ঘুমের ঘাটতি: আপনার জীবন কীভাবে প্রভাবিত হচ্ছে

ভারতে অপর্যাপ্ত ঘুমের সমস্যা ক্রমশ একটি গুরুতর জনস্বাস্থ্য উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠছে। আধুনিক জীবনযাত্রার চাপ, কর্মব্যস্ততা এবং ডিজিটাল ডিভাইসের অতিরিক্ত ব্যবহার ভারতীয়দের ঘুমের মান ও পরিমাণকে প্রভাবিত করছে। এই নিবন্ধে…

Srijita Chattopadhay

 

ভারতে অপর্যাপ্ত ঘুমের সমস্যা ক্রমশ একটি গুরুতর জনস্বাস্থ্য উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠছে। আধুনিক জীবনযাত্রার চাপ, কর্মব্যস্ততা এবং ডিজিটাল ডিভাইসের অতিরিক্ত ব্যবহার ভারতীয়দের ঘুমের মান ও পরিমাণকে প্রভাবিত করছে। এই নিবন্ধে আমরা পর্যাপ্ত ঘুমের অভাবে সৃষ্ট বিভিন্ন ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে আলোচনা করব।

ঘুমের বর্তমান চিত্র:

ফিলিপস ইন্ডিয়া স্লিপ সার্ভে 2023 অনুযায়ী, ভারতীয়দের গড় ঘুমের সময় 7 ঘণ্টা 12 মিনিট। এই সমীক্ষায় দেখা গেছে, 73% ভারতীয় মনে করেন তাদের ঘুমের মান ভালো নয়। 58% লোক বলেছেন, তারা সপ্তাহে কমপক্ষে তিনবার ঘুম থেকে ক্লান্ত বোধ করে ওঠেন।

শারীরিক স্বাস্থ্যের উপর প্রভাব:

অপর্যাপ্ত ঘুমের সবচেয়ে মারাত্মক প্রভাব পড়ে আমাদের শারীরিক স্বাস্থ্যের উপর। দীর্ঘমেয়াদী ঘুমের ঘাটতি হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অফ মেডিক্যাল রিসার্চের (ICMR) সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, 2021 সালে ভারতে হৃদরোগে মৃত্যুর হার ছিল 28.1%। এটি দেশের সর্বোচ্চ মৃত্যুর কারণ।

ঘুমের অভাব ডায়াবেটিসের ঝুঁকিও বাড়িয়ে দেয়। ইন্টারন্যাশনাল ডায়াবেটিস ফেডারেশনের (IDF) ডায়াবেটিস অ্যাটলাস 10ম সংস্করণ অনুযায়ী, 2021 সালে ভারতে ডায়াবেটিস রোগীর সংখ্যা ছিল 74.2 মিলিয়ন। এই সংখ্যা 2045 সাল নাগাদ 124.9 মিলিয়নে পৌঁছাবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

অপর্যাপ্ত ঘুম শরীরের মেটাবলিজম প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করে, যা ওজন বৃদ্ধির কারণ হতে পারে। ওয়ার্ল্ড ওবেসিটি ফেডারেশনের 2022 সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভারতে প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে স্থূলতার হার 3.9%।

মানসিক স্বাস্থ্যের উপর প্রভাব:

পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব মানসিক স্বাস্থ্যকেও নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করে। দীর্ঘমেয়াদী ঘুমের ঘাটতি বিষণ্নতা ও উদ্বেগের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। ল্যানসেট সাইকিয়াট্রি জার্নালে 2023 সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে, 2020 সালে ভারতে মোট জনসংখ্যার 14.3% কোনো না কোনো ধরনের মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় আক্রান্ত ছিল।

অপর্যাপ্ত ঘুম স্মৃতিশক্তি ও একাগ্রতার উপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ মেন্টাল হেলথ অ্যান্ড নিউরোসায়েন্সেস (NIMHANS) এর একটি গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত 7-8 ঘণ্টার কম ঘুমানো ব্যক্তিদের কগনিটিভ পারফরম্যান্স 20-30% কম।

দীর্ঘমেয়াদী ঘুমের ঘাটতি মানুষের মেজাজকে খিটখিটে করে তোলে। ইন্ডিয়ান জার্নাল অফ সাইকিয়াট্রিতে 2022 সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে, অপর্যাপ্ত ঘুমের কারণে 65% লোক নিয়মিত মেজাজ খারাপ ও চিড়চিড়ে আচরণ করেন।

কর্মক্ষমতার উপর প্রভাব:

ঘুমের ঘাটতি কর্মক্ষেত্রে উৎপাদনশীলতাকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করে। র্যান্ড কর্পোরেশনের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, ভারতে অপর্যাপ্ত ঘুমের কারণে বার্ষিক 2% জিডিপি ক্ষতি হয়। 2022 সালের হিসাবে, এর পরিমাণ প্রায় 58 বিলিয়ন ডলার।

কর্মক্ষেত্রে ভুল ও দুর্ঘটনার সম্ভাবনাও বেড়ে যায়। ন্যাশনাল সেফটি কাউন্সিল অফ ইন্ডিয়ার 2022 সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনার 13% ঘটে অপর্যাপ্ত ঘুমের কারণে।

সৃজনশীলতা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাও কমে যায় ঘুমের অভাবে। ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ ম্যানেজমেন্ট আহমেদাবাদের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, পর্যাপ্ত ঘুম না পাওয়া ব্যক্তিদের সৃজনশীল চিন্তার ক্ষমতা 30% পর্যন্ত কমে যায়।

সামাজিক জীবনের উপর প্রভাব:

অপর্যাপ্ত ঘুম আমাদের সামাজিক জীবনকেও প্রভাবিত করে। দীর্ঘমেয়াদী ঘুমের ঘাটতি পারিবারিক ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কে অবনতি ঘটায়। টাটা ইনস্টিটিউট অফ সোশ্যাল সায়েন্সেস-এর একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, অপর্যাপ্ত ঘুমের কারণে 45% দম্পতি নিয়মিত ঝগড়া-বিবাদে জড়িয়ে পড়েন।

সামাজিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের আগ্রহও কমে যায় ঘুমের অভাবে। ইন্ডিয়ান সোসাইটি ফর স্লিপ রিসার্চের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, অপর্যাপ্ত ঘুমের কারণে 40% লোক সামাজিক অনুষ্ঠান এড়িয়ে যান।

পর্যাপ্ত ও গুণগত মানের ঘুম আমাদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভারতীয়দের উচিত প্রতিদিন 7-9 ঘণ্টা ঘুমানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা। নিয়মিত শোওয়া-ওঠার সময় ঠিক করা, ঘুমের আগে ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহার কমানো এবং শান্ত পরিবেশ নিশ্চিত করার মাধ্যমে ভালো ঘুমের অভ্যাস গড়ে তোলা যায়। সুস্থ জীবনযাপনের জন্য পর্যাপ্ত ঘুমের বিকল্প নেই।

About Author
Srijita Chattopadhay

সৃজিতা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় স্নাতক। তিনি একজন প্রতিশ্রুতিশীল লেখক এবং সাংবাদিক, যিনি তার লেখা দ্বারা বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির সমৃদ্ধি তুলে ধরতে সদা উদ্যমী। সৃজিতার লেখার ধারা মূলত সাহিত্য, সমাজ এবং সংস্কৃতির বিভিন্ন দিককে ঘিরে আবর্তিত হয়, যেখানে তিনি তার গভীর পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা ও বিশ্লেষণী দক্ষতার পরিচয় দেন। তাঁর নিবন্ধ ও প্রতিবেদনগুলি পাঠকদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে, যা তার বস্তুনিষ্ঠতা ও সংবেদনশীলতার পরিচয় বহন করে। সৃজিতা তার কর্মজীবনে ক্রমাগত নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে বদ্ধপরিকর, যা তাকে বাংলা সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে একটি উজ্জ্বল ভবিষ্যতের দিকে নিয়ে যাচ্ছে।

আরও পড়ুন