কল্যাণীবাসীর দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান হতে চলেছে। এই নভেম্বর মাস থেকেই শহরের বাড়িগুলিতে শুরু হচ্ছে পাইপলাইন মারফত প্রাকৃতিক গ্যাস (PNG) সরবরাহের প্রক্রিয়া। সিলিন্ডার বুকিং-এর ঝঞ্ঝাট, হঠাৎ গ্যাস ফুরিয়ে যাওয়ার চিন্তা এবং নিরাপত্তার ঝুঁকি থেকে মুক্তি পেতে চলেছেন শহরের হাজার হাজার পরিবার। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের উদ্যোগে এবং বেঙ্গল গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড (BGCL)-এর তত্ত্বাবধানে, এই প্রকল্পটি কল্যাণীর সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে চলেছে। এই পরিষেবা শুধু যে অবিচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করবে তাই নয়, এটি LPG সিলিন্ডারের তুলনায় অনেক বেশি নিরাপদ এবং সাশ্রয়ী বলেও বিবেচিত হচ্ছে।
এই নিবন্ধে, আমরা কল্যাণীতে PNG সংযোগ পাওয়ার সম্পূর্ণ প্রক্রিয়া, এর জন্য কত খরচ হতে পারে, আবেদন করার পদ্ধতি, এর সুবিধা-অসুবিধা এবং দেশব্যাপী সিটি গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন (CGD) নেটওয়ার্কের প্রেক্ষাপটে এর গুরুত্ব নিয়ে গভীরভাবে বিশ্লেষণ করব। আমরা শুধুমাত্র নির্ভরযোগ্য এবং যাচাইকৃত তথ্যের উপর ভিত্তি করেই এই আলোচনা করব, যাতে পাঠকরা একটি সম্পূর্ণ এবং স্বচ্ছ ধারণা পেতে পারেন। এই পদক্ষেপটি শুধুমাত্র কল্যাণীর জন্য নয়, বরং সমগ্র পশ্চিমবঙ্গকে একটি পরিচ্ছন্ন, সবুজ এবং গ্যাস-ভিত্তিক অর্থনীতির দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার বৃহত্তর পরিকল্পনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
কল্যাণীর রান্নাঘরে পাইপলাইন গ্যাসের নতুন যুগ
কল্যাণী, যা পশ্চিমবঙ্গের অন্যতম পরিকল্পিত শহর হিসেবে পরিচিত, এবার তার আধুনিক পরিকাঠামোর তালিকায় আরও একটি পালক যোগ করতে চলেছে। নভেম্বর মাস থেকে শুরু হওয়া এই পাইপড ন্যাচারাল গ্যাস (PNG) প্রকল্পটি শহরের শক্তি ব্যবহারের মানচিত্র সম্পূর্ণ বদলে দেবে।
নভেম্বর থেকে ঠিক কী শুরু হচ্ছে?
নভেম্বর মাস থেকে, বেঙ্গল গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড (BGCL), যা ভারত সরকারের GAIL (India) Limited এবং পশ্চিমবঙ্গ শিল্পোন্নয়ন নিগম (WBIDC)-এর একটি যৌথ উদ্যোগ, কল্যাণীতে তাদের পরিকাঠামো পরীক্ষা এবং সংযোগ প্রদানের কাজ শুরু করবে। প্রাথমিক পর্যায়ে, যে সমস্ত এলাকায় ইতিমধ্যেই পাইপলাইন পাতার কাজ সম্পন্ন হয়েছে, সেই সমস্ত বাড়ির গ্রাহকদের সংযোগ দেওয়া হবে।
এই প্রক্রিয়াটি পর্যায়ক্রমে (Phased Manner) বাস্তবায়িত হবে। BGCL-এর লক্ষ্য হল আগামী কয়েক মাসের মধ্যে কল্যাণী পৌরসভার বেশিরভাগ এলাকাকে এই নেটওয়ার্কের আওতায় নিয়ে আসা। এই পদক্ষেপটি পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাস নিয়ন্ত্রক বোর্ড (PNGRB)-এর নির্দেশিকা মেনেই করা হচ্ছে, যা সারা দেশে সিটি গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন (CGD) নেটওয়ার্কের প্রসারের তত্ত্বাবধান করে।
কেন এই পদক্ষেপ এত গুরুত্বপূর্ণ?
এই পদক্ষেপের গুরুত্ব বহুমাত্রিক:
- জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন: সিলিন্ডার বহন করা, সময়মতো বুকিং করা বা অতিরিক্ত সিলিন্ডার মজুত রাখার মতো বিষয়গুলি থেকে শহরবাসী মুক্তি পাবেন। বিদ্যুতের বিলের মতোই, মাস শেষে ব্যবহৃত গ্যাসের পরিমাণের উপর ভিত্তি করে বিল আসবে।
- অর্থনৈতিক সাশ্রয়: বর্তমানে, ভর্তুকিহীন LPG সিলিন্ডারের দামের তুলনায় PNG উল্লেখযোগ্যভাবে সস্তা। পেট্রোলিয়াম মন্ত্রকের (MoPNG) বিভিন্ন রিপোর্ট অনুযায়ী, PNG ব্যবহার করলে রান্নার জ্বালানির খরচ প্রায় ৩০% থেকে ৪০% পর্যন্ত কমতে পারে।
- নিরাপত্তা বৃদ্ধি: PNG, যা মূলত মিথেন, বাতাসের চেয়ে হালকা। তাই কোনও কারণে লিক হলেও তা দ্রুত বাতাসে মিশে যায় এবং নীচে জমাট বাঁধে না। অন্যদিকে, LPG বাতাসের চেয়ে ভারী হওয়ায় লিক হলে তা মেঝের স্তরে জমা হয়, যা থেকে বিস্ফোরণের ঝুঁকি বেশি থাকে।
- পরিবেশ সুরক্ষা: PNG একটি অনেক বেশি পরিচ্ছন্ন জ্বালানি। এর দহনে কার্বন ডাই অক্সাইড, সালফার ডাই অক্সাইড এবং নাইট্রোজেন অক্সাইডের মতো ক্ষতিকারক গ্যাসের নিঃসরণ LPG বা অন্যান্য জীবাশ্ম জ্বালানির তুলনায় অনেক কম হয়।
PNG কী এবং এটি LPG-এর থেকে কতটা আলাদা?
আমরা প্রায়শই PNG এবং LPG-কে একই ধরনের জ্বালানি বলে ভুল করি, কিন্তু এই দুটির মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। এই পার্থক্যগুলি বোঝা অত্যন্ত জরুরি, কারণ এর উপরেই নিরাপত্তা এবং খরচ নির্ভর করে।
PNG (পাইপড ন্যাচারাল গ্যাস) পরিচিতি
PNG হল মূলত মিথেন ($CH_4$), যা মাটির তলা থেকে উত্তোলন করা হয় এবং পরিশোধনের পর সরাসরি পাইপলাইনের মাধ্যমে গ্রাহকের বাড়িতে পৌঁছে দেওয়া হয়। এটি অত্যন্ত কম চাপে (Low Pressure) সরবরাহ করা হয়, যা এটিকে গার্হস্থ্য ব্যবহারের জন্য অত্যন্ত নিরাপদ করে তোলে। এর কোনও রঙের বা গন্ধের প্রয়োজন হয় না, তবে নিরাপত্তার জন্য এতে মার্কাটান (Mercaptan) নামক একটি গন্ধক যৌগ মেশানো হয়, যাতে লিক হলে তা সহজেই ধরা পড়ে।
LPG (লিকুইফাইড পেট্রোলিয়াম গ্যাস) পরিচিতি
LPG হল প্রোপেন ($C_3H_8$) এবং বিউটেন ($C_4H_{10}$) গ্যাসের মিশ্রণ। এটি পেট্রোলিয়াম পরিশোধন প্রক্রিয়ার একটি উপজাত (By-product)। এই গ্যাসকে উচ্চ চাপে তরল করে ধাতব সিলিন্ডারে ভরা হয়। ব্যবহারের সময় এটি আবার গ্যাসে রূপান্তরিত হয়।
PNG বনাম LPG: একটি বিস্তারিত তুলনা
কল্যাণীবাসীর জন্য কোনটি বেশি সুবিধাজনক তা বোঝার জন্য নিচের এই তুলনাটি অত্যন্ত সহায়ক হবে:
| বৈশিষ্ট্য (Feature) | PNG (পাইপড ন্যাচারাল গ্যাস) | LPG (লিকুইফাইড পেট্রোলিয়াম গ্যাস) |
| প্রধান উপাদান | মিথেন ($CH_4$) | প্রোপেন ($C_3H_8$) এবং বিউটেন ($C_4H_{10}$) |
| সরবরাহ | পাইপলাইনের মাধ্যমে অবিচ্ছিন্ন (২৪x৭) | সিলিন্ডারে ভর্তি; শেষ হলে রিফিল করতে হয় |
| মজুত | বাড়িতে মজুতের প্রয়োজন নেই | বাড়িতে সিলিন্ডার মজুত রাখতে হয় |
| বায়ুর তুলনায় | হালকা (Halka) – লিক হলে উপরে উঠে যায় | ভারী (Bhari) – লিক হলে মেঝের কাছে জমা হয় |
| নিরাপত্তা | তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি নিরাপদ | কম নিরাপদ (ভারী হওয়ায় বিস্ফোরণের ঝুঁকি বেশি) |
| বুকিং | বুকিং-এর কোনও ঝামেলা নেই | নিয়মিত বুকিং এবং ডেলিভারির অপেক্ষা করতে হয় |
| খরচ (আনুমানিক) | ভর্তুকিহীন LPG-এর তুলনায় ৩০-৪০% সস্তা | দাম পরিবর্তনশীল (ভর্তুকিযুক্ত ও ভর্তুকিহীন) |
| পরিবেশগত প্রভাব | অত্যন্ত পরিচ্ছন্ন জ্বালানি, কম কার্বন নিঃসরণ | PNG-এর তুলনায় বেশি দূষণকারী |
| চাপ | খুব কম চাপে সরবরাহ করা হয় | সিলিন্ডারে খুব উচ্চ চাপে তরল থাকে |
এই টেবিল থেকে স্পষ্ট যে, সুবিধা, নিরাপত্তা এবং খরচ – এই তিনটি প্রধান মাপকাঠিতেই PNG, বর্তমান LPG সিলিন্ডারের থেকে অনেকটাই এগিয়ে রয়েছে।
কল্যাণীতে PNG সংযোগের জন্য আবেদন প্রক্রিয়া (A-Z গাইড)
কল্যাণীতে যারা নতুন PNG সংযোগ নিতে আগ্রহী, তাদের বেঙ্গল গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড (BGCL)-এর নির্ধারিত পদ্ধতি অনুসরণ করতে হবে। প্রক্রিয়াটি বেশ সহজ এবং মূলত অনলাইন-ভিত্তিক।
ধাপে ধাপে আবেদন পদ্ধতি
- প্রাথমিক অনুসন্ধান (Initial Enquiry):
- প্রথমেই আপনাকে বেঙ্গল গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড (BGCL)-এর অফিসিয়াল ওয়েবসাইট-এ যেতে হবে।
- ওয়েবসাইটে ‘Customer Zone’ বা ‘New Connection’ বিভাগে গিয়ে দেখতে হবে আপনার এলাকাটি (কল্যাণীর নির্দিষ্ট ওয়ার্ড বা ব্লক) বর্তমানে পরিষেবাযোগ্য (Serviceable) কি না। BGCL পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন এলাকার জন্য রেজিস্ট্রেশন শুরু করে।
- অনলাইন রেজিস্ট্রেশন (Online Registration):
- আপনার এলাকা পরিষেবাযোগ্য হলে, আপনাকে একটি অনলাইন রেজিস্ট্রেশন ফর্ম পূরণ করতে হবে।
- এই ফর্মে আপনার নাম, ঠিকানা (যেখানে সংযোগ চান), মোবাইল নম্বর, ইমেল আইডি এবং অন্যান্য প্রাথমিক তথ্য চাওয়া হবে।
- আবেদন ফি জমা (Application Fee Payment):
- রেজিস্ট্রেশনের সময় একটি এককালীন, অফেরতযোগ্য (Non-Refundable) আবেদন ফি বা রেজিস্ট্রেশন চার্জ জমা দিতে হতে পারে। এই চার্জ সাধারণত ₹৫০০ থেকে ₹১০০০-এর মধ্যে হয় (নির্দিষ্ট পরিমাণ BGCL-এর পোর্টালে উল্লেখ থাকবে)।
- সাইট সার্ভে (Site Survey):
- আবেদন জমা দেওয়ার পর, BGCL-এর একজন অনুমোদিত টেকনিশিয়ান আপনার বাড়ি পরিদর্শন করতে আসবেন।
- এই সার্ভের উদ্দেশ্য হল পাইপলাইন কোন পথে রান্নাঘর পর্যন্ত যাবে, মিটার কোথায় বসানো হবে এবং নিরাপত্তার সমস্ত দিক খতিয়ে দেখা।
- নথি জমা (Document Submission):
- সার্ভে সফল হলে, আপনাকে প্রয়োজনীয় নথি জমা দিতে হবে। এগুলি সাধারণত অনলাইনে আপলোড করা যায়।
প্রয়োজনীয় নথি (Required Documents)
একটি নতুন PNG সংযোগের জন্য সাধারণত নিম্নলিখিত নথিগুলির প্রয়োজন হয়:
- পরিচয় প্রমাণ (Identity Proof): আধার কার্ড, ভোটার কার্ড, বা পাসপোর্টের কপি।
- ঠিকানা প্রমাণ (Address Proof): সাম্প্রতিকতম বিদ্যুৎ বিল, জলের বিল, বা বাড়ি বা ফ্ল্যাটের মালিকানার দলিল (Sale Deed/Property Tax Receipt)।
- মালিকানার প্রমাণ: যদি আবেদনকারী বাড়ির মালিক হন, তবে মালিকানার প্রমাণপত্র।
- ভাড়াটিয়ার ক্ষেত্রে: যদি আপনি ভাড়া থাকেন, তবে বাড়ির মালিকের কাছ থেকে একটি অনাপত্তি শংসাপত্র (No Objection Certificate – NOC) এবং ভাড়ার চুক্তিপত্র (Rent Agreement) জমা দিতে হবে।
খরচ এবং বিলিং: কত টাকা লাগবে?
একটি নতুন PNG সংযোগ নেওয়ার ক্ষেত্রে দুটি প্রধান ধরনের খরচ রয়েছে: এককালীন সংযোগ খরচ এবং মাসিক ব্যবহারের বিল।
সংযোগের খরচ (Connection Charges)
সংযোগের খরচ মূলত দুটি ভাগে বিভক্ত:
- সিকিউরিটি ডিপোজিট (Security Deposit):
- এটি একটি ফেরতযোগ্য (Refundable) আমানত। PNGRB-এর নিয়ম অনুযায়ী, CGD কোম্পানিগুলি গ্রাহকদের কাছ থেকে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা নিরাপত্তা আমানত হিসেবে নেয়।
- গার্হস্থ্য সংযোগের জন্য এই পরিমাণ সাধারণত ₹৫,০০০ থেকে ₹৭,০০০-এর মধ্যে হয়। এই টাকাটি সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার সময় ফেরতযোগ্য। অনেক কোম্পানি এই টাকা সহজ কিস্তিতে (EMI) পরিশোধ করার সুবিধাও দেয়, যা মাসিক বিলের সাথে যোগ হয়ে আসে।
- কল্যাণীর জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণ BGCL তাদের পোর্টালে ঘোষণা করবে।
- ইন্সটলেশন চার্জ (Installation Charges):
- কিছু কোম্পানি একটি নির্দিষ্ট দৈর্ঘ্য পর্যন্ত (যেমন, ১৫ মিটার) পাইপলাইন বসানোর জন্য কোনও আলাদা চার্জ নেয় না, এটি ডিপোজিটের অন্তর্ভুক্ত থাকে।
- তবে, অতিরিক্ত পাইপিং বা বিশেষ কোনও ফিটিংস-এর প্রয়োজন হলে তার জন্য আলাদা চার্জ লাগতে পারে।
মাসিক বিল কীভাবে কাজ করে?
PNG-এর বিলিং প্রক্রিয়াটি বিদ্যুতের বিলের মতোই অত্যন্ত স্বচ্ছ:
- মিটার রিডিং: আপনার রান্নাঘরের বাইরে বা বাড়ির সুবিধাজনক স্থানে একটি গ্যাস মিটার বসানো হবে। এই মিটারটি আপনার মোট গ্যাস ব্যবহারের পরিমাণ রেকর্ড করবে।
- বিলিং ইউনিট: PNG মাপা হয় SCM (Standard Cubic Meter) এককে।
- বিলিং সাইকেল: বেশিরভাগ ক্ষেত্রে, বিল হয় মাসিক বা দ্বিমাসিক (Monthly or Bi-Monthly) ভিত্তিতে। BGCL-এর কর্মীরা মিটার রিডিং নেবেন অথবা গ্রাহকরা সেলফ-মিটার রিডিং অ্যাপের মাধ্যমেও রিডিং জমা দিতে পারবেন।
- খরচের তুলনা: ধরা যাক, একটি ১৪.২ কেজির ভর্তুকিহীন LPG সিলিন্ডারের দাম ₹১০০০। এই সিলিন্ডারে প্রায় ২৭ SCM গ্যাসের সমান শক্তি থাকে। যদি প্রতি SCM গ্যাসের দাম ₹৫০ হয় (উদাহরণস্বরূপ), তবে সমপরিমাণ PNG-এর খরচ পড়বে প্রায় ₹১৩৫০। কিন্তু, সাধারণত PNG-এর দাম LPG-এর তুলনায় অনেক কম রাখা হয়। যদি প্রতি SCM-এর দাম ₹৩৫ হয়, তবে খরচ হবে মাত্র ₹৯৪৫, যা সিলিন্ডারের থেকে সস্তা। (দ্রষ্টব্য: এই দামগুলি উদাহরণ মাত্র, আসল দাম BGCL দ্বারা নির্ধারিত হবে)।
নিরাপত্তার খুঁটিনাটি: PNG কি সত্যিই নিরাপদ?
যেকোনও জ্বালানির ক্ষেত্রেই নিরাপত্তা একটি প্রধান উদ্বেগের বিষয়। PNG-কে বর্তমানে গার্হস্থ্য ব্যবহারের জন্য উপলব্ধ সবচেয়ে নিরাপদ জ্বালানিগুলির মধ্যে একটি বলে মনে করা হয়।
কেন PNG বেশি নিরাপদ?
- বাতাসের চেয়ে হালকা: আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, PNG মূলত মিথেন, যা বাতাসের চেয়ে হালকা। কোনও কারণে লিক হলে এটি সিলিং-এর দিকে উঠে যায় এবং জানলা বা ভেন্টিলেটর দিয়ে দ্রুত বেরিয়ে যায়। এটি LPG-এর মতো মেঝের কাছে জমে থাকে না, ফলে বিস্ফোরণের ঝুঁকি প্রায় থাকে না বললেই চলে।
- নিম্নচাপ (Low Pressure): PNG পাইপলাইনগুলি অত্যন্ত কম চাপে (প্রায় ২১ মিলিবার) গ্যাস সরবরাহ করে, যা আমাদের ফুঁ দেওয়ার চাপের চেয়েও কম। অন্যদিকে, LPG সিলিন্ডারের ভিতরে অত্যন্ত উচ্চ চাপে (প্রায় ৭-৮ বার) তরল অবস্থায় থাকে।
- কোনও মজুত নয় (No Storage): বাড়িতে কোনও সিলিন্ডার মজুত করার প্রয়োজন নেই, যা দুর্ঘটনাবশত আগুন লাগার ঝুঁকি কমিয়ে দেয়।
- অবিচ্ছিন্ন পর্যবেক্ষণ: সম্পূর্ণ পাইপলাইন নেটওয়ার্কটি BGCL-এর কন্ট্রোল রুম থেকে ২৪x৭ পর্যবেক্ষণ করা হয়। কোনও অসামঞ্জস্য দেখা দিলেই দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব।
গ্রাহকদের জন্য সুরক্ষা টিপস
- গন্ধ পেলে সতর্ক হোন: গ্যাসে মেশানো বিশেষ গন্ধটি (পচা ডিমের মতো) পেলে অবিলম্বে বাড়ির সমস্ত জানলা-দরজা খুলে দিন।
- ইলেকট্রিক সুইচ বন্ধ রাখুন: কোনও ইলেকট্রিক সুইচ, ফ্যান বা লাইট অন বা অফ করবেন না। মোবাইল ফোন ব্যবহার করবেন না।
- মেইন ভালভ বন্ধ করুন: মিটারের কাছে থাকা মেইন ভালভটি অবিলম্বে বন্ধ করে দিন।
- হেল্পলাইনে কল করুন: বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসে প্রতিবেশীর ফোন বা নিরাপদ দূরত্ব থেকে BGCL-এর ২৪x৭ ইমার্জেন্সি হেল্পলাইন নম্বরে কল করুন।
- পাইপলাইন ঢাকবেন না: গ্যাসের পাইপলাইন কোনও আসবাবপত্র বা ফলস সিলিং দিয়ে ঢাকবেন না।
ভারতের ‘সিটি গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন’ (CGD) নেটওয়ার্ক এবং কল্যাণীর ভূমিকা
কল্যাণীতে PNG-এর আগমন কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি ভারত সরকারের একটি সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার অংশ, যার লক্ষ্য দেশকে একটি “গ্যাস-ভিত্তিক অর্থনীতি” (Gas-Based Economy)-তে রূপান্তরিত করা।
কী এই CGD নেটওয়ার্ক?
সিটি গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন (CGD) হল এমন একটি পরিকাঠামো যার মাধ্যমে শহর এবং সংলগ্ন অঞ্চলে পাইপলাইনের মাধ্যমে প্রাকৃতিক গ্যাস পৌঁছে দেওয়া হয়। এই নেটওয়ার্ক তিনটি প্রধান ক্ষেত্রে পরিষেবা দেয়:
- গার্হস্থ্য PNG: বাড়ি এবং অ্যাপার্টমেন্টে রান্নার জন্য।
- বাণিজ্যিক PNG: হোটেল, রেস্তোরাঁ এবং ছোট শিল্পের জন্য।
- CNG (কম্প্রেসড ন্যাচারাল গ্যাস): যানবাহন (গাড়ি, অটো, বাস)-এর জন্য পরিবেশবান্ধব জ্বালানি হিসেবে।
পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাস নিয়ন্ত্রক বোর্ড (PNGRB) নিলাম প্রক্রিয়ার (Bidding Rounds) মাধ্যমে বিভিন্ন ভৌগোলিক এলাকায় (Geographical Areas – GAs) CGD নেটওয়ার্ক স্থাপনের জন্য বিভিন্ন সংস্থাকে লাইসেন্স দেয়।
পশ্চিমবঙ্গের প্রেক্ষাপট এবং ‘প্রধানমন্ত্রী উর্জা গঙ্গা’
পশ্চিমবঙ্গ, বিশেষত পূর্ব ভারত, ঐতিহ্যগতভাবে জাতীয় গ্যাস গ্রিড থেকে কিছুটা বিচ্ছিন্ন ছিল। এই ব্যবধান দূর করতে, ভারত সরকার “প্রধানমন্ত্রী উর্জা গঙ্গা” (Pradhan Mantri Urja Ganga) নামক একটি মেগা-প্রকল্প চালু করেছে। GAIL (India) Limited-এর নেতৃত্বে এই পাইপলাইনটি উত্তরপ্রদেশ থেকে শুরু করে বিহার, ঝাড়খণ্ড, পশ্চিমবঙ্গ এবং ওড়িশা পর্যন্ত বিস্তৃত।
এই “উর্জা গঙ্গা” পাইপলাইনই হল সেই প্রধান ধমনী যা পশ্চিমবঙ্গে প্রাকৃতিক গ্যাস নিয়ে আসছে। বেঙ্গল গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড (BGCL) এই প্রধান লাইন থেকেই গ্যাস সংগ্রহ করে কল্যাণী সহ নদীয়া, উত্তর ২৪ পরগণা এবং কলকাতার বিভিন্ন অংশে বিতরণ করছে।
গুরুত্বপূর্ণ পরিসংখ্যান:
- লক্ষ্য: ভারত সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের মোট শক্তি ব্যবহারে প্রাকৃতিক গ্যাসের অংশ বর্তমান প্রায় ৬.৭% থেকে বাড়িয়ে ১৫% করার লক্ষ্যমাত্রা নিয়েছে।
- CGD কভারেজ: PNGRB-এর ১১তম এবং ১২তম নিলাম প্রক্রিয়ার পর, ভারতের প্রায় ৯৮% জনসংখ্যা এবং ৮৮% ভৌগোলিক এলাকা CGD নেটওয়ার্কের আওতায় চলে এসেছে।
কল্যাণীতে এই পরিষেবা শুরু হওয়া প্রমাণ করে যে, পূর্ব ভারতেও এই পরিচ্ছন্ন জ্বালানির বিপ্লব দ্রুত গতিতে ছড়িয়ে পড়ছে।
PNG ব্যবহারের সুবিধা ও অসুবিধা: একটি নিরপেক্ষ বিশ্লেষণ
যেকোনও প্রযুক্তিরই ভালো এবং মন্দ দুটি দিক থাকে। যদিও PNG-এর সুবিধাগুলি অনেক বেশি, তবুও একটি স্বচ্ছ ধারণা পেতে দুটি দিকই জানা প্রয়োজন।
প্রধান সুবিধাগুলি (Advantages)
- অবিচ্ছিন্ন সরবরাহ (Uninterrupted Supply): ২৪x৭, ৩৬৫ দিন গ্যাস পাওয়ার নিশ্চয়তা। গ্যাস শেষ হয়ে যাওয়ার কোনও ভয় নেই।
- সাশ্রয়ী (Cost-Effective): ভর্তুকিহীন LPG-এর তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে সস্তা। শুধুমাত্র ব্যবহৃত গ্যাসের জন্যই বিল দিতে হয়, পুরো সিলিন্ডারের দাম একবারে দিতে হয় না।
- অত্যন্ত নিরাপদ (Highly Safe): বাতাসের চেয়ে হালকা এবং কম চাপে সরবরাহ হওয়ার কারণে এটি গার্হস্থ্য ব্যবহারের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ জ্বালানি।
- স্থান সাশ্রয় (Space Saving): রান্নাঘরে সিলিন্ডার রাখার জন্য আলাদা জায়গার প্রয়োজন হয় না, ফলে রান্নাঘর অনেক খোলামেলা থাকে।
- পরিবেশ বান্ধব (Eco-Friendly): এটি একটি সবুজ জ্বালানি। এর ব্যবহারে কার্বন ফুটপ্রিন্ট কমে, যা জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সহায়তা করে।
- স্বচ্ছ বিলিং (Transparent Billing): মিটারের মাধ্যমে সঠিক ব্যবহারের পরিমাপ এবং পোস্ট-পেইড বিলিং সিস্টেম।
সম্ভাব্য অসুবিধা বা চ্যালেঞ্জ (Disadvantages / Challenges)
- প্রাথমিক খরচ (Initial Cost): সিকিউরিটি ডিপোজিট এবং ইন্সটলেশন চার্জ বাবদ এককালীন খরচ কিছু পরিবারের কাছে বেশি মনে হতে পারে, যদিও এর জন্য কিস্তির সুবিধা থাকে।
- পরিকাঠামোগত কাজ (Infrastructure Work): পাইপলাইন বসানোর জন্য রাস্তায় খোঁড়াখুঁড়ি এবং বাড়ির ভিতরে সামান্য ড্রিলিং-এর প্রয়োজন হয়, যা সাময়িক অসুবিধার সৃষ্টি করতে পারে।
- নির্ভরশীলতা: যদিও সরবরাহ খুব কমই বন্ধ হয়, তবুও যদি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বা কোনও দুর্ঘটনায় প্রধান লাইনে সমস্যা হয়, তবে সরবরাহ সাময়িকভাবে বন্ধ হতে পারে (যদিও এমন ঘটনা বিরল)।
- সীমিত প্রাপ্যতা: বর্তমানে এই পরিষেবা শুধুমাত্র শহরাঞ্চলেই সীমাবদ্ধ এবং পর্যায়ক্রমে তা বাড়ানো হচ্ছে।
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)
প্রশ্ন ১: আমি যদি ভাড়া বাড়িতে থাকি, আমি কি PNG সংযোগ নিতে পারি?
উত্তর: হ্যাঁ, আপনি ভাড়া বাড়িতেও সংযোগ নিতে পারেন। তবে এর জন্য আপনাকে বাড়ির মালিকের কাছ থেকে একটি লিখিত অনাপত্তি শংসাপত্র (NOC) এবং আপনার ভাড়ার চুক্তিপত্রের কপি জমা দিতে হবে।
প্রশ্ন ২: আমার বাড়িতে পাইপলাইন বসাতে কত সময় লাগবে?
উত্তর: সাইট সার্ভে এবং অনুমোদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর, বাড়ির ভিতরে পাইপলাইন বসাতে এবং মিটার ইনস্টল করতে সাধারণত কয়েক ঘণ্টা (২ থেকে ৪ ঘণ্টা) সময় লাগে।
প্রশ্ন ৩: পিএনজি কি শুধু রান্নার জন্যই ব্যবহার করা যায়?
উত্তর: না। PNG রান্নার পাশাপাশি গিজার (জল গরম করার জন্য) এবং এয়ার কন্ডিশনার (Gas-based AC) চালাতেও ব্যবহার করা যেতে পারে, যদিও গার্স্থ্য সংযোগ মূলত রান্নার জন্যই ব্যবহৃত হয়।
প্রশ্ন ৪: গ্যাস লিক হলে আমার কী করা উচিত?
উত্তর: গন্ধ পেলে সঙ্গে সঙ্গে মেইন ভালভ বন্ধ করুন, বাড়ির জানলা-দরজা খুলে দিন, কোনও ইলেকট্রিক সুইচ অন/অফ করবেন না এবং অবিলম্বে বাড়ি থেকে বেরিয়ে BGCL-এর ইমার্জেন্সি নম্বরে ফোন করুন।
প্রশ্ন ৫: মাসিক বিল না দিলে কী হবে?
উত্তর: বিদ্যুতের বিলের মতোই, নির্দিষ্ট তারিখের মধ্যে বিল না দিলে প্রথমে লেট ফি ধার্য করা হতে পারে এবং বারবার সতর্ক করার পরেও বিল বকেয়া থাকলে সংস্থা আপনার সংযোগ সাময়িকভাবে বা স্থায়ীভাবে বিচ্ছিন্ন করার অধিকার রাখে।
কল্যাণীতে পাইপলাইন মারফত প্রাকৃতিক গ্যাসের (PNG) আগমন শুধুমাত্র একটি নাগরিক পরিষেবার উন্নতি নয়, এটি একটি বড়সড় জীবনযাত্রার পরিবর্তন। Bengal Gas Company Limited (BGCL) এবং সরকারের এই উদ্যোগ শহরবাসীকে একটি সস্তা, নিরাপদ এবং পরিবেশবান্ধব জ্বালানির বিকল্প প্রদান করছে। সিলিন্ডার বুকিং-এর দিন শেষ হতে চলেছে। যদিও প্রাথমিক পর্যায়ে কিছু খরচ এবং পরিকাঠামোগত কাজের সামান্য অসুবিধা হতে পারে, তবে এর দীর্ঘমেয়াদী সুবিধাগুলি অপরিসীম। কল্যাণীর এই পদক্ষেপ পশ্চিমবঙ্গকে একটি পরিচ্ছন্ন শক্তি ব্যবহারের মডেল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। যে সমস্ত নাগরিকের এলাকায় এই পরিষেবা চালু হচ্ছে, তাদের উচিত এই সুযোগ গ্রহণ করে একটি আধুনিক এবং ঝঞ্ঝাটমুক্ত জীবনযাত্রার শরিক হওয়া।











