মা এসেছেন, চারদিন আনন্দ দিয়েছেন এবং আবার কৈলাসের পথে পাড়ি দিয়েছেন। এই আনন্দ ও বিষাদের মিশ্র অনুভূতিই বিজয়া দশমীর মূল সুর। উৎসব শেষের এই লগ্নে, “Think Bengal“-এর পক্ষ থেকে আমাদের সকল পাঠক, দর্শক এবং শুভানুধ্যায়ীদের জানাই শুভ বিজয়ার আন্তরিক প্রীতি, শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। এই দিনটি কেবল প্রতিমা বিসর্জনের নয়, এটি মানুষের সাথে মানুষের মনকে মেলানোর এক মহান উৎসব। বিজয়া দশমী হলো অশুভ শক্তির বিনাশ এবং শুভ শক্তির জয়ের প্রতীক। শাস্ত্রীয় তাৎপর্যের পাশাপাশি এর একটি সামাজিক দিকও রয়েছে, যা ভেদাভেদ ভুলে সকলকে একাত্ম হওয়ার বার্তা দেয়। এই দিনে মিষ্টিমুখ, কোলাকুলি এবং বড়দের পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করার মধ্যে দিয়ে যে আন্তরিকতার আদান-প্রদান হয়, তা বাঙালির শ্রেষ্ঠ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের পরিচায়ক।
বিজয়া দশমীর এই শুভক্ষণে আমাদের কামনা, সকলের জীবন থেকে দুঃখ, গ্লানি ও অশুভ শক্তির বিনাশ হোক এবং আনন্দ, শান্তি ও সমৃদ্ধিতে ভরে উঠুক। দেবী দুর্গার আশীর্বাদে আগামী দিনগুলি হোক মঙ্গলময়।
বিজয়া দশমী: শুধু উৎসবের শেষ নয়, এক নতুন সূচনার আহ্বান
বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসব দুর্গাপূজার সমাপ্তি ঘটে বিজয়া দশমীর মাধ্যমে। ‘বিজয়া’ শব্দটি ‘জয়’ থেকে উদ্ভূত, যা মূলত দেবী দুর্গার মহিষাসুর বধের বিজয়কে নির্দেশ করে। টানা দশ দিন ধরে চলা এই উৎসবের শেষ দিনে প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হয়, যা মায়ের কৈলাসে ফিরে যাওয়াকে প্রতীকবাদ করে। কিন্তু এই বিদায় কেবলই বিষাদের নয়, এর মধ্যে মিশে থাকে একরাশ আনন্দ ও আগামী বছর মায়ের ফিরে আসার অপেক্ষা। জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সংস্থা (UNESCO) কলকাতার দুর্গাপূজাকে “মানবতার জন্য এক অমূল্য সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য” (Intangible Cultural Heritage of Humanity) হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে, যা এই উৎসবের বিশ্বজনীন আবেদনকে প্রতিষ্ঠা করে।
বিজয়া দশমী শুধুমাত্র একটি ধর্মীয় রীতি নয়, এটি বাঙালির সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই দিনে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানুষ একে অপরের বাড়িতে যান, শুভেচ্ছা বিনিময় করেন এবং মিষ্টিমুখ করেন। এটি সম্পর্কের পুনর্নবীকরণ এবং সামাজিক সম্প্রীতিকে আরও মজবুত করার এক অনন্য উপলক্ষ
পৌরাণিক কাহিনীর গভীরে বিজয়া দশমী
বিজয়া দশমীর তাৎপর্য বুঝতে হলে আমাদের ফিরে তাকাতে হবে এর পেছনের পৌরাণিক কাহিনীগুলোর দিকে। একাধিক powerful আখ্যান এই দিনটিকে মহিমান্বিত করেছে।
দেবী দুর্গার মহিষাসুর বধ
বিজয়া দশমীর সবচেয়ে প্রচলিত আখ্যানটি হলো দেবী দুর্গার বিজয়গাথা। পৌরাণিক কাহিনী অনুসারে, মহিষাসুর নামক এক অসুর ব্রহ্মার বরে বলীয়ান হয়ে উঠেছিল যে কোনও পুরুষ তাকে বধ করতে পারবে না। এই ক্ষমতার অপব্যবহার করে সে স্বর্গ, মর্ত্য ও পাতাল—এই তিন লোকে নিজের আধিপত্য স্থাপন করে এবং দেবতাদের বিতাড়িত করে। দেবতারা তখন ত্রিদেব—ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও মহেশ্বরের শরণাপন্ন হন। তিন দেবতার সম্মিলিত তেজ এবং অন্যান্য দেবতাদের শক্তি থেকে আবির্ভূত হন দেবী দুর্গা। দশ হাতে দশ অস্ত্র নিয়ে তিনি মহিষাসুরের সাথে নয় দিন ও নয় রাত্রি ব্যাপী এক ভয়ঙ্কর যুদ্ধে লিপ্ত হন। অবশেষে দশম দিনে, অর্থাৎ শুক্লপক্ষের দশমী তিথিতে, তিনি মহিষাসুরকে বধ করেন। এই বিজয়ই ‘বিজয়া দশমী’ নামে পরিচিত। এই ঘটনাটি অশুভ শক্তির উপর শুভ শক্তির জয়ের চিরন্তন প্রতীক। এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা (Encyclopaedia Britannica) অনুসারে, এই নয় রাতের যুদ্ধই ‘নবরাত্রি’ এবং দশম দিনের বিজয় ‘দশেরা’ বা ‘বিজয়া দশমী’ হিসেবে পালিত হয়।
শ্রীরামচন্দ্রের রাবণ বধ ও অকালবোধন
বিজয়া দশমীর সাথে জড়িয়ে আছে রামায়ণের কাহিনীও। ত্রেতা যুগে লঙ্কার রাজা রাবণ সীতাকে হরণ করলে শ্রীরামচন্দ্র তাকে উদ্ধার করার জন্য লঙ্কার দিকে অগ্রসর হন। কিন্তু রাবণের অপ্রতিরোধ্য শক্তি এবং তার বিশাল রাক্ষস বাহিনীর সামনে জয়লাভ করা সহজ ছিল না। তখন ভগবান ব্রহ্মার পরামর্শে শ্রীরামচন্দ্র দেবী দুর্গার পূজা করার সিদ্ধান্ত নেন, যা ‘অকালবোধন’ নামে পরিচিত। কারণ, সেই সময়টি ছিল দেবতাদের ঘুমের সময় বা ‘দক্ষিণায়ন’। শরৎকালে দেবীর এই অকাল পূজা করে রামচন্দ্র তাঁর আশীর্বাদ লাভ করেন এবং শুক্লপক্ষের দশমী তিথিতেই রাবণকে বধ করে সীতাকে উদ্ধার করেন। রাবণ বধের এই বিজয়কেও বিজয়া দশমীর অন্যতম কারণ হিসেবে গণ্য করা হয় এবং ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে এই দিনটিকে ‘দশেরা’ হিসেবে পালন করা হয়, যেখানে রাবণের কুশপুত্তলিকা দাহ করা হয়।
উমার ঘরে ফেরা এবং কৈলাসে প্রত্যাবর্তন
বিজয়া দশমীর একটি অত্যন্ত মানবিক এবং emocional দিকও রয়েছে। দেবী দুর্গা এখানে কেবল রণরঙ্গিনী দেবী নন, তিনি হিমালয় এবং মেনকার কন্যা ‘উমা’। পূজার এই চারটি দিন তিনি স্বামীগৃহ কৈলাস থেকে তার সন্তানদের—লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক ও গণেশকে নিয়ে বাপের বাড়ি অর্থাৎ পৃথিবীতে আসেন। তাই দুর্গাপূজা বাঙালির কাছে শুধু পূজা নয়, ঘরের মেয়ের ঘরে ফেরার আনন্দ। বিজয়া দশমীর দিনে সেই মেয়ের আবার স্বামীগৃহে ফিরে যাওয়ার পালা। তাই এই বিদায়লগ্নে একদিকে যেমন জয়ের আনন্দ থাকে, তেমনই অন্যদিকে থাকে মেয়েকে বিদায় দেওয়ার বিষাদ। প্রতিমা বিসর্জনের সময় ঢাকের করুণ সুর এবং “আসছে বছর আবার হবে” ধ্বনির মধ্যে দিয়ে সেই আনন্দ-বিষাদের মিশ্র অনুভূতিই প্রকাশ পায়।
বিজয়া দশমীর সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য
বিজয়া দশমীর ধর্মীয় আচারের পাশাপাশি এর সামাজিক ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব অপরিসীম। বেশ কিছু অনন্য প্রথা এই দিনটিকে মহিমান্বিত করে তুলেছে।
প্রতিমা বিসর্জন
বিজয়া দশমীর প্রধান অঙ্গ হলো প্রতিমা বিসর্জন। পূজা মণ্ডপ থেকে বিশাল শোভাযাত্রা সহকারে প্রতিমা ঘাটে নিয়ে যাওয়া হয় এবং মন্ত্রোচ্চারণের মাধ্যমে দেবীকে জলে বিসর্জন দেওয়া হয়। এটি দেবীর মর্ত্যলোক থেকে কৈলাসে ফিরে যাওয়ার প্রতীক। এই বিসর্জনের দৃশ্য একদিকে যেমন বেদনাদায়ক, তেমনই এর মধ্যে রয়েছে এক আধ্যাত্মিক তাৎপর্য—যা কিছু মূর্ত, তা একদিন নিরাকারে বিলীন হবে। কলকাতার গঙ্গার ঘাটগুলিতে বিসর্জনের দৃশ্য এক অসাধারণ অভিজ্ঞতা, যা দেখতে দেশ-বিদেশ থেকে বহু পর্যটক ভিড় জমান। পশ্চিমবঙ্গ পর্যটন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, কলকাতার রেড রোডে আয়োজিত দুর্গাপূজা কার্নিভাল এখন এক আন্তর্জাতিক আকর্ষণ, যেখানে সেরা পূজা কমিটিগুলি তাদের প্রতিমা নিয়ে এক বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রায় অংশ নেয়।
সিঁদুর খেলা
বিজয়া দশমীর অন্যতম আকর্ষণীয় এবং রঙিন প্রথা হলো ‘সিঁদুর খেলা’। প্রতিমা বিসর্জনের আগে বিবাহিত মহিলারা মণ্ডপে একত্রিত হন। তারা প্রথমে দেবীর পায়ে সিঁদুর অর্পণ করেন এবং মিষ্টিমুখ করান। এরপর তারা একে অপরের সিঁথিতে এবং মুখে সিঁদুর মাখিয়ে দেন। এই প্রথাটি একে অপরের দীর্ঘ ও সুখী দাম্পত্য জীবন কামনার প্রতীক। এটি নারীশক্তির একাত্মতা এবং পারস্পরিক সৌহার্দ্যের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। আধুনিক যুগে এই প্রথায় অনেক পরিবর্তন এসেছে, এবং বর্তমানে অনেক জায়গায় বিবাহিত-অবিবাহিত নির্বিশেষে সকল নারীই এই খেলায় অংশ নিয়ে থাকেন, যা এটিকে আরও বেশি অন্তর্ভুক্তিমূলক করে তুলেছে।
শান্তিজল গ্রহণ ও শুভেচ্ছা বিনিময়
প্রতিমা বিসর্জন দিয়ে বাড়ি ফেরার পর পূজার ঘটে রাখা জল, যা ‘শান্তিজল’ নামে পরিচিত, তা পরিবারের সকলের মাথায় ছিটিয়ে দেওয়া হয়। বিশ্বাস করা হয় যে, এই জল সমস্ত অশুভ শক্তি থেকে রক্ষা করে এবং গৃহে শান্তি ফিরিয়ে আনে। এরপর শুরু হয় বিজয়ার মূল পর্ব—শুভেচ্ছা বিনিময়। ছোটরা বড়দের পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করে আশীর্বাদ গ্রহণ করে এবং সমবয়সীরা একে অপরের সাথে কোলাকুলি করে। এই প্রথাটি সম্পর্কগুলোকে নতুন করে ঝালিয়ে নেওয়ার এবং পুরনো কোনও মনোমালিন্য থাকলে তা ভুলে যাওয়ার সুযোগ করে দেয়।
| প্রথা | তাৎপর্য | অংশগ্রহণকারী |
| প্রতিমা বিসর্জন | দেবীর কৈলাসে প্রত্যাবর্তন এবং মূর্তির নিরাকারে বিলীন হওয়া। | সকল ভক্ত |
| সিঁদুর খেলা | সুখী দাম্পত্য জীবন কামনা এবং নারী-সংহতির প্রতীক। | মূলত বিবাহিত নারী (এখন সকলেই) |
| কোলাকুলি ও প্রণাম | পারস্পরিক শ্রদ্ধা, ভালোবাসা এবং সামাজিক বন্ধন দৃঢ় করা। | সকল স্তরের মানুষ |
| মিষ্টিমুখ | উৎসবের আনন্দ ভাগ করে নেওয়া এবং সম্পর্কের মিষ্টতা বৃদ্ধি করা। | অতিথি ও আপ্যায়নকারী |
বিজয়ার মিষ্টিমুখ: সম্পর্কের মিষ্টতা
বাঙালির কোনো উৎসবই মিষ্টি ছাড়া সম্পূর্ণ হয় না, আর বিজয়া দশমী তো মিষ্টিমুখের জন্যই বিখ্যাত। এই দিনে প্রত্যেক বাড়িতেই নাড়ু, নিমকি, সন্দেশ, রসগোল্লার মতো বিভিন্ন ধরনের মিষ্টি এবং নোনতা খাবার তৈরি করা হয়। অতিথিরা বাড়িতে এলে তাদের মিষ্টিমুখ করানো হয়, যা সম্পর্কের মিষ্টতা এবং আন্তরিকতাকে প্রকাশ করে। এই আতিথেয়তার মাধ্যমে সামাজিক বন্ধন আরও দৃঢ় হয়











