আজ, ২৮ মার্চ ২০২৫, শিলিগুড়িতে ডেমোক্রেটিক ইয়ুথ ফেডারেশন অফ ইন্ডিয়া (DYFI)-এর উত্তরকন্যা অভিযানকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। বেকারত্বের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে এই অভিযানের আয়োজন করা হয়েছিল। কিন্তু পুলিশের ব্যারিকেড এবং নিরস্ত্র কর্মীদের উপর লাঠিচার্জের ঘটনায় পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। DYFI-এর নেতা-কর্মীরা অভিযোগ করেছেন, পুলিশ অসভ্যের মতো আচরণ করে তাঁদের উপর হামলা চালিয়েছে। এই ঘটনায় বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন এবং অনেককে আটক করা হয়েছে বলে খবর।
ঘটনার বিবরণে জানা যায়, শুক্রবার সকালে DYFI-এর রাজ্য সভানেত্রী মীনাক্ষী মুখোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে শতাধিক কর্মী শিলিগুড়ি থেকে উত্তরকন্যার দিকে রওনা দেন। উত্তরকন্যা হল উত্তরবঙ্গের প্রশাসনিক কার্যালয়, যেখানে তাঁরা বেকারত্বের সমস্যা নিয়ে সরকারের কাছে দাবি জানাতে যাচ্ছিলেন। কিন্তু উত্তরকন্যার কাছাকাছি পৌঁছনোর আগেই পুলিশ ব্যারিকেড দিয়ে তাঁদের পথ আটকে দেয়। কর্মীরা ব্যারিকেড অতিক্রম করার চেষ্টা করলে পুলিশ লাঠিচার্জ শুরু করে। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, পুলিশের আক্রমণ এতটাই নৃশংস ছিল যে অনেক নিরস্ত্র কর্মী রাস্তায় পড়ে যান। এরপর পুলিশ বিক্ষোভকারীদের গাড়িতে তুলে থানায় নিয়ে যায়।
এই ঘটনার প্রেক্ষাপট বোঝার জন্য প্রাসঙ্গিক তথ্য জানা জরুরি। ২৮ মার্চকে ‘বেকার বিরোধী দিবস’ হিসেবে পালন করে DYFI। এই দিনে তাঁরা সরকারের কাছে যুবকদের জন্য চাকরির দাবি জানায়। গত কয়েক বছর ধরে পশ্চিমবঙ্গে বেকারত্বের হার বেড়ে চলেছে। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, রাজ্যে প্রায় ৪০ শতাংশ যুবক বেকার। এই পরিস্থিতিতে DYFI-এর মতো সংগঠনগুলো সরকারের নীতির বিরুদ্ধে সরব হয়েছে। শিলিগুড়ির এই অভিযানও ছিল সেই প্রতিবাদের একটি অংশ। কিন্তু পুলিশের এই হামলার ঘটনা প্রশ্ন তুলেছে—শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের অধিকার কি খর্ব হচ্ছে?
DYFI-এর নেতৃত্বের দাবি, এই হামলা সম্পূর্ণ পরিকল্পিত। মীনাক্ষী মুখোপাধ্যায় বলেন, “আমরা শান্তিপূর্ণভাবে আমাদের দাবি জানাতে এসেছিলাম। কিন্তু পুলিশ আমাদের উপর অতর্কিত হামলা চালিয়েছে। এটা গণতান্ত্রিক অধিকারের উপর আঘাত।” তিনি আরও অভিযোগ করেন, পুলিশ শুধু লাঠি দিয়েই নয়, গাড়ি আটকে রেখে তাঁদের হয়রানি করেছে। অন্যদিকে, পুলিশের তরফে বলা হয়েছে, বিক্ষোভকারীরা ব্যারিকেড ভাঙার চেষ্টা করছিল, তাই বাধ্য হয়ে তারা ব্যবস্থা নিয়েছে। তবে এই দাবির সত্যতা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন অনেকে।
পরিস্থিতি যখন উত্তপ্ত হয়ে ওঠে, তখন রাস্তায় জমে ওঠে স্থানীয় মানুষের ভিড়। অনেকে পুলিশের আচরণের প্রতিবাদ জানান। একজন রোগীর আত্মীয়, যিনি কাছের হাসপাতালে যাওয়ার পথে আটকে পড়েছিলেন, বলেন, “আমরা এখানে রোগী নিয়ে যাচ্ছিলাম। পুলিশের ব্যারিকেড আর লাঠিচার্জের জন্য আমাদের ভোগান্তি পোহাতে হল। এটা কোনও সভ্য আচরণ নয়।” এই ঘটনা শুধু DYFI-এর কর্মীদের মধ্যেই নয়, সাধারণ মানুষের মধ্যেও ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে।
ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে রাজনৈতিক মহলেও শুরু হয়েছে তর্ক-বিতর্ক। বিরোধী দলগুলো সরকারের সমালোচনা করে বলেছে, এই হামলা সরকারের ব্যর্থতা ঢাকার চেষ্টা। অন্যদিকে, শাসকদলের নেতারা দাবি করেছেন, DYFI আইন ভঙ্গ করার চেষ্টা করছিল, তাই পুলিশকে পদক্ষেপ নিতে হয়েছে। তবে সাধারণ মানুষের মধ্যে এই বিতর্কের চেয়ে বড় প্রশ্ন—কেন শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদকে এভাবে দমন করা হল?
এই ঘটনা শিলিগুড়ির রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। উত্তরবঙ্গে বেকারত্ব ও উন্নয়নের অভাব নিয়ে স্থানীয় মানুষের মধ্যে ক্ষোভ দিন দিন বাড়ছে। DYFI-এর মতো সংগঠনগুলো এই ক্ষোভকে সংগঠিত করার চেষ্টা করছে। কিন্তু পুলিশের এই পদক্ষেপ কি সেই আন্দোলনকে দমিয়ে দেবে, নাকি আরও জোরদার করবে—তা সময়ই বলবে। আপাতত, আহত কর্মীদের চিকিৎসা চলছে, আর আটকদের মুক্তির দাবিতে DYFI-এর প্রতিবাদ অব্যাহত রয়েছে।
সব মিলিয়ে, শিলিগুড়ির এই ঘটনা একদিকে যেমন সরকারের নীতির সমালোচনাকে সামনে এনেছে, তেমনই পুলিশি কার্যকলাপ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। সাধারণ মানুষের জন্য এটা শুধু একটা সংবাদ নয়, বরং তাঁদের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে জড়িত একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ভবিষ্যতে এই ঘটনার প্রভাব কী হবে, সেটাই এখন দেখার।