ন্যাশনাল ফার্মাসিউটিক্যাল প্রাইসিং অথরিটি (এনপিপিএ) দেশে অপরিহার্য ওষুধের দাম ১ এপ্রিল, ২০২৫ থেকে ১.৭৪ শতাংশ বাড়ানোর অনুমোদন দিয়েছে। এই মূল্যবৃদ্ধি ৯০৬টি ওষুধের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে, যার মধ্যে ৮০টি নতুন ওষুধও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এতে ডায়াবেটিস, জ্বর, অ্যালার্জি, হৃদরোগ, ক্যানসারসহ সাধারণ রোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত ওষুধগুলিও রয়েছে।
গত দুই বছরের তুলনায় এবারের মূল্যবৃদ্ধি অনেকটাই কম। ২০২৩ সালে ১২ শতাংশ এবং ২০২২ সালে ১০ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি হয়েছিল। তবে এই বৃদ্ধিও সাধারণ মানুষের পকেটে আরও একটি আর্থিক বোঝা চাপাবে, বিশেষ করে যারা ইতোমধ্যেই স্বাস্থ্য সংক্রান্ত খরচের জন্য সংগ্রাম করছেন তাদের জন্য।
ওষুধের দাম বৃদ্ধির প্রধান কারণ হিসেবে কাঁচামালের বর্ধিত খরচকে দায়ী করা হয়েছে। ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিগুলি জানিয়েছে, ওষুধ তৈরিতে ব্যবহৃত উপাদান বা কাঁচামালের দাম কিছু সময় ধরে ক্রমাগত বাড়ছে, যার ফলে তাদের উৎপাদন খরচও বেড়েছে। এই কারণে, কোম্পানিগুলি দীর্ঘদিন ধরে মূল্য বৃদ্ধির দাবি করছিল, যাতে তারা তাদের বর্ধিত খরচের জন্য ক্ষতিপূরণ পেতে পারে।
এনপিপিএ’র অফিস মেমোরান্ডাম অনুসারে, “২০২৪ সালে বার্ষিক হোলসেল প্রাইস ইনডেক্সের (ডব্লিউপিআই) পরিবর্তন ২০২৩ সালের তুলনায় (+) ১.৭৪০২৮% হয়েছে… ২০১৩ সালের ড্রাগ প্রাইস কন্ট্রোল অর্ডারের ১৬(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, উৎপাদকরা এই ডব্লিউপিআই-এর ভিত্তিতে নির্ধারিত ফর্মুলেশনের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য বাড়াতে পারেন এবং এই বিষয়ে সরকারের পূর্বানুমোদন প্রয়োজন হবে না।”
সাধারণভাবে ব্যবহৃত অ্যান্টিবায়োটিক অ্যাজিথ্রোমাইসিন এখন ২৫০ মিলিগ্রাম এবং ৫০০ মিলিগ্রাম সংস্করণের জন্য যথাক্রমে ১১.৮৭ টাকা এবং ২৩.৯৮ টাকা সিলিং প্রাইস (সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য) থাকবে। অ্যামক্সিসিলিন এবং ক্লাভুলানিক অ্যাসিড ফর্মুলেশনযুক্ত অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল ড্রাই সিরাপের সিলিং প্রাইস হবে ২.০৯ টাকা প্রতি মিলিলিটার।
অল ইন্ডিয়া অর্গানাইজেশন অফ কেমিস্টস অ্যান্ড ড্রাগিস্টস (এআইওসিডি)-এর জেনারেল সেক্রেটারি রাজীব সিংহল বিজনেস টুডেকে জানিয়েছেন যে, এই পদক্ষেপ ফার্মাসিউটিক্যাল শিল্পকে স্বস্তি দেবে, কারণ কাঁচামাল এবং অন্যান্য খরচ বাড়ছে। তিনি বলেন, “বাণিজ্যের দিক থেকে, বাজারে ওষুধের নতুন দাম দেখতে আরও দুই থেকে তিন মাস সময় লাগবে, কারণ যে কোনও সময়ে বাজারে প্রায় ৯০ দিনের বিক্রেয়যোগ্য ওষুধ থাকে।”
একটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, পার্লামেন্টারি স্ট্যান্ডিং কমিটি অন কেমিক্যালস অ্যান্ড ফার্টিলাইজারস-এর একটি অধ্যয়নে প্রকাশিত হয়েছে যে, ফার্মা কোম্পানিগুলি ওষুধের মূল্য নিয়ন্ত্রণের নিয়ম বারবার লঙ্ঘন করেছে, অনুমোদিত মূল্য বৃদ্ধির সীমা অতিক্রম করে। এনপিপিএ-র তরফে ৩০৭টি ক্ষেত্রে এই ধরনের লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়া গেছে।
এটাও উল্লেখযোগ্য যে, জানুয়ারি ২০২৫-এ ফার্মেসি এবং ড্রাগ স্টোর দ্বারা বাণিজ্যের ওপর মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) ২.৪ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৩ শতাংশ করা হয়েছিল, যা ইতিমধ্যেই ওষুধের মূল্যকে প্রভাবিত করেছে। এই অতিরিক্ত ০.৬ শতাংশ ভ্যাটের ফলে সামগ্রিক খরচ ০.৬০ টাকা বেড়েছে – পূর্বের ১১৭.৪ টাকা থেকে বর্তমানে প্রায় ১১৮ টাকা। রেনাটা পিএলসি-এর চিফ ফাইন্যান্সিয়াল অফিসার মুস্তাফা আলিম আওলাদ জানিয়েছেন, “পরিশেষে, এই বোঝা ভোক্তাদের উপর চাপিয়ে দেওয়া হবে।”
এছাড়াও, ক্যানসার, কিডনি ডায়ালিসিস, ম্যালেরিয়া, যক্ষ্মা, লিভার সিরোসিস এবং হেপাটাইটিস সি-র মতো রোগের জন্য কিছু ওষুধের ক্ষেত্রে ভ্যাট থেকে ছাড় দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অফ ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ (বিআইডিএস)-এর স্বাস্থ্য অর্থনীতিবিদ ও গবেষণা ফেলো আবদুর রাজ্জাক সরকার জানিয়েছেন, “ভ্যাট বৃদ্ধি রোগীদের মধ্যে অপরিহার্য ওষুধের ব্যবহার কমাতে পারে।” বাংলাদেশে আউট-অফ-পকেট স্বাস্থ্যসেবা খরচ বিশ্বে সবচেয়ে বেশি। ভোক্তারা এই খরচের ৬৪ শতাংশ পর্যন্ত ওষুধের জন্য ব্যয় করে থাকেন।
সাধারণভাবে, এপ্রিল ১ থেকে ডায়াবেটিস, ক্যানসার, হৃদরোগসহ সংক্রমণ চিকিৎসায় ব্যবহৃত ওষুধ, পেইনকিলার, অ্যান্টিবায়োটিক এবং অ্যালার্জির ওষুধসহ ৯০০ এরও বেশি অপরিহার্য ওষুধের দাম ১.৭৪ শতাংশ বাড়ছে। যদিও এই বৃদ্ধি আগের বছরগুলির তুলনায় কম, তবুও এটি সেইসব মানুষকে উল্লেখযোগ্যভাবে প্রভাবিত করবে যারা নিয়মিত ওষুধ সেবন করেন, বিশেষ করে দীর্ঘমেয়াদী রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য এটি আরও একটি আর্থিক বোঝা হিসেবে দেখা দেবে।