রাস পূর্ণিমা ২০২৫: এই দিন ভুল করেও এই কাজ করবেন না! জানুন সঠিক তারিখ, পূর্ণিমার সময় এবং শ্রীকৃষ্ণের অলৌকিক রাসলীলা

প্রেম, ভক্তি এবং শরতের পূর্ণিমার চাঁদের স্নিগ্ধ আলোয় উদ্ভাসিত এক মহিমান্বিত উৎসব হলো রাস পূর্ণিমা। এটি বাঙালি হিন্দু, বিশেষত বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের কাছে এক অত্যন্ত পবিত্র দিন। এই দিনটি ভগবান শ্রীকৃষ্ণ…

Riddhi Datta

 

প্রেম, ভক্তি এবং শরতের পূর্ণিমার চাঁদের স্নিগ্ধ আলোয় উদ্ভাসিত এক মহিমান্বিত উৎসব হলো রাস পূর্ণিমা। এটি বাঙালি হিন্দু, বিশেষত বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের কাছে এক অত্যন্ত পবিত্র দিন। এই দিনটি ভগবান শ্রীকৃষ্ণ এবং শ্রীমতী রাধারানির দিব্য প্রেমলীলার স্মরণে উদযাপিত হয়। প্রতি বছর কার্তিক মাসের পূর্ণিমা তিথিতে এই উৎসব অনুষ্ঠিত হয়, যা কার্তিক পূর্ণিমা নামেও পরিচিত। এই প্রবন্ধে আমরা ২০২৫ সালের রাস পূর্ণিমার সঠিক তারিখ, সময়সূচী, এর গভীর আধ্যাত্মিক তাৎপর্য, বাংলার বিভিন্ন প্রান্তের অনন্য উদযাপন পদ্ধতি এবং এই দিনের অবশ্য পালনীয় নিয়মাবলী সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করব।

রাস পূর্ণিমা ২০২৫: সঠিক তারিখ ও সময়সূচী

যেকোনো পারলৌকিক কাজ বা পূজার্চনার জন্য সঠিক সময় বা তিথি জানা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হিন্দু ধর্মে তিথি চন্দ্রের গতিপথের উপর নির্ভরশীল, তাই ইংরেজি ক্যালেন্ডারের তারিখের সাথে এর সামান্য পার্থক্য ঘটে।

বাংলা পঞ্জিকা অনুসারে, ২০২৫ সালে (১৪৩২ বঙ্গাব্দে) কার্তিক পূর্ণিমা বা রাস পূর্ণিমার তিথি শুরু হচ্ছে ১৫ই নভেম্বর, ২০২৫, শনিবার এবং তিথি সমাপ্ত হচ্ছে ১৬ই নভেম্বর, ২০২৫, রবিবার

যেহেতু রাসলীলা বা শ্রীকৃষ্ণের পূজা মূলত রাত্রিকালীন, তাই এই বছর ১৫ই নভেম্বর, শনিবার রাতেই মূল রাস উৎসব এবং পূজা অনুষ্ঠিত হবে। তবে, কার্তিক পূর্ণিমার পুণ্যস্নান ও ব্রত উদযাপনের জন্য ১৬ই নভেম্বর, রবিবার সকালটিও অত্যন্ত শুভ।

রাস পূর্ণিমা ২০২৫ (১৪৩২) সময়সূচী

বিবরণ তারিখ (ইংরেজি) তারিখ (বাংলা) সময় (আনুমানিক)
পূর্ণিমা তিথি শুরু ১৫ নভেম্বর, ২০২৫ (শনিবার) ২৮শে কার্তিক, ১৪৩২ সকাল ০৮:৫০ মিনিট থেকে
পূর্ণিমা তিথি শেষ ১৬ নভেম্বর, ২০২৫ (রবিবার) ২৯শে কার্তিক, ১৪৩২ সকাল ০৭:১০ মিনিট পর্যন্ত
রাস পূজার শুভক্ষণ ১৫ নভেম্বর, ২০২৫ (শনিবার) ২৮শে কার্তিক, ১৪৩২ সন্ধ্যা থেকে মধ্যরাত্রি
পূর্ণিমা স্নানের দিন ১৬ নভেম্বর, ২০২৫ (রবিবার) ২৯শে কার্তিক, ১৪৩২ সূর্যোদয়ের সময়

(দ্রষ্টব্য: সময়সূচী বিভিন্ন পঞ্জিকা অনুসারে সামান্য পরিবর্তিত হতে পারে। নির্দিষ্ট অঞ্চলের জন্য স্থানীয় পঞ্জিকা অনুসরণ করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। এই সময়সূচীটি Drik Panchang-এর মতো নির্ভরযোগ্য জ্যোতিষ সংক্রান্ত উৎস থেকে যাচাইকৃত তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি।)

২০২৫ সালের Purnima তিথির তালিকা: এক নজরে দেখে নিন সারা বছরের পূর্ণিমার দিনগুলি

রাস পূর্ণিমার আসল তাৎপর্য কি?

রাস পূর্ণিমা কেবল একটি উৎসব নয়, এটি একটি গভীর আধ্যাত্মিক দর্শনের প্রতীক। এর তাৎপর্য বুঝতে হলে আমাদের দুটি মূল বিষয় জানতে হবে: শ্রীকৃষ্ণের ‘রাসলীলা’ এবং ‘কার্তিক পূর্ণিমা’-এর মাহাত্ম্য।

শ্রীকৃষ্ণের ‘রাসলীলা’: আত্মার সাথে পরমাত্মার মিলন

‘রাস’ শব্দের অর্থ হলো “আনন্দময় নৃত্য” বা “রস”। রাসলীলা হলো ভগবান শ্রীকৃষ্ণের সাথে ব্রজের গোপিনীদের দিব্য প্রেম ও আনন্দের নৃত্য। এই দিব্য লীলার বিস্তারিত বর্ণনা পাওয়া যায় শ্রীমদ্ভাগবত পুরাণ-এর দশম স্কন্ধের ২৯ থেকে ৩৩ অধ্যায়ে, যা ‘রাস পঞ্চাধ্যায়ী’ নামে খ্যাত।

এই লীলার মূল দর্শন হলো:

  1. প্রেমের সর্বোচ্চ রূপ: রাসলীলা জাগতিক কামনার ঊর্ধ্বে। এটি হলো আত্মার (জীবাত্মা) তার পরম উৎস পরমাত্মার (শ্রীকৃষ্ণ) প্রতি বিশুদ্ধ, নিঃশর্ত প্রেমের এক রূপক। গোপিনীরা হলেন সেই ভক্তের প্রতীক, যারা সংসারের সমস্ত বাঁধন ত্যাগ করে কেবল ঈশ্বরের সান্নিধ্য লাভের জন্য আকুল।
  2. অহংকারের বিনাশ: ভাগবত পুরাণ অনুযায়ী, যখন গোপিনীরা কৃষ্ণের সাথে নৃত্য করতে করতে নিজেদের পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সৌভাগ্যবতী বলে মনে করতে শুরু করেন, তখন শ্রীকৃষ্ণ তাদের মধ্য থেকে অন্তর্হিত হয়ে যান। এটি ভক্তের মন থেকে সূক্ষ্ম অহংকারকেও দূর করার শিক্ষা দেয়।
  3. ঈশ্বরের সর্বব্যাপকতা: শ্রীকৃষ্ণ রাসলীলার সময় নিজেকে এমনভাবে বহুগুণিত করেছিলেন যে প্রত্যেক গোপিনীই অনুভব করেছিলেন যে কৃষ্ণ কেবল তারই সাথে নৃত্য করছেন। এটি এই মহাসত্যকে প্রতিষ্ঠা করে যে, ভগবান এক হয়েও তাঁর প্রতিটি ভক্তের কাছে ব্যক্তিগতভাবে উপস্থিত থাকতে পারেন।
  4. পূর্ণিমার তাৎপর্য: শারদ পূর্ণিমার উজ্জ্বল, কলঙ্কমুক্ত চাঁদ যেমন আকাশকে আলোকিত করে, তেমনই ভক্তের শুদ্ধ, নিষ্কাম প্রেম ঈশ্বরের কৃপা লাভ করে। এই রাতের পূর্ণ চাঁদ হলো ভক্তের সেই পবিত্র মনের প্রতীক।

পদ্মশ্রীপ্রাপ্ত সন্ন্যাসী কার্তিক মহারাজের বিরুদ্ধে ধর্ষণ ও জোরপূর্বক গর্ভপাতের গুরুতর অভিযোগ

 কার্তিক পূর্ণিমার বিশেষ গুরুত্ব

রাস পূর্ণিমা কার্তিক মাসের শেষ দিনে পড়ে। কার্তিক মাস হিন্দু ধর্মে ‘দামোদর মাস’ নামেও পরিচিত এবং একে বছরের শ্রেষ্ঠ ও পবিত্রতম মাস হিসেবে গণ্য করা হয়।

  • কার্তিক ব্রতের সমাপ্তি: বহু ভক্ত সারা কার্তিক মাস জুড়ে বিশেষ ব্রত পালন করেন, প্রতিদিন সন্ধ্যায় তুলসী মঞ্চে বা মন্দিরে প্রদীপ (আকাশ প্রদীপ) দান করেন এবং পুণ্যস্নান করেন। রাস পূর্ণিমার দিন এই এক মাসব্যাপী ব্রতের সমাপ্তি ঘটে।
  • দেব দীপাবলি: ভারতের অনেক প্রান্তে, বিশেষত বারাণসীতে, এই দিনটিকে ‘দেব দীপাবলি’ বা দেবতাদের দীপাবলি হিসেবে পালন করা হয়। বিশ্বাস করা হয় যে, এই দিনে দেবতারা স্বর্গ থেকে নেমে এসে গঙ্গা নদীতে স্নান করেন এবং প্রদীপ প্রজ্জ্বলন করে উৎসব করেন। গঙ্গার ঘাটগুলি লক্ষ লক্ষ প্রদীপের আলোয় সেজে ওঠে, যা এক অভূতপূর্ব দৃশ্য তৈরি করে।
  • ত্রিপুরী পূর্ণিমা: এই পূর্ণিমার আরেকটি নাম ‘ত্রিপুরী পূর্ণিমা’। পৌরাণিক কাহিনী অনুসারে, এই তিথিতে ভগবান শিব ত্রিপুরাসুর নামক এক মহাশক্তিশালী অসুরকে বধ করেছিলেন। তাই এই দিনটি শৈবদের কাছেও অত্যন্ত পবিত্র।

বাংলার রাস উৎসব: এক অনন্য উদযাপন

যদিও রাসলীলার উৎপত্তি ব্রজভূমি বৃন্দাবনে, কিন্তু বাংলায় এই উৎসব এক ভিন্ন ও অনন্য মাত্রা পেয়েছে। এর সম্পূর্ণ কৃতিত্বই প্রায় শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু-কে দেওয়া হয়।

 শ্রীচৈতন্যের ভাবধারায় বাংলার রাস

শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু, যিনি রাধা-কৃষ্ণের মিলিত রূপ হিসেবে পূজিত হন, তিনি ভক্তি আন্দোলনের মাধ্যমে বাংলায় কৃষ্ণপ্রেমের বন্যা বইয়ে দিয়েছিলেন। তিনিই নবদ্বীপে রাস উৎসবকে একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেন। চৈতন্যদেবের কাছে রাস ছিল তত্ত্বের চেয়েও বেশি ‘ভাব’-এর বিষয়। তিনি রাধারানীর ‘মহাভাব’-এ বিভোর হয়ে কৃষ্ণের আরাধনা করতেন। তাঁর প্রবর্তিত সংকীর্তন আন্দোলন রাস উৎসবের মূল অঙ্গ হয়ে ওঠে। খোল-করতালের ধ্বনিতে “হরে কৃষ্ণ” মহামন্ত্র জপ এবং ভাগবত পাঠ এই উৎসবের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

নবদ্বীপের রাস: বৈষ্ণব ও শাক্তের অভূতপূর্ব মহামিলন

বাংলার রাস উৎসবের কথা উঠলে প্রথমেই আসে নদীয়া জেলার নবদ্বীপের নাম। আশ্চর্যের বিষয় হলো, শ্রীকৃষ্ণের রাস উৎসব হলেও নবদ্বীপের রাস মূলত শাক্ত আরাধনার এক সুবিশাল প্রদর্শনী। এটি বাংলার এক অনন্য সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য, যেখানে বৈষ্ণব ও শাক্ত ভাবধারা এক স্রোতে মিলিত হয়েছে।

  • ইতিহাস: কথিত আছে, নদিয়ার বিখ্যাত রাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায় এই প্রথার সূচনা করেন। তাঁর সময়ে নবদ্বীপে শাক্ত (কালী, দুর্গা) পূজার প্রচলন বেশি ছিল। তিনি বৈষ্ণব ও শাক্ত ধর্মের অনুগামীদের মধ্যে সম্প্রীতি স্থাপনের উদ্দেশ্যে রাস পূর্ণিমার রাতে শাক্ত দেব-দেবীদের বিশাল মৃৎশিল্প (প্রতিমা) তৈরি করে পূজা করার নির্দেশ দেন।
  • আড়ং (শোভাযাত্রা): নবদ্বীপের রাসের প্রধান আকর্ষণ হলো এর ‘আড়ং’ বা শোভাযাত্রা। রাস পূর্ণিমার রাতে, শহরের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বিশাল বিশাল, সুসজ্জিত প্রতিমা (অনেক সময় ৩০-৪০ ফুট উঁচু) বাদ্যযন্ত্র ও আলোকসজ্জা সহকারে রাস্তায় বের করা হয়। এই প্রতিমাগুলির মধ্যে বিভিন্ন রূপের কালী (যেমন ভদ্রকালী, অলদিয়া কালী, বড় কালী), দুর্গা, নৃসিংহ, শিব এবং অন্যান্য পৌরাণিক চরিত্র থাকে।
  • সাংস্কৃতিক তাৎপর্য: নবদ্বীপের রাস কেবল একটি ধর্মীয় উৎসব নয়, এটি নদীয়া জেলার সংস্কৃতির ধারক। এই সময়ে শহর এক বিশাল মেলায় পরিণত হয়, যা দেখতে লক্ষ লক্ষ মানুষের সমাগম ঘটে।

 শান্তিপুরের রাস: ঐতিহ্য ও আভিজাত্য

নবদ্বীপের ঠিক পাশেই শান্তিপুরের রাস উৎসব তার নিজস্ব বৈশিষ্ট্যে উজ্জ্বল। শান্তিপুরের রাস নবদ্বীপের মতো শাক্ত প্রতিমার আড়ম্বরের জন্য নয়, বরং তার বৈষ্ণব ঐতিহ্য ও আভিজাত্যের জন্য বিখ্যাত।

  • রাসযাত্রা: এখানে বিভিন্ন ‘আটচালা’ বা মন্দিরে শ্রীকৃষ্ণের বিগ্রহকে সুন্দরভাবে সাজিয়ে পূজা করা হয়।
  • ভাঙা রাস: শান্তিপুরের মূল আকর্ষণ হলো ‘ভাঙা রাস’, যা রাস পূর্ণিমার পরের দিন অনুষ্ঠিত হয়। এই দিন বিভিন্ন মন্দির থেকে শোভাযাত্রা সহকারে রাধা-কৃষ্ণের বিগ্রহগুলিকে শহরের রাস্তায় বের করা হয় এবং ভক্তরা কীর্তন করতে করতে শোভাযাত্রায় অংশ নেন।

অন্যান্য স্থানের রাস (কোচবিহার ও মায়াপুর)

  • কোচবিহারের রাস মেলা: উত্তরবঙ্গের কোচবিহারের মদনমোহন মন্দিরের রাস উৎসব ও তৎসংলগ্ন মেলা অত্যন্ত প্রাচীন ও বিখ্যাত। কোচবিহার রাস মেলা এই অঞ্চলের সর্ববৃহৎ উৎসবগুলির মধ্যে অন্যতম, যা ধর্মীয় গুরুত্বের পাশাপাশি এক বিরাট অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র।
  • মায়াপুর (ইসকন): আন্তর্জাতিক কৃষ্ণ ভাবনামৃত সংঘ (ISKCON)-এর প্রধান কেন্দ্র মায়াপুরে রাস পূর্ণিমা অত্যন্ত ভক্তি সহকারে পালিত হয়। এখানে মূল আকর্ষণ হলো শ্রীমদ্ভাগবত পুরাণ থেকে রাস পঞ্চাধ্যায়ী পাঠ, সারা রাত ব্যাপী কীর্তন এবং রাধা-মাধবের বিশেষ পূজা ও অভিষেক। সারা বিশ্ব থেকে ভক্তরা এই উদযাপনে যোগ দিতে আসেন।

রাস পূর্ণিমার পূজা বিধি ও নিয়মাবলী

রাস পূর্ণিমার দিনটি ব্রত, উপবাস এবং পূজার্চনার জন্য অত্যন্ত ফলদায়ক। বাড়িতে বা মন্দিরে খুব সহজভাবেই এই পূজা করা যেতে পারে।

 পূজার সাধারণ উপকরণ

  • শ্রীকৃষ্ণ ও রাধারানির যুগল মূর্তি বা ছবি
  • গঙ্গা জল বা শুদ্ধ জল
  • তাজা ফুল (বিশেষত পদ্ম, গাঁদা, গোলাপ)
  • তুলসী পাতা ও মঞ্জরী (এটি অপরিহার্য)
  • চন্দন (সাদা ও লাল)
  • ধূপ, দীপ (ঘি বা তিলের তেলের প্রদীপ)
  • পঞ্চামৃত (দুধ, দই, ঘি, মধু, চিনি)
  • নৈবেদ্য (মিষ্টি, ফল, লুচি, সুজি, পায়েস, মাখন-মিছরি)
  • নতুন বস্ত্র (মূর্তির জন্য)

 ব্রত ও উপবাসের নিয়ম

রাস পূর্ণিমার দিন অনেকেই উপবাস বা ব্রত পালন করেন।

  1. উপবাস: সাধারণত সূর্যোদয় থেকে চন্দ্রোদয় পর্যন্ত উপবাস রাখা হয়। অনেকে সারাদিন নির্জলা বা সজল উপবাস রেখে রাতে চন্দ্র দর্শনের পর এবং শ্রীকৃষ্ণকে ভোগ নিবেদন করে প্রসাদ গ্রহণ করেন। আবার কেউ কেউ সারাদিন ফল ও দুধ গ্রহণ করে উপবাস পালন করেন।
  2. স্নান: এই দিনের প্রধান কর্তব্য হলো পুণ্যস্নান। সম্ভব হলে ভোরে গঙ্গায় বা অন্য কোনো পবিত্র নদীতে স্নান করা উচিত। তা সম্ভব না হলে, বাড়িতে স্নানের জলে সামান্য গঙ্গা জল মিশিয়ে “গঙ্গে চ যমুনে চৈব…” মন্ত্র পাঠ করে স্নান করলেও সমান পুণ্য লাভ হয়।

 মূল পূজা পদ্ধতি (রাত্রিকালীন পূজা)

রাস পূর্ণিমার প্রধান পূজা সন্ধ্যায় বা মধ্যরাতে অনুষ্ঠিত হয়।

  1. সঙ্কল্প: স্নান সেরে শুদ্ধ বস্ত্রে পূজার স্থানে বসে হাতে জল, ফুল ও আতপ চাল নিয়ে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ও রাধারানির পূজার সঙ্কল্প করতে হয়।
  2. আবাহন ও অভিষেক: প্রথমে ভগবানকে পূজায় আবাহন করতে হয়। এরপর মূর্তি থাকলে সেটিকে পঞ্চামৃত দিয়ে এবং তারপর শুদ্ধ জল দিয়ে অভিষেক (স্নান) করানো হয়।
  3. বস্ত্র ও সজ্জা: বিগ্রহকে নতুন বস্ত্র পরিয়ে চন্দন, অলঙ্কার ও ফুলের মালা দিয়ে সুন্দর করে সাজাতে হয়।
  4. অর্ঘ্যদান (চন্দ্রকে): যেহেতু এটি পূর্ণিমা তিথি, তাই রাতে চন্দ্রদেবকে অর্ঘ্য দেওয়া অত্যন্ত শুভ। একটি পাত্রে দুধ, জল, সাদা ফুল ও আতপ চাল মিশিয়ে চন্দ্রের উদ্দেশ্যে অর্ঘ্য প্রদান করা হয়।
  5. ভোগ নিবেদন: এরপর ভগবানকে ফল, মিষ্টি, পায়েস এবং অন্যান্য তৈরি করা ভোগ নিবেদন করতে হয়। ভোগের সাথে অবশ্যই তুলসী পাতা দিতে হবে।
  6. আরতি ও কীর্তন: ভোগ নিবেদনের পর ধূপ, দীপ জ্বালিয়ে রাধা-কৃষ্ণের আরতি করা হয়। এই সময় ভজন, কীর্তন বা “হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ, কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে। হরে রাম হরে রাম, রাম রাম হরে হরে।।” মহামন্ত্র জপ করা উচিত।
  7. ব্রত কথা পাঠ: সম্ভব হলে এই দিন শ্রীমদ্ভাগবত থেকে রাস পঞ্চাধ্যায়ী বা শ্রীকৃষ্ণের রাসলীলার কাহিনী পাঠ করা বা শ্রবণ করা অত্যন্ত পুণ্যের কাজ।

গুরু পূর্ণিমায় কী কী করা উচিত: আপনার ভাগ্য পরিবর্তনের সুবর্ণ সুযোগ!

এই দিনে কী কী করবেন (এবং কী করবেন না)

রাস পূর্ণিমার পবিত্রতা রক্ষা করতে কিছু নিয়ম পালন করা বাঞ্ছনীয়।

অবশ্য পালনীয় (করণীয়):

  • দান: এই দিনে দান করাকে ‘মহাদান’ বলা হয়। কার্তিক পূর্ণিমায় অন্ন, বস্ত্র, বা অর্থ দান করলে তা অক্ষয় পুণ্য প্রদান করে।
  • দীপদান: এই দিন সন্ধ্যায় নদী বা পুকুরে প্রদীপ ভাসানো (দীপদান) হয়। এটি সারা কার্তিক মাসের আকাশ প্রদীপের সমাপ্তি সূচক এবং এটি পূর্বপুরুষদের আত্মার শান্তি কামনা ও জীবনের অন্ধকার দূর করার প্রতীক।
  • সত্যনারায়ণ পূজা: অনেক পরিবারে এই পূর্ণিমা তিথিতে সত্যনারায়ণ বা সত্যগোপালের পূজা দেওয়া হয়, যা পরিবারের জন্য অত্যন্ত মঙ্গলজনক বলে মনে করা হয়।
  • তুলসী পূজা: তুলসী গাছকে এই দিন বিশেষ ভাবে পূজা করা হয়, কারণ তুলসী হলেন শ্রীকৃষ্ণের পরম প্রিয়া।

বর্জনীয় (কী করবেন না):

  • তামসিক আহার: এই পবিত্র দিনে পেঁয়াজ, রসুন, মাছ, মাংস এবং যেকোনো ধরনের তামসিক খাবার গ্রহণ করা থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকা উচিত।
  • কলহ: পূর্ণিমার দিন মনকে শান্ত রাখা প্রয়োজন। বাড়িতে বা বাইরে কারো সাথে কলহ, ঝগড়া বা কটু কথা বলা উচিত নয়।
  • তুলসী পাতা ছেঁড়া: যদিও পূজায় তুলসী পাতা অপরিহার্য, কিন্তু এই দিন (বিশেষত পূর্ণিমা তিথি থাকাকালীন) গাছ থেকে তুলসী পাতা ছেঁড়া অনুচিত। পূজার জন্য পাতা আগের দিন সংগ্রহ করে রাখা ভালো।
  • বড়দের অসম্মান: এই দিন মা-বাবা বা কোনো গুরুজনকে অসম্মান করলে তা মহাপাপ হিসেবে গণ্য হয়।

রাস পূর্ণিমা এবং জ্যোতিষ শাস্ত্র

জ্যোতিষ শাস্ত্রের দৃষ্টিকোণ থেকেও কার্তিক পূর্ণিমা এক অত্যন্ত শক্তিশালী দিন।

  • চন্দ্র ও মনের সম্পর্ক: জ্যোতিষে চন্দ্রকে ‘মন’-এর কারক গ্রহ হিসেবে ধরা হয়। পূর্ণিমার দিন চন্দ্র তার ষোল কলায় পূর্ণ থাকে, অর্থাৎ পৃথিবীর উপর তার প্রভাব সর্বাধিক থাকে। এই কারণে এই দিনে মানুষের আবেগ ও মানসিক শক্তি খুব প্রবল থাকে। এই শক্তিশালী মানসিক শক্তিকে যদি উপবাস, ধ্যান এবং ঈশ্বরের আরাধনায় ব্যবহার করা হয়, তবে তা আধ্যাত্মিক উন্নতির জন্য অত্যন্ত সহায়ক হয়।
  • নক্ষত্রের অবস্থান: কার্তিক পূর্ণিমার চাঁদ সাধারণত কৃত্তিকা বা রোহিণী নক্ষত্রে অবস্থান করে। কৃত্তিকা নক্ষত্রের অধিপতি সূর্য এবং দেবতা অগ্নি, যা শুদ্ধিকরণের প্রতীক। আবার রোহিণী নক্ষত্র চন্দ্রের নিজের উচ্চস্থান, যা সমৃদ্ধি ও সৃজনশীলতার প্রতীক। এই যোগগুলি এই দিনের শুভত্বকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
  • গ্রহণ মুক্ত পূর্ণিমা (২০২৫): অনেক সময় পূর্ণিমা তিথিতে চন্দ্রগ্রহণ ঘটলে পূজার সময়সূচীতে পরিবর্তন আসে। তবে জ্যোতিষ গণনা অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১৫ই নভেম্বরের কার্তিক পূর্ণিমা সম্পূর্ণ গ্রহণমুক্তNASA-এর গ্রহণ তালিকা অনুযায়ী, ২০২৫ সালের প্রধান চন্দ্রগ্রহণগুলি মার্চ ও সেপ্টেম্বরে ঘটবে। তাই এই রাস পূর্ণিমা পূজা, দান এবং স্নানের জন্য অত্যন্ত শুভ ও বাধাহীন হতে চলেছে।

রাস পূর্ণিমা শুধু রাধা-কৃষ্ণের যুগল মূর্তি পূজার দিন নয়, এটি জীবনের এক গভীর দর্শনকে উদযাপন করার উৎসব। এটি আমাদের শেখায় যে, ঈশ্বরের সাথে ভক্তের সম্পর্ক কোনো জাগতিক নিয়মের অধীন নয়, তা কেবল শুদ্ধ, নিঃস্বার্থ প্রেমের উপর ভিত্তি করেই গড়ে ওঠে। শ্রীমদ্ভাগবতের রাসলীলার বর্ণনায় দেখা যায়, কৃষ্ণ সেই ভক্তদেরই কাছেই ধরা দেন, যারা নিজেদের সর্বস্ব ত্যাগ করে কেবল তাঁকেই পাওয়ার জন্য আকুল হয়েছেন।

২০২৫ সালের এই রাস পূর্ণিমায়, আসুন আমরা কেবল বাহ্যিক আড়ম্বরে নয়, বরং নিজেদের মনকে শুদ্ধ করে ভক্তি ও প্রেমের সাথে সেই পরম সত্তার আরাধনা করি। নবদ্বীপের রাস যেমন শাক্ত ও বৈষ্ণবের ভেদাভেদ ভুলে এক মহামিলনের উৎসব, তেমনই আমাদের জীবনও যেন সমস্ত ভেদাভবের ঊর্ধ্বে উঠে এক আনন্দময় লীলায় পরিণত হয়।

About Author
Riddhi Datta

ঋদ্ধি দত্ত কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রসায়নবিদ্যায় স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেছেন। তিনি একজন উদীয়মান বিজ্ঞান লেখক ও গবেষক, যিনি জটিল বৈজ্ঞানিক ধারণাগুলিকে সাধারণ পাঠকদের জন্য সহজবোধ্য করে তোলেন। তাঁর লেখায় রসায়ন, পরিবেশ বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তির সমসাময়িক বিষয়গুলি প্রাধান্য পায়। ঋদ্ধি নিয়মিতভাবে এই ওয়েবসাইটে বিজ্ঞান-ভিত্তিক প্রবন্ধ, গবেষণা সারসংক্ষেপ এবং বিশেষজ্ঞদের সাক্ষাৎকার প্রকাশ করেন।