বাংলা সিনেমার কথা উঠলেই আমাদের মনে ভেসে ওঠে সত্যজিৎ রায়, ঋত্বিক ঘটক বা মৃণাল সেনের নাম। তাঁদের বলা হয় বাংলা চলচ্চিত্রের ‘ত্রয়ী’। কিন্তু এই স্বর্ণযুগের আকাশে এমন আরও অনেক নক্ষত্র ছিলেন, যাঁদের আলো হয়তো এই তিন মহারথীর প্রখর দীপ্তিতে কিছুটা আড়ালে পড়ে গেছে। এমনই একজন বিস্মৃতপ্রায় অথচ প্রতিভাবান শিল্পী ও নির্মাতার নাম রাজেন তরফদার।
বেশিরভাগ মানুষ তাঁকে হয়তো শুধু ‘গঙ্গা’ (১৯৫৯) বা ‘পালঙ্ক’ (১৯৭৫) -এর পরিচালক হিসেবে চেনেন। কিন্তু তাঁর আসল পরিচয় কী? তিনি কি শুধুই একজন পরিচালক ছিলেন? না। রাজেন তরফদারের যাত্রা শুরু হয়েছিল তুলি আর ক্যানভাস দিয়ে। তিনি ছিলেন একজন জাত শিল্পী, একজন গ্রাফিক ডিজাইনার, এবং একজন প্রথম শ্রেণীর আর্ট ডিরেক্টর। তাঁর এই শিল্পীসত্তাই তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করে দিয়েছে।
বিজ্ঞাপনের পোস্টার ডিজাইন থেকে শুরু করে সিনেমার সেট তৈরি, এবং অবশেষে নিজেই ক্যামেরার পেছনে দাঁড়িয়ে কালজয়ী সিনেমা নির্মাণ—রাজেন তরফদারের জীবন সত্যিই ‘পোস্টার থেকে পর্দা’ হয়ে ওঠার এক অসামান্য গল্প। এই লেখায় আমরা সেই উপেক্ষিত প্রতিভার জীবনের প্রতিটি স্তর খতিয়ে দেখব। আমরা জানার চেষ্টা করব, কীভাবে একজন চিত্রশিল্পী সময়ের প্রয়োজনে কমার্শিয়াল আর্টিস্ট হলেন এবং শেষ পর্যন্ত বাংলা সিনেমার ইতিহাসে নিজের নাম সগর্বে লিখে গেলেন।
আসুন, আজ আমরা সেই রাজেন তরফদারকে নতুন করে আবিষ্কার করি, যাঁর শৈল্পিক দৃষ্টি বাংলা সিনেমাকে এক নতুন মাত্রা দিয়েছিল।
প্রাথমিক জীবন ও শিল্প শিক্ষা: যেখানে ক্যানভাস কথা বলে
যেকোনো শিল্পীর কাজ বুঝতে গেলে তাঁর বেড়ে ওঠা এবং শিক্ষাকে জানা খুব জরুরি। রাজেন তরফদারের ক্ষেত্রেও এর কোনো ব্যতিক্রম নেই। তাঁর পরবর্তী জীবনের সমস্ত কাজের মধ্যে তাঁর এই প্রাথমিক শিক্ষার ছাপ স্পষ্ট।
জন্ম ও শৈশব
রাজেন তরফদারের জন্ম হয়েছিল ১৯১৭ সালে, অবিভক্ত বাংলার রাজশাহীতে (বর্তমানে বাংলাদেশ)। সেই সময় রাজশাহী ছিল শিক্ষা ও সংস্কৃতির অন্যতম পীঠস্থান। ছোটবেলা থেকেই তাঁর ছবি আঁকার প্রতি এক অদ্ভুত ঝোঁক ছিল। প্রথাগত পড়াশোনার পাশাপাশি তিনি সময় কাটাতেন প্রকৃতির ছবি এঁকে, চারপাশের মানুষগুলোকে স্কেচ করে। তাঁর পরিবারের মানুষেরা তাঁর এই প্রতিভাকে শুরু থেকেই গুরুত্ব দিয়েছিলেন। তাঁরা বুঝতে পেরেছিলেন, এই ছেলেটি আর পাঁচটা সাধারণ ছেলের মতো নয়।
কলকাতায় আগমন ও আর্ট কলেজে ভর্তি
নিজের শিল্পশিক্ষাকে আরও এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য রাজেন তরফদার কৈশোর পার করেই চলে আসেন স্বপ্নের শহর কলকাতায়। সে সময় কলকাতা ছিল সমগ্র ভারতের শিল্প ও সংস্কৃতির রাজধানী। তাঁর একমাত্র লক্ষ্য ছিল—গভর্নমেন্ট স্কুল অফ আর্ট (বর্তমান গভর্নমেন্ট কলেজ অফ আর্ট অ্যান্ড ক্র্যাফট)-এ ভর্তি হওয়া।
তিনি সফলভাবে ভর্তিও হলেন। এই আর্ট কলেজই তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। এখানে এসে তিনি শুধুমাত্র আঁকার কৌশল শিখলেন না, তিনি পেলেন এক নতুন দৃষ্টিভঙ্গি। তিনি শিখলেন আলো-ছায়ার ব্যবহার, কম্পোজিশন এবং রঙের মাধ্যমে আবেগ প্রকাশ করার ভাষা। এই শিক্ষা তাঁর পরবর্তী জীবনে, বিশেষ করে তাঁর সিনেমাটোগ্রাফিতে গভীরভাবে প্রভাব ফেলেছিল। তিনি যখন সিনেমার ফ্রেম সাজাতেন, তখন মনে হতো তিনি যেন ক্যানভাসে ছবি আঁকছেন।
আপনার ছবিকে দিন K-Drama লুক: Gemini AI-এর ১০টি জাদুকরী প্রম্পট যা আপনাকে স্টার বানিয়ে দেবে!
সংগ্রামের দিনগুলো
আর্ট কলেজ থেকে পাশ করার পর সব কিছু খুব সহজ ছিল না। সেই সময় (১৯৪০-এর দশক) একজন ফ্রিল্যান্স চিত্রশিল্পী হিসেবে বেঁচে থাকা খুব কঠিন ছিল। দেশভাগের আঁচ, অর্থনৈতিক মন্দা, এবং চাকরির বাজারের মন্দা—সব মিলিয়ে এক অস্থির সময়। রাজেন তরফদারকেও এই কঠিন বাস্তবের মুখোমুখি হতে হয়েছিল। পেট চালানোর তাগিদে তাঁকে তাঁর ‘শুদ্ধ শিল্প’ (Fine Arts)-এর স্বপ্নকে কিছুটা সরিয়ে রাখতে হয়েছিল। তিনি যোগ দিলেন কমার্শিয়াল আর্টের জগতে। আর এই ঘটনাই তাঁকে নাড়িয়ে দিয়েছিল, যা পরবর্তীকালে তাঁকে সিনেমার পোস্টার ডিজাইনের দিকে ঠেলে দেয়।
| রাজেন তরফদারের প্রাথমিক জীবন (এক নজরে) | |
| পূর্ণ নাম | রাজেন তরফদার |
| জন্ম | ১৯১৭ |
| জন্মস্থান | রাজশাহী, অবিভক্ত বাংলা (বর্তমানে বাংলাদেশ) |
| শিক্ষা প্রতিষ্ঠান | গভর্নমেন্ট স্কুল অফ আর্ট, কলকাতা |
| মূল আগ্রহ | চিত্রশিল্প, স্কেচিং, প্রকৃতি |
| প্রভাব | বাংলার লোকশিল্প এবং ইউরোপীয় অ্যাকাডেমিক আর্ট |
কর্মজীবনের শুরু: বিজ্ঞাপনী জগত ও পোস্টার ডিজাইন
শিল্পীর জীবন আর জীবনের তাগিদ—এই দুইয়ের মধ্যে সামঞ্জস্য রেখে রাজেন তরফদার কমার্শিয়াল আর্টের জগতে পা রাখলেন। এটাই ছিল তাঁর “পোস্টার” জীবনের সূচনা।
গ্রাফিক ডিজাইনার হিসেবে পথচলা
১৯৪০ ও ৫০-এর দশকে কলকাতায় বেশ কিছু ব্রিটিশ এবং ভারতীয় বিজ্ঞাপনী সংস্থা (Ad Agency) মাথাচাড়া দিয়ে উঠছিল। রাজেন তরফদার তাঁর অসামান্য ড্রয়িং এবং ডিজাইন সেন্স-এর জোরে খুব তাড়াতাড়ি এই জগতে নিজের জায়গা করে নেন। তিনি বিভিন্ন প্রথম সারির বিজ্ঞাপনী সংস্থায় গ্রাফিক ডিজাইনার বা ভিজ্যুয়ালাইজার হিসেবে কাজ শুরু করেন। তাঁর কাজ ছিল বিভিন্ন পণ্যের জন্য বিজ্ঞাপন তৈরি করা, লোগো ডিজাইন করা এবং খবরের কাগজের জন্য ইলাস্ট্রেশন তৈরি করা।
এই কাজটি করতে গিয়ে তিনি শিখলেন, কীভাবে একটি মাত্র ছবির মাধ্যমে বা খুব কম কথায় একটি সম্পূর্ণ বার্তা মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া যায়। এই দক্ষতা তাঁর চলচ্চিত্র পরিচালক জীবনে প্রভূত সাহায্য করেছিল।
সিনেমার পোস্টার ডিজাইনে বিপ্লব
সেই সময় বাংলা সিনেমার পোস্টারগুলো ছিল বেশ গতানুগতিক। সাধারণত সিনেমার হিরো-হিরোইন বা ভিলেনের বড় বড় মুখ আঁকা থাকত। কিন্তু রাজেন তরফদার এই ধারায় এক নতুনত্ব আনলেন।
তিনি যেহেতু সিনেমার গল্পের ভেতরের আবেগটা বুঝতেন, তাই তিনি পোস্টারে সেই আবেগটাকেই ধরতে চাইতেন। তিনি সিনেমার ‘মূল ভাবনা’ বা ‘থিম’-কে পোস্টারের মাধ্যমে প্রকাশ করার চেষ্টা শুরু করলেন। তাঁর ডিজাইনে রঙের ব্যবহার, টাইপোগ্রাফি (অক্ষরের শৈলী) এবং কম্পোজিশন ছিল সম্পূর্ণ আলাদা। তিনি পোস্টার ডিজাইনকে ‘কমার্শিয়াল’ স্তর থেকে ‘আর্ট’-এর স্তরে উন্নীত করেছিলেন।
দুর্ভাগ্যবশত, সেই সময়ের অনেক পোস্টারই আজ আর সংরক্ষিত নেই। কিন্তু যাঁরা সেই সময়ের সিনেমা দেখেছেন, তাঁরা স্বীকার করেন যে রাজেন তরফদারের ডিজাইন করা পোস্টারগুলো সিনেমা দেখার আগ্রহকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিত। তিনি সত্যজিৎ রায়ের ‘পথের পাঁচালী’-র পোস্টার ডিজাইন ও প্রচারণার কাজেও যুক্ত ছিলেন বলে জানা যায়, যা বাংলা পোস্টার আর্টের ইতিহাসে একটি মাইলফলক।
| পোস্টার শিল্পী হিসেবে রাজেন তরফদার | |
| মূল ভূমিকা | গ্রাফিক ডিজাইনার, ভিজ্যুয়ালাইজার, পোস্টার আর্টিস্ট |
| কাজের ধরণ | বিজ্ঞাপনের ইলাস্ট্রেশন, পণ্যের প্রচার, সিনেমার পোস্টার ডিজাইন |
| তাঁর বিশেষত্ব | গতানুগতিক পোস্টারের বদলে থিম-ভিত্তিক (Theme-based) ডিজাইন |
| প্রভাব | বাংলা সিনেমার পোস্টার ডিজাইনে শৈল্পিক এবং আধুনিক ধারার প্রবর্তন |
চলচ্চিত্র জগতে প্রবেশ: তুলি থেকে ক্যামেরা
পোস্টার ডিজাইন করতে করতেই রাজেন তরফদার চলচ্চিত্র জগতের অন্দরে প্রবেশ করেন। তিনি শুধু বাইরে থেকে পোস্টার এঁকেই সন্তুষ্ট ছিলেন না। তাঁর শিল্পীমন চাইছিল এই চলমান শিল্পের আরও গভীরে যেতে।
জিবলি আর্টের জাদু: নেটদুনিয়া ছেয়ে যাওয়ার পিছনে যে কারণ
আর্ট ডিরেক্টর (কলা নির্দেশক) হিসেবে আত্মপ্রকাশ
পরিচালক হওয়ার আগে, রাজেন তরফদারের চলচ্চিত্র জীবনের শুরু হয় একজন আর্ট ডিরেক্টর বা কলা নির্দেশক হিসেবে। এটি এমন একটি পেশা যেখানে তাঁর চিত্রশিল্পীর শিক্ষা সরাসরি কাজে লেগেছিল।
আর্ট ডিরেক্টরের কাজ কী?
সহজ কথায়, সিনেমার সেট (Set) কেমন হবে, ঘরের দেয়ালের রঙ কী হবে, আসবাবপত্র কেমন থাকবে, এমনকি ছোট ছোট প্রপস (Props) যেমন—দেয়ালের একটি ক্যালেন্ডার বা টেবিলের ওপর রাখা একটি বই—এই সব কিছু ঠিক করেন আর্ট ডিরেক্টর। তাঁর কাজ হলো পরিচালকের ভাবনা অনুযায়ী সিনেমার জগতটাকে ‘তৈরি’ করা।
রাজেন তরফদার এই কাজে অসামান্য দক্ষতা দেখান। তিনি শুধু সুন্দর সেট বানাতেন না, তিনি এমন সেট বানাতেন যা গল্পের চরিত্রদের সামাজিক বা মানসিক অবস্থা ফুটিয়ে তোলে। উদাহরণস্বরূপ, একজন ধনী ব্যক্তির ঘরের সেট আর একজন গরীব কৃষকের ঘরের সেট—দুটোর মধ্যে শুধু আসবাবের তফাৎ নয়, বরং দেয়ালের রঙ, আলো-আঁধারির ব্যবহার দিয়েও তিনি সেই তফাৎ তৈরি করতে পারতেন।
পরিচালনার পথে প্রথম পদক্ষেপ
বিভিন্ন পরিচালকের সাথে আর্ট ডিরেক্টর হিসেবে কাজ করতে গিয়ে তিনি সিনেমার ব্যাকরণগুলো (Film Grammar) খুব কাছ থেকে শেখেন। তিনি ক্যামেরা চালানো, লাইটিং এবং এডিটিং-এর খুঁটিনাটি বিষয়গুলো আত্মস্থ করতে শুরু করেন।
তাঁর শিল্পী মন আর সন্তুষ্ট থাকতে পারছিল না। তিনি এতদিন অন্যের ভাবনার জগত তৈরি করেছেন। এবার তিনি নিজের ভাবনার জগত তৈরি করতে চাইলেন। তিনি ঠিক করলেন, তিনি নিজেই সিনেমা বানাবেন। আর্ট ডিরেক্টরের ভূমিকা থেকে পরিচালকের আসনে বসার এই সিদ্ধান্তটিই ছিল তাঁর জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মোড়। তাঁর হাতে এখন শুধু তুলি বা পেন্সিল নয়, তাঁর হাতে ছিল আস্ত একটা ক্যামেরা।
পরিচালক রাজেন তরফদার: বাংলা সিনেমায় নতুন বাস্তবতা
১৯৫৭ সাল। রাজেন তরফদার তাঁর প্রথম সিনেমা ‘অন্তরীক্ষ’ তৈরি করলেন। এই সিনেমাটি খুব একটা ব্যবসাসফল না হলেও, সমালোচকদের নজরে পড়েছিল। তাঁরা বুঝতে পারছিলেন, বাংলা সিনেমায় এক নতুন ভাবনার পরিচালকের আগমন ঘটেছে। তবে রাজেন তরফদারের আসল চমক অপেক্ষা করছিল আরও দু’বছর।
‘গঙ্গা’ (১৯৫৯): একটি কালজয়ী মাস্টারপিস
১৯৫৯ সালে মুক্তি পেল ‘গঙ্গা’। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের কালজয়ী উপন্যাস অবলম্বনে তৈরি এই সিনেমাটি শুধু বাংলা নয়, বিশ্ব চলচ্চিত্রের ইতিহাসেই একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন।
গল্পের বিষয়বস্তু
‘গঙ্গা’ হলো পদ্মা নদীর জেলেদের জীবনের রূঢ় বাস্তবতার এক অসামান্য দলিল। এই সিনেমায় নদীই প্রধান চরিত্র। জেলেরা এই নদীকে ‘মা গঙ্গা’ বলে ডাকে। এই নদীই তাদের জীবন দেয়, আবার এই নদীই কখনো কখনো সর্বস্ব কেড়ে নেয়। এই সিনেমার প্রধান চরিত্র ‘পাঁচু’ এবং ‘বিলাস’-এর মাধ্যমে রাজেন তরফদার দেখিয়েছেন প্রকৃতির সাথে মানুষের আদিম সংগ্রাম এবং জীবনের প্রতি অদম্য ভালোবাসার কাহিনী।
কেন ‘গঙ্গা’ একটি বিশেষ সিনেমা?
১. বাস্তবতার নিখুঁত চিত্রণ: রাজেন তরফদার স্টুডিওর ভেতরে কৃত্রিম সেট বানিয়ে এই সিনেমা বানাননি। তিনি সোজা ক্যামেরাসহ তাঁর পুরো ইউনিট নিয়ে চলে গিয়েছিলেন আসল নদীর পারে, জেলেদের গ্রামে। তিনি দিনের পর দিন তাঁদের সাথে থেকে, তাঁদের জীবনযাত্রা পর্যবেক্ষণ করে এই সিনেমা বানান।
২. অপেশাদার অভিনেতাদের ব্যবহার: এই সিনেমার বেশিরভাগ চরিত্রেই অভিনয় করেছেন আসল জেলেরা। তাঁদের হাঁটাচলা, কথাবার্তা, জাল ফেলার ধরণ—সবকিছুই ছিল নিখুঁত এবং বাস্তব। পেশাদার অভিনেতা (যেমন রুমা গুহঠাকুরতা, জ্ঞানেশ মুখার্জী) এবং অপেশাদার জেলেদের তিনি এমনভাবে মিশিয়ে দিয়েছিলেন যে পর্দায় তাঁদের আলাদা করে চেনার উপায় ছিল না। এই ধারাটি ‘ইতালীয় নিও-রিয়ালিজম’ (Italian Neorealism) দ্বারা প্রভাবিত ছিল, যা সত্যজিৎ রায়ের ‘পথের পাঁচালী’-তেও দেখা যায়।
৩. শিল্পী রাজেনের চোখ: আর্ট ডিরেক্টর হিসেবে তাঁর অভিজ্ঞতা এখানে চূড়ান্তভাবে কাজে লেগেছে। ‘গঙ্গা’ সিনেমার প্রতিটি ফ্রেম যেন এক একটি অসামান্য পেইন্টিং। নদীর জলের ওপর আলোর ঝিকিমিকি, জেলেদের ছেঁড়া জাল, ঘামে ভেজা শরীর, কাদার মধ্যে দিয়ে হাঁটা—এই সবকিছুর ‘টেক্সচার’ বা ‘বুনোট’ তিনি পর্দায় জীবন্ত করে তুলেছিলেন। তাঁর এই শৈল্পিক দৃষ্টি ‘গঙ্গা’-কে শুধু একটি সিনেমা নয়, একটি ‘চলমান শিল্পকর্ম’ (Moving Art)-এ পরিণত করেছে।
স্বীকৃতি
‘গঙ্গা’ মুক্তি পাওয়ার সাথে সাথেই চারদিকে সাড়া ফেলে দেয়। এটি শ্রেষ্ঠ বাংলা চলচ্চিত্র হিসেবে ‘রাষ্ট্রপতি পদক’ (জাতীয় পুরস্কারে মেধার শংসাপত্র) লাভ করে। শুধু তাই নয়, ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবসহ বিশ্বের নানা প্রান্তে এই সিনেমা প্রদর্শিত ও প্রশংসিত হয়।
| গঙ্গা (১৯৫৯): এক নজরে | |
| পরিচালক | রাজেন তরফদার |
| উপন্যাস | তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় |
| মুখ্য অভিনয়ে | জ্ঞানেশ মুখার্জী, রুমা গুহঠাকুরতা, নিরঞ্জন রায় |
| সঙ্গীত | সলিল চৌধুরী |
| মূল বিষয় | জেলেদের জীবন সংগ্রাম, প্রকৃতির সাথে মানুষের সম্পর্ক |
| পুরস্কার | জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার (মেধার শংসাপত্র), ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শন |
অন্যান্য উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্র
‘গঙ্গা’-র সাফল্যের পর রাজেন তরফদার আরও বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিনেমা নির্মাণ করেন। যদিও নানা কারণে তিনি খুব বেশি সিনেমা বানাতে পারেননি।
- ‘অগ্নিশিখা’ (১৯৬২): এটি একটি সামাজিক সিনেমা।
- ‘জীবন কাহিনী’ (১৯৬৪): এখানেও তিনি সাধারণ মানুষের জীবনের গল্প বলার চেষ্টা করেন।
কিন্তু ‘গঙ্গা’-র পর তাঁর যে সিনেমাটি আবার সমালোচকদের গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল, সেটি হলো ‘পালঙ্ক’ (১৯৭৫)।
‘পালঙ্ক’ (১৯৭৫): এক গভীর প্রতীকী সিনেমা
‘গঙ্গা’-র সাথে ‘পালঙ্ক’-এর বিষয়বস্তু বা শৈলীর কোনো মিল নেই। এটি তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়েরই আরেকটি গল্প অবলম্বনে তৈরি।
এই সিনেমার কেন্দ্রবিন্দুতে আছে একটি খাট বা ‘পালঙ্ক’। দেশভাগের (Partition) পর এক হিন্দু পরিবার পূর্ববঙ্গ থেকে চলে আসার সময় তাদের একটি সুন্দর পালঙ্ক এক মুসলিম পরিবারের কাছে আমানত হিসেবে রেখে আসে। অনেক বছর পর সেই হিন্দু পরিবারের এক সদস্য (অভিনয়ে উৎপল দত্ত) ফিরে আসেন সেই পালঙ্কটি উদ্ধার করতে।
এই একটি পালঙ্ককে ঘিরে দুই পরিবারের মধ্যে যে জটিল সম্পর্ক, মালিকানার দ্বন্দ্ব এবং মানসিক টানাপোড়েন তৈরি হয়—তা-ই এই সিনেমার মূল উপজীব্য। রাজেন তরফদার এই ‘পালঙ্ক’-কে দেশভাগ, হারানো ঐতিহ্য এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক অসামান্য ‘প্রতীক’ বা ‘মেটাফর’ হিসেবে ব্যবহার করেছেন। এটি একটি অত্যন্ত পরিণত এবং গভীর ভাবনার সিনেমা। এই সিনেমায়ও তাঁর আর্ট ডিরেক্টরের চোখ (পালঙ্কটির ডিজাইন, পুরোনো বাড়ির সেট) বিশেষভাবে নজরে পড়ে।
পর্দা কাঁপানো বিতর্ক! অন্তরঙ্গ দৃশ্যের জন্য সমালোচিত সেই ১০টি সাউথ ইন্ডিয়ান সিনেমা
রাজেন তরফদারের চলচ্চিত্র নির্মাণ শৈলী
রাজেন তরফদারের সিনেমাগুলো বিশ্লেষণ করলে তাঁর নির্মাণ শৈলীর কয়েকটি বিশেষ দিক ফুটে ওঠে, যা তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করে।
১. চিত্রশিল্পীর চোখ (The Painter’s Eye):
তিনি সব সময় বলতেন, “আমি আগে চিত্রকর, তারপর পরিচালক।” তাঁর প্রতিটি ফ্রেম ছিল সুচিন্তিত। তিনি জানতেন একটি ফ্রেমে ঠিক কতটা আলো বা কতটা অন্ধকার রাখলে সঠিক আবেগটি ফুটে উঠবে। তাঁর কম্পোজিশন ছিল নিখুঁত।
২. বাস্তববাদ এবং লোকজীবন (Realism and Folk Life):
তিনি স্টুডিওর কৃত্রিমতা পছন্দ করতেন না। তিনি বিশ্বাস করতেন, আসল গল্প লুকিয়ে আছে মাটির কাছাকাছি থাকা সাধারণ মানুষের জীবনে। তাই তিনি ক্যামেরা নিয়ে ছুটে গেছেন জেলেদের কাছে (‘গঙ্গা’), বা দেশভাগের যন্ত্রণায় দগ্ধ গ্রামের মানুষের কাছে (‘পালঙ্ক’)।
৩. টেক্সচার ও ডিটেলিং-এর ব্যবহার:
একজন আর্ট ডিরেক্টর হিসেবে তিনি জানতেন যে ছোট ছোট ডিটেলস একটা সিনকে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলে। ছেঁড়া কাঁথা, মাটির পাত্র, পুরোনো দেয়ালের শ্যাওলা—এই সবকিছুকে তিনি গুরুত্ব দিতেন। তিনি সিনেমার মাধ্যমে দর্শকের শুধু চোখ নয়, স্পর্শের অনুভূতিকেও জাগিয়ে তুলতে চাইতেন।
৪. অপেশাদার অভিনেতাদের ওপর বিশ্বাস:
তিনি বিশ্বাস করতেন, যে চরিত্রটি যে জীবনে বাস করে, তার থেকে ভালো অভিনয় আর কেউ করতে পারে না। তাই তিনি ‘গঙ্গা’-তে আসল জেলেদের ব্যবহার করার মতো সাহসী পদক্ষেপ নিতে পেরেছিলেন।
| রাজেন তরফদারের নির্মাণ শৈলী (Style Analysis) | |
| উপাদান | তাঁর পদ্ধতি |
| দৃশ্যসজ্জা (Visuals) | প্রতিটা ফ্রেমকে পেইন্টিং-এর মতো কম্পোজ করা |
| অভিনয় (Acting) | পেশাদার ও অপেশাদার অভিনেতাদের মিশ্রণ |
| লোকেশন (Location) | স্টুডিওর বদলে আসল লোকেশনে শুটিং |
| বিষয়বস্তু (Theme) | মাটির কাছাকাছি থাকা মানুষের গল্প, প্রতীকী ব্যবহার |
উত্তরাধিকার ও শেষ জীবন
এত অসামান্য কাজ করার পরেও রাজেন তরফদার বাংলা সিনেমার মূল স্রোতে সেভাবে আলোচিত হননি। এর পেছনে অনেক কারণ থাকতে পারে।
চলচ্চিত্র থেকে দূরে সরে যাওয়া
‘পালঙ্ক’-এর পর তিনি আর খুব বেশি সিনেমা তৈরি করেননি। সত্তরের দশকের পর বাংলা সিনেমার ধরণও অনেক বদলে যাচ্ছিল। রাজেন তরফদারের মতো গভীর, বাস্তববাদী এবং শৈল্পিক সিনেমার প্রযোজক পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছিল। বাণিজ্যিক সিনেমার যে ফর্মুলা, তার সাথে তিনি কখনো আপোস করতে চাননি।
ফিরে গেলেন তুলি-ক্যানভাসে
জীবনের শেষ দিকে তিনি চলচ্চিত্র জগত থেকে প্রায় স্বেচ্ছায় নির্বাসনে চলে যান। যেখান থেকে তাঁর যাত্রা শুরু হয়েছিল, সেই চিত্রশিল্পের জগতেই তিনি ফিরে যান। তিনি আবার ছবি আঁকা, ভাস্কর্য (Sculpture) গড়া শুরু করেন। ১৯৯৮ সালে তিনি মারা যান।
তাঁর উত্তরাধিকার
রাজেন তরফদার হয়তো সত্যজিৎ-ঋত্বিকের মতো বহু সিনেমার স্রষ্টা নন, কিন্তু তিনি ‘গঙ্গা’-র মতো একটি সিনেমা তৈরি করেছেন, যা বাংলা সিনেমার ইতিহাসে চিরকাল থেকে যাবে। তিনি প্রমাণ করেছেন যে, সিনেমা শুধু গল্প বলার যন্ত্র নয়, সিনেমা একটি দৃশ্যকাব্য।
তিনি আমাদের শিখিয়েছেন, একজন আর্ট ডিরেক্টরের চোখ দিয়ে দেখলে একটি সাধারণ জালের বুনোট বা একটি পুরোনো খাটের কারুকার্যও কতটা অর্থবহ হয়ে উঠতে পারে। পোস্টার থেকে পর্দা—তাঁর এই যাত্রা একজন প্রকৃত শিল্পীর আপোসহীন সংগ্রামের কাহিনী। বাংলা সিনেমার ইতিহাস তাঁকে ছাড়া অসম্পূর্ণ।
রাজশাহী থেকে কলকাতা, আর্ট কলেজ থেকে বিজ্ঞাপনী সংস্থা, পোস্টারের পাতা থেকে সিনেমার রূপালী পর্দা—রাজেন তরফদারের জীবন ছিল এক বিচিত্র এবং বর্ণময় পথচলা। তিনি সেই বিরল পরিচালকদের মধ্যে একজন, যিনি সিনেমার ভাষা শেখার আগেই দৃশ্যের ভাষা শিখেছিলেন। তাঁর তুলি আর তাঁর ক্যামেরা কখনো আলাদা ছিল না; দুটোই ছিল তাঁর শৈল্পিক ভাবনার প্রকাশ।
আজ যখন আমরা বাংলা সিনেমার স্বর্ণযুগ নিয়ে আলোচনা করি, তখন ‘গঙ্গা’ বা ‘পালঙ্ক’-এর মতো সিনেমাগুলোকে বাদ দিয়ে সেই আলোচনা সম্পূর্ণ হতে পারে না। আর এই সিনেমাগুলোর পেছনে থাকা মানুষটি, আর্ট ডিরেক্টর রাজেন তরফদার, আমাদের কাছে এক চিরন্তন অনুপ্রেরণার নাম। তিনি প্রমাণ করে গেছেন যে, বাণিজ্যিক সাফল্যই একজন শিল্পীর শেষ কথা নয়; আসল কথা হলো নিজের শিল্পের প্রতি সৎ থাকা।










