পবিত্র রমজান মাস ১৪৪৭ হিজরি — এটি বিশ্বের ১৮০ কোটিরও বেশি মুসলমানের সবচেয়ে প্রতীক্ষিত মাস। বাংলাদেশে ২০২৬ সালের পবিত্র রমজান মাস আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে ১৯ ফেব্রুয়ারি, বৃহস্পতিবার থেকে। জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটির আনুষ্ঠানিক সভায় ১৭ ফেব্রুয়ারি, বুধবার সন্ধ্যায় বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদে এই সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হয়। বাংলাদেশের মোট জনগোষ্ঠীর প্রায় ৯০ শতাংশ মুসলিম, অর্থাৎ প্রায় ১৫ কোটিরও বেশি মানুষ এই মাসে পবিত্র রোজা পালন করছেন।
চাঁদ দেখার ঘোষণা: কবে ও কীভাবে?
জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটির সভা
১৪৪৭ হিজরি সনের রমজানের চাঁদ দেখার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে ১৭ ফেব্রুয়ারি, বুধবার সন্ধ্যা ৬টায় বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের ইসলামিক ফাউন্ডেশন সভাকক্ষে জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটির জরুরি সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন বিএনপি সরকারের ধর্মবিষয়ক মন্ত্রী কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসাইন কায়কোবাদ। সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বাংলাদেশের আকাশে রমজান মাসের চাঁদ দেখা গেছে এবং ১৯ ফেব্রুয়ারি, বৃহস্পতিবার থেকে রমজান গণনা শুরু হওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়।
জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটি কীভাবে কাজ করে?
বাংলাদেশে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের অধীনে জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটি (National Moon Sighting Committee) প্রতি বছর হিজরি মাস গণনার জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে চাঁদ দেখার তথ্য যাচাই করে। এই কমিটিতে ধর্মীয় পণ্ডিত, আবহাওয়াবিদ ও সরকারি কর্মকর্তারা অন্তর্ভুক্ত থাকেন। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে চাঁদ দেখার তথ্য সংগ্রহ করে কমিটি সরকারিভাবে রমজান ও ঈদের তারিখ নির্ধারণ করে এবং সারাদেশে ঘোষণা দেয়।
রমজান ২০২৬: গুরুত্বপূর্ণ তারিখ একনজরে
| ইভেন্ট | তারিখ | দিন |
|---|---|---|
| রমজানের চাঁদ দেখার সভা | ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | বুধবার |
| প্রথম তারাবিহ নামাজ | ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ রাত | বুধবার রাত |
| প্রথম রোজা / রমজান শুরু | ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | বৃহস্পতিবার |
| লাইলাতুল কদর (২৭ রমজান) | সম্ভাব্য ১৭ মার্চ ২০২৬ | মঙ্গলবার রাত |
| শেষ রোজা | সম্ভাব্য ১৯-২০ মার্চ ২০২৬ | — |
| ঈদুল ফিতর | সম্ভাব্য ২০ বা ২১ মার্চ ২০২৬ | শুক্রবার/শনিবার |
রমজান মাসের ইসলামিক তাৎপর্য
রমজান কেন ফরজ?
রমজান ইসলামের পাঁচটি মূল স্তম্ভের একটি। প্রতিটি সুস্থ ও প্রাপ্তবয়স্ক মুসলমানের জন্য এই মাসে রোজা রাখা ফরজ। পবিত্র কোরআনের সূরা আল-বাকারা (আয়াত ১৮৩)-তে আল্লাহ বলেছেন — “হে ঈমানদারগণ! তোমাদের উপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর, যাতে তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পারো।” এই মাসেই মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর উপর পবিত্র কোরআন নাজিল শুরু হয়েছিল, তাই রমজানকে কোরআনের মাস-ও বলা হয়।
লাইলাতুল কদর: হাজার মাসের চেয়ে শ্রেষ্ঠ রাত
রমজানের শেষ দশ দিনের বেজোড় রাতগুলোতে লাইলাতুল কদর খোঁজার নির্দেশ রয়েছে। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, এই রাতে ইবাদত হাজার মাসের ইবাদতের চেয়ে উত্তম। ২০২৬ সালে ২৭ রমজানের রাত (লাইলাতুল কদর) পড়বে সম্ভাব্য ১৭ মার্চ, মঙ্গলবার রাতে। এই রাতটিকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের মসজিদগুলোতে বিশেষ ইবাদত, মোনাজাত ও কোরআন খতমের আয়োজন হয়।
ঢাকার সেহরি ও ইফতারের সময়সূচি ২০২৬
ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ এ বছর দেশের ৬৪টি জেলার জন্য ৬৪টি আলাদা সময়সূচি প্রকাশ করেছে, যাতে রোজাদারগণ নির্ভুল সময়ে ইবাদত সম্পন্ন করতে পারেন। নিচে ঢাকার সম্পূর্ণ রমজান সময়সূচি দেওয়া হলো:
| রোজা নং | তারিখ | সেহরির শেষ সময় | ইফতারের সময় |
|---|---|---|---|
| ১ম | ১৯ ফেব্রুয়ারি | ০৫:১২ AM | ০৫:৫৭ PM |
| ২য় | ২০ ফেব্রুয়ারি | ০৫:১১ AM | ০৫:৫৮ PM |
| ৩য় | ২১ ফেব্রুয়ারি | ০৫:১১ AM | ০৫:৫৮ PM |
| ৪র্থ | ২২ ফেব্রুয়ারি | ০৫:১০ AM | ০৫:৫৯ PM |
| ৫ম | ২৩ ফেব্রুয়ারি | ০৫:০৯ AM | ০৫:৫৯ PM |
| ৬ষ্ঠ | ২৪ ফেব্রুয়ারি | ০৫:০৮ AM | ০৬:০০ PM |
| ৭ম | ২৫ ফেব্রুয়ারি | ০৫:০৮ AM | ০৬:০০ PM |
| ৮ম | ২৬ ফেব্রুয়ারি | ০৫:০৭ AM | ০৬:০১ PM |
| ৯ম | ২৭ ফেব্রুয়ারি | ০৫:০৬ AM | ০৬:০১ PM |
| ১০ম | ২৮ ফেব্রুয়ারি | ০৫:০৫ AM | ০৬:০২ PM |
| ১১তম | ০১ মার্চ | ০৫:০৪ AM | ০৬:০২ PM |
| ১২তম | ০২ মার্চ | ০৫:০৪ AM | ০৬:০৩ PM |
| ১৩তম | ০৩ মার্চ | ০৫:০৩ AM | ০৬:০৩ PM |
| ১৪তম | ০৪ মার্চ | ০৫:০২ AM | ০৬:০৪ PM |
| ১৫তম | ০৫ মার্চ | ০৫:০১ AM | ০৬:০৪ PM |
| ১৬তম | ০৬ মার্চ | ০৫:০০ AM | ০৬:০৪ PM |
| ১৭তম | ০৭ মার্চ | ০৪:৫৯ AM | ০৬:০৫ PM |
| ১৮তম | ০৮ মার্চ | ০৪:৫৮ AM | ০৬:০৫ PM |
| ১৯তম | ০৯ মার্চ | ০৪:৫৭ AM | ০৬:০৬ PM |
| ২০তম | ১০ মার্চ | ০৪:৫৬ AM | ০৬:০৬ PM |
| ২১তম | ১১ মার্চ | ০৪:৫৬ AM | ০৬:০৭ PM |
| ২২তম | ১২ মার্চ | ০৪:৫৫ AM | ০৬:০৭ PM |
| ২৩তম | ১৩ মার্চ | ০৪:৫৪ AM | ০৬:০৮ PM |
| ২৪তম | ১৪ মার্চ | ০৪:৫৩ AM | ০৬:০৮ PM |
| ২৫তম | ১৫ মার্চ | ০৪:৫২ AM | ০৬:০৮ PM |
| ২৬তম | ১৬ মার্চ | ০৪:৫১ AM | ০৬:০৯ PM |
| ২৭তম | ১৭ মার্চ (লাইলাতুল কদর) | ০৪:৫০ AM | ০৬:০৯ PM |
| ২৮তম | ১৮ মার্চ | ০৪:৪৯ AM | ০৬:১০ PM |
| ২৯তম | ১৯ মার্চ | ০৪:৪৮ AM | ০৬:১০ PM |
| ৩০তম | ২০ মার্চ | ০৪:৪৭ AM | ০৬:১০ PM |
⚠️ দ্রষ্টব্য: সময়সূচি ±২ মিনিট পরিবর্তিত হতে পারে। সর্বদা ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশের অফিশিয়াল নির্দেশিকা অনুসরণ করুন।
বিভাগভিত্তিক সেহরি ও ইফতারের সময় (প্রথম রোজা, ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬)
বাংলাদেশের আট বিভাগের ভৌগোলিক অবস্থান আলাদা হওয়ায় সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের সময় ভিন্ন হয়। তাই প্রতিটি বিভাগের সেহরি ও ইফতারের সময়ও আলাদা।
| বিভাগ | সেহরির শেষ সময় | ইফতারের সময় |
|---|---|---|
| ঢাকা | ০৫:১২ AM | ০৫:৫৭ PM |
| চট্টগ্রাম | ০৫:০৬ AM | ০৫:৫৩ PM |
| রাজশাহী | ০৫:১৮ AM | ০৬:০২ PM |
| খুলনা | ০৫:১৬ AM | ০৬:০০ PM |
| সিলেট | ০৫:০৭ AM | ০৫:৫৩ PM |
| বরিশাল | ০৫:১২ AM | ০৫:৫৬ PM |
| রংপুর | ০৫:২০ AM | ০৬:০৩ PM |
| ময়মনসিংহ | ০৫:১১ AM | ০৫:৫৬ PM |
রমজান মাসের করণীয় ও বর্জনীয়
যা অবশ্যই করতে হবে
-
প্রতিদিন সময়মতো সেহরি খাওয়া — কারণ নবীজি (সা.) বলেছেন সেহরিতে বরকত রয়েছে
-
পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ এবং রাতে তারাবিহ নামাজ আদায় করা
-
বেশি বেশি কোরআন তিলাওয়াত ও জিকির-আজকার করা
-
সামর্থ্যবান হলে জাকাত, সদকা ও ফিতরা আদায় করা
-
রমজানের শেষ দশ দিনে ইতিকাফ করার চেষ্টা করা
-
দরিদ্র ও অসহায়দের মধ্যে ইফতার বিতরণ করা
যা অবশ্যই বর্জন করতে হবে
-
মিথ্যা বলা, গিবত ও পরনিন্দা থেকে বিরত থাকা
-
রাগ-ক্রোধ ও অহেতুক ঝগড়া-বিবাদ পরিহার করা
-
সময় অপচয় না করে ইবাদতে মনোযোগ দেওয়া
-
ইফতারে অতিরিক্ত খাওয়া এড়িয়ে চলা
রোজার স্বাস্থ্যগত উপকারিতা
শুধু আধ্যাত্মিক দিক থেকেই নয়, আধুনিক বিজ্ঞানও রোজার স্বাস্থ্যগত উপকারিতা স্বীকার করে। গবেষণায় দেখা গেছে:
-
বিপাকক্রিয়া উন্নতি: রোজা রাখলে শরীরে ইনসুলিনের মাত্রা নিয়ন্ত্রিত হয় এবং রক্তে শর্করার মাত্রা স্বাভাবিক থাকে
-
ওজন নিয়ন্ত্রণ: সঠিক সেহরি ও পরিমিত ইফতার অভ্যাস শরীরের অতিরিক্ত চর্বি কমাতে সাহায্য করে
-
মানসিক শান্তি: রোজা রাখলে মানসিক চাপ কমে এবং আত্মনিয়ন্ত্রণ শক্তি বৃদ্ধি পায়
-
ডিটক্সিফিকেশন: দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকলে শরীর স্বাভাবিকভাবে বিষাক্ত পদার্থ নিঃসরণ করে
-
কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণ: রোজার ফলে রক্তে খারাপ কোলেস্টেরল (LDL) কমে এবং ভালো কোলেস্টেরল (HDL) বাড়তে পারে
রমজান ও বাংলাদেশের সমাজ-অর্থনীতি
সামাজিক বন্ধন ও মানবিক উদ্যোগ
রমজান মাস বাংলাদেশে শুধু ধর্মীয় আচার পালনের মাস নয়, এটি সামাজিক সংহতির মাসও। মসজিদে মসজিদে ইফতার মাহফিলের আয়োজন হয়। পাড়া-মহল্লায় মানুষ একত্রে ইফতার করেন। বিভিন্ন সংগঠন ও ব্যক্তিগত উদ্যোগে দরিদ্র মানুষদের মধ্যে ইফতার ও সেহরির খাবার বিতরণ করা হয়। সরকারের পক্ষ থেকে টিসিবির মাধ্যমে ন্যায্য মূল্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য বিক্রি করা হয়, যাতে সাধারণ মানুষ স্বস্তিতে রমজান পালন করতে পারেন।
রমজানে বাজার ও ব্যবসা
রমজান মাসে বাংলাদেশের খাদ্যশিল্প ও বাণিজ্যে ব্যাপক পরিবর্তন আসে। ইফতারি বাজার, খেজুর, ফলমূল, শরবত উপকরণ এবং দেশীয় খাবারের চাহিদা কয়েকগুণ বেড়ে যায়। রমজান মাসে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোতে খাদ্যপণ্যের চাহিদা গড়ে ৩০-৪০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়। ঢাকার পুরান ঢাকার চকবাজার ইফতারি বাজারের জন্য সারাদেশে বিখ্যাত, যেখানে রমজান মাসে প্রতিদিন লক্ষাধিক মানুষের সমাগম হয়।
রমজান ও হিজরি ক্যালেন্ডার: বিজ্ঞানসম্মত ব্যাখ্যা
রমজান হলো হিজরি ক্যালেন্ডারের নবম মাস। হিজরি ক্যালেন্ডার সম্পূর্ণ চন্দ্রনির্ভর হওয়ায় প্রতি বছর রমজান গ্রেগরীয়ান ক্যালেন্ডারের তুলনায় প্রায় ১১ দিন এগিয়ে আসে। এ কারণেই ২০২৫ সালে রমজান মার্চে ছিল, আর ২০২৬ সালে এটি ফেব্রুয়ারিতে এসেছে। হিজরি বছরে মোট ৩৫৪ দিন থাকে, যা গ্রেগরীয়ান বছরের তুলনায় প্রায় ১১ দিন কম। ২০২৬ সালের রমজান হলো ১৪৪৭ হিজরি সনের রমজান।
ঈদুল ফিতর ২০২৬: কবে হবে আনন্দের উৎসব?
রমজানের পরিসমাপ্তিতে আসে মুসলমানদের সর্ববৃহৎ উৎসব ঈদুল ফিতর। ২০২৬ সালে রমজান যদি ৩০ দিনে হয়, তাহলে ঈদুল ফিতর হবে ২০ মার্চ ২০২৬ (শুক্রবার)। আর রমজান ২৯ দিনে শেষ হলে ঈদ হবে ১৯ মার্চ ২০২৬ (বৃহস্পতিবার)। চূড়ান্ত তারিখ শাওয়াল মাসের চাঁদ দেখার ওপর নির্ভর করে — জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটি সেদিনও সন্ধ্যায় সভা করে ঘোষণা দেবে। ঈদুল আজহা ২০২৬ সম্ভাব্য ২৭ মে, বুধবার পালিত হবে।
রমজান ২০২৬: বৈশ্বিক পরিসংখ্যান
| তথ্য | পরিসংখ্যান |
|---|---|
| বিশ্বে মোট মুসলিম জনসংখ্যা | প্রায় ১৮০ কোটি |
| বাংলাদেশে মুসলিম জনসংখ্যা | প্রায় ১৫ কোটি (৯০%) |
| বাংলাদেশে মোট মসজিদ | ৩ লাখেরও বেশি |
| ইসলামিক ফাউন্ডেশন প্রকাশিত জেলাভিত্তিক সময়সূচি | ৬৪টি আলাদা সময়সূচি |
| রমজানে খাদ্যপণ্যের চাহিদা বৃদ্ধি | ৩০-৪০ শতাংশ |
| হিজরি ও গ্রেগরীয়ান ক্যালেন্ডারের পার্থক্য | প্রতি বছর ১১ দিন |











