক সূচনা অনুভব করেন, যাদের প্রাথমিক সূচনা পারকিনসন রোগ হিসাবে শ্রেণীবদ্ধ করা হয়। ভারতে গড় সূচনা বয়স ৫১.০৩ ± ১১.৩২ বছর, যা বৈশ্বিক গড়ের তুলনায় এক দশক কম।

ঝুঁকির কারণ

পারকিনসন রোগের বেশিরভাগ ক্ষেত্রে কোনও স্পষ্ট কারণ নেই, তবে প্রায় ১০-১৫% জেনেটিক মিউটেশনের জন্য দায়ী করা যেতে পারে। পরিবেশগত ট্রিগার যেমন কীটনাশক বা ভারী ধাতুর দীর্ঘায়িত এক্সপোজারও অবদানকারী কারণ বলে বিশ্বাস করা হয়। পুরুষরা বিশ্বব্যাপী নারীদের তুলনায় এই রোগে বেশি সংবেদনশীল।

Parkinson Disease: মস্তিষ্কের এই ক্ষতি কেন হয়? জানুন চাঞ্চল্যকর তথ্য

পারকিনিল ট্যাবলেটের পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া

পারকিনিল ট্যাবলেট সাধারণত নিরাপদ এবং সহনীয়, তবে কিছু রোগী পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া অনুভব করতে পারেন। সাধারণ ডোজ স্তরে মুখের শুষ্কতা সাধারণত একমাত্র বিরূপ প্রভাব। তবে, অন্যান্য পার্শ্ব প্রতিক্রিয়াও দেখা দিতে পারে।

সাধারণ পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া

সবচেয়ে সাধারণ পার্শ্ব প্রতিক্রিয়াগুলির মধ্যে রয়েছে:

  • মুখের শুষ্কতা: এটি সবচেয়ে সাধারণ পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া। ঘন ঘন মুখ ধোয়া, ভাল মৌখিক স্বাস্থ্যবিধি বজায় রাখা এবং জল গ্রহণ বৃদ্ধি করা সাহায্য করতে পারে

  • দৃষ্টি সমস্যা: পিউপিল প্রসারণ এবং দৃষ্টি ঝাপসা হতে পারে। চোখ শুষ্ক হতে পারে, তাই কন্টাক্ট লেন্স পরা এড়িয়ে চলা ভাল

  • গ্যাস্ট্রোইনটেস্টাইনাল সমস্যা: বমি বমি ভাব, বমি, এপিগ্যাস্ট্রিক ব্যথা এবং কোষ্ঠকাঠিন্য মাঝে মাঝে দেখা দিতে পারে

  • মাথা ঘোরা এবং হালকা মাথা: এটি মানসিক ফোকাস প্রয়োজন এমন কাজ করা কঠিন করে তুলতে পারে, তাই গাড়ি চালানো বা যন্ত্রপাতি পরিচালনা করা এড়িয়ে চলুন

  • প্রস্রাব ধারণ: কিছু রোগী প্রস্রাব পাস করতে অসুবিধা অনুভব করতে পারেন

গুরুতর পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া

উচ্চ মাত্রায় আরও গুরুতর পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া হতে পারে যেমন:

  • মাথা ঘোরা এবং বিভ্রান্তি

  • হ্যালুসিনেশন (বিভ্রম)

  • পেশী দুর্বলতা

  • কম্পন

  • তীব্র সাপিউরেটিভ প্যারোটাইটিস (লালা গ্রন্থির প্রদাহ)

  • অ্যালার্জিক প্রতিক্রিয়া যেমন ফুসকুড়ি

পার্শ্ব প্রতিক্রিয়াগুলি সাধারণত ডোজ সামঞ্জস্য এবং খাবারের পরে প্রশাসনের মাধ্যমে কম করা যেতে পারে। যদি কোনও গুরুতর পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়, অবিলম্বে চিকিৎসকের সাথে যোগাযোগ করুন।

সতর্কতা এবং বিপরীত ইঙ্গিত

কখন পারকিনিল ব্যবহার করবেন না

নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে পারকিনিল ট্যাবলেট ব্যবহার করা উচিত নয়:

  • প্রোসাইক্লিডিন বা ওষুধের অন্যান্য উপাদানের প্রতি পরিচিত অ্যালার্জি

  • গ্লকোমা (বিশেষত অ্যাঙ্গেল-ক্লোজার গ্লকোমা) রোগীদের ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত

  • প্রস্রাব পাস করতে সমস্যা বা মূত্রনালীর বাধা

  • গ্যাস্ট্রোইনটেস্টাইনাল বাধা

  • মায়াস্থেনিয়া গ্রাভিস (পেশী দুর্বলতা রোগ)

বিশেষ জনসংখ্যা

গর্ভাবস্থা এবং বুকের দুধ খাওয়ানো: গর্ভবতী এবং স্তন্যদানকারী মহিলাদের শুধুমাত্র চিকিৎসকের পরামর্শে পারকিনিল ব্যবহার করা উচিত যখন সুবিধাগুলি ঝুঁকি ছাড়িয়ে যায়।

বয়স্ক রোগী: বয়স্ক রোগীদের কম ডোজ প্রয়োজন কারণ তারা পার্শ্ব প্রতিক্রিয়ার প্রতি বেশি সংবেদনশীল হতে পারেন। বিভ্রান্তি এবং স্মৃতিশক্তি সমস্যা বয়স্কদের মধ্যে বেশি সাধারণ।

শিশু: পেডিয়াট্রিক ব্যবহারে, এটি সেরিব্রাল পলসির কারণে ডিস্টোনিয়া সহ শিশুদের জন্য এবং লালা ঝরা নিয়ন্ত্রণের জন্য নির্ধারিত হয়েছে।

অন্যান্য ওষুধের সাথে মিথস্ক্রিয়া

পারকিনিল অন্যান্য ওষুধের সাথে মিথস্ক্রিয়া করতে পারে। চিকিৎসককে আপনার গ্রহণ করা সমস্ত ওষুধ, সাপ্লিমেন্ট এবং ভেষজ পণ্য সম্পর্কে জানান। বিশেষত অ্যান্টিকোলিনার্জিক প্রভাব সহ অন্যান্য ওষুধ, অ্যান্টিডিপ্রেসেন্টস এবং অ্যান্টিহিস্টামিনগুলির সাথে মিথস্ক্রিয়া হতে পারে।

পারকিনিল ট্যাবলেট সংরক্ষণ এবং হ্যান্ডলিং

পারকিনিল ট্যাবলেট সঠিকভাবে সংরক্ষণ করা গুরুত্বপূর্ণ:

  • ঘরের তাপমাত্রায় (২৫°C বা ৭৭°F এর নিচে) একটি শুষ্ক জায়গায় সংরক্ষণ করুন

  • সরাসরি সূর্যালোক এবং আর্দ্রতা থেকে দূরে রাখুন

  • শিশুদের নাগালের বাইরে রাখুন

  • মেয়াদ উত্তীর্ণ তারিখের পরে ব্যবহার করবেন না

  • প্যাকেজিং ক্ষতিগ্রস্ত হলে বা ট্যাবলেট বিবর্ণ দেখায় তবে ব্যবহার করবেন না

পারকিনসন রোগের সামগ্রিক ব্যবস্থাপনা

পারকিনিল ট্যাবলেট পারকিনসন রোগের চিকিৎসার একটি অংশ মাত্র। একটি সামগ্রিক পদ্ধতির মধ্যে রয়েছে:

ওষুধ থেরাপি

পারকিনসন রোগের জন্য বিভিন্ন ওষুধ ব্যবহার করা হয়, যার মধ্যে রয়েছে লেভোডোপা (প্রধান চিকিৎসা), ডোপামিন অ্যাগোনিস্ট, MAO-B ইনহিবিটরস এবং অ্যান্টিকোলিনার্জিক যেমন পারকিনিল। প্রায়শই একাধিক ওষুধের সংমিশ্রণ ব্যবহার করা হয়।

জীবনযাত্রার পরিবর্তন

নিয়মিত ব্যায়াম, সুষম খাদ্য এবং পর্যাপ্ত ঘুম পারকিনসন রোগীদের জীবনযাত্রার মান উন্নত করতে সাহায্য করতে পারে। ফিজিওথেরাপি এবং অকুপেশনাল থেরাপি চলাচল এবং দৈনন্দিন কাজকর্মে সহায়তা করতে পারে।

প্রাথমিক সনাক্তকরণের গুরুত্ব

পারকিনসন রোগের প্রাথমিক সনাক্তকরণ এবং কার্যকর ব্যবস্থাপনা লক্ষণ ব্যবস্থাপনা উন্নত করতে, রোগের অগ্রগতি ধীর করতে এবং জটিলতা প্রতিরোধ করতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। যত তাড়াতাড়ি চিকিৎসা শুরু হয়, রোগীর সামগ্রিক জীবনযাত্রার মান তত ভাল হয়।

পারকিনিল বনাম অন্যান্য অ্যান্টিপারকিনসোনিয়ান ওষুধ

ওষুধের শ্রেণী উদাহরণ প্রধান কর্মপ্রণালী প্রধান ব্যবহার
অ্যান্টিকোলিনার্জিক পারকিনিল (প্রোসাইক্লিডিন) অ্যাসিটাইলকোলিন ব্লক করে কম্পন, শক্ততা, ওষুধ-জনিত ইপিএস
লেভোডোপা সিনেমেট, মাডোপার ডোপামিন প্রিকার্সর সব ধরনের পারকিনসন লক্ষণ
ডোপামিন অ্যাগোনিস্ট প্রামিপেক্সোল, রোপিনিরোল ডোপামিন রিসেপ্টর সক্রিয় করে প্রাথমিক পারকিনসন, লেভোডোপার সাথে
MAO-B ইনহিবিটরস সেলিজিলিন, রাসাগিলিন ডোপামিন ভাঙ্গন রোধ করে প্রাথমিক পারকিনসন

পারকিনিল মূলত কম্পন এবং শক্ততা নিয়ন্ত্রণে বেশি কার্যকর এবং প্রায়শই অন্যান্য পারকিনসন ওষুধের সাথে সংমিশ্রণে ব্যবহার করা হয়।

পারকিনিল ট্যাবলেটের মূল্য এবং প্রাপ্যতা

পারকিনিল ট্যাবলেট ভারত এবং বাংলাদেশে ব্যাপকভাবে পাওয়া যায়। এটি একটি প্রেসক্রিপশন ওষুধ, তাই বৈধ প্রেসক্রিপশন ছাড়া কেনা যায় না। ওষুধটি বিভিন্ন জেনেরিক এবং ব্র্যান্ডেড ফর্মে পাওয়া যায়, যার ফলে বিভিন্ন মূল্য পরিসীমা থাকে।

সাধারণত ১০ ট্যাবলেটের একটি স্ট্রিপের দাম সাশ্রয়ী, যদিও নির্দিষ্ট মূল্য ব্র্যান্ড, অঞ্চল এবং ফার্মেসি অনুযায়ে পরিবর্তিত হতে পারে। অনলাইন ফার্মেসি থেকেও বৈধ প্রেসক্রিপশন আপলোড করে পারকিনিল ট্যাবলেট কেনা যায়।

ক্লিনিকাল গবেষণা এবং কার্যকারিতা

প্রোসাইক্লিডিন বহু দশক ধরে পারকিনসন রোগ এবং ওষুধ-জনিত এক্সট্রাপিরামিডাল লক্ষণের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়ে আসছে। ক্লিনিকাল অধ্যয়নগুলি দেখিয়েছে যে এটি কম্পন এবং পেশী শক্ততা কমাতে কার্যকর। তবে, এটি ব্র্যাডিকাইনেসিয়া (ধীর নড়াচড়া) বা পোস্টুরাল অস্থিরতার চিকিৎসায় কম কার্যকর।

অ্যান্টিসাইকোটিক ওষুধ দ্বারা সৃষ্ট তীব্র ডিস্টোনিক প্রতিক্রিয়ার চিকিৎসায় পারকিনিল বিশেষভাবে কার্যকর। অধ্যয়নগুলি ইঙ্গিত করে যে অ্যান্টিকোলিনার্জিক এজেন্টগুলি সাধারণত উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ রোগীদের তীব্র ডিস্টোনিয়া প্রতিরোধ করতে দেওয়া হয়, যদিও দীর্ঘমেয়াদী প্রফিল্যাক্সিস বিতর্কিত।

আমান্টাডিন এবং বেনজোডায়াজেপাইন উভয়ই পুনরাবৃত্ত নিউরোলেপ্টিক-জনিত ডিস্টোনিক প্রতিক্রিয়ার জন্য কার্যকর বলে প্রমাণিত হয়েছে। লিপোফিলিক বিটা-ব্লকার, বিশেষত প্রোপ্রানোলল এবং মেটোপ্রোলল, অ্যাকাথিসিয়ার জন্য সবচেয়ে কার্যকর চিকিৎসা বলে মনে হয়।

ট্যাবলেটেই নির্মূল হবে রক্তের ক্যান্সার? বাজারে আসছে যুগান্তকারী ওষুধ!

রোগীদের জন্য পরামর্শ এবং টিপস

পারকিনিল ট্যাবলেট গ্রহণকারী রোগীদের জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ:

  • নিয়মিত সেবন: ওষুধ প্রতিদিন একই সময়ে নিন এবং কোনো ডোজ মিস করবেন না

  • হাইড্রেশন: মুখের শুষ্কতা মোকাবেলায় প্রচুর পানি পান করুন এবং চিনিমুক্ত ক্যান্ডি ব্যবহার করতে পারেন

  • মৌখিক স্বাস্থ্যবিধি: ভাল দাঁতের যত্ন বজায় রাখুন এবং নিয়মিত দাঁতের ডাক্তারের কাছে যান

  • চোখের যত্ন: যদি শুষ্ক চোখ সমস্যা করে তবে কন্টাক্ট লেন্স এড়িয়ে চলুন এবং লুব্রিকেটিং আই ড্রপ ব্যবহার করুন

  • সতর্কতা: মাথা ঘোরা হতে পারে বলে গাড়ি চালানো বা ভারী যন্ত্রপাতি পরিচালনা এড়িয়ে চলুন

  • তাপ এক্সপোজার: ওষুধটি অ্যানহাইড্রোসিস (ঘামের অভাব) সৃষ্টি করতে পারে, তাই অতিরিক্ত তাপ এবং ব্যায়াম সাবধানে করুন

  • নিয়মিত ফলো-আপ: চিকিৎসকের সাথে নিয়মিত অ্যাপয়েন্টমেন্ট রাখুন এবং যেকোনো নতুন লক্ষণ রিপোর্ট করুন

পারকিনিল ট্যাবলেট পারকিনসন রোগ এবং ওষুধ-জনিত এক্সট্রাপিরামিডাল লক্ষণের চিকিৎসায় একটি মূল্যবান এবং কার্যকর ওষুধ। প্রোসাইক্লিডিন হাইড্রোক্লোরাইড সমৃদ্ধ এই ওষুধটি মস্তিষ্কে রাসায়নিক ভারসাম্য পুনরুদ্ধার করে পেশী শক্ততা, কম্পন এবং অন্যান্য মোটর লক্ষণ কমাতে সাহায্য করে। ভারতে পারকিনসন রোগের ক্রমবর্ধমান প্রকোপ – যা ২০৫০ সালের মধ্যে ১৬৮% বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করা হচ্ছে – এই ধরনের কার্যকর চিকিৎসা বিকল্পের গুরুত্বকে আরও বাড়িয়ে তোলে।

যদিও পারকিনিল ট্যাবলেট সাধারণত নিরাপদ এবং সহনীয়, তবে এটি অবশ্যই চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে ব্যবহার করা উচিত। প্রাথমিক সনাক্তকরণ, সঠিক চিকিৎসা এবং সামগ্রিক ব্যবস্থাপনা পারকিনসন রোগীদের জীবনযাত্রার মান উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত করতে পারে। রোগীদের তাদের চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলা, নিয়মিত ফলো-আপ রাখা এবং যেকোনো পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া বা উদ্বেগ সম্পর্কে অবিলম্বে জানানো উচিত। পারকিনসন রোগের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সচেতনতা, প্রাথমিক নির্ণয় এবং উপযুক্ত চিকিৎসা হল মূল চাবিকাঠি।

About Author
Debolina Roy

দেবলীনা রায় একজন চিকিৎসক এবং স্বাস্থ্য বিষয়ক লেখক, যিনি স্বাস্থ্য সচেতনতা এবং চিকিৎসা বিজ্ঞান সম্পর্কে পাঠকদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য নিবেদিত। ডাক্তারি নিয়ে পড়াশোনা করা দেবলীনা তার লেখায় চিকিৎসা বিষয়ক জটিল তথ্যগুলি সহজ ভাষায় উপস্থাপন করেন, যা সাধারণ পাঠকদের জন্য সহজবোধ্য এবং উপকারী। স্বাস্থ্য, পুষ্টি, এবং রোগ প্রতিরোধের বিষয়ে তার গভীর জ্ঞান এবং প্রাঞ্জল লেখনী পাঠকদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। দেবলীনা রায়ের লক্ষ্য হল সঠিক ও তথ্যনির্ভর স্বাস্থ্যবিধি প্রচার করা এবং মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত করা।

আরও পড়ুন