শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ড রায়ের পর আশ্রয়দাতা ভারত এখন কোন পথে হাঁটবে?

বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ওপর সোমবার মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণা করেছে ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি)। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র আন্দোলনের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য এই রায় দেওয়া হয়েছে। ৭৮ বছর…

Avatar

 

বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ওপর সোমবার মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণা করেছে ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি)। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র আন্দোলনের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য এই রায় দেওয়া হয়েছে। ৭৮ বছর বয়সী শেখ হাসিনা, যিনি গত বছরের ৫ আগস্ট ক্ষমতা ছেড়ে ভারতে পালিয়ে যান, এখন মারাত্মক রাজনৈতিক ও আইনি সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে আছেন। ভারত তাকে আশ্রয় দিলেও ঢাকা সরকারের চাপ এবং আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির কারণে তার ভবিষ্যৎ এখন অনিশ্চিত। এই রায়ের পর দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক মানচিত্রে নতুন জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে এবং প্রশ্ন উঠেছে—শেখ হাসিনা এখন কোন পথে হাঁটবেন?

মৃত্যুদণ্ডের রায়: কী ছিল অভিযোগ?

ঢাকার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল শেখ হাসিনাকে মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দিয়েছে। ৪৫৩ পৃষ্ঠার এই রায়ে তিন বিচারকের প্যানেল জানায় যে শেখ হাসিনা ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট মাসে ছাত্র বিক্ষোভকারীদের ওপর নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিবর্ষণের নির্দেশ দিয়েছিলেন। জাতিসংঘের মানবাধিকার বিভাগের রিপোর্ট অনুযায়ী, এই সময়ের মধ্যে প্রায় ১,৪০০ জন নিহত হয়েছে।

প্রসিকিউশন পাঁচটি অভিযোগ উত্থাপন করেছিল, যার মধ্যে রয়েছে হত্যার নির্দেশ, নিরীহ বিক্ষোভকারীদের ওপর মারাত্মক অস্ত্রের ব্যবহার এবং ঢাকার চাঁখারপুলসহ বিভিন্ন স্থানে ছাত্রদের হত্যার দায়। ট্রাইব্যুনাল জানায় যে শেখ হাসিনা প্রত্যক্ষভাবে হত্যার নির্দেশ দিয়েছিলেন এবং নিরাপত্তা বাহিনীর নৃশংসতা প্রতিরোধে ব্যর্থ হয়েছিলেন। তার সাথে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকেও মৃত্যুদণ্ড এবং সাবেক পুলিশ প্রধান চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

শেখ হাসিনা এই রায় প্রত্যাখ্যান করে বলেছেন যে এটি “পক্ষপাতদুষ্ট এবং রাজনৈতিকভাবে অনুপ্রাণিত”। তিনি দাবি করেছেন যে একটি অনির্বাচিত সরকারের অধীনে গঠিত এই ট্রাইব্যুনাল একটি “প্রহসন” এবং তার বিরুদ্ধে অভিযোগগুলি সম্পূর্ণ মিথ্যা।

Bangladesh Government: শেখ হাসিনার নিরাপত্তা বৃদ্ধি: ভারতের কূটনৈতিক চালে কুপোকাত বাংলাদেশ

ভারতে আশ্রয়: কেন দিল্লি হাসিনাকে আশ্রয় দিল?

গত বছরের ৫ আগস্ট, শেখ হাসিনা ব্যাপক ছাত্র বিক্ষোভের মধ্যে বাংলাদেশ ছেড়ে ভারতের গাজিয়াবাদের হিন্ডন এয়ারবেসে অবতরণ করেন। তার এই পলায়ন ছিল জীবনের দ্বিতীয় বড় রাজনৈতিক সংকট। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ডের পর তিনি প্রথমবার ভারতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী তাকে রাজনৈতিক আশ্রয় দিয়েছিলেন এবং তিনি প্রায় ছয় বছর দিল্লিতে অবস্থান করেছিলেন। এবার শেখ হাসিনা দিল্লিতে একটি গোপন নিরাপদ আবাসে তার ছোট বোন শেখ রেহানাসহ অবস্থান করছেন।

ভারত শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দিয়েছে প্রধানত দুটি কারণে—ঐতিহাসিক সম্পর্ক এবং কৌশলগত স্বার্থ। শেখ হাসিনা ভারতের সাথে দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখেছিলেন এবং তার সরকারের সময়ে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য, সংযোগ এবং নিরাপত্তা সহযোগিতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছিল। দিল্লি তাকে একজন নির্ভরযোগ্য মিত্র হিসেবে বিবেচনা করত এবং তার সরকারের পতনের পর তাকে আশ্রয় দেওয়াকে মানবিক এবং কৌশলগত উভয় কারণেই প্রয়োজনীয় মনে করেছে।

তবে এই সিদ্ধান্ত বিতর্কিত হয়েছে। বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার এবং রাজনৈতিক দলগুলি ভারতের এই পদক্ষেপকে “অগণতান্ত্রিক নেতৃত্বের পৃষ্ঠপোষকতা” হিসেবে দেখছে। ঢাকা থেকে আনুষ্ঠানিক প্রত্যর্পণের অনুরোধ সত্ত্বেও দিল্লি কোনো সরকারি সাড়া দেয়নি। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় শুধু নিশ্চিত করেছে যে তারা অনুরোধটি পেয়েছে কিন্তু এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি।

ঢাকার প্রত্যর্পণ দাবি এবং দিল্লির নীরবতা

বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার, যার নেতৃত্বে রয়েছেন নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী মুহাম্মদ ইউনূস, আনুষ্ঠানিকভাবে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের জন্য ভারতের কাছে কূটনৈতিক চিঠি পাঠিয়েছে। ইউনূস সরকার বলেছে যে শেখ হাসিনাকে মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং গণহত্যার জন্য বিচারের মুখোমুখি হতে হবে। তবে ভারত এখনও পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক সাড়া দেয়নি।

ইউনূস সরকারের প্রেস সেক্রেটারি শফিকুল আলম বলেছেন যে “দীর্ঘদিন ধরে ভারত বাংলাদেশের আইনসম্মত প্রত্যর্পণ অনুরোধ মানতে অস্বীকার করছে” এবং এই অবস্থান “আর গ্রহণযোগ্য নয়”। তিনি সতর্ক করেছেন যে “আঞ্চলিক বন্ধুত্ব, কৌশলগত বিবেচনা বা রাজনৈতিক উত্তরাধিকার” নাগরিকদের ইচ্ছাকৃত হত্যার ন্যায্যতা দিতে পারে না।

আইনগত দৃষ্টিকোণ থেকে, ভারত এবং বাংলাদেশের মধ্যে একটি দ্বিপাক্ষিক প্রত্যর্পণ চুক্তি রয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন যে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, আইনি নয়। প্রত্যর্পণ চুক্তিতে এমন বেশ কয়েকটি ধারা রয়েছে যা রাজনৈতিক অপরাধ বা রাজনৈতিকভাবে অনুপ্রাণিত মামলার ক্ষেত্রে প্রত্যর্পণ অস্বীকার করার সুযোগ দেয়। ভারত এই যুক্তি ব্যবহার করে শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণ না করার সিদ্ধান্ত নিতে পারে।

তবে এই নীরবতার মূল্য দিতে হচ্ছে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কে। ঢাকার নতুন সরকার দিল্লির অবস্থানকে “বাংলাদেশের জনগণের ইচ্ছার বিরুদ্ধে” হিসেবে দেখছে। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) থেকে জামায়াতে ইসলামী পর্যন্ত সব দলই ভারতের এই পদক্ষেপের বিরোধিতা করছে।

শেখ হাসিনার ভবিষ্যৎ: তিনটি সম্ভাব্য পথ

ভারতীয় সরকারের সূত্রের বরাত দিয়ে বাংলাদেশি সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে যে শেখ হাসিনার ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনটি সম্ভাব্য বিকল্প রয়েছে।

প্রথম বিকল্প: তৃতীয় দেশে আশ্রয়

শেখ হাসিনার জন্য তৃতীয় কোনো দেশে নিরাপদ আশ্রয় খোঁজার চেষ্টা সম্পূর্ণভাবে বাদ দেওয়া হয়নি। ভারত অনানুষ্ঠানিকভাবে কাতার, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং কয়েকটি ছোট ইউরোপীয় দেশের সাথে আলোচনা করেছে। তবে এখনও পর্যন্ত এমন কোনো দেশ পাওয়া যায়নি যা শেখ হাসিনার সব প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ করে। কিছু আলোচনা যথেষ্ট অগ্রগতি হলেও কোনো সফলতা আসেনি।

সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, শেখ হাসিনা সংযুক্ত আরব আমিরাতের আজমান শহরে যেতে পারেন বলে একসময় গুজব ছড়িয়েছিল, তবে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন জানিয়েছেন যে তারা ভারত এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত উভয় দেশেই শেখ হাসিনার অবস্থান সম্পর্কে তথ্য চেয়েছিল কিন্তু কোনো নিশ্চিতকরণ পাননি। ঢাকা ট্রিবিউনের অনুসন্ধান নিশ্চিত করেছে যে শেখ হাসিনা এখনও ভারতেই আছেন এবং দেশ ছেড়ে যাননি।

দ্বিতীয় বিকল্প: ভারতে দীর্ঘমেয়াদী অবস্থান

দ্বিতীয় বিকল্প হলো শেখ হাসিনাকে দীর্ঘ সময়ের জন্য ভারতে রাখা, কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা ছাড়াই। ভারতের কর্তৃত্ব রয়েছে তাকে যতদিন প্রয়োজন ততদিন থাকার অনুমতি দেওয়ার। কূটনৈতিক পাসপোর্টের অধীনে ৪৫ দিনের ভিসামুক্ত থাকার নিয়ম এই ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়, কারণ ভারত শেখ হাসিনার প্রবেশকে বৈধ বলে মনে করে। দিল্লি সহজেই এমন একজন উচ্চপদস্থ অতিথির জন্য অনির্দিষ্টকালের জন্য থাকার ব্যবস্থা করতে পারে।

তৃতীয় বিকল্প: রাজনৈতিক আশ্রয়

তৃতীয় বিকল্প হলো শেখ হাসিনাকে রাজনৈতিক আশ্রয় প্রদান করা, যা তাকে স্থায়ীভাবে বা যতদিন তিনি চান ততদিন ভারতে থাকার অনুমতি দেবে। তবে ভারত সরকার এই পথে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলে সম্ভবত সব প্রধান রাজনৈতিক দলের সাথে পরামর্শ করবে। কংগ্রেসের সাথে শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক এবং গান্ধী পরিবারের সাথে তার বন্ধুত্বের কারণে এই প্রস্তাব ব্যাপক সমর্থন পেতে পারে এবং একটি ঐকমত্যের সিদ্ধান্ত হতে পারে।

বিশ্লেষকরা বলছেন যে এই তিনটি বিকল্পের মধ্যে প্রথমটি সম্পূর্ণভাবে ভারতের নিয়ন্ত্রণে নেই, কারণ এটি তৃতীয় দেশের পরিস্থিতি এবং শর্তের ওপর নির্ভরশীল। তবে অন্য দুটি বিকল্প সম্পূর্ণভাবে ভারতের হাতে। সূত্রগুলি বলছে যে শেখ হাসিনাকে দীর্ঘ সময়ের জন্য ভারতে থাকতে হতে পারে এবং দিল্লি ধীরে ধীরে এই বাস্তবতার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে।

মৃত্যুদণ্ডের রায়ের পর শেখ হাসিনার প্রতিক্রিয়া

সোমবারের রায়ের পর শেখ হাসিনা একটি বিবৃতিতে ট্রাইব্যুনালের সিদ্ধান্তকে “পক্ষপাতদুষ্ট এবং রাজনৈতিকভাবে অনুপ্রাণিত” বলে সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেছেন, “আমার বিরুদ্ধে ঘোষিত রায়গুলি একটি কারচুপিকৃত ট্রাইব্যুনাল দ্বারা করা হয়েছে যা একটি অনির্বাচিত সরকার দ্বারা প্রতিষ্ঠিত এবং পরিচালিত হয়েছে যার কোনো গণতান্ত্রিক বৈধতা নেই”। তিনি দাবি করেছেন যে মৃত্যুদণ্ডের দাবিতে অন্তর্বর্তী সরকারের চরমপন্থী ব্যক্তিদের “বাংলাদেশের শেষ নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রীকে অপসারণ এবং আওয়ামী লীগকে একটি রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে বাতিল করার” উদ্দেশ্য রয়েছে।

শেখ হাসিনা তার কার্যকালের রেকর্ড তুলে ধরে বলেছেন যে তিনি বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালতে যোগদান করিয়েছিলেন, মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা শরণার্থীদের আশ্রয় দিয়েছিলেন, বিদ্যুৎ এবং শিক্ষার প্রবেশাধিকার সম্প্রসারিত করেছিলেন এবং ১৫ বছরে ৪৫০% জিডিপি বৃদ্ধি তদারকি করেছিলেন যা লাখ লাখ মানুষকে দারিদ্র্য থেকে উত্তোলন করেছিল। তিনি যোগ করেছেন, “এই অর্জনগুলি ঐতিহাসিক রেকর্ডের বিষয়”।

রায়ের আগে একটি অডিও বার্তায়, শেখ হাসিনা বলেছিলেন, “তারা যে রায়ই ঘোষণা করুক না কেন, আমার কাছে তা কোনো ব্যাপার নয়। আল্লাহ আমাকে এই জীবন দিয়েছেন এবং শুধুমাত্র তিনিই এটি শেষ করতে পারেন। আমি এখনও আমার জনগণের সেবা করব”।

তার ছেলে এবং উপদেষ্টা সাজিব ওয়াজেদ সতর্ক করেছেন যে আওয়ামী লীগের সমর্থকরা ফেব্রুয়ারির নির্বাচন বাধা দেবে যদি দলটির ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার না করা হয়, এবং প্রতিবাদ সহিংসতায় রূপান্তরিত হতে পারে বলেও সতর্ক করেছেন।

বাংলাদেশে রাজনৈতিক সংকট এবং আসন্ন নির্বাচন

বাংলাদেশ এখন একটি গুরুতর রাজনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার ফেব্রুয়ারি ২০২৬ সালে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের অঙ্গীকার করেছে। তবে নির্বাচন কমিশন জাতীয় নিরাপত্তার উদ্বেগ এবং যুদ্ধাপরাধ তদন্তের কারণ দেখিয়ে আওয়ামী লীগের নিবন্ধন স্থগিত করেছে।

ইউনূস সরকার “জুলাই চার্টার” নামে একটি ২৬-দফা সংস্কার পরিকল্পনা প্রকাশ করেছে, যার মধ্যে রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর জন্য দুই মেয়াদের সীমা, শক্তিশালী ক্ষমতার ভারসাম্য এবং বাংলাদেশকে একটি বহু-জাতিগত, বহু-ধর্মীয় রাষ্ট্র হিসেবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি। একটি জাতীয় গণভোট এবং সাধারণ নির্বাচন একই দিনে অনুষ্ঠিত হবে বলে ঘোষণা করা হয়েছে।

শেখ হাসিনা এই নির্বাচনকে “বৈধতাহীন” বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন এবং বলেছেন যে তিনি কোনো সরকারের অধীনে দেশে ফিরবেন না যা তার দল বাদ দিয়ে গঠিত হবে। তিনি সতর্ক করেছেন যে আওয়ামী লীগের কয়েক মিলিয়ন সমর্থক নির্বাচন বয়কট করবে এবং এটি বাংলাদেশের গণতন্ত্রের জন্য বিপর্যয়কর হবে।

আওয়ামী লীগ ছাড়া বিএনপি আসন্ন নির্বাচনে নেতৃত্ব দেওয়ার আশা করা হচ্ছে, যখন জামায়াতে ইসলামী, দেশের বৃহত্তম ইসলামপন্থী সংগঠন, শক্তি অর্জন করছে। ১২.৬ কোটি নিবন্ধিত ভোটার সহ বাংলাদেশ তার সবচেয়ে গুরুতর রাজনৈতিক সংকটের মুখোমুখি হচ্ছে কয়েক দশকে।

ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কে উত্তেজনা

শেখ হাসিনার আশ্রয় ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কে উল্লেখযোগ্য চাপ সৃষ্টি করেছে। ইউনূস সরকার প্রকাশ্যে ভারতের শেখ হাসিনার প্রতি সমর্থনকে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের অবনতির কারণ বলে দোষারোপ করেছে। বাংলাদেশি কর্তৃপক্ষ অভিযোগ করেছে যে শেখ হাসিনা ভারত থেকে উস্কানিমূলক বক্তৃতা দিচ্ছেন এবং বাংলাদেশে সহিংসতা উসকে দেওয়ার জন্য নির্দেশ দিচ্ছেন।

দুই দেশের মধ্যে প্রায় ৭০টি দ্বিপাক্ষিক প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া রয়েছে যা নিরাপত্তা, বাণিজ্য, শক্তি, পরিবহন এবং নদী বিষয়ক বিভিন্ন ক্ষেত্র কভার করে। তবে শেখ হাসিনার পতনের পর এই সহযোগিতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন জানিয়েছেন যে দুই দেশের সম্পর্ক একটি “পুনর্বিন্যাস পর্যায়ের” মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।

২০২৫ সালের ৪ এপ্রিল, মুহাম্মদ ইউনূস এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ব্যাংককে ষষ্ঠ বিমস্টেক সম্মেলনের পাশাপাশি প্রথমবারের মতো দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করেন। আলোচিত বিষয়গুলির মধ্যে ছিল শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ, সীমান্ত হত্যা, ফারাক্কায় গঙ্গা এবং তিস্তার পানি ভাগাভাগি, এবং শেখ হাসিনার নির্বাসনের পর বাংলাদেশে হিন্দু সংখ্যালঘুদের নিপীড়ন।

ভারত বাংলাদেশে হিন্দু সংখ্যালঘুদের ওপর আক্রমণ নিয়ে বারবার উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। শেখ হাসিনা ইউনূস সরকারকে “রাষ্ট্র-অনুমোদিত নৃশংসতা” এবং সংখ্যালঘুদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করার অভিযোগ করেছেন। তিনি বলেছেন যে ভারত এবং বাংলাদেশের সম্পর্ক “৪,০০০ কিলোমিটার সীমান্ত, গভীর পারিবারিক এবং সাংস্কৃতিক সম্পর্ক এবং গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা স্বার্থের” ওপর ভিত্তি করে।

ভারতের হাইকমিশনার প্রণয় বর্মা বলেছেন যে নয়াদিল্লি ঢাকার সাথে একটি “স্থিতিশীল, গঠনমূলক সম্পর্ক” বজায় রাখতে চায়। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন যে শেখ হাসিনার আশ্রয় এবং প্রত্যর্পণ দাবি এই সম্পর্কের জন্য একটি বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক: নতুন ঢাকা সরকারের সাথে কূটনৈতিক সংলাপে দিল্লির অগ্রাধিকার

শেখ হাসিনার পথ: রাজনৈতিক নির্বাসন নাকি প্রত্যাবর্তন?

শেখ হাসিনা নিজে বলেছেন যে তিনি দেশে ফিরতে চান, তবে শুধুমাত্র একটি “বৈধ সরকারের” অধীনে যা সাংবিধানিক শাসন পুনরুদ্ধার করবে। তিনি জোর দিয়ে বলেছেন যে তার ফিরে যাওয়ার জন্য বাংলাদেশে অবশ্যই আওয়ামী লীগ পুনর্বহাল করে মুক্ত, ন্যায্য এবং অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে হবে। তিনি বলেছেন, “আমি ব্যক্তিগত ক্ষমতা চাইছি না। এটি কখনোই আমার বা আমার পরিবার সম্পর্কে ছিল না। এটি নিশ্চিত করা যে বাংলাদেশের জনগণ তাদের প্রতিনিধিদের বেছে নেওয়ার মৌলিক অধিকার প্রয়োগ করতে পারে”।

তবে বাস্তবতা হলো যে শেখ হাসিনার বাংলাদেশে ফিরে যাওয়ার সম্ভাবনা এখন অত্যন্ত কম। ট্রাইব্যুনালের নিয়ম অনুযায়ী, তিনি রায়ের ৩০ দিনের মধ্যে আত্মসমর্পণ বা গ্রেফতার না হলে আপিল করতে পারবেন না। আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ, এবং তার বেশিরভাগ নেতা হয় কারাবন্দি, নাকি পালিয়ে গেছে। ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ছাড়া অনুষ্ঠিত হলে তা শেখ হাসিনার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎকে আরও অনিশ্চিত করবে।

শেখ হাসিনা দিল্লিতে বসবাস সম্পর্কে বলেছেন, “দিল্লিতে, আমি আমার দিন সম্পর্কে যেতে এবং যুক্তিসঙ্গতভাবে যা চাই তা করতে মুক্ত”। তবে তিনি বারবার জানিয়েছেন যে এটি একটি অস্থায়ী পরিস্থিতি এবং তিনি দেশে ফিরে যাওয়ার আশা রাখেন।

আঞ্চলিক এবং আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া

শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ডের রায় আন্তর্জাতিক মনোযোগ আকর্ষণ করেছে। জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ আওয়ামী লীগের ওপর নিষেধাজ্ঞাকে “স্বৈরাচারী” বলে নিন্দা করেছে।

ভারত এবং চীন উভয়েই বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিয়ে আগ্রহী। চীন বাংলাদেশে তার প্রভাব বৃদ্ধি করছে, বিশেষত অবকাঠামো এবং প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে, যা ভারতের জন্য একটি কৌশলগত উদ্বেগের বিষয়। পাকিস্তানও বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনকে ঘনিষ্ঠভাবে দেখছে।

বাংলাদেশ এখন একটি ক্রান্তিকালের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলিতে দেশজুড়ে অপরিশোধিত বোমা হামলা, অগ্নিসংযোগ এবং সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। নিরাপত্তা বাহিনী সর্বোচ্চ সতর্কতায় রয়েছে এবং ঢাকার পুলিশ কমিশনার “গুলি করার” নির্দেশ জারি করেছেন যদি কেউ গাড়িতে আগুন দেওয়ার বা অপরিশোধিত বোমা নিক্ষেপ করার চেষ্টা করে।

 অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ

শেখ হাসিনা এখন একটি গুরুতর রাজনৈতিক এবং আইনি সংকটের মধ্যে আটকে আছেন। মৃত্যুদণ্ডের রায় তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের জন্য একটি বড় আঘাত, কিন্তু তিনি দৃঢ়ভাবে রায় প্রত্যাখ্যান করেছেন এবং বলেছেন যে তিনি তার জনগণের সেবা চালিয়ে যাবেন। ভারত তাকে আশ্রয় দিয়ে একটি মানবিক অঙ্গীকার পূরণ করেছে, কিন্তু এই সিদ্ধান্ত ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কে নতুন উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে।

শেখ হাসিনার ভবিষ্যৎ এখন তিনটি সম্ভাব্য পথের মধ্যে সীমাবদ্ধ: তৃতীয় দেশে আশ্রয়, ভারতে দীর্ঘমেয়াদী অবস্থান, বা রাজনৈতিক আশ্রয়। যে পথেই তিনি হাঁটুন না কেন, এটা স্পষ্ট যে তার বাংলাদেশে ফিরে যাওয়ার সম্ভাবনা এখন অত্যন্ত কম, অন্তত নিকট ভবিষ্যতে। তবে শেখ হাসিনা নিজে আশাবাদী এবং বলেছেন, “বাংলাদেশ এই অবস্থায় থাকতে পারে না এবং থাকবে না… আমরা আবার উঠে দাঁড়াব”।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ, ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের গতিপথ এবং শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত ভাগ্য—সব কিছুই এখন ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর নির্বাচনের ওপর নির্ভর করছে। এই নির্বাচন শুধুমাত্র বাংলাদেশের জন্য নয়, সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক ভূ-দৃশ্যের জন্য একটি নির্ধারক মুহূর্ত হবে।

About Author
Avatar

বাংলাদেশ প্রতিনিধি থেকে সঠিক ও নির্ভরযোগ্য খবর পেতে আমাদের সংবাদ ওয়েবসাইট দেখুন। তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের বিস্তারিত জানুন।