সিজারিয়ান অপারেশনের পর কীভাবে শুলে সেলাই দ্রুত শুকাবে এবং শরীর সহজে সুস্থ হবে — এটি প্রতিটি নতুন মায়ের সবচেয়ে জরুরি প্রশ্নগুলোর একটি। সিজারিয়ান একটি বড় পেটের অস্ত্রোপচার (Major Abdominal Surgery), তাই অপারেশনের পর সঠিক ভঙ্গিতে শোয়া কেবল আরামের বিষয় নয় — এটি আপনার শারীরিক পুনরুদ্ধারের অপরিহার্য অংশ।
Bangladesh Bureau of Statistics (BBS)-এর ২০২৫ সালের Multiple Indicator Cluster Survey (MICS) অনুযায়ী, বাংলাদেশে এখন ৫১.৮% প্রসব সিজারিয়ান পদ্ধতিতে হচ্ছে, যা ২০১২ সালের ১৯.১% থেকে ২.৭ গুণ বেশি। এর মানে প্রতি দুইজন মায়ের মধ্যে একজনেরও বেশি সিজার করাচ্ছেন। এই বিশাল সংখ্যক মায়ের জন্য সঠিক পোস্টঅপারেটিভ যত্ন, বিশেষত সঠিকভাবে শোয়ার নিয়ম জানা, অত্যন্ত জরুরি।
সিজারের পর কেন সঠিক শোয়ার ভঙ্গি এত গুরুত্বপূর্ণ?
সিজারিয়ান অপারেশনে পেটের চর্বি, পেশি এবং জরায়ু কেটে শিশুকে বের করা হয়। ক্ষতস্থান সাধারণত ১০ থেকে ১৫ সেন্টিমিটার লম্বা হয়। এই অস্ত্রোপচারের পর শরীর দুর্বল থাকে, সেলাইয়ে ব্যথা থাকে এবং পেটের পেশিতে টান অনুভব হয়। ভুল ভঙ্গিতে শুলে —
-
সেলাইয়ের উপর সরাসরি চাপ পড়ে এবং ব্যথা তীব্র হয়
-
রক্ত সঞ্চালন বাধাগ্রস্ত হয়, ফলে সারাতে বেশি সময় লাগে
-
সেলাই ছিঁড়ে যাওয়ার বা ইনফেকশনের ঝুঁকি বাড়ে
-
পেটের পেশি ও মেরুদণ্ডে অতিরিক্ত চাপ পড়ে
-
ঘুমের মান খারাপ হয়, যা মানসিক স্বাস্থ্যকেও প্রভাবিত করে
American College of Obstetricians and Gynecologists (ACOG) এবং Enhanced Recovery After Surgery (ERAS) গাইডলাইন অনুযায়ী, সিজারের পর সঠিক পোস্টঅপারেটিভ কেয়ার মেনে চললে সুস্থতার সময় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসে এবং জটিলতার ঝুঁকি কমে।
সিজারের পর শোয়ার সঠিক নিয়ম — তিনটি নিরাপদ ভঙ্গি
১. চিৎ হয়ে হাঁটুর নিচে বালিশ দিয়ে শোয়া (Back Sleeping with Knee Support)
অপারেশনের পর প্রথম ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টা চিৎ হয়ে শোয়াই সবচেয়ে নিরাপদ এবং ডাক্তারদের প্রথম পছন্দ। এই ভঙ্গিতে সেলাইয়ের উপর কোনো সরাসরি চাপ পড়ে না। হাঁটুর নিচে একটি নরম বালিশ রাখলে পেটের পেশিতে টান কমে এবং রক্ত সঞ্চালন ভালো থাকে।
কীভাবে করবেন:
-
পিঠের উপর সোজা হয়ে শুয়ে পড়ুন
-
হাঁটুর নিচে একটি ভাঁজ করা নরম বালিশ রাখুন
-
পিঠের নিচের অংশে ছোট একটি বালিশ দিলে মেরুদণ্ড আরামদায়ক অবস্থানে থাকে
-
মাথার নিচে আরামদায়ক বালিশ ব্যবহার করুন
-
পেটের উপর সরাসরি কিছু রাখবেন না
২. বাম পাশ ফিরে শোয়া (Left Side Sleeping)
পাশ ফিরে শোয়া, বিশেষত বাম পাশে, সিজারের পর সবচেয়ে উপকারী ভঙ্গিগুলোর একটি। Enfamil-এর মেডিকেল গাইড এবং C-Section UK-এর বিশেষজ্ঞদের মতে, বাম পাশে শোয়া রক্ত সঞ্চালন, হজমশক্তি ও কিডনির কার্যকারিতা উন্নত করে। এই ভঙ্গি পিঠের ব্যথা ও ঘাড়ের ব্যথাতেও উপশম দেয়।
কীভাবে করবেন:
-
ধীরে ধীরে বাম পাশ ফিরুন, হঠাৎ করে বাঁক নেবেন না
-
দুই হাঁটুর মাঝে একটি বালিশ রাখুন — এটি মেরুদণ্ড সঠিক অবস্থানে রাখে
-
পেটের সামনে একটি ছোট বালিশ রাখলে সেলাইয়ে আরাম পাবেন
-
পিঠের পেছনে আরেকটি বালিশ দিলে পিছলে যাওয়ার ভয় থাকে না
৩. আধা-হেলান দিয়ে শোয়া (Semi-Reclined Position)
অপারেশনের প্রথম কয়েকদিন এবং বুকের দুধ খাওয়ানোর সময় এই ভঙ্গিটি বিশেষভাবে আরামদায়ক। Belly Bandit-এর গাইড অনুযায়ী, ৪৫ ডিগ্রি কোণে হেলান দিয়ে শোয়া পেটের উপর চাপ কমায় এবং রিফ্লাক্স বা বুক জ্বালা থেকে মুক্তি দেয়। এই ভঙ্গি রাতের বেলা শিশুকে বুকের দুধ দেওয়ার জন্য আদর্শ, কারণ এতে উঠতে গেলে কম কষ্ট হয়।
কীভাবে করবেন:
-
পিছনে ২ থেকে ৩টি বালিশ সাজিয়ে নিন যাতে শরীরের উপরের অংশ উঁচু থাকে
-
ওয়েজ বালিশ (Wedge Pillow) ব্যবহার করলে আরও ভালো সাপোর্ট পাবেন
-
রিক্লাইনার চেয়ারেও এই ভঙ্গিতে বিশ্রাম নেওয়া যায়
কোন ভঙ্গিতে শোয়া সম্পূর্ণ নিষেধ?
উপুড় হয়ে পেটের উপর শোয়া
এটি সিজারের পরের সবচেয়ে বিপজ্জনক ভঙ্গি। উপুড় হলে সেলাইয়ের উপর সরাসরি চাপ পড়ে, প্রচণ্ড ব্যথা হয় এবং সেলাই ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। সম্পূর্ণ সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত — সাধারণত ৬ থেকে ৮ সপ্তাহ — এই ভঙ্গি এড়িয়ে চলতে হবে।
বালিশ ছাড়া সম্পূর্ণ সমতল হয়ে পিঠের উপর শোয়া
কোনো সাপোর্ট ছাড়া সমতলভাবে শুলে পেটের পেশিতে টান পড়ে এবং সেলাইয়ের জায়গায় অস্বস্তি বাড়ে। পা বা মাথার নিচে অন্তত একটি বালিশ সবসময় রাখা জরুরি।
বালিশ ছাড়া পাশ ফিরে শোয়া
সাপোর্ট ছাড়া পাশ ফিরলে শরীর মুচড়ে যায়, যা পেটে অতিরিক্ত টান তৈরি করে এবং ব্যথা বাড়িয়ে দেয়। সবসময় হাঁটুর মাঝে এবং পেটের পাশে বালিশ রেখে পাশ ফিরুন।
সিজারের পর বিছানায় ওঠা-নামার সঠিক নিয়ম
ভুল পদ্ধতিতে বিছানা থেকে উঠলে সেলাইয়ে টান লেগে তীব্র ব্যথা হতে পারে। প্রতিবার বিছানায় উঠতে বা নামতে এই ধাপগুলো অনুসরণ করুন:
-
প্রথমে পাশ ফিরুন — সরাসরি উঠে বসার চেষ্টা করবেন না
-
হাতের সাহায্য নিন — কনুই ও হাতের তালু দিয়ে ধীরে ধীরে উপরে উঠুন
-
পা বিছানার পাশে ঝুলিয়ে বসুন — কয়েক মুহূর্ত বসে থাকুন
-
মাথা ঘুরলে আবার বসুন — তাড়াহুড়ো করবেন না
-
ধীরে উঠে দাঁড়ান — প্রয়োজনে পাশে কাউকে ধরে উঠুন
-
হাঁচি বা কাশির সময় — সেলাইয়ের জায়গায় হাত বা বালিশ চাপা দিন
সময়সূচি অনুযায়ী শোয়ার পরামর্শ
| সময়কাল | প্রস্তাবিত ভঙ্গি | বিশেষ পরামর্শ |
|---|---|---|
| প্রথম ২৪–৪৮ ঘণ্টা | চিৎ, হাঁটুর নিচে বালিশ | হাসপাতালে নার্সের সাহায্যে পরিবর্তন করুন |
| ৩–৭ দিন | চিৎ বা আধা-হেলান; বাম পাশ শুরু করা যায় | ধীরে ধীরে পাশ পরিবর্তন করুন |
| ১–৬ সপ্তাহ | বাম পাশ ফিরে (হাঁটুর মাঝে বালিশ) | পেটের বেল্ট ব্যবহার করতে পারেন |
| ৬–৮ সপ্তাহ পর | ডাক্তারের পরামর্শে যেকোনো ভঙ্গি | চেকআপের পর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিন |
-
নন-অ্যাবজর্বেবল সুতা: অপারেশনের ৫–৭ দিন পর কেটে দেওয়া হয় এবং ড্রেসিং করা হয়
-
অ্যাবজর্বেবল সুতা: শরীরের সাথে মিশে যায়, আলাদাভাবে কাটার দরকার হয় না
-
ত্বকের উপরের অংশ: ৪ থেকে ৬ সপ্তাহে সেরে ওঠে
-
ভেতরের ক্ষত সম্পূর্ণ সারতে: ৩ থেকে ৬ মাস পর্যন্ত লাগতে পারে
-
স্বাভাবিক জীবনে ফেরা: সাধারণত ৪ থেকে ৬ সপ্তাহ সময় লাগে
ঘুমের মান উন্নত করার কার্যকর উপায়
পরিবেশ তৈরি করুন
শুধু সঠিক ভঙ্গিই যথেষ্ট নয়। ঘুমের পরিবেশও গুরুত্বপূর্ণ। ঘর হালকা অন্ধকার, শান্ত ও আরামদায়ক তাপমাত্রায় রাখুন। হোয়াইট নয়েজ মেশিন বা কানের প্লাগ শব্দ কমাতে সাহায্য করে। শিশুকে কাছে রাখুন যাতে বারবার উঠতে না হয়।
পরিবারের সহায়তা নিন
রাতের বেলা শিশুর যত্নে পরিবারের অন্য সদস্যদের পালা করে সাহায্য নিন। শিশু যখন ঘুমায়, সেই সময়ে আপনিও বিশ্রাম নিন। ERAS গাইডলাইনের ২০২৬ সালের হালনাগাদ সংস্করণ অনুযায়ী, বিশ্রামের সময় নিশ্চিত করা সিজার-পরবর্তী সুস্থতার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।
পেটের বেল্ট বা অ্যাবডোমিনাল বাইন্ডার ব্যবহার করুন
সিজারের পর পেটে বেল্ট ব্যবহার করলে পেটের পেশিতে সাপোর্ট পাওয়া যায় এবং ঘুমের সময় আরামদায়ক অনুভব হয়। তবে ভেজা বেল্ট পরবেন না এবং সেলাইয়ের উপর সরাসরি চাপ লাগে এমন বেল্ট এড়িয়ে চলুন।
সেলাইয়ের যত্নে যা মানতে হবে
ঘুমের পাশাপাশি সেলাইয়ের যত্নও সমান গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিদিন ক্ষতস্থান পরিষ্কার ও শুকনো রাখুন। গোসলের সময় সরাসরি পানির ধারা সেলাইয়ে না লাগানোর চেষ্টা করুন এবং গন্ধহীন, সুগন্ধিমুক্ত সাবান ব্যবহার করুন — ঘষা দেবেন না। ঢিলাঢালা ও নরম কাপড় পরুন যাতে সেলাইয়ে ঘষা না লাগে।
বিপদের লক্ষণ: এই সংকেত দেখলে অবিলম্বে ডাক্তার দেখান
-
সেলাইয়ের জায়গা থেকে পুঁজ বা দুর্গন্ধ বের হলে
-
ক্ষতস্থান লাল, ফুলে ওঠা বা স্পর্শে গরম অনুভব হলে
-
জ্বর ১০০.৪°F (৩৮°C) বা তার বেশি হলে
-
অস্বাভাবিক বা অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হলে
-
ব্যথা ক্রমশ বাড়তে থাকলে, না কমলে
পুনরুদ্ধারের সময়রেখা
সিজারের পর সুস্থতা একটি ক্রমান্বয়িক প্রক্রিয়া। দ্রুত সেরে উঠতে এই সময়রেখা মাথায় রাখুন:
-
প্রথম সপ্তাহ: সম্পূর্ণ বিশ্রাম, বিছানায় সীমিত নড়াচড়া
-
২য়–৩য় সপ্তাহ: হালকা হাঁটাহাঁটি শুরু করা যায়
-
৪র্থ–৬ষ্ঠ সপ্তাহ: স্বাভাবিক দৈনন্দিন কাজে ধীরে ফেরা
-
৬ষ্ঠ–৮ম সপ্তাহ: ডাক্তারের পরামর্শে হালকা ব্যায়াম শুরু
-
৩–৬ মাস পর: সম্পূর্ণ অভ্যন্তরীণ সুস্থতা অর্জন
বাংলাদেশে সিজারিয়ান প্রসবের বাস্তবচিত্র
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) বিশ্বব্যাপী সিজারিয়ান প্রসবের গ্রহণযোগ্য হার ১০–১৫% নির্ধারণ করেছে। অথচ বাংলাদেশে এই হার ৫১.৮%-এ পৌঁছেছে — যা WHO-র সুপারিশকৃত হারের তিন থেকে পাঁচগুণ বেশি। Save the Children-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে বাংলাদেশে অপ্রয়োজনীয় সিজারিয়ান অপারেশনের সংখ্যা ৫১% বৃদ্ধি পেয়েছে। এই বিপুল সংখ্যক মায়েদের জন্য সঠিক পোস্টঅপারেটিভ যত্ন ও শোয়ার নিয়ম সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করা এখন জাতীয় স্বাস্থ্য অগ্রাধিকারের বিষয় হওয়া উচিত।
সিজারিয়ান অপারেশনের পরের সময়টা একজন মায়ের জীবনের সবচেয়ে কঠিন ও আবেগময় মুহূর্তগুলোর একটি — একদিকে নবজাতকের যত্ন, অন্যদিকে নিজের শরীরের সুস্থতা। এই দ্বৈত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে অনেক মা নিজের বিশ্রামের বিষয়টি উপেক্ষা করে ফেলেন, যা পরে নানা জটিলতার জন্ম দেয়। সিজারের পর সঠিক ভঙ্গিতে শোয়া — বিশেষত চিৎ হয়ে হাঁটুর নিচে বালিশ দিয়ে বা বাম পাশ ফিরে হাঁটুর মাঝে বালিশ রেখে — শুধু ব্যথা কমায় না, বরং সেলাই দ্রুত শুকাতে এবং রক্ত সঞ্চালন স্বাভাবিক রাখতেও সাহায্য করে। মনে রাখবেন, প্রতিটি মায়ের শরীর আলাদা — একজনের জন্য যা আরামদায়ক, অন্যজনের জন্য তা নাও হতে পারে, তাই নিজের শরীরের সংকেত বুঝুন এবং ডাক্তারের পরামর্শ মেনে চলুন। পরিবারের সহযোগিতা, সঠিক ঘুমের পরিবেশ এবং ধৈর্য ধরে বিশ্রাম নেওয়া — এই তিনটি জিনিস একসাথে আপনার সুস্থতার পথকে সুগম করবে। একজন সুস্থ ও সবল মা-ই পারেন তাঁর সন্তানকে সঠিকভাবে ভালোবাসা দিতে এবং সুন্দরভাবে গড়ে তুলতে।











