২৫ বছরে প্রধানমন্ত্রী গ্রাম সড়ক যোজনা: পশ্চিমবঙ্গের গ্রামীণ সংযোগে যুগান্তকারী পরিবর্তন

২৫ ডিসেম্বর ২০২৫-এ প্রধানমন্ত্রী গ্রাম সড়ক যোজনা (PMGSY) তার রজত জয়ন্তী উদযাপন করেছে। ২০০০ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ীর নেতৃত্বে শুরু হওয়া এই প্রকল্প ভারতের গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নের ইতিহাসে…

Chanchal Sen

 

২৫ ডিসেম্বর ২০২৫-এ প্রধানমন্ত্রী গ্রাম সড়ক যোজনা (PMGSY) তার রজত জয়ন্তী উদযাপন করেছে। ২০০০ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ীর নেতৃত্বে শুরু হওয়া এই প্রকল্প ভারতের গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নের ইতিহাসে এক মাইলফলক হয়ে উঠেছে। পশ্চিমবঙ্গে এই যোজনার মাধ্যমে ৩৬,৬৯৩ কিলোমিটার রাস্তা নির্মিত হয়েছে এবং হাজারো গ্রামের মানুষের জীবনযাত্রায় এসেছে আমূল পরিবর্তন।

PMGSY-র সূচনা এবং উদ্দেশ্য

প্রধানমন্ত্রী গ্রাম সড়ক যোজনা ২৫ ডিসেম্বর ২০০০ সালে চালু করা হয়েছিল গ্রামীণ এলাকার বিচ্ছিন্ন বসতিগুলিতে সারা বছর ব্যবহারযোগ্য সড়ক সংযোগ প্রদানের লক্ষ্যে। এই প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য ছিল ১০০০-এর বেশি জনসংখ্যার গ্রামগুলিকে পাকা রাস্তার মাধ্যমে যুক্ত করা এবং পাহাড়ি ও আদিবাসী অঞ্চলে ৫০০-এর বেশি জনসংখ্যার বসতিগুলিতে সংযোগ স্থাপন করা। দেশব্যাপী এই প্রকল্পের অধীনে ৮,২৫,১১৪ কিলোমিটার গ্রামীণ রাস্তা অনুমোদিত হয়েছে, যার মধ্যে ৭,৮৭,৫২০ কিলোমিটার (প্রায় ৯৫ শতাংশ) সম্পন্ন হয়েছে ডিসেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত।

প্রকল্পটি শুধুমাত্র সড়ক নির্মাণে সীমাবদ্ধ নয়, এটি কৃষি উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃজন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার উন্নত প্রবেশাধিকার এবং দারিদ্র্য দূরীকরণের মূল চালিকা শক্তি হিসেবে কাজ করছে। পশ্চিমবঙ্গের প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে এই প্রকল্পের প্রভাব অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী, যেখানে বর্ষায় কাদামাটির রাস্তায় যাতায়াত ছিল প্রায় অসম্ভব।

পশ্চিমবঙ্গে PMGSY-র অগ্রগতি এবং পরিসংখ্যান

পশ্চিমবঙ্গে প্রধানমন্ত্রী গ্রাম সড়ক যোজনার বাস্তবায়ন উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। রাজ্য সরকারের পঞ্চায়েত ও গ্রামোন্নয়ন দপ্তরের তথ্য অনুসারে, PMGSY-র অধীনে মোট ৩৬,৬৯৩ কিলোমিটার রাস্তা নির্মিত হয়েছে এবং ৫০টি নতুন সেতু নির্মাণ সম্পন্ন হয়েছে। এর মধ্যে ২৬,০৩০ কিলোমিটার সম্পূর্ণ নতুন রাস্তা তৈরি করা হয়েছে মে ২০১১ সালের পর থেকে।

জুলাই ২০২৩ পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গে PMGSY-র বিভিন্ন পর্যায়ে মোট ৩৭,৮৫০.১৮ কিলোমিটার রাস্তা অনুমোদিত হয়েছিল এবং ৩৬,৪৬১.৪৭ কিলোমিটার রাস্তা সম্পন্ন হয়েছিল। এই প্রকল্পের জন্য কেন্দ্রীয় সরকার ২০১৮-১৯ থেকে ২০২৩-২৪ অর্থবর্ষ পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গে মোট ৩,১৭৫.৫১ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষের জন্য সারা দেশে PMGSY-র বাজেট বরাদ্দ করা হয়েছে ১৯,০০০ কোটি টাকা।

পর্যায়ক্রমিক বিকাশ

প্রধানমন্ত্রী গ্রাম সড়ক যোজনা চারটি প্রধান পর্যায়ে বিভক্ত করে বাস্তবায়িত হয়েছে। প্রথম পর্যায়ে (২০০০-২০১৪) প্রায় ৩.৬৮ লক্ষ কিলোমিটার রাস্তা নির্মাণের মাধ্যমে ১.৩৫ লক্ষ গ্রাম সংযুক্ত করা হয়। পশ্চিমবঙ্গে প্রথম পর্যায়ে প্রায় ৩৬,০০০ কিলোমিটার রাস্তা চিহ্নিত এবং অনুমোদিত হয়েছিল সর্বকালীন সংযোগ প্রদানের জন্য।

দ্বিতীয় পর্যায়ে (২০১৩ থেকে) বিদ্যমান গ্রামীণ সড়কগুলির উন্নয়ন ও প্রশস্তকরণে জোর দেওয়া হয়। পশ্চিমবঙ্গে এই পর্যায়ে ২,৫২৭ কিলোমিটার রাস্তা বরাদ্দ করা হয়। তৃতীয় পর্যায় (২০১৯-২০২৫) শুরু হয় মূলত মাধ্যমিক সংযোগ ও গুরুত্বপূর্ণ গ্রামীণ লিঙ্কগুলি উন্নত করতে, যেখানে ১.২৫ লক্ষ কিলোমিটার রাস্তা নির্মাণ ও উন্নয়নের লক্ষ্য নেওয়া হয়। পশ্চিমবঙ্গে তৃতীয় পর্যায়ে ৬,২৮৭.৫০ কিলোমিটার রাস্তা বরাদ্দ করা হয়েছে।

সর্বশেষ চতুর্থ পর্যায় (২০২৪) অনুমোদিত হয় ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৪-এ, যেখানে ২৫,০০০ নতুন বসতিতে সংযোগ প্রদানের জন্য প্রায় ৬২,৫০০ কিলোমিটার রাস্তা নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে। এই পর্যায়ে ২০২৪-২৫ থেকে ২০২৮-২৯ অর্থবর্ষের মধ্যে মোট ৭০,০০০ কোটি টাকার আর্থিক বরাদ্দ রয়েছে।

ট্রাফিক আইনে ঝড়! জরিমানা ১০ গুণ বাড়ল, জেলের শাস্তিও জুটবে—দেখে নিন নতুন তালিকা

জেলাভিত্তিক সাফল্যের চিত্র

পশ্চিমবঙ্গের ২৩টি জেলায় PMGSY-র বাস্তবায়ন সমানভাবে গুরুত্ব পেয়েছে। ২০১৮-১৯ থেকে জুলাই ২০২৩ পর্যন্ত জেলাভিত্তিক রাস্তা নির্মাণের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে পশ্চিম মেদিনীপুরে সর্বাধিক ১,২০৭.২৬ কিলোমিটার রাস্তা সম্পন্ন হয়েছে এই সময়কালে। দক্ষিণ ২৪ পরগনায় ৭২২.১৫ কিলোমিটার এবং বাঁকুড়ায় ৯৩৬.৯৪ কিলোমিটার রাস্তা নির্মিত হয়েছে।

মালদহ জেলায় ৬২৪.০৪ কিলোমিটার, পুরুলিয়ায় ৭১১.৩৩ কিলোমিটার এবং বীরভূমে ৫৪৫.২৩ কিলোমিটার রাস্তা এই সময়ের মধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। উত্তরবঙ্গের জেলাগুলিতেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে – জলপাইগুড়িতে ২২৭.০১ কিলোমিটার, দার্জিলিংয়ে ৩০৬.৩২ কিলোমিটার এবং আলিপুরদুয়ারে ৩৫০.০৯ কিলোমিটার রাস্তা নির্মিত হয়েছে। নদীয়া জেলায় ৪০১.৪৩ কিলোমিটার, হুগলিতে ৫০৪.৬০ কিলোমিটার এবং হাওড়ায় ৫২৫.২০ কিলোমিটার রাস্তা এই পাঁচ বছরে তৈরি হয়েছে।

আর্থিক বরাদ্দ এবং ব্যয়

কেন্দ্রীয় সরকার পশ্চিমবঙ্গে PMGSY বাস্তবায়নের জন্য বছরওয়ারি তহবিল বরাদ্দ করেছে। ২০১৮-১৯ অর্থবর্ষে সর্বোচ্চ ১,৪২৬.৯৮ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছিল। ২০১৯-২০ তে ৩৪৮.২৫ কোটি টাকা, ২০২০-২১ এ ৯৬৯.৩১ কোটি টাকা, ২০২১-২২ এ ৪৯.৯৪ কোটি টাকা এবং ২০২২-২৩ এ ৩৮১.০৩ কোটি টাকা কেন্দ্রীয় তহবিল মুক্তি দেওয়া হয়েছে। জুলাই ২০২৩ পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গের কাছে সিকিউরিটি ডিপোজিট বাদে ৩১৯.০৬ কোটি টাকা অব্যয়িত তহবিল রয়েছে।

PMGSY-র অর্থায়ন ব্যবস্থায় কেন্দ্র ও রাজ্যের অনুপাত ৬০:৪০ অনুসরণ করা হয়। তবে রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ১০০ শতাংশ তহবিল রাজ্য সরকার বহন করে। পশ্চিমবঙ্গ সড়ক উন্নয়ন সংস্থা (WBSRDA) ২০২২-২৩ অর্থবর্ষে রাজ্য তহবিল থেকে ডিএলপি (ডিফেক্ট লায়াবিলিটি পিরিয়ড) রক্ষণাবেক্ষণে ১০৭.১৪ কোটি টাকা এবং পাঁচ বছরের পোস্ট রক্ষণাবেক্ষণে ৫৪৩.৬৭ কোটি টাকা ব্যয় করেছে, যা সারা দেশে সর্বোচ্চ।

গ্রামীণ জীবনে PMGSY-র প্রভাব

নদীয়া জেলার গ্রামবাসী পপুল বিশ্বাসের কথায়, “PMGSY রাস্তা তৈরি হওয়ার পর আমাদের জীবনযাত্রা সম্পূর্ণ বদলে গেছে। গাড়ির চলাচল সহজ হয়েছে, কৃষিপণ্য বাজারে নিয়ে যাওয়া সুবিধাজনক হয়েছে এবং জরুরি সেবা পাওয়া আরও দ্রুত হয়েছে।” আরেক বাসিন্দা বাবু পাল যোগ করেন, “অটল বিহারী বাজপেয়ীর এই প্রকল্প আমাদের গ্রামগুলিকে শহরের সঙ্গে যুক্ত করার ধারণা প্রথম বাস্তবায়ন করেছে। বর্ষাকালে কাদামাটি রাস্তায় যে সমস্যা হতো, PMGSY রাস্তা তৈরির পর তা অনেকটাই সমাধান হয়েছে।”

গ্রামীণ সংযোগ উন্নত হওয়ায় কৃষকরা তাদের উৎপাদিত পণ্য আরও ভালো দামে বিক্রি করতে পারছেন। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলিতে পৌঁছানো সহজ হয়েছে, যার ফলে শিক্ষার হার বৃদ্ধি পেয়েছে এবং জরুরি চিকিৎসা সেবা দ্রুত পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে। অ্যাম্বুলেন্স এখন বিলম্ব ছাড়াই রোগীদের কাছে পৌঁছাতে পারে, যা জীবন রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

কর্মসংস্থান সৃজনেও PMGSY-র অবদান উল্লেখযোগ্য। রাস্তা নির্মাণ এবং রক্ষণাবেক্ষণের কাজে স্থানীয় শ্রমিকদের নিয়োগ দেওয়া হয়, যা গ্রামীণ অর্থনীতিকে চাঙ্গা করেছে। কৃষি ও অকৃষি উভয় ক্ষেত্রে জীবিকার সুযোগ বৃদ্ধি পেয়েছে। বাজার সংযোগ শক্তিশালী হওয়ায় ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটেছে এবং গ্রামীণ উদ্যোক্তাদের জন্য নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে।

প্রযুক্তি ও মান নিয়ন্ত্রণ

PMGSY প্রকল্পের একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো আধুনিক প্রযুক্তি ও কঠোর মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা। অনলাইন ম্যানেজমেন্ট, মনিটরিং অ্যান্ড অ্যাকাউন্টিং সিস্টেম (OMMAS), ই-মার্গ (e-MARG), জিপিএস-ভিত্তিক ট্র্যাকিং এবং জিও-ট্যাগিং ব্যবহার করে রাস্তা নির্মাণের অগ্রগতি ও গুণমান নিরীক্ষণ করা হচ্ছে। এই ডিজিটাল মনিটরিং সিস্টেমগুলি স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং পরিবেশগত স্থিতিস্থাপকতা নিশ্চিত করেছে।

তিন স্তরের মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা চালু রয়েছে – নির্মাতা সংস্থা, রাজ্য সরকার এবং কেন্দ্রীয় পর্যবেক্ষক। পশ্চিমবঙ্গে রাজ্যের সদর দপ্তরে একটি পৃথক মান নিয়ন্ত্রণ বিভাগ রয়েছে যা কাজের গুণমান তদারকি করে। প্রকল্পটি ৩১টি বিভাগের নেটওয়ার্কের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হয়, যার প্রতিটি একজন কার্যনির্বাহী প্রকৌশলীর নেতৃত্বে পরিচালিত হয় এবং ক্ষেত্র কর্মকর্তা, সহকারী প্রকৌশলী, জুনিয়র প্রকৌশলী এবং ডেটা এন্ট্রি অপারেটরদের দ্বারা সমর্থিত হয়।

তদারকির জন্য রয়েছে ৫টি আঞ্চলিক বৃত্ত যা অধীক্ষক প্রকৌশলীদের নেতৃত্বে পরিচালিত হয়, এছাড়াও সদর দপ্তরের অধীক্ষক প্রকৌশলী, রাজ্য মান সমন্বয়কারী, নোডাল রক্ষণাবেক্ষণ অফিসার এবং ভেটিং সেল অধীক্ষক প্রকৌশলী রয়েছেন। রাস্তা নির্মাণের পাঁচ বছর পর পুনরায় পরিদর্শন এবং রক্ষণাবেক্ষণ করা হয় নতুন বিস্তারিত প্রকল্প প্রতিবেদন (DPR) প্রস্তুতির মাধ্যমে। ২০২৩ পর্যন্ত ২৭,৬৯৪ কিলোমিটার রাস্তা পাঁচ বছরের পর পুনর্নবীকরণ রক্ষণাবেক্ষণ কাজের অধীনে রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়েছে।

রাজ্য সরকারের সম্পূরক প্রচেষ্টা

কেন্দ্রীয় PMGSY প্রকল্পের পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গ সরকার নিজস্ব উদ্যোগেও গ্রামীণ সড়ক উন্নয়নে বিনিয়োগ করেছে। পথশ্রী (Pathasree) প্রকল্পের অধীনে রাজ্য সরকার গ্রামীণ রাস্তা পুনর্নির্মাণ ও মেরামতের লক্ষ্যমাত্রা অতিক্রম করেছে। ২০২০ সালের অক্টোবরে চালু হওয়া এই কর্মসূচির অধীনে প্রাথমিক লক্ষ্যমাত্রা ১২,৫৫৭ কিলোমিটার থেকে বৃদ্ধি করে ১৭,৩৩৩.৮৬ কিলোমিটার করা হয়েছিল।

২০২১ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত পথশ্রী প্রকল্পের অধীনে ১৪,৪১৬.২৫ কিলোমিটার গ্রামীণ রাস্তা পুনর্নির্মাণ করা হয়েছিল, যা প্রায় ৭,৩০০ বসতিতে সংযোগ প্রদান করেছে। পঞ্চায়েত ও গ্রামোন্নয়ন বিভাগ ১৪,০৬৪.০৭ কিলোমিটার, নগর উন্নয়ন ও পৌর বিষয়ক বিভাগ ২৫৫.৫৪ কিলোমিটার, PWD ৯৩.০৫ কিলোমিটার এবং সেচ বিভাগ ৩.৬০ কিলোমিটার রাস্তা পুনর্নির্মাণ করেছে। ডিসেম্বর ২০২৫-এ রাজ্য সরকার ৮,৪৮৭ কোটি টাকার একটি নতুন সড়ক উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদন করেছে, যার অধীনে ২০,০০০ কিলোমিটারেরও বেশি গ্রামীণ ও শহুরে রাস্তা নির্মিত হবে।

পথশ্রী প্রকল্পের অধীনে প্রায় ১৫,০১১ কিলোমিটার গ্রামীণ রাস্তা নির্মাণ করা হবে, যা বিশেষভাবে সেই গ্রামগুলিকে উপকৃত করবে যেখানে রাস্তাগুলি কাঁচা বা আংশিকভাবে উন্নত রয়েছে। এই উদ্যোগ স্থানীয় বাজার, স্বাস্থ্যসেবা সুবিধা, স্কুল এবং প্রশাসনিক কেন্দ্রগুলিতে প্রবেশাধিকার উন্নত করবে, বিশেষত প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলিতে। রাজ্যের এই সম্পূরক প্রচেষ্টা PMGSY-র সাথে মিলিত হয়ে পশ্চিমবঙ্গের গ্রামীণ সংযোগ নেটওয়ার্ককে আরও শক্তিশালী করছে।

টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যের সাথে সংযুক্তি

প্রধানমন্ত্রী গ্রাম সড়ক যোজনা জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (SDG) সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ, বিশেষত দারিদ্র্য হ্রাস (SDG 1), ভালো স্বাস্থ্য ও সুস্থতা (SDG 3), মানসম্পন্ন শিক্ষা (SDG 4), শিল্প, উদ্ভাবন ও অবকাঠামো (SDG 9) এবং টেকসই শহর ও সম্প্রদায় (SDG 11) ক্ষেত্রে। প্রকল্পটি শুধুমাত্র অবকাঠামো সৃষ্টির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এটি পরিবেশগত স্থায়িত্ব, দারিদ্র্য হ্রাস এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক গ্রামীণ রূপান্তরকে উৎসাহিত করে।

PMGSY রাস্তাগুলি জলবায়ু স্থিতিস্থাপক নকশা অনুসরণ করে নির্মিত হয় যা প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং চরম আবহাওয়া পরিস্থিতি সামলাতে সক্ষম। পরিবেশ বান্ধব নির্মাণ পদ্ধতি ব্যবহার করা হয় যা স্থানীয় বাস্তুতন্ত্রের ক্ষতি কমায়। রাস্তা নির্মাণে স্থানীয় উপকরণ ব্যবহার করা হয়, যা পরিবহন খরচ এবং কার্বন ফুটপ্রিন্ট হ্রাস করে। ড্রেনেজ এবং জল নিষ্কাশন ব্যবস্থা পরিকল্পনা করা হয় বর্ষাকালে রাস্তার ক্ষতি রোধ করতে।

প্রকল্পের মাধ্যমে গ্রামীণ নারীদের জীবনযাত্রার মান উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হয়েছে। স্বাস্থ্যসেবা সুবিধা সহজলভ্য হওয়ায় মাতৃ ও শিশু স্বাস্থ্য সূচক উন্নতি করেছে। মেয়েদের স্কুলে যাতায়াত সহজ হওয়ায় শিক্ষায় লিঙ্গ সমতা বৃদ্ধি পেয়েছে। গ্রামীণ মহিলা উদ্যোক্তারা তাদের পণ্য বাজারে নিয়ে যেতে এবং ব্যবসায়িক সুযোগ পেতে সক্ষম হচ্ছেন। স্বনির্ভর গোষ্ঠীগুলি (SHG) তাদের পণ্য পরিবহন এবং বিপণনে উন্নত সংযোগ থেকে উপকৃত হচ্ছে।

চ্যালেঞ্জ এবং ভবিষ্যতের পথ

PMGSY-র উল্লেখযোগ্য সাফল্য সত্ত্বেও কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে যা মোকাবিলা করা প্রয়োজন। ভূমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া কখনও কখনও প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব ঘটায়। স্থানীয় প্রশাসন এবং গ্রামবাসীদের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব প্রকল্প সম্পাদনে প্রভাব ফেলে। কিছু অঞ্চলে ঠিকাদারদের সক্ষমতা এবং প্রযুক্তিগত দক্ষতার সীমাবদ্ধতা নির্মাণ মান এবং সময়সূচী প্রভাবিত করে। ভৌগোলিক জটিলতা যেমন পাহাড়ি অঞ্চল, বন্যাপ্রবণ এলাকা এবং দূর্গম টেরেনে রাস্তা নির্মাণ অতিরিক্ত চ্যালেঞ্জ তৈরি করে।

রক্ষণাবেক্ষণ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যেখানে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন। ভারী যানবাহনের চলাচল এবং চরম আবহাওয়া পরিস্থিতি রাস্তার ক্ষতি ত্বরান্বিত করে। রাজ্য সরকারকে রক্ষণাবেক্ষণের জন্য পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ নিশ্চিত করতে হবে। স্থানীয় সম্প্রদায়কে রক্ষণাবেক্ষণে জড়িত করার মাধ্যমে রাস্তার দীর্ঘায়ু বৃদ্ধি করা যেতে পারে। সামাজিক অডিট এবং জনসাধারণের অংশগ্রহণ স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা বাড়াতে পারে।

ভবিষ্যতে PMGSY-র চতুর্থ পর্যায়ের সফল বাস্তবায়ন পশ্চিমবঙ্গের গ্রামীণ সংযোগ আরও শক্তিশালী করবে। অবশিষ্ট অসংযুক্ত বসতিগুলিতে সংযোগ প্রদান এবং বিদ্যমান রাস্তাগুলির গুণমান উন্নয়ন অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। ডিজিটাল প্রযুক্তির আরও সম্প্রসারণ যেমন ড্রোন সার্ভেইলেন্স, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স-ভিত্তিক মনিটরিং এবং রিয়েল-টাইম ড্যাটা বিশ্লেষণ প্রকল্প ব্যবস্থাপনা উন্নত করতে পারে। জলবায়ু-স্থিতিস্থাপক এবং পরিবেশ বান্ধব নির্মাণ প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ দীর্ঘমেয়াদী স্থায়িত্ব নিশ্চিত করবে।

Modi 3.0 এর প্রথম বাজেট, ভারতের অর্থনীতির নতুন দিগন্ত!

জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি

প্রধানমন্ত্রী গ্রাম সড়ক যোজনা দেশে এবং বিদেশে ব্যাপক স্বীকৃতি পেয়েছে। বিশ্বব্যাংক এই প্রকল্পকে গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নের একটি মডেল হিসেবে প্রশংসা করেছে। অনেক উন্নয়নশীল দেশ PMGSY-র কাঠামো এবং বাস্তবায়ন পদ্ধতি অধ্যয়ন করছে তাদের নিজস্ব গ্রামীণ সড়ক প্রকল্পের জন্য। আগস্ট ২০২৫ পর্যন্ত দেশব্যাপী সমস্ত পর্যায়ে PMGSY-র অধীনে ১,৯১,২৮২টি গ্রামীণ রাস্তা (৮,৩৮,৬১১ কিলোমিটার) এবং ১২,১৪৬টি সেতু অনুমোদিত হয়েছে।

এর মধ্যে ১,৮৩,২১৫টি রাস্তা (৭,৮৩,৭২৭ কিলোমিটার) এবং ৯,৮৯১টি সেতু ইতিমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। PMGSY-র সাফল্য ভারতকে গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নে একটি বৈশ্বিক নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। প্রকল্পটি গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নে সরকারী খাতের কার্যকর হস্তক্ষেপের একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হয়। স্বচ্ছতা, ডিজিটাল মনিটরিং এবং মান নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে PMGSY-র উদ্ভাবনী পদ্ধতি আন্তর্জাতিক মনোযোগ আকর্ষণ করেছে।

পশ্চিমবঙ্গ বিশেষভাবে PMGSY বাস্তবায়নে তার প্রতিশ্রুতির জন্য স্বীকৃতি পেয়েছে। রাজ্যের রক্ষণাবেক্ষণ কার্যক্রম দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ হিসেবে প্রশংসিত হয়েছে। PMGSY রাস্তা নির্মাণে রাজ্যের অগ্রগতি এবং পথশ্রী-র মতো সম্পূরক কর্মসূচী অন্যান্য রাজ্যের জন্য অনুকরণীয় মডেল হয়ে উঠেছে। গ্রামীণ সংযোগ উন্নয়নে পশ্চিমবঙ্গের সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গি যেখানে কেন্দ্রীয় এবং রাজ্য প্রকল্পগুলি একসাথে কাজ করছে, তা অন্যান্য রাজ্যের জন্য একটি মূল্যবান পাঠ প্রদান করে।

পশ্চিমবঙ্গে PMGSY: সাফল্যের সারণী

বিবরণ পরিসংখ্যান
মোট নির্মিত রাস্তা ৩৬,৬৯৩ কিলোমিটার
সম্পূর্ণ নতুন রাস্তা (মে ২০১১ থেকে) ২৬,০৩০ কিলোমিটার
নির্মিত সেতু ৫০টি
পর্যায়-১ বরাদ্দ প্রায় ৩৬,০০০ কিলোমিটার
পর্যায়-২ বরাদ্দ ২,৫২৭ কিলোমিটার
পর্যায়-৩ বরাদ্দ ৬,২৮৭.৫০ কিলোমিটার
কেন্দ্রীয় তহবিল (২০১৮-২৩) ৩,১৭৫.৫১ কোটি টাকা
পাঁচ বছর পর রক্ষণাবেক্ষণ ২৭,৬৯৪ কিলোমিটার
DLP রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় (২০২২-২৩) ১০৭.১৪ কোটি টাকা
পোস্ট রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় ৫৪৩.৬৭ কোটি টাকা

শেষ সিদ্ধান্ত

প্রধানমন্ত্রী গ্রাম সড়ক যোজনার ২৫ বছরের যাত্রা পশ্চিমবঙ্গের গ্রামীণ ভূদৃশ্যে একটি রূপান্তরকারী প্রভাব ফেলেছে। ৩৬,৬৯৩ কিলোমিটারেরও বেশি রাস্তা নির্মাণের মাধ্যমে এই প্রকল্প হাজারো গ্রামকে সংযুক্ত করেছে এবং লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত করেছে। অটল বিহারী বাজপেয়ীর দূরদৃষ্টিসম্পন্ন উদ্যোগ আজ ভারতের সবচেয়ে সফল গ্রামীণ উন্নয়ন কর্মসূচী হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। পশ্চিমবঙ্গে PMGSY শুধু রাস্তা নির্মাণ করেনি, এটি শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, কৃষি এবং ব্যবসায়ে নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দিয়েছে। আধুনিক প্রযুক্তি, কঠোর মান নিয়ন্ত্রণ এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার সাথে সংযুক্তি এই প্রকল্পকে বিশ্বব্যাপী একটি অনুকরণীয় মডেল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। পথশ্রী-র মতো রাজ্য সরকারের সম্পূরক প্রচেষ্টা এবং চতুর্থ পর্যায়ের আসন্ন বাস্তবায়ন পশ্চিমবঙ্গের গ্রামীণ সংযোগকে আরও শক্তিশালী করবে এবং সত্যিকারের অর্থে নগর ও গ্রামীণ বাংলার মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করবে। এই রজত জয়ন্তীতে দাঁড়িয়ে PMGSY-র অর্জন উদযাপন করার পাশাপাশি ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা এবং সর্বশেষ অসংযুক্ত বসতিগুলিতে সংযোগ প্রদানের প্রতিশ্রুতি নবায়ন করা প্রয়োজন।

About Author
Chanchal Sen

চঞ্চল সেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতক। তিনি একজন অভিজ্ঞ লেখক এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষক, যিনি পলিটিক্স নিয়ে লেখালিখিতে পারদর্শী। চঞ্চলের লেখায় রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের গভীর বিশ্লেষণ এবং সমসাময়িক ঘটনাবলীর সঠিক উপস্থাপন পাঠকদের মুগ্ধ করে। তার নিবন্ধ এবং মতামতমূলক লেখা বস্তুনিষ্ঠতা ও বিশ্লেষণধর্মিতার কারণে পাঠকমহলে ব্যাপকভাবে সমাদৃত। চঞ্চল সেনের তীক্ষ্ণ দৃষ্টিভঙ্গি এবং গভীর গবেষণা তাকে রাজনৈতিক সাংবাদিকতার জগতে একটি স্বতন্ত্র স্থান প্রদান করেছে। তিনি তার লেখনীর মাধ্যমে পাঠকদের রাজনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধি করতে এবং সমাজে পরিবর্তন আনতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে চলেছেন।

আরও পড়ুন