পশ্চিমবঙ্গে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (SIR) প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে ৪ নভেম্বর ২০২৫ থেকে, যার অংশ হিসেবে বুথ লেভেল অফিসার (BLO) বাড়ি বাড়ি এনুমারেশন ফর্ম বিতরণ করছেন। এই ফর্মটি পূরণ না করলে বা ভুল তথ্য দিলে আপনার ভোটার নাম তালিকা থেকে মুছে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে, যা আপনার ভোটাধিকারকে সরাসরি প্রভাবিত করবে। নির্বাচন কমিশনের (ECI) নির্দেশ অনুসারে, এই প্রক্রিয়া ২০০২ সালের ভোটার তালিকার সাথে বর্তমান তালিকা যাচাই করে নিশ্চিত করবে যে কোনো অবৈধ নাম নেই, এবং নতুন ভোটার যোগ করা হবে। প্রথম তিন দিনেই ২.১০ কোটি ফর্ম বিতরিত হয়েছে, যা রাজ্যের মোট ৭.৩ কোটিরও বেশি ভোটারের প্রায় ২৮% কভার করে। এই নিবন্ধে আমরা বিস্তারিত জানবো কীভাবে ফর্ম পূরণ করবেন, ভুলের পরিণতি কী, এবং কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ – সবকিছু নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে যাচাইকৃত তথ্যের ভিত্তিতে।
SIR কী এবং এর পটভূমি
SIR অর্থাৎ Special Intensive Revision, ভোটার তালিকার একটি বিশেষ সংশোধন প্রক্রিয়া যা নির্বাচন কমিশন অব্যবহারিক নাম মুছে ফেলতে এবং নতুন ভোটার যোগ করতে চালায়। পশ্চিমবঙ্গে এটি ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে চালু হয়েছে, যাতে তালিকা ১০০% সঠিক হয়। ECI-এর মতে, এই প্রক্রিয়া ১৯৬০ সালের নির্বাচনী নিয়মাবলীর অধীনে পরিচালিত হচ্ছে।
বিএলওদের সাম্মানিক দ্বিগুণ, SIR কাজে ৬ হাজার টাকা অতিরিক্ত সুবিধা: নির্বাচন কমিশনের বড় ঘোষণা!
SIR-এর ইতিহাস এবং উদ্দেশ্য
ভারতে SIR প্রথমবারের মতো বিহারে ২০২৫ সালে ব্যাপকভাবে চালু হয়, যেখানে প্রায় ৬৫ লক্ষ ভোটারের নাম মুছে ফেলা হয়েছে, কিন্তু পরে ৭৪.২ মিলিয়ন নতুন তালিকায় যোগ হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে এটি দ্বিতীয় পর্যায়, যা ১২টি রাজ্য এবং কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে ৫১ কোটি ভোটার কভার করছে। উদ্দেশ্য স্পষ্ট: অবৈধ ভোটার (যেমন মৃত ব্যক্তি বা দ্বিগুণ নাম) মুছে ফেলা এবং ১৮-২০ বছরের নতুন ভোটার যোগ করা। রাজ্যে প্রি-SIR ম্যাপিং-এ দেখা গেছে, ২০০২ সালের তালিকার সাথে ৪৫% মিল নেই, যা প্রায় ২ কোটি ভোটারের ঝুঁকিতে ফেলেছে।
এই প্রক্রিয়া শুধুমাত্র প্রশাসনিক নয়, রাজনৈতিকভাবেও স্পর্শকাতর। তৃণমূল কংগ্রেসের নেতা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এটিকে ‘ভোটার হরণ’ বলে অভিযোগ করেছেন, যখন BJP এটিকে ‘অবৈধ ভোটার শুদ্ধি’ বলছেন। কিন্তু ECI জোর দিয়েছে যে কোনো বৈধ ভোটার মুছে যাবে না, যদি তারা ফর্ম জমা দেয়।
পশ্চিমবঙ্গের মতো জনবহুল রাজ্যে এই প্রক্রিয়া চ্যালেঞ্জিং। ১০০ বছরেরও বেশি বয়সী ভোটারদের মধ্যে প্রায় ৫০% মৃত বলে প্রাথমিক তদন্তে পাওয়া গেছে। এটি নিশ্চিত করে যে তালিকা আপডেট হওয়া দরকার, কারণ অবৈধ নাম থাকলে নির্বাচনের সত্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়।
SIR ফর্ম পূরণের ধাপসমূহ: সহজ গাইড
SIR ফর্মটি একটি সাধারণ এনুমারেশন ফর্ম, যাতে পরিবারের সব সদস্যের তথ্য থাকবে। BLO হাতে দিলে অথবা অনলাইনে ডাউনলোড করে পূরণ করুন। প্রথমে আপনার EPIC (Electoral Photo Identity Card) নম্বর চেক করুন।
অফলাইন পূরণ প্রক্রিয়া
BLO আপনার বাড়িতে এসে ফর্ম দেবেন। ফর্মে নিম্নলিখিত তথ্য দিন:
- নাম, জন্মতারিখ, লিঙ্গ।
- মা-বাবার নাম (২০০২ তালিকা যাচাইয়ের জন্য)।
- ঠিকানা, মোবাইল নম্বর।
- EPIC নম্বর যদি থাকে।
সতর্কতা: নামের বানান ভুল হলে সংশোধন করুন, কারণ এটি পরে সমস্যা তৈরি করতে পারে। ফর্ম পূরণ করে BLO-কে ফেরত দিন ৪ ডিসেম্বরের মধ্যে। যদি BLO না আসেন, নিকটস্থ BO (Booth Office)-তে জমা দিন।
অনলাইন পূরণ: স্টেপ বাই স্টেপ
অনলাইন লিঙ্ক ৬ নভেম্বর থেকে চালু হয়েছে, যদিও প্রাথমিক সমস্যা ছিল। ভিজিট করুন nvsp.in অথবা ceowestbengal.nic.in।
- লগইন করুন: EPIC নম্বর বা মোবাইল নম্বর দিয়ে।
- প্রি-ফিল্ড ডেটা চেক করুন: সিস্টেম আপনার পুরনো তথ্য দেখাবে।
- আপডেট করুন: নতুন সদস্য যোগ করুন, ভুল সংশোধন করুন।
- সাবমিট করুন: PDF ডাউনলোড করে BLO-কে দিন।
যদি অনলাইনে সমস্যা হয়, হেল্পলাইন ১৯৫০-এ কল করুন। এই প্রক্রিয়া ৮০% ভোটারের জন্য সহজ করে তুলেছে, ECI-এর তথ্য অনুসারে।
প্রয়োজনীয় ডকুমেন্টস: কারা কী জমা দিতে হবে?
সবার জন্য ডকুমেন্ট লাগবে না। যদি আপনি বা আপনার মা-বাবা-ঠাকুরদা ২০০২ তালিকায় থাকেন, শুধু ফর্ম যথেষ্ট। অন্যথায়, প্রমাণ লাগবে। ECI ১১টি ডকুমেন্টের লিস্ট দিয়েছে
| ক্যাটাগরি | ডকুমেন্টের নাম | কার জন্য প্রযোজ্য | উদাহরণ |
|---|---|---|---|
| জন্ম প্রমাণ | জন্ম নিবন্ধন সার্টিফিকেট | ২০০২ তালিকায় নাম নেই | হাসপাতাল সার্টিফিকেট |
| পরিচয় প্রমাণ | আধার কার্ড বা PAN | সবার জন্য | UIDAI ইস্যু |
| আত্মীয়তা প্রমাণ | মা-বাবার ভোটার কার্ড | নতুন ভোটার | ২০০২ EPIC |
| বয়স প্রমাণ | SSC সার্টিফিকেট | ১৮+ বছর | স্কুল সার্টিফিকেট |
| ঠিকানা প্রমাণ | রেশন কার্ড | স্থানান্তরিত | সরকারি ডকুমেন্ট |
এই টেবিল ECI-এর অফিসিয়াল গাইডলাইন থেকে নেওয়া। যদি কোনো ডকুমেন্ট না থাকে, অ্যাফিডেভিট দিয়ে চলবে, কিন্তু পরে যাচাই হবে।
রিয়েল-টাইম ডেটা: প্রথম দিনেই ১.১ কোটি ফর্মে ডকুমেন্ট চেক হয়েছে, যার মধ্যে ২৫% ক্ষেত্রে অতিরিক্ত প্রমাণ লাগছে।
জমা না দিলে কী হতে পারে? গভীর বিশ্লেষণ
SIR ফর্ম জমা না দিলে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো আপনার নাম ‘অ্যাবসেন্ট’ মার্ক হয়ে যাওয়া, যা ড্রাফট তালিকায় মুছে ফেলার কারণ হতে পারে। ECI-এর নিয়মে, অ্যাবসেন্ট হাউসহোল্ডের ভোটাররা ‘পেন্ডিং ডিলিশন’ লিস্টে যাবে। বিহারের উদাহরণ দেখুন: SIR-এ ৬৫ লক্ষ নাম মুছে গেছে, যার ৭০% অ্যাবসেন্টের কারণে।
পশ্চিমবঙ্গে এটি আরও গুরুতর, কারণ প্রি-ম্যাপিং-এ ৩.৫ কোটি ভোটার যাচাইয়ের প্রয়োজন। যদি না জমা দেন:
- স্বল্পমেয়াদী: ড্রাফট তালিকায় নাম না থাকলে ক্লেইম ফাইল করতে হবে (৯ ডিসেম্বর থেকে ২৫ ডিসেম্বর)।
- দীর্ঘমেয়াদী: ভোট দিতে না পারা, সরকারি সুবিধা (যেমন পেনশন) প্রভাবিত।
- পরিসংখ্যান: রাজ্যে ১২% ভোটার (প্রায় ৮৮ লক্ষ) এখনও ফর্ম পাননি, যারা ঝুঁকিতে।
একটি উদাহরণ: দক্ষিণ ২৪ পরগনায় এক ব্যক্তি ফর্ম না দিয়ে আত্মহত্যা করেছেন, পরিবারের অভিযোগে ‘ভয়’। এটি দেখায় মানসিক চাপও বাড়ছে। তাই, অবিলম্বে জমা দিন – এটি আপনার অধিকার রক্ষা করবে।
২০০২ সালের পশ্চিমবঙ্গের ভোটার লিস্ট ডাউনলোড: সহজ উপায়ে জানুন কীভাবে পাবেন পুরাতন ভোটার তালিকা
ফর্মে ভুল করলে কী পরিণতি? সাধারণ ভুল এবং সমাধান
ভুল তথ্য দিলে ফর্ম ‘ইনভ্যালিড’ হয়ে যাবে, এবং যাচাইয়ের সময় সমস্যা হবে। সাধারণ ভুল:
- নামের বানান ভুল (৩০% ক্ষেত্রে)।
- জন্মতারিখ অসঙ্গতি।
- EPIC নম্বর ভুল।
পরিণতি: নাম ডিলিশনের লিস্টে যাওয়া, এবং পুনরায় ক্লেইম করতে হবে। বিহারে ১৫% ডিলিশন ভুল ডেটার কারণে। সমাধান: ফর্ম পূরণের আগে ২০০২ তালিকা চেক করুন nvsp.in-এ। ভুল হলে BLO-কে জানান, তারা সংশোধন করবেন।
আরও গভীরে যাই: রাজনৈতিক দলগুলো BLA (Booth Level Agent) মাধ্যমে সাহায্য করছে। CPM বা TMC-এর এজেন্ট যোগাযোগ করুন। এটি নিশ্চিত করে যে ভুল কম হয়।
সর্বশেষ পরিসংখ্যান এবং রিয়েল-টাইম ডেটা: গভীর অনুসন্ধান
SIR-এর প্রথম তিন দিনে (৪-৬ নভেম্বর) ২.১০ কোটি ফর্ম বিতরিত, যা ৭৩ মিলিয়ন মোট ভোটারের ২৮.৭৭%। ECI-এর PIB রিলিজ অনুসারে, ১২ রাজ্যে মোট ৫১ কোটি ভোটার কভার হচ্ছে।
পশ্চিমবঙ্গ-নির্দিষ্ট:
- ম্যাপিং সম্পন্ন: ৩.৪৮ কোটি নাম যাচাই, ৪৫% মিল নেই।
- সম্ভাব্য ডিলিশন: ২ কোটি (২৭% মোট ভোটার)।
- নতুন যোগ: ১৮-২০ বছরের ১২ লক্ষ ভোটার প্রত্যাশিত।
এই ডেটা eci.gov.in থেকে নেওয়া, যা রিয়েল-টাইম আপডেট দেয়। বিহারের তুলনায় (৬৫ লক্ষ ডিলিট, ৮% হার), পশ্চিমবঙ্গে হার ২৫-৩০% হতে পারে যদি অংশগ্রহণ কম হয়।
জেলা-ভিত্তিক বিশ্লেষণ
দক্ষিণ ২৪ পরগনায় ২৫ লক্ষ ফর্ম বিতরিত, কিন্তু ১০% অ্যাবসেন্ট। উত্তর দিনাজপুরে ৩৫% মিসম্যাচ। এই ডেটা indianexpress.com থেকে। এটি দেখায় গ্রামীণ এলাকায় চ্যালেঞ্জ বেশি।
BLO-এর ভূমিকা এবং সহায়তা
BLO-রা QR কোডযুক্ত ID কার্ড নিয়ে আসবেন, যা eci.gov.in-এ স্ক্যান করে যাচাই করুন। তারা ফর্ম সংগ্রহ করবেন এবং প্রাথমিক যাচাই করবেন। যদি বাড়িতে না থাকেন, প্রতিবেশীকে দিন বা অনলাইনে আপলোড করুন। রাজ্যে ৮০,০০০ BLO কাজ করছেন।
রাজনৈতিক দলের BLA-রা সাথে থাকবেন, যা নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করে। যদি BLO না আসেন, helpline 1950-এ রিপোর্ট করুন।
SIR-এর প্রভাব: নারী এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপর
SIR নারী ভোটারদের উপর বিশেষ প্রভাব ফেলতে পারে। বিহারে ৭ লক্ষ বেশি নারী ডিলিট হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে ৪৯% ভোটার নারী, যাদের মধ্যে ২০% ডকুমেন্টের অভাবে ঝুঁকিতে। সংখ্যালঘু এলাকায় (মুর্শিদাবাদ) ৪০% মিসম্যাচ।
এই বিশ্লেষণ দেখায় যে SIR গণতান্ত্রিক স্বচ্ছতা বাড়ায়, কিন্তু সচেতনতা না থাকলে বঞ্চিত হওয়ার ঝুঁকি। ECI-এর প্রতিশ্রুতি: ‘নো লেজিটিমেট ভোটার উইল বি রিমুভড’।
SIR প্রক্রিয়া পশ্চিমবঙ্গের গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ, যা অবৈধতা দূর করে সত্যিকারের ভোটারদের অধিকার রক্ষা করে। কিন্তু এর সাফল্য নির্ভর করে আপনাদের সক্রিয় অংশগ্রহণের উপর – ফর্ম জমা না দিলে বা ভুল করলে ভোটাধিকার হারানোর ঝুঁকি রয়েছে, যা ২০২৬ নির্বাচনকে প্রভাবিত করবে। ECI-এর তথ্য অনুসারে, ২.১০ কোটি ফর্ম ইতিমধ্যে বিতরিত হয়েছে, কিন্তু এখনও লক্ষাধিককে সচেতন হতে হবে। আজই BLO বা অনলাইনের মাধ্যমে পদক্ষেপ নিন, যাতে আপনার কণ্ঠস্বর নির্বাচনে পৌঁছায়। সরকারি সাইট চেক করে রাখুন এবং সাহায্য নিন – এটি শুধু ফর্ম নয়, আপনার ভবিষ্যতের ব্যাপার।











