অসুস্থতা জীবনের একটি স্বাভাবিক অংশ, কিন্তু যখন রোগ কঠিন ও দীর্ঘস্থায়ী হয়, তখন মানুষ মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “আল্লাহ এমন কোনো রোগ সৃষ্টি করেননি যার প্রতিষেধক বা নিরাময় তিনি সৃষ্টি করেননি” । রোগ মুক্তির দোয়া এবং সঠিক চিকিৎসা—উভয়ের সমন্বয়েই মহান আল্লাহর রহমতে আরোগ্য লাভ সম্ভব। চিকিৎসা বিজ্ঞানের উন্নতির পাশাপাশি দোয়ার আধ্যাত্মিক শক্তি রোগীকে মানসিক প্রশান্তি দেয় এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। এই আর্টিকেলে আমরা কোরআন ও হাদিস থেকে প্রমাণিত এমন কিছু শক্তিশালী দোয়া ও আমল নিয়ে আলোচনা করব, যা আপনার সুস্থতার জন্য অত্যন্ত কার্যকরী হতে পারে।
রোগ মুক্তির দোয়া: কোরআন ও সুন্নাহর আলোকে
ইসলাম ধর্মে রোগবালাই থেকে মুক্তির জন্য চিকিৎসার পাশাপাশি দোয়ার গুরুত্ব অপরিসীম। হাদিসে বিভিন্ন পরিস্থিতির জন্য নির্দিষ্ট কিছু দোয়ার উল্লেখ রয়েছে যা পাঠ করলে আল্লাহর রহমতে দ্রুত আরোগ্য লাভ করা যায়।
১. সর্বরোগ থেকে মুক্তির শ্রেষ্ঠ দোয়া
যখন কেউ অসুস্থ হয়, তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) এই দোয়াটি পাঠ করতেন এবং রোগীর শরীরে হাত বুলিয়ে দিতেন। এটি বুখারি ও মুসলিম শরিফের একটি প্রসিদ্ধ হাদিস।
-
আরবি:
اللَّهُمَّ رَبَّ النَّاسِ أَذْهِبِ الْبَأْسَ اشْفِ أَنْتَ الشَّافِي لَا شَافِيَ إِلَّا أَنْتَ شِفَاءً لَا يُغَادِرُ سَقَمًا -
বাংলা উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা রব্বান-নাস, আজহিবিল বা’স, ইশফি আনতাশ-শাফি, লা শিফা’আ ইল্লা শিফা’উকা, শিফা’আল লা ইউগাদিরু সাক্বামা।
-
অর্থ: “হে আল্লাহ, মানুষের প্রতিপালক! আপনি কষ্ট দূর করে দিন এবং আরোগ্য দান করুন। আপনিই আরোগ্যদানকারী। আপনার আরোগ্য ব্যতীত অন্য কোনো আরোগ্য নেই। এমন আরোগ্য দান করুন, যা কোনো রোগ অবশিষ্ট রাখে না” ।
দোয়া কবুল না হওয়ার ৬টি গুরুত্বপূর্ণ কারণ – যা প্রত্যেক মুসলিমের জানা জরুরি
২. কঠিন ও দুরারোগ্য ব্যাধি থেকে মুক্তির দোয়া
ক্যান্সার, কুষ্ঠ বা মহামারি ভাইরাসের মতো কঠিন রোগ থেকে বাঁচতে রাসুলুল্লাহ (সা.) একটি বিশেষ দোয়া শিখিয়েছেন। এটি নিয়মিত পাঠ করলে আল্লাহ কঠিন বালাই থেকে হেফাজত করেন।
-
আরবি:
اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنَ الْبَرَصِ وَالْجُنُونِ وَالْجُذَامِ وَمِنْ سَيِّئِ الْأَسْقَامِ -
বাংলা উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা ইন্নি আ’উযু বিকা মিনাল বারাসি, ওয়াল জুনুনি, ওয়াল জুজামি, ওয়া সাইয়্যিইল আসক্বাম।
-
অর্থ: “হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে ধবল, উন্মাদনা, কুষ্ঠ এবং সব ধরণের কঠিন রোগ-ব্যাধি থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করছি” ।
৩. শরীরের ব্যথা দূর করার আমল
শরীরের কোনো নির্দিষ্ট স্থানে প্রচণ্ড ব্যথা অনুভব হলে, সেই স্থানে ডান হাত রেখে প্রথমে তিনবার ‘বিসমিল্লাহ’ বলতে হবে। এরপর নিচের দোয়াটি সাতবার পাঠ করতে হবে।
-
আরবি:
أَعُوذُ بِاللَّهِ وَقُدْرَتِهِ مِنْ شَرِّ مَا أَجِدُ وَأُحَاذِرُ -
বাংলা উচ্চারণ: আ’উযু বিল্লাহি ওয়া কুদরাতিহি মিন শাররি মা আজিদু ওয়া উহাজিরু।
-
অর্থ: “আমি যা অনুভব করছি এবং যা আশঙ্কা করছি, তার অনিষ্ট থেকে আমি আল্লাহ এবং তাঁর ক্ষমতার আশ্রয় প্রার্থনা করছি” ।
আয়াতে শিফা: কোরআনের ৬টি নিরাময় আয়াত
পবিত্র কোরআনে এমন কিছু আয়াত রয়েছে যা ‘আয়াতে শিফা’ বা আরোগ্যের আয়াত নামে পরিচিত। আধ্যাত্মিক চিকিৎসায় এই আয়াতগুলোর প্রভাব পরীক্ষিত। ওলামায়ে কেরাম বলেন, এই আয়াতগুলো পাঠ করে পানিতে ফুঁ দিয়ে পান করলে বা রোগীর ওপর দম করলে উপকার পাওয়া যায় ।
| ক্রম | সুরা ও আয়াত | বিষয়বস্তু |
|---|---|---|
| ১ | সুরা তাওবা: ১৪ | মুমিনদের অন্তরের আরোগ্য। |
| ২ | সুরা ইউনুস: ৫৭ | অন্তরের ব্যাধির নিরাময়। |
| ৩ | সুরা নাহল: ৬৯ | পানীয় (মধু) যা মানুষের জন্য নিরাময়। |
| ৪ | সুরা বনী ইসরাঈল: ৮২ | কোরআন মুমিনদের জন্য শিফা ও রহমত। |
| ৫ | সুরা শুআরা: ৮০ | “যখন আমি অসুস্থ হই, তখন তিনিই আমাকে সুস্থ করেন।” |
| ৬ | সুরা ফুসসিলাত: ৪৪ | মুমিনদের জন্য পথনির্দেশ ও আরোগ্য। |
চিকিৎসা বিজ্ঞান ও দোয়ার প্রভাব: পরিসংখ্যান ও গবেষণা
আধুনিক বিজ্ঞান ও চিকিৎসাশাস্ত্র এখন স্বীকার করছে যে, প্রার্থনার সাথে শারীরিক সুস্থতার একটি গভীর সম্পর্ক রয়েছে। যদিও বিশ্বাসী মানুষের জন্য হাদিসই যথেষ্ট, তবুও বৈজ্ঞানিক গবেষণা আমাদের ঈমানকে আরও মজবুত করতে পারে।
সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, যারা নিয়মিত প্রার্থনা বা দোয়া করেন, তাদের মানসিক চাপ এবং হতাশা অন্যদের তুলনায় কম থাকে। ‘আমেরিকান সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন’ এবং অন্যান্য জার্নালে প্রকাশিত তথ্য মতে, প্রার্থনা মানুষের মস্তিস্কে প্রশান্তি আনে, যা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা (Immune System) বাড়াতে সাহায্য করে ।
অতিরিক্ত ঘুম থেকে মুক্তির ৯টি কার্যকর উপায় – যা আপনার জীবনকে বদলে দিতে পারে!
২০২৩ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় (NCBI) দীর্ঘস্থায়ী রোগে আক্রান্ত রোগীদের ওপর প্রার্থনার প্রভাব পর্যবেক্ষণ করা হয়। সেখানে দেখা গেছে, যারা নিয়মিত ব্যক্তিগতভাবে প্রার্থনা করেছেন, তাদের বেঁচে থাকার হার (Survival Rate) অন্যদের তুলনায় ১.৫ থেকে ১.৭ গুণ বেশি ছিল। এই গবেষণায় ৬ বছর ধরে রোগীদের পর্যবেক্ষণ করা হয় এবং দেখা যায় যে প্রার্থনার ফলে রোগীদের মানসিক শক্তি বৃদ্ধি পায়, যা ওষুধের কার্যকারিতা বাড়িয়ে দেয় ।
অন্য একটি গবেষণায় দেখা গেছে, হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের মধ্যে যাদের জন্য নিয়মিত দোয়া করা হয়েছে, তাদের জ্বরের স্থায়িত্ব এবং হাসপাতালে অবস্থানের সময়কাল অন্যদের তুলনায় কম ছিল । এটি প্রমাণ করে যে, দোয়ার প্রভাব কেবল আধ্যাত্মিক নয়, বরং এটি শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়াতেও ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে।
রোগীর পাশে বসে যে দোয়া পড়বেন
আত্মীয়-স্বজন বা বন্ধু-বান্ধব অসুস্থ হলে তাদের দেখতে যাওয়া বা ‘ইয়াদত’ করা ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। রোগীর শিয়রে বসে ৭ বার নিচের দোয়াটি পাঠ করলে, মৃত্যু আসন্ন না হলে আল্লাহ তাকে সুস্থ করে দেন বলে হাদিসে উল্লেখ আছে।
-
দোয়া: আসআলুল্লাহাল ‘আজিম, রব্বাল ‘আরশিল ‘আজিম, আইঁ-ইয়াশফিয়াক।
-
অর্থ: “আমি মহান আল্লাহর কাছে, যিনি মহান আরশের রব—প্রার্থনা করছি যেন তিনি তোমাকে আরোগ্য দান করেন” ।
রোগ-মুক্তি মূলত মহান আল্লাহর হাতে, আর দোয়া হলো মুমিনের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার। কঠিন বিপদে হতাশ না হয়ে সুচিকিৎসার পাশাপাশি উপরে উল্লেখিত রোগ মুক্তির দোয়া এবং আমলগুলো নিয়মিত পালন করা উচিত। মনে রাখবেন, বিপদ ও অসুস্থতা মুমিনের গুনাহ মাফের একটি মাধ্যমও হতে পারে। তাই সবর বা ধৈর্যের সাথে আল্লাহর কাছে সাহায্য চাইতে হবে। মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে সব ধরনের কঠিন ও দুরারোগ্য ব্যাধি থেকে হেফাজত করুন এবং সুস্থ, সুন্দর জীবন দান করুন। আমিন।











