শবে মেরাজ হলো ইসলামের ইতিহাসে সবচেয়ে মহিমান্বিত রাতগুলোর মধ্যে একটি, যা ২৭ রজব পালিত হয় এবং ২০২৬ সালে এটি ১৬ জানুয়ারি শুক্রবার দিবাগত রাতে পালিত হচ্ছে। এই পবিত্র রাতে আল্লাহ তায়ালা মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-কে মক্কার মসজিদুল হারাম থেকে জেরুজালেমের মসজিদুল আকসায় এবং সেখান থেকে সপ্ত আসমানে ভ্রমণ করিয়েছিলেন। সহিহ বুখারীতে বর্ণিত হাদিসে এই অলৌকিক যাত্রার বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে, যেখানে রাসুলুল্লাহ (সা.) আল্লাহর সান্নিধ্যে গিয়ে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের আদেশ লাভ করেন।
ইসলামিক ফাইন্ডারের তথ্য অনুযায়ী, এই রাতটি বছরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাত এবং মুসলমানরা বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন ইবাদত ও আমলের মাধ্যমে এই রাত উদযাপন করে থাকেন। দাওয়াতে ইসলামীর গবেষণা অনুসারে, এই রাতে করা ইবাদত ৬০ বছরের ইবাদতের সমান সওয়াব পাওয়া যায়। চলুন বিস্তারিতভাবে জেনে নিই শবে মেরাজে কী কী ইবাদত করা যায়।
শবে মেরাজের নফল নামাজ
১২ রাকাত নফল নামাজের বিধান
শবে মেরাজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত হলো ১২ রাকাত নফল নামাজ। ইসলামিক সেন্টার লিসেস্টারের বর্ণনা অনুযায়ী, এই নামাজ বিভিন্ন পদ্ধতিতে আদায় করা যায়। প্রথম পদ্ধতিতে ১২ রাকাত নামাজ এক সালামে আদায় করতে হয়, যেখানে প্রতি রাকাতে সূরা ফাতিহার পর সূরা ইখলাস তিনবার পড়তে হয়। নামাজ শেষে ১০০ বার “সুবহানাল্লাহি ওয়াল হামদুলিল্লাহি ওয়া লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার” পড়তে হয়, এরপর ১০০ বার “আস্তাগফিরুল্লাহা রব্বি মিন কুল্লি যাম্বিও ওয়া আতুবু ইলাইহি” পড়তে হয় এবং সবশেষে ১০০ বার দরুদ শরীফ পাঠ করতে হয়।
লার্ন এবাউট ইসলাম ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, দ্বিতীয় পদ্ধতিতে এই ১২ রাকাত নামাজ তিন সালামে আদায় করা হয়, যেখানে প্রথম চার রাকাতে প্রতি রাকাতে সূরা ফাতিহার পর সূরা কদর তিনবার পড়তে হয়। সালাম ফেরানোর পর ৭০ বার “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহুল মালিকুল হাক্কুল মুবিন” পড়তে হয়। দ্বিতীয় চার রাকাতে সূরা ফাতিহার পর সূরা নাসর তিনবার পড়ে সালাম ফেরাতে হয় এবং পরে নির্দিষ্ট দোয়া পড়তে হয়। তৃতীয় চার রাকাতে প্রতি রাকাতে সূরা ফাতিহার পর সূরা ইখলাস তিনবার পড়ে নামাজ শেষ করতে হয়, এরপর ৭০ বার দরুদ শরীফ অথবা সূরা আলাম নাশরাহ পড়তে হয়।
তৃতীয় পদ্ধতিতে সাধারণভাবে দুই দুই রাকাত করে মোট ১২ রাকাত নামাজ আদায় করা যায়, যেখানে প্রতি রাকাতে সূরা ফাতিহার পর যেকোনো সূরা পড়া যায়। স্ক্রিবড ডকুমেন্টেশনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, এই নামাজ পড়ার ফলে পার্থিব ও পরকালীন সকল প্রয়োজন পূরণ হয় এবং ৭০ হাজার গুনাহ মাফ হয়ে যায়। ইসলামী পণ্ডিতদের মতে, এই নামাজের সওয়াব ১০০ বছরের ইবাদতের সমান।
এশার নামাজ কয় রাকাত: বিস্তারিত জেনে নিন ও কিছু জরুরি মাসলা
৬ রাকাত নফল নামাজ
শবে মেরাজের জন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ নফল নামাজ হলো ৬ রাকাত, যা দুই দুই রাকাত করে তিন সালামে আদায় করতে হয়। প্রতি রাকাতে সূরা ফাতিহা একবার এবং সূরা ইখলাস সাতবার পড়তে হয়। নামাজ শেষে ৫০ বার দরুদ শরীফ পাঠ করতে হয়। ইসলামিক স্কলারদের মতে, এই নামাজের মাধ্যমে দুনিয়া ও আখিরাতের সকল প্রয়োজন পূরণ হয় এবং অসংখ্য গুনাহ মাফ হয়।
১০ রাকাত নফল নামাজ
১০ রাকাত নফল নামাজ দুই দুই রাকাত করে পাঁচ সালামে আদায় করা হয়। প্রতি রাকাতে সূরা ফাতিহা একবার, আয়াতুল কুরসি তিনবার এবং সূরা ইখলাস পাঁচবার পড়তে হয়। এই নামাজের বিশেষ ফজিলত রয়েছে এবং এটি পড়লে আল্লাহর বিশেষ রহমত ও বরকত লাভ হয়।
কোরআন তিলাওয়াত ও যিকির
কোরআন পাঠের গুরুত্ব
শবে মেরাজে কোরআন তিলাওয়াত অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ আমল। ফেইথ কাউন্টস ডট কমের তথ্যমতে, এই রাতে কোরআন তিলাওয়াত করলে বিশেষ সওয়াব পাওয়া যায়। যতটা সম্ভব বেশি বেশি কোরআন পড়া উচিত, বিশেষত সূরা আল-ইসরা যা মিরাজের ঘটনা বর্ণনা করে। কোরআন মাজীদের ১৭ নম্বর সূরা আল-ইসরার প্রথম আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেন, “পরম পবিত্র ও মহিমাময় সেই সত্তা, যিনি তাঁর বান্দাকে রাত্রিবেলায় ভ্রমণ করিয়েছিলেন মসজিদুল হারাম থেকে মসজিদুল আকসা পর্যন্ত”।
দরুদ শরীফ পাঠ
দরুদ শরীফ পাঠ করা শবে মেরাজের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আমল। ডেদাএন্ডসন্স ওয়েবসাইটের গাইডলাইন অনুযায়ী, এই রাতে যত বেশি সম্ভব দরুদ শরীফ পড়া উচিত। বিশেষভাবে “দরুদে ইব্রাহিম” এবং যেকোনো প্রকার দরুদ শরীফ পাঠ করলে মহানবী (সা.)-এর শাফায়াত লাভ হয় এবং আল্লাহর রহমত বর্ষিত হয়। কোয়ার্ন ফোকাস ওয়েবসাইটের তথ্য অনুসারে, মুসলিম পরিবারগুলো এই রাতে একসাথে বসে দরুদ শরীফের মজলিস করে থাকেন।
ইস্তিগফার ও তওবা
শবে মেরাজে ইস্তিগফার বা ক্ষমা প্রার্থনা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। “আস্তাগফিরুল্লাহ” বার বার পাঠ করতে হয়। আলে কুতুব ডট কমের বর্ণনা মতে, এই রাতে আল্লাহ তায়ালা বিশেষভাবে বান্দাদের ক্ষমা করে থাকেন এবং তওবা কবুল করেন। রজব মাসে গুনাহের ভার বেশি হয় এবং নেক আমলের মূল্য বৃদ্ধি পায়, তাই এই রাতে বেশি বেশি তওবা করা উচিত। ইসলামিক পণ্ডিতদের মতে, যারা রাতের বেলা মানুষের চোখের আড়ালে ইবাদত করেন, তাদেরকে কিয়ামতের দিন বিশেষভাবে সম্মানিত করা হবে।
রাতে মোবাইল ব্যবহারের ৭টি ক্ষতিকর অভ্যাস: আপনার স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে ফেলছেন কি?
বিশেষ দোয়া ও আমল
শবে মেরাজের বিশেষ দোয়া
এই রাতে নিজের, পরিবারের, বন্ধু-বান্ধবের এবং সমগ্র মুসলিম উম্মাহর জন্য দোয়া করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দাওয়াতে ইসলামীর পরামর্শ অনুযায়ী, দোয়া করার সময় আল্লাহর কাছে দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ চাইতে হয়। বিশেষভাবে “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহুল মালিকুল হাক্কুল মুবিন” এই দোয়াটি ৭০ বার পাঠ করলে বিশেষ ফজিলত পাওয়া যায়। এছাড়াও তাসবিহ “সুবহানাল্লাহি ওয়াল হামদুলিল্লাহি ওয়া লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার” বার বার পাঠ করতে হয়।
সদকা ও দান-খয়রাত
শবে মেরাজে দান-খয়রাত করা অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ আমল। কোয়ার্ন ফোকাস ওয়েবসাইটের তথ্যমতে, এই রাতে দান করা এবং দরিদ্রদের সাহায্য করা প্রতিটি মুসলমানের জন্য অন্যতম প্রধান আমল। রজব মাস আল্লাহর মাস হিসেবে পরিচিত এবং এই মাসে নেক কাজ করলে বিশেষ সওয়াব পাওয়া যায়। গরিব-অসহায়দের খাদ্য দান, মসজিদে দান এবং বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে সাহায্য করা এই রাতের বিশেষ আমল।
রোজা রাখার ফজিলত
শবে মেরাজের পরের দিন অর্থাৎ ২৭ রজব এবং তার পরবর্তী দিন রোজা রাখার বিশেষ ফজিলত রয়েছে। লার্ন এবাউট ইসলামের বর্ণনা অনুযায়ী, যে ব্যক্তি এই দিনগুলোতে রোজা রাখবে, সে কবরের আজাব এবং জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্তি পাবে। মহানবী (সা.) ইহুদিদের প্রথার বিপরীতে ২৬-২৭ অথবা ২৭-২৮ রজব দুই দিন রোজা রাখার নির্দেশ দিয়েছেন।
রাত জেগে ইবাদত
তাহাজ্জুদ ও তাসবিহ
শবে মেরাজের রাত জেগে ইবাদত করা অত্যন্ত সওয়াবের কাজ। ভ্যান্ডারবিল্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, এই রাতে আল্লাহ তায়ালা মহানবী (সা.)-কে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের নির্দেশ দিয়েছিলেন, তাই এই রাতে নামাজের গুরুত্ব অপরিসীম। রাত জেগে তাহাজ্জুদ নামাজ, নফল নামাজ এবং বিভিন্ন তাসবিহ-তাহলিল পাঠ করা উচিত। আলে কুতুবের গবেষণায় বলা হয়েছে, যারা রাতে জেগে ইবাদত করেন, তাদের জন্য জান্নাতে বিশেষ প্রাসাদ প্রস্তুত রয়েছে।
মসজিদে সমবেত হওয়া
এই রাতে মসজিদে সমবেত হয়ে ইবাদত করা, মিরাজের ঘটনা শোনা এবং ইমামের বয়ান শোনা বিশেষ ফজিলতপূর্ণ। এসকেটি ওয়েলফেয়ারের তথ্য অনুযায়ী, অনেক মুসলিম সারা রাত মসজিদে অবস্থান করে উলেমাদের থেকে মিরাজের ঘটনা শোনেন এবং রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনী আলোচনা করেন। বয়োবৃদ্ধরা শিশুদেরকে মহানবী (সা.)-এর জীবনের গল্প শোনান, যা ইসলামী শিক্ষা বৃদ্ধিতে সহায়ক।
শবে মেরাজের ঐতিহাসিক তাৎপর্য
মিরাজের যাত্রা
সহিহ বুখারীর হাদিস অনুযায়ী, মিরাজের রাতে হযরত জিবরাইল (আ.) মহানবী (সা.)-কে বোরাক নামক একটি সাদা বাহনে করে মক্কা থেকে জেরুজালেম নিয়ে যান। পথে তিনি মদিনা, তুর পর্বত, বায়তুল লাহাম এবং হযরত মুসা (আ.)-এর কবরে নামাজ আদায় করেন। মসজিদুল আকসায় পৌঁছে মহানবী (সা.) সকল নবীর ইমামতি করেন এবং দুই রাকাত নামাজ পড়েন। এরপর তাঁর সামনে দুটি পেয়ালা আনা হয় – একটিতে দুধ এবং অপরটিতে মদ। তিনি দুধ বেছে নেন, যার ফলে হযরত জিবরাইল (আ.) বলেন যে তিনি ফিতরাত (স্বভাবধর্ম) বেছে নিয়েছেন।
সপ্ত আসমান ভ্রমণ
ইসলামিক ফাইন্ডারের বিস্তারিত বর্ণনা অনুযায়ী, মসজিদুল আকসা থেকে মহানবী (সা.) সাত আসমান ভ্রমণ করেন এবং প্রতি আসমানে বিভিন্ন নবীর সাথে সাক্ষাত করেন। প্রথম আসমানে হযরত আদম (আ.), দ্বিতীয় আসমানে হযরত ঈসা (আ.) ও হযরত ইয়াহইয়া (আ.), তৃতীয় আসমানে হযরত ইউসুফ (আ.), চতুর্থ আসমানে হযরত ইদরিস (আ.), পঞ্চম আসমানে হযরত হারুন (আ.), ষষ্ঠ আসমানে হযরত মুসা (আ.) এবং সপ্তম আসমানে হযরত ইব্রাহিম (আ.)-এর সাথে সাক্ষাত হয়। তিনি বায়তুল মামুর দেখেন, যেখানে প্রতিদিন ৭০ হাজার ফেরেশতা নামাজ আদায় করেন।
সিদরাতুল মুনতাহা ও আল্লাহর সান্নিধ্য
মহানবী (সা.) সিদরাতুল মুনতাহা পর্যন্ত পৌঁছান, যা আসমানের শেষ সীমা। সহিহ মুসলিমের হাদিস অনুযায়ী, এই স্থান থেকে হযরত জিবরাইল (আ.) আর এগোতে পারেননি, কিন্তু মহানবী (সা.) একা এগিয়ে যান এবং আল্লাহর সান্নিধ্য লাভ করেন। কোরআনের সূরা আন-নাজমে বলা হয়েছে, “অতঃপর সেই দৃশ্য আরও নিকটবর্তী হলো এবং পূর্ণভাবে সামনে এলো। তাই দৃশ্য ও প্রিয়তমের মধ্যে দূরত্ব ছিল মাত্র দুই ধনুক পরিমাণ বা তার চেয়েও কম”।
পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের উপহার
এই যাত্রায় আল্লাহ তায়ালা মহানবী (সা.)-কে তিনটি বিশেষ উপহার দেন। প্রথমত, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ যা প্রথমে ৫০ ওয়াক্ত ছিল কিন্তু হযরত মুসা (আ.)-এর পরামর্শে মহানবী (সা.) বারবার আল্লাহর কাছে সহজীকরণ চেয়ে পাঁচ ওয়াক্তে নামিয়ে আনেন, যার সওয়াব ৫০ ওয়াক্তের সমান। দ্বিতীয়ত, সূরা বাকারার শেষ দুই আয়াত যা অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ। তৃতীয়ত, আল্লাহর প্রতিশ্রুতি যে মুহাম্মদ (সা.)-এর উম্মতের গুনাহ মাফ করা হবে যদি তারা শিরক না করে।
শবে মেরাজ থেকে শিক্ষা
নামাজের গুরুত্ব
শবে মেরাজ থেকে সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো নামাজের গুরুত্ব। দাওয়াতে ইসলামীর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ মুসলমানদের জীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত এবং এটি কখনো ত্যাগ করা উচিত নয়। নামাজ আল্লাহর সাথে বান্দার সরাসরি যোগাযোগের মাধ্যম এবং আত্মিক উন্নতির সোপান। প্রতিদিন পাঁচবার নামাজ আমাদেরকে আল্লাহর কাছে ডাকছে, যা মিরাজের রাতের সবচেয়ে বড় উপহার।
ধৈর্য ও বিশ্বাসের শক্তি
মিরাজের ঘটনা আমাদের শেখায় যে, কঠিন সময়েও আল্লাহর উপর দৃঢ় বিশ্বাস রাখতে হয়। মহানবী (সা.) তায়েফে অপমানিত হওয়ার পর এবং প্রিয় স্ত্রী হযরত খাদিজা (রা.) ও চাচা আবু তালিবের মৃত্যুর পর গভীর দুঃখে নিমজ্জিত ছিলেন। ঠিক সেই সময় আল্লাহ তায়ালা তাঁকে মিরাজের সম্মান দান করেন, যা প্রমাণ করে যে প্রতিটি কষ্টের পরে স্বস্তি আসে। ফেইথ কাউন্টসের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এই ঘটনা আমাদের ধৈর্য ধারণ এবং কখনো হাল না ছেড়ে দেওয়ার শিক্ষা দেয়।
মসজিদুল আকসার সংযোগ
মিরাজের যাত্রা ইসলামের সাথে মসজিদুল আকসার বিশেষ সংযোগ প্রতিষ্ঠা করে। জেরুজালেমে অবস্থিত এই মসজিদ ইসলামের তৃতীয় পবিত্রতম স্থান। ভ্যান্ডারবিল্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এই ঘটনা মুসলমানদের জন্য মসজিদুল আকসার ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় গুরুত্ব তুলে ধরে এবং ফিলিস্তিনি ভূমির সাথে ইসলামের অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক প্রমাণ করে।
বিশ্বব্যাপী শবে মেরাজ উদযাপন
মুসলিম দেশগুলোতে আয়োজন
বিশ্বব্যাপী মুসলমানরা বিভিন্নভাবে শবে মেরাজ উদযাপন করেন। কোয়ার্ন ফোকাসের রিপোর্ট অনুযায়ী, মুসলিম পরিবারগুলো তাদের ঘর ও পাড়া-মহল্লায় মোমবাতি এবং আলোকসজ্জা করেন। তারা পরিবার ও প্রতিবেশীদের জন্য বিভিন্ন সুস্বাদু খাবার ও মিষ্টি তৈরি করেন এবং একসাথে খান। মসজিদগুলোতে বিশেষ আলোকসজ্জা করা হয় এবং মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করা হয়।
ধর্মীয় সমাবেশ
পাকিস্তানের করাচিতে দাওয়াতে ইসলামীর আন্তর্জাতিক মাদানি কেন্দ্রে প্রতি বছর বৃহৎ মিরাজ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়, যেখানে লাখো মুসলমান অংশগ্রহণ করেন। এই ধরনের অনুষ্ঠান বিশ্বব্যাপী অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে ইসলামী পণ্ডিতরা মিরাজের ঘটনা বিস্তারিত বর্ণনা করেন এবং মুসলমানদের আধ্যাত্মিক শিক্ষা প্রদান করেন।
আধুনিক যুগে প্রাসঙ্গিকতা
আধুনিক যুগে শবে মেরাজের প্রাসঙ্গিকতা কমেনি বরং বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে মুসলমানরা সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে শবে মেরাজের শুভেচ্ছা বিনিময় করেন, অনলাইন লেকচার শোনেন এবং ভার্চুয়াল সমাবেশে অংশগ্রহণ করেন। ইসলামিক ফাইন্ডার ওয়েবসাইটের মতো অনেক প্ল্যাটফর্ম এই রাতে বিশেষ তথ্য ও গাইডলাইন প্রদান করে, যা বিশ্বব্যাপী লক্ষ লক্ষ মুসলমান দেখেন।
শবে মেরাজে করণীয় ও বর্জনীয়
করণীয় কাজসমূহ
শবে মেরাজে যেসব কাজ করা উচিত তার মধ্যে রয়েছে: গোসল করে পবিত্র হওয়া, নতুন পরিচ্ছন্ন কাপড় পরা, মসজিদে যাওয়া, যথাসম্ভব বেশি নফল নামাজ আদায় করা, কোরআন তিলাওয়াত করা, দরুদ শরীফ পাঠ করা, ইস্তিগফার করা, দান-খয়রাত করা, গরিবদের খাওয়ানো, মা-বাবার জন্য দোয়া করা, সমগ্র মুসলিম উম্মাহর জন্য দোয়া করা, এবং মিরাজের ঘটনা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করা।
বর্জনীয় কাজসমূহ
এই পবিত্র রাতে কিছু বিষয় এড়িয়ে চলা উচিত। অনর্থক কথাবার্তা, গীবত, মিথ্যা কথা, ঝগড়া-বিবাদ, গান-বাজনা, পাপকাজ এবং অন্যায় কাজ থেকে বিরত থাকতে হবে। এই রাতকে শুধুমাত্র খাওয়া-দাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে ইবাদতের মাধ্যমে কাটানো উচিত। আলে কুতুবের পরামর্শ অনুযায়ী, এই রাতে ঘুমিয়ে সময় নষ্ট না করে জেগে ইবাদত করা উত্তম।
শবে মেরাজের আধ্যাত্মিক তাৎপর্য
আত্মশুদ্ধির রাত
শবে মেরাজ হলো আত্মশুদ্ধির একটি বিশেষ সুযোগ। এই রাতে আল্লাহর রহমতের দরজা খোলা থাকে এবং বান্দাদের তওবা কবুল করা হয়। ইসলামী স্কলারদের মতে, যারা আন্তরিকভাবে তওবা করে এবং পাপ থেকে ফিরে আসার দৃঢ় সংকল্প করে, আল্লাহ তাদের ক্ষমা করে দেন। এই রাতে মানুষের চোখের আড়ালে ইবাদত করা বিশেষ ফজিলতপূর্ণ, কারণ এতে রিয়া (প্রদর্শনী) থেকে মুক্ত থাকা যায়।
আল্লাহর সান্নিধ্য লাভ
মিরাজের ঘটনা প্রমাণ করে যে আল্লাহর সান্নিধ্য লাভ করা সম্ভব এবং এটি প্রতিটি মুমিনের চূড়ান্ত লক্ষ্য হওয়া উচিত। দাওয়াতে ইসলামীর বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, নামাজের মাধ্যমে আমরা প্রতিদিন পাঁচবার আল্লাহর সান্নিধ্যে যাই এবং তাঁর সাথে কথা বলি। শবে মেরাজ আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, ইবাদতের মাধ্যমে আমরা আল্লাহর আরও নিকটবর্তী হতে পারি।
পরকালের প্রস্তুতি
এই রাতে মহানবী (সা.) জান্নাত ও জাহান্নাম পরিদর্শন করেন এবং সেখানকার অবস্থা দেখেন। এটি আমাদের পরকালের জন্য প্রস্তুতি নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা মনে করিয়ে দেয়। সহিহ মুসলিমের হাদিস অনুযায়ী, যারা শিরক থেকে মুক্ত থাকবে, আল্লাহ তাদের গুনাহ মাফ করবেন। তাই এই রাতে আমাদের উচিত তওহিদে বিশ্বাস দৃঢ় করা এবং সকল প্রকার শিরক থেকে বেঁচে থাকা।
শবে মেরাজ ইসলামের ইতিহাসে একটি অনন্য ও অলৌকিক ঘটনা, যা মুসলমানদের জন্য অসংখ্য শিক্ষা ও অনুপ্রেরণার উৎস। এই পবিত্র রাতে বিভিন্ন প্রকার নফল নামাজ, কোরআন তিলাওয়াত, দরুদ শরীফ, ইস্তিগফার, দান-খয়রাত এবং দোয়ার মাধ্যমে আমরা আল্লাহর নৈকট্য লাভ করতে পারি। ২০২৬ সালের ১৬ জানুয়ারি শুক্রবার দিবাগত এই মহিমান্বিত রাতে সকল মুসলমানের উচিত যথাসাধ্য ইবাদত-বন্দেগি করা এবং মিরাজের ঘটনা থেকে জীবনের জন্য শিক্ষা গ্রহণ করা। এই রাতের ইবাদত ৬০ বছরের ইবাদতের সমান সওয়াব বয়ে আনে, তাই এই সুযোগ যেন আমরা হাতছাড়া না করি। আল্লাহ তায়ালা যেন আমাদের সকলকে এই পবিত্র রাতে ইবাদত করার তৌফিক দান করেন এবং আমাদের সকল দোয়া কবুল করেন।











