রাহুলের মৃত্যু ঘিরে ধোঁয়াশা কাটার বদলে ক্রমশই জটিল হচ্ছে গোটা ঘটনা। শুটিংয়ের অনুমতি ছিল কি না, সমুদ্রের জলে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল কি না, দুর্ঘটনার পর উদ্ধারকাজে এত দেরি হল কেন— এই সব প্রশ্ন এখন সামনে আসছে একের পর এক। ঘটনার বিভিন্ন পর্যায়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষের পরস্পরবিরোধী বয়ান ঘিরেও তৈরি হয়েছে নতুন বিতর্ক।
ওড়িশা পুলিশের বক্তব্য, সংশ্লিষ্ট শুটিংয়ের জন্য প্রয়োজনীয় অনুমতি নেওয়া হয়নি। সেই দাবিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন তুলে দিচ্ছে। যদি অনুমতিই না-থাকে, তা হলে সমুদ্রতটে বা সমুদ্রের জলে কী ভাবে শুটিং চলল? প্রশাসনিক নজরদারি ছিল কোথায়? এই প্রশ্নের উত্তর এখনও স্পষ্ট নয়।
ঘটনাকে ঘিরে দ্বিতীয় বড় প্রশ্ন, সমুদ্রের জলে শুটিংয়ের মতো ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতির জন্য প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা আদৌ ছিল কি না। লাইফগার্ড, উদ্ধারকারী দল, প্রাথমিক চিকিৎসা, সুরক্ষা সরঞ্জাম— কোনও কিছুই কি যথাযথ ভাবে মোতায়েন ছিল? কারণ এমন পরিবেশে সামান্য গাফিলতিও প্রাণঘাতী হতে পারে।
এ দিকে ধারাবাহিকের প্রযোজকের বক্তব্য নিয়েও দেখা দিয়েছে ধোঁয়াশা। প্রথমে জানানো হয়, জলের দৃশ্য নাকি চিত্রনাট্যে ছিল না। পরে সেই অবস্থান থেকে সরে অন্য সুর শোনা যায়। ফলে প্রশ্ন উঠছে, প্রথম বক্তব্য বদলানো হল কেন? যদি জলের দৃশ্য শুরুতে না-থাকে, তা হলে পরে সেটি যোগ করার সিদ্ধান্তই বা নিল কে?
এই জায়গাতেই উঠে আসছে আরও একটি তাৎপর্যপূর্ণ প্রশ্ন। পরিচালক কি নিজ দায়িত্বে জলের দৃশ্য সংযোজন করেছিলেন? যদি তা-ই হয়ে থাকে, তা হলে সেই সিদ্ধান্তের আগে নিরাপত্তা ও অনুমতির বিষয়টি কতটা বিবেচনায় নেওয়া হয়েছিল, তা খতিয়ে দেখা জরুরি। কারণ কোনও সৃজনশীল সিদ্ধান্তের ফল যদি প্রাণহানির দিকে গড়ায়, তা হলে দায় এড়ানোর সুযোগ খুব কম।
ঘটনার সময় নিয়েও রয়েছে বিভ্রান্তি। দুর্ঘটনাটি কি শুটিং চলাকালীন ঘটেছিল, না কি প্যাকআপের পরে? এই প্রশ্নের উত্তর গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সময় নির্ধারণ করা গেলে বোঝা যাবে, ঘটনার মুহূর্তে ইউনিটের নিরাপত্তা-ব্যবস্থা সক্রিয় ছিল কি না এবং দায়িত্বপ্রাপ্তদের অবস্থান কী ছিল।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক অভিযোগ, রাহুল জলে ডুবে যাওয়ার পরে ঘটনাস্থলেই কিছু সময় পড়ে ছিলেন। তাঁকে উদ্ধার করতে দেরি হল কেন, সেই প্রশ্ন এখন তদন্তের কেন্দ্রে। উপস্থিত ইউনিটকর্মী, নিরাপত্তাকর্মী বা স্থানীয় সহায়তাকারীরা কি দ্রুত সক্রিয় হননি? না কি তখন পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার মতো প্রস্তুতিই ছিল না? এই দিকটি বিশেষ ভাবে গুরুত্ব পাচ্ছে।
একই সঙ্গে, রাহুল ঠিক কী ভাবে জলে ডুবলেন, তা নিয়েও একাধিক পরস্পরবিরোধী বয়ান সামনে এসেছে। কেউ বলছেন, এটি শুটিংয়েরই অংশ ছিল। আবার কেউ দাবি করছেন, ঘটনাটি অন্য পরিস্থিতিতে ঘটে। এই অসামঞ্জস্যই সন্দেহ আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। একটি অস্বাভাবিক মৃত্যুকে ঘিরে যখন একাধিক আলাদা বয়ান সামনে আসে, তখন স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন ওঠে তথ্য গোপন করা হচ্ছে কি না।
রাহুলের মৃত্যু শুধু একটি ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়, শুটিং-সেটের নিরাপত্তা, প্রোটোকল এবং দায়িত্ববোধ নিয়েও বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। ঘটনাটির নিরপেক্ষ তদন্ত করে প্রকৃত সত্য সামনে আনা এবং দায় নির্ধারণ করা এখন সময়ের দাবি। না হলে এই সাত প্রশ্নের ধোঁয়াশা আরও ঘনীভূতই হবে।
সাত প্রশ্ন
১) ওড়িশা পুলিশের বক্তব্য, শুটিংয়ের অনুমতি ছিল না। প্রয়োজনীয় অনুমতি ছাড়াই কী ভাবে শুটিং হল?
২) সমুদ্রের জলে শুটিংয়ের জন্য প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা কি ছিল?
৩) ধারাবাহিকের প্রযোজক প্রথমে জানান, জলের দৃশ্য ছিল না চিত্রনাট্যে, পরে কেন বয়ান বদল?
৪) তা হলে কি পরিচালক নিজে দায়িত্বে জলের দৃশ্য যোগ করেছিলেন?
৫) শুটিং চলাকালীন দুর্ঘটনা, না কি প্যাকআপের পরে?
৬) রাহুল জলে ডুবে যাওয়ার পরে ঘটনাস্থানেই পড়ে রইলেন, উদ্ধার করতে কেন এত দেরি?
৭) কী ভাবে ডুবলেন রাহুল, তা নিয়ে একাধিক পরস্পরবিরোধী বয়ান কেন?











