নতুন বসানো সিরামিক টাইলস থেকে “পোড়া/কেমিক্যাল” গন্ধ আসলে বেশিরভাগ সময় টাইলসের নয়—টাইল অ্যাডহেসিভ, গ্রাউট, সিলিকন/কক, সিলার বা পরিষ্কারক রাসায়নিক থেকে নির্গত VOC (Volatile Organic Compounds) ও আর্দ্রতার কারণে হয়। ইউএস EPA বলছে, অনেক VOC-এর ঘরের ভেতরের ঘনত্ব বাইরে থেকে ২–৫ গুণ বেশি হতে পারে এবং কিছু পরিস্থিতিতে আরও অনেক বেশি বাড়ে—তাই দ্রুত ভেন্টিলেশন, উৎস শনাক্তকরণ আর সঠিক ক্লিনিং/ড্রাইংই সবচেয়ে কার্যকর সমাধান।
সিরামিকের গন্ধ—আসলে উৎস কোথায়?
নতুন সিরামিক লাগানোর পর যে “গন্ধ”টা টের পাওয়া যায়, সেটা সাধারণত কয়েকটা উৎস থেকে আসে—এগুলো আলাদা করে বুঝতে পারলে সমাধান দ্রুত হয়।
টাইলস নয়, বেশিরভাগ সময় সমস্যা “ইনস্টলেশন ম্যাটেরিয়াল”
-
সিরামিক টাইলস সাধারণত VOC ছাড়ে না—কারণ এটি খনিজজাত এবং উচ্চ তাপে ফায়ারিং হওয়ায় জৈব অবশিষ্টাংশ ধ্বংস হয়ে যায়—এটা নির্মাতাদের পরিবেশ/গুণমান ব্যাখ্যাতেও উল্লেখ থাকে।
-
একই কারণে অনেক টাইল গাইডে সিরামিক/পোরসেলেন টাইলকে “জিরো VOC” হিসেবে ধরা হয়—তাই গন্ধের উৎস সাধারণত টাইলের আঠা/গ্রাউট/সিলার-পক্ষেই যায়।
সবচেয়ে কমন উৎস (বাস্তবে যেগুলো গন্ধ ছাড়ে)
-
টাইল অ্যাডহেসিভ/আঠা (বিশেষ করে সলভেন্ট-বেসড বা নিম্নমানের আঠা)।
-
গ্রাউট (কিছু পলিমার/অ্যাডিটিভ থাকলে গন্ধ হতে পারে, বিশেষত ভেজা অবস্থায়)।
-
সিলিকন কক/সিল্যান্ট (বাথরুম/কিচেনে বেশি ব্যবহার হয়)। সাম্প্রতিক এক গবেষণার সারাংশে দেখা যায়, কিচেন/বাথরুমে টাইল বসানোর এক সপ্তাহ পরেও কক ব্যবহারের কারণে VOC ঘনত্ব বেশি থাকতে পারে।
-
সিলার/কোটিং (স্টোন-লুক টাইল, গ্রাউট সিলার, “স্টেইন প্রটেক্টর” ইত্যাদি)।
-
আর্দ্রতা আটকে থাকা (নতুন কাজের পর পানি/ময়েশ্চার আটকে গেলে “স্যাঁতসেঁতে” বা “মাটির” গন্ধ)।
কীভাবে চিনবেন কেমিক্যালে পাকা আম? ১০টি সহজ উপায়
গন্ধ কি স্বাস্থ্যঝুঁকি?
“গন্ধ” মানেই সবসময় বিপদ নয়, কিন্তু টানা কেমিক্যাল গন্ধ থাকলে সেটাকে হালকা করে দেখাও ঠিক না—কারণ VOC-এর সাথে চোখ-নাক-গলা জ্বালা, মাথাব্যথা, বমিভাব ইত্যাদি স্বল্পমেয়াদি উপসর্গ জড়িত থাকতে পারে বলে ইউএস EPA উল্লেখ করে।
কেন ঘরের ভেতরে সমস্যা বেশি হয়
-
EPA-এর VOC গাইডে বলা আছে, ঘরের ভেতরে অনেক VOC-এর ঘনত্ব বাইরে থেকে “আপ টু ১০ গুণ” বেশি হতে পারে।
-
EPA-এর TEAM স্টাডিতে (1985) দেখা যায়, বহু সাধারণ অর্গানিক পলিউট্যান্ট ঘরের ভেতরে বাইরে থেকে ২–৫ গুণ বেশি ছিল।
-
কিছু কাজের সময়/পরে (যেমন সলভেন্ট-হাই কাজ) কয়েক ঘণ্টার জন্য ঘনত্ব ব্যাকগ্রাউন্ড আউটডোর লেভেলের ১০০০ গুণ পর্যন্ত উঠতে পারে বলেও EPA সতর্ক করেছে।
“ফর্মালডিহাইড” নিয়ে সংক্ষিপ্ত নোট (যদি নতুন ঘর/রিনোভেশন হয়)
ফর্মালডিহাইড VOC-এর মধ্যে বহুল আলোচিত—WHO-এর ইনডোর এয়ার গাইডলাইন অনুযায়ী ৩০ মিনিটের জন্য ০.১ mg/m³ (≈০.০৮ ppm) সীমা একটি রেফারেন্স হিসেবে বহুল ব্যবহৃত।
বড় ছবি: ইনডোর এয়ার কোয়ালিটি কেন সিরিয়াস
WHO-এর সর্বশেষ ফ্যাক্টশিট অনুযায়ী, ২০২১ সালে হাউসহোল্ড এয়ার পলিউশন আনুমানিক ২.৯ মিলিয়ন মৃত্যু/বছর-এর সাথে যুক্ত ছিল—এটা মূলত রান্নার ধোঁয়ার মতো উৎস নিয়ে, তবে বার্তা একটাই: ঘরের ভেতরের বাতাস দীর্ঘসময় খারাপ থাকলে স্বাস্থ্যঝুঁকি বাস্তব।
কেরোসিন তেলের গন্ধ শুকলে স্বাস্থ্যের উপর বিরূপ প্রভাব
৩০–৬০ মিনিটে গন্ধ কমানোর “ফার্স্ট এইড” প্ল্যান
এখনই গন্ধ কমাতে হলে লক্ষ্য হবে: (১) বাতাস চলাচল বাড়ানো, (২) গন্ধ-ধরা অণু শোষণ করা, (৩) নতুন গন্ধ তৈরি করে এমন ভুল কাজ বন্ধ করা।
ধাপ ১: ভেন্টিলেশন—সবচেয়ে দ্রুত কাজ দেয়
-
জানালা–দরজা ক্রস-ভেন্টিলেশন হয় এমনভাবে খুলুন (এক দিক খুললে কম কাজ করে)।
-
এক্সহস্ট ফ্যান থাকলে রান্নাঘর/বাথরুমে চালান; না থাকলে টেবিল ফ্যান জানালার দিকে মুখ করে দিন যাতে ঘরের বাতাস বাইরে বের হয়।
-
সম্ভব হলে ১–২ ঘণ্টা “ফুল ভেন্টিলেশন” দিন, তারপর দিনভর মাঝে মাঝে ১৫–২০ মিনিট করে।
ধাপ ২: গন্ধ শোষণ—নিরাপদ, কম খরচ
-
অ্যাক্টিভেটেড চারকোল/চারকোল ব্যাগ: টয়লেট/কিচেন/ঘরের কোণে কয়েকটি পাউচ রাখুন।
-
বেকিং সোডা: চওড়া পাত্রে ছড়িয়ে গন্ধযুক্ত জায়গায় রেখে দিন (বিশেষ করে আলমারি/স্টোর/বন্ধ রুমে)।
-
কফি গ্রাউন্ডস (ড্রাই): সাময়িকভাবে গন্ধ ঢেকে দিতে সাহায্য করে—তবে এটি “কভার” করে, উৎস কমায় না।
ধাপ ৩: ভুল কাজ বন্ধ করুন (এগুলো গন্ধ বাড়ায়)
-
ঘর বন্ধ করে এয়ার ফ্রেশনার/আগরবাতি ব্যবহার করবেন না—EPA জানায় VOC বহু পণ্যে থাকে এবং অনেক পণ্য ব্যবহারের পরও বাতাসে উচ্চ ঘনত্ব কিছু সময় থাকতে পারে, তাই “আরও কেমিক্যাল যোগ” ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
-
“ব্লিচ + অ্যাসিড/ভিনেগার” জাতীয় মিক্সিং কখনও করবেন না (ঝুঁকিপূর্ণ গ্যাস তৈরি হতে পারে)।
-
ভেজা মোছার পর জায়গা দ্রুত না শুকালে স্যাঁতসেঁতে গন্ধ আরও আটকে যায়—তাই ড্রাইং নিশ্চিত করুন।
স্থায়ী সমাধান: উৎস শনাক্ত করুন
এখানে লক্ষ্য একটাই—গন্ধের “রুট কজ” ধরতে পারলে বারবার ফ্রেশনার লাগবে না।
উৎস ধরার সহজ টেস্ট (১০ মিনিট)
-
গন্ধটা কি কেমিক্যাল/পেইন্টের মতো? তাহলে আঠা/সিলার/কক সম্ভাবনা বেশি।
-
গন্ধটা কি স্যাঁতসেঁতে/পচা? তাহলে আর্দ্রতা, পানি লিক, বা ভেজা সাব-ফ্লোর/দেয়াল দায়ী হতে পারে।
-
গন্ধ কি একটা নির্দিষ্ট কোণে বেশি? ওই জায়গায় কক/সিলার/ড্যাম্পনেস খুঁজুন।
কেস ১: অ্যাডহেসিভ/গ্রাউটের গন্ধ (নতুন কাজের পর)
-
প্রথম ৩–৭ দিন ভেন্টিলেশনই প্রধান—কারণ অফ-গ্যাসিং সময় লাগে।
-
ভেজা জায়গা শুকাতে দিন; বারবার পানি ঢাললে কিউরিং ধীর হয় এবং গন্ধ দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।
-
যদি ব্যবহার করা আঠা/গ্রাউটের প্যাকেটে “লো-VOC” উল্লেখ না থাকে, ভবিষ্যতে একই ব্র্যান্ড এড়িয়ে চলুন (বিশেষ করে কম ভেন্টিলেশনযুক্ত বাথরুমে)।
কেস ২: সিলিকন কক/সিল্যান্টের গন্ধ (বাথরুমে বেশি)
-
নতুন কক দিলে ২৪–৪৮ ঘণ্টা টানা এক্সহস্ট/ভেন্টিলেশন দিন।
-
কক যদি ঠিকমতো “কিউর” না হয় (জায়গা ভেজা থাকলে), গন্ধ আটকে যেতে পারে—তাই বাথরুম শুকনো রাখুন।
-
যদি ৭–১০ দিন পরও তীব্র গন্ধ থাকে, নিম্নমানের কক/ভুল কিউরিং সন্দেহ করুন—প্রয়োজনে পেশাদার দিয়ে রিমুভ করে কম গন্ধ/লো-এমিশন সিল্যান্ট ব্যবহার বিবেচনা করুন।
কেস ৩: গ্রাউট সিলার/কোটিংয়ের গন্ধ
-
অনেক সিলার সলভেন্ট-বেসড হতে পারে—তাই প্রয়োগের পর ঘর বন্ধ রাখলে গন্ধ “মাথা ধরানো” পর্যায়ে যেতে পারে।
-
সমাধান: ক্রস-ভেন্টিলেশন + ফ্যান আউটফ্লো + চারকোল ৩–৫ দিন।
-
ভুল হলে: সিলারের ওপর বারবার পারফিউমড ক্লিনার ব্যবহার করবেন না—গন্ধ লেয়ারিং হয়।
কেস ৪: স্যাঁতসেঁতে/ড্যাম্প গন্ধ (আর্দ্রতা আটকে আছে)
-
নতুন টাইল বসালে নিচে/দেয়ালে আর্দ্রতা আটকে থাকতে পারে—বিশেষ করে বর্ষা/শীতে।
-
সমাধান: ডিহিউমিডিফায়ার (থাকলে) বা ফ্যান-ড্রাইং, দরজা খোলা, রোদ/এয়ারফ্লো; বাথরুমে “ভিজে কাপড়” ঝুলিয়ে রাখা বন্ধ।
-
যদি গন্ধের সাথে কালচে দাগ/ফাঙ্গাস দেখা যায়, তখন শুধু গন্ধ নয়—মোল্ড কন্ট্রোল দরকার (প্রয়োজনে এক্সপার্ট কল)।
গন্ধ বনাম সমাধান—বাস্তবসম্মত টাইমলাইন (টেবিল)
নিচের সময়গুলো “সাধারণ অভিজ্ঞতা” ধরে দেওয়া; আপনার ঘরের আকার, ভেন্টিলেশন, আর্দ্রতা, ব্যবহৃত কেমিক্যাল অনুযায়ী কমবেশি হতে পারে।
| সম্ভাব্য উৎস | গন্ধের ধরন | প্রথম করণীয় | সাধারণত কমতে সময় |
|---|---|---|---|
| অ্যাডহেসিভ/আঠা | কেমিক্যাল, নতুন কাজের গন্ধ | ক্রস-ভেন্টিলেশন + ফ্যান আউটফ্লো | ২–৭ দিন |
| সিলিকন কক/সিল্যান্ট | তীক্ষ্ণ কেমিক্যাল | এক্সহস্ট/ভেন্টিলেশন + শুকনো রাখা | ১–৭ দিন (খারাপ হলে বেশি) |
| গ্রাউট সিলার/কোটিং | সলভেন্টি/পেইন্ট টাইপ | ভেন্টিলেশন + চারকোল | ৩–১৪ দিন |
| আর্দ্রতা/ড্যাম্প | স্যাঁতসেঁতে, মাটির গন্ধ | ড্রাইং + ফ্যান + আর্দ্রতা কমানো | আর্দ্রতা না কমলে চলতেই পারে |
| ভুল ক্লিনার/এয়ার ফ্রেশনার | পারফিউম মিক্সড, মাথা ধরা | বন্ধ করুন + ভেন্টিলেশন | কয়েক ঘণ্টা–২ দিন |
ভবিষ্যতে গন্ধ এড়াতে কেনার গাইড
রিনোভেশন/নতুন টাইল বসানোর আগে “টাইল” নয়—ইনস্টলেশন ম্যাটেরিয়াল বাছাইই গন্ধ কমানোর সবচেয়ে বড় ইনভেস্টমেন্ট।
কেনার সময় যেগুলো খুঁজবেন (বিশেষ করে আঠা/সিল্যান্টে)
-
“লো-VOC” লিখলেই যথেষ্ট নয়—সম্ভব হলে থার্ড-পার্টি সার্টিফিকেশন দেখুন। UL-এর GREENGUARD সার্টিফিকেশন প্রোগ্রাম ইনডোর এয়ার কোয়ালিটির জন্য কম VOC এমিশন যাচাই করে, আর GREENGUARD Gold আরও কঠোর সীমা ধরে।
-
ইন্ডাস্ট্রি গাইডে বলা হয়, অনেক অ্যাডহেসিভ ইনডোর এয়ার কোয়ালিটির জন্য GREENGUARD/অনুরূপ প্রোগ্রামে সার্টিফাইড হতে পারে—কেনার আগে প্রোডাক্ট ডেটাশিট/সার্টিফিকেট মিলিয়ে নিন।
-
মনে রাখুন: সিরামিক টাইল নিজেই সাধারণত VOC ছাড়ে না—তাই “টাইলের গন্ধ” দীর্ঘদিন থাকলে ইনস্টলেশন ম্যাটেরিয়াল/ভেন্টিলেশন/আর্দ্রতাকে অগ্রাধিকার দিন।
কখন অবশ্যই বিশেষজ্ঞ ডাকবেন?
-
১০–১৪ দিন পরও তীব্র কেমিক্যাল গন্ধ থাকলে।
-
মাথা ঘোরা, শ্বাসকষ্ট, চোখ-নাক জ্বালা নিয়মিত হলে—EPA VOC এক্সপোজারের সাথে এসব উপসর্গের কথা উল্লেখ করে।
-
ড্যাম্প গন্ধের সাথে ফাঙ্গাস/কালো দাগ বাড়লে বা লিক সন্দেহ হলে।
সিরামিকের গন্ধ দূর করার সবচেয়ে দ্রুত ও নিরাপদ উপায় হলো ভেন্টিলেশন বাড়ানো এবং গন্ধের উৎস (আঠা/গ্রাউট/কক/সিলার/আর্দ্রতা) আলাদা করে শনাক্ত করা।
সিরামিক টাইল সাধারণত VOC ছাড়ে না—তাই সমস্যা দীর্ঘস্থায়ী হলে টাইল নয়, ইনস্টলেশন ম্যাটেরিয়াল বা ভেজাভাবকে সন্দেহ করা বেশি যুক্তিযুক্ত।
EPA দেখায় ঘরের ভেতরে VOC ঘনত্ব বাইরে থেকে বেশি হতে পারে, তাই বন্ধ ঘরে সুগন্ধি স্প্রে দিয়ে “ঢেকে” না রেখে বাতাস বের করে দেওয়াই বাস্তব সমাধান।
শরীর খারাপ লাগা, চোখ-নাক জ্বালা বা মাথাব্যথা বাড়লে সেটাকে সতর্ক সংকেত ধরে দ্রুত ভেন্টিলেশন ও এক্সপোজার কমানো উচিত।
ভবিষ্যতে গন্ধ এড়াতে আঠা/সিল্যান্ট কেনার সময় লো-এমিশন/সার্টিফিকেশন (যেমন GREENGUARD) যাচাই করলে ঝুঁকি অনেক কমে।
ঠিক পরিকল্পনা + সঠিক ম্যাটেরিয়াল + পর্যাপ্ত শুকানো—এই তিনটি মিললেই “সিরামিকের গন্ধ” সাধারণত স্থায়ী সমস্যা হয় না।











