রাতে ঘুমানোর সময় ঘর, টিভি, মোবাইল বা নাইট ল্যাম্পের আলো জ্বালিয়ে রাখার অভ্যাস শরীরের ঘুমের হরমোন মেলাটোনিন কমিয়ে দেয়, ঘুমের মান নষ্ট করে এবং দীর্ঘমেয়াদে হার্টের রোগ ও টাইপ–২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, বিশেষ করে নীল আলো (মোবাইল, ট্যাব, LED স্ক্রিন) মেলাটোনিন ৫০%–এর বেশি পর্যন্ত কমিয়ে দিতে পারে, যা রক্তচাপ, রক্তে গ্লুকোজ নিয়ন্ত্রণ ও ইনসুলিন সংবেদনশীলতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। তাই যাদের আগে থেকেই হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ বা ডায়াবেটিস আছে, কিংবা ঝুঁকিতে আছেন, তাদের জন্য রাতে আলো জ্বেলে ঘুমোনো অভ্যাস মোটেও নিরাপদ নয়।
রাতে আলো, ঘুম ও শরীরের ঘড়ি
মানুষের শরীরে একটি “বায়োলজিক্যাল ক্লক” বা সার্কাডিয়ান রিদম আছে, যা আলো–অন্ধকারের সংকেত দেখে ঘুম–জাগরণ, হরমোন নিঃসরণ ও বিপাকক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করে। রাতে অন্ধকার হলে মস্তিষ্ক থেকে মেলাটোনিন হরমোন বেড়ে যায়, যা আমাদের ঘুম পেতে সাহায্য করে এবং হৃদযন্ত্র ও মেটাবলিজমের জন্য সুরক্ষামূলক কাজ করে।
নীল আলো–সমৃদ্ধ LED, মোবাইল, টিভি বা উজ্জ্বল বাল্ব এই প্রাকৃতিক সিগন্যালকে “বিভ্রান্ত” করে, ফলে শরীর অন্ধকারকে ঠিকভাবে চিনতে পারে না, মেলাটোনিন কমে যায় এবং ঘুমের গভীর ও পুনরুদ্ধারকারী অংশ নষ্ট হয়। দীর্ঘদিন এই অবস্থা চললে তা উচ্চ রক্তচাপ, ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স, স্থূলতা এবং শেষে হার্ট অ্যাটাক ও টাইপ–২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়াতে সাহায্য করে।
রাতে ভালো ঘুমের জন্য আপনার খাদ্য তালিকায় রাখুন এই ৭টি খাবার
নীল আলো কতটা বিপজ্জনক? গবেষণা কী বলছে
বিভিন্ন পরীক্ষায় দেখা গেছে, নীল আলো মেলাটোনিন দমনে অন্য আলোর চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী প্রভাব ফেলে।
-
একটি ক্লিনিক্যাল স্টাডিতে দেখা যায়, নির্দিষ্ট তরঙ্গদৈর্ঘ্যের নীল LED আলোর সংস্পর্শে গেলে অংশগ্রহণকারীদের রক্তে মেলাটোনিন ধীরে ধীরে বেশি মাত্রায় কমতে থাকে এবং আলো যত উজ্জ্বল হয়, দমনও তত বাড়ে।
-
আরেকটি গবেষণায় সকালে ব্লু–এনরিচড সাদা আলোতে এক ঘণ্টা এক্সপোজারের পর মেলাটোনিনের মাত্রা প্রায় ৫০%–এর বেশি কমে যায়, যেখানে উষ্ণ সাদা আলোতে এই কমা মাত্র প্রায় ২০%–এর মতো ছিল।
-
শিশুদের ক্ষেত্রে একই ধরণের পরীক্ষায় দেখা গেছে, নির্দিষ্ট সময় নীল আলোতে থাকার পর তাদের মেলাটোনিন গড়ে প্রায় ৫১% পর্যন্ত কমেছে, যেখানে প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে এই দমন ছিল প্রায় ২৭%–এর মতো।
স্ক্রিন ব্যবহারেও একই প্রভাব দেখা যায়। একটি সাম্প্রতিক রিভিউ ও শিক্ষার্থীদের ওপর করা গবেষণায় দেখা গেছে, মাত্র ২ ঘণ্টা ট্যাবলেট স্ক্রিনে কাজ করার পর তাদের মেলাটোনিন গড়ে ৫৫% পর্যন্ত কমেছে এবং ঘুম আসার সময় পিছিয়ে গেছে।
নীল আলো ও মেলাটোনিন দমন – নির্বাচিত গবেষণা
| গবেষণার ধরন | আলো/ডিভাইসের ধরন | এক্সপোজার সময় | মেলাটোনিনের পরিবর্তন | সূত্র |
|---|---|---|---|---|
| প্রাপ্তবয়স্ক, ল্যাব স্টাডি | সংকীর্ণ ব্যান্ড নীল LED | রাত ২টা–৩.৩০, নির্দিষ্ট ডোজ | আলোর তীব্রতা বাড়ার সঙ্গে মেলাটোনিন দমন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ে | |
| বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী | ব্লু–এনরিচড সাদা বনাম উষ্ণ সাদা আলো | সকাল, ১ ঘণ্টা | ব্লু–এনরিচড আলোতে মেলাটোনিন গড়ে ~৫৩% কমে; উষ্ণ সাদায় ~২০% কমে | |
| শিশু বনাম প্রাপ্তবয়স্ক | নির্দিষ্ট আলোক এক্সপোজার | রাতের সময় | শিশুদের মেলাটোনিন দমন ~৫১.৬%, প্রাপ্তবয়স্কদের ~২৬.৭% | |
| শিক্ষার্থী, ট্যাবলেট ব্যবহার | LED ট্যাবলেট স্ক্রিন | ২ ঘণ্টা | মেলাটোনিন প্রায় ৫৫% কমে, ঘুম আসার সময় পিছিয়ে যায় |
ঘুম কম, ঝুঁকি বেশি: হার্ট ও ডায়াবেটিসের সঙ্গে যোগসূত্র
অপর্যাপ্ত বা ভাঙা ঘুমকে একাধিক বড় স্বাস্থ্য সংস্থা এখন বৈশ্বিক জনস্বাস্থ্য সংকট হিসেবে দেখছে, কারণ এটি বিভিন্ন নন–কমিউনিকেবল ডিজিজের গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকিকারক। পর্যাপ্ত ঘুম না হলে বা ঘুমের মান খারাপ হলে উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, স্ট্রোক, স্থূলতা, ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স ও টাইপ–২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি অর্থপূর্ণভাবে বেড়ে যায়।
একটি বড় কোর্ট স্টাডিতে দেখা গেছে, যারা প্রতিদিন গড়ে ৫ ঘণ্টা ঘুমায়, তাদের টাইপ–২ ডায়াবেটিস ধরা পড়ার ঝুঁকি কমপক্ষে প্রায় ১৬% বেশি, আর যারা মাত্র ৩–৪ ঘণ্টা ঘুমায়, তাদের ক্ষেত্রে এই অতিরিক্ত ঝুঁকি প্রায় ৪১% পর্যন্ত উঠে যায়, তুলনামূলকভাবে যারা ৭–৮ ঘণ্টা ঘুমায় তাদের তুলনায়। আরেকটি বিশ্লেষণে দেখা গেছে, প্রতি রাতে ৬ ঘণ্টার কম ঘুমানো ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে সবধরনের মৃত্যুঝুঁকি গড়ে প্রায় ১৩% বেশি পাওয়া গেছে, যারা ৭–৯ ঘণ্টা ঘুমায় তাদের তুলনায়।
এ ধরনের ফলাফলগুলো হার্টের রোগীদের জন্য বিশেষ সতর্কবার্তা, কারণ অপর্যাপ্ত ঘুম রক্তচাপ, ধমনী শক্ত হয়ে যাওয়া (এথেরোস্ক্লেরোসিস), হার্ট ফেইলিওর ও অ্যারিথমিয়া–সবকিছুর ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
রাতের আলো, শিফট ডিউটি ও ডায়াবেটিস
রাতে আলো জ্বেলে কাজ করা বা নিয়মিত নাইট শিফটে কাজ করা মানে প্রায়ই দীর্ঘসময় কৃত্রিম আলোতে থাকা ও ঘুমের সময় পাল্টে ফেলা – এই দুইটি বিষয়ই টাইপ–২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত।
-
যুক্তরাজ্য বায়োব্যাংকের প্রায় আড়াই লাখের বেশি অংশগ্রহণকারীকে নিয়ে করা একটি গবেষণায় দেখা গেছে, যারা নিয়মিত রাতভিত্তিক শিফটে কাজ করেন, তাদের টাইপ–২ ডায়াবেটিস হওয়ার “অডস” দিনমজুরদের চেয়ে গড়ে ১৫% থেকে প্রায় ৪৪% পর্যন্ত বেশি, শিফটের ফ্রিকোয়েন্সি ও ধরন অনুযায়ী।
-
বিভিন্ন কোর্ট স্টাডি মিলিয়ে করা আরেকটি বিশ্লেষণে দেখা গেছে, নাইট শিফটে কাজ করা ব্যক্তিদের নতুন করে টাইপ–২ ডায়াবেটিস হওয়ার “ইনসিডেন্স” আনুপাতিকভাবে গড়ে প্রায় ৩০% পর্যন্ত বেশি।
-
স্বাস্থ্যকর্মীদের ওপর করা এক মেটা–অ্যানালাইসিসে দেখা যায়, শিফট কর্মীদের ডায়াবেটিস ঝুঁকি দিনমজুরদের তুলনায় গড়ে ৯%–৪০% বেশি থাকতে পারে।
একটি সাম্প্রতিক স্টাডিতে দেখা গেছে, নির্দিষ্ট একদল নাইট শিফট কর্মীর গড় HbA1c প্রায় ৮.২%, যেখানে একই ধরনের ডে–শিফট কর্মীদের ক্ষেত্রে এই মান ছিল গড়ে ৭.৬%–এর মতো এবং যারা কাজ করছেন না তাদের গড় ছিল ৭.৫%। HbA1c যত বেশি, ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ তত খারাপ – অর্থাৎ রাতে কাজ ও আলোতে থাকার প্রভাব শুধু ডায়াবেটিস হওয়ার ঝুঁকি নয়, নিয়ন্ত্রণকেও কঠিন করে তুলতে পারে।
হার্ট ও ঘুম: আলো কীভাবে বাড়ায় কার্ডিয়াক রিস্ক
অপর্যাপ্ত ও ভাঙা ঘুমের সঙ্গে হার্টের রোগের সম্পর্ক এখন পর্যন্ত অসংখ্য কোর্ট স্টাডি ও রিভিউতে প্রমাণিত হয়েছে।
-
একটি বড় জন–স্বাস্থ্য গবেষণায় দেখা গেছে, যারা স্বভাবগতভাবে কম ঘুমায় এবং ঘুমের মান খারাপ, তাদের মধ্যে কার্ডিওভাসকুলার ডিজিজের ঝুঁকি গড়ে প্রায় ২৯% পর্যন্ত বেশি পাওয়া গেছে, তুলনায় যাদের ঘুম স্বাভাবিক।
-
অন্যদিকে, বিভিন্ন দেশের জনস্বাস্থ্য তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, প্রতি রাতে ৭ ঘণ্টার কম ঘুমানো জনসংখ্যার মধ্যে হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ ও স্ট্রোকের হার অর্থপূর্ণভাবে বেশি।
রাতে আলোতে ঘুমালে বা স্ক্রিন ব্যবহার করলে এই ঝুঁকিগুলো আরও বাড়তে পারে, কারণ ঘুমের গভীরতা কমে, সিমপ্যাথেটিক সিস্টেম বেশি সক্রিয় থাকে, রাতেও হৃদস্পন্দন ও রক্তচাপ পুরোপুরি কমে না এবং প্রদাহজনিত সিগন্যাল বাড়তে পারে – এগুলো সব মিলিয়ে দীর্ঘমেয়াদে হার্টের ওপর বাড়তি চাপ ফেলে।
হার্ট ও ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য কেন বেশি বিপদজনক
যাদের আগে থেকেই করোনারি আর্টারি ডিজিজ, হার্ট ফেইলিওর, উচ্চ রক্তচাপ, অরিথমিয়া বা টাইপ–২ ডায়াবেটিস আছে, তাদের শরীরের “রিজার্ভ” বা সুরক্ষামূলক ক্ষমতা তুলনামূলকভাবে কম থাকে। ফলে অতিরিক্ত একটি চাপ – যেমন প্রতি রাতে হালকা হলেও আলোতে ঘুমানো, ক্রনিক মেলাটোনিন দমন ও ঘুম কমে যাওয়া – ধীরে ধীরে তাদের রোগের জটিলতা বাড়াতে এবং নতুন ইভেন্ট (হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক, কিডনি ড্যামেজ) ট্রিগার করতে পারে।
ডায়াবেটিস রোগীদের ক্ষেত্রে অপ্রতুল ঘুম ও রাতের আলো রক্তে গ্লুকোজের ওঠানামা বাড়িয়ে দিতে পারে, ইনসুলিনের প্রতি টিস্যুর সংবেদনশীলতা কমায় এবং HbA1c যোগ হয়, ফলে ওষুধ বা ইনসুলিনের মাত্রা ঠিক রেখে থাকলেও কন্ট্রোল খারাপ হতে পারে। একই সঙ্গে উচ্চ রক্তচাপ, স্থূলতা ও লিপিড প্রোফাইল খারাপ হয়ে রিওয়ার্ক–হার্ট ইভেন্টের ঝুঁকি বাড়ায়।
রাতে আলো জ্বেলে ঘুমোনোর সাধারণ উৎস
দৈনন্দিন জীবনে অনেকেই না বুঝেই এমন সব উৎস থেকে রাতের আলোতে এক্সপোজড থাকেন, যা ঘুমের ওপর নীরবে প্রভাব ফেলে।
-
স্মার্টফোন, ট্যাব, ল্যাপটপ – বিশেষ করে শোয়ার আগের ১–২ ঘণ্টা সোশ্যাল মিডিয়া বা ভিডিও দেখা
-
বেডরুমে টিভি অন রেখে ঘুমিয়ে পড়া
-
উজ্জ্বল টিউবলাইট বা LED বাল্ব জ্বালিয়ে ঘুমানো
-
নাইট ল্যাম্প বা বেডসাইড ল্যাম্পের খুব বেশি উজ্জ্বল আলো
-
জানালা দিয়ে আসা রাস্তার আলোর ঝলকানি
এই সব আলোর মধ্যে বিশেষ করে নীল বা ব্লু–এনরিচড LED আলো মেলাটোনিনের ওপর বেশি প্রভাব ফেলে, তাই এগুলোকে বেছে নিয়েই কমাতে হবে।
রাতে আলো কমানোর প্রমাণভিত্তিক কৌশল
হার্ট ও ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমাতে এবং ঘুমের মান ভালো রাখতে রাতে আলো নিয়ন্ত্রণের কিছু প্র্যাকটিক্যাল, প্রমাণ–সমর্থিত কৌশল অনুসরণ করা যেতে পারে।
শোয়ার আগে স্ক্রিন টাইম কমানো
-
শোয়ার অন্তত ১–২ ঘণ্টা আগে মোবাইল, ট্যাব, ল্যাপটপ ও টিভি ব্যবহার বন্ধ করার চেষ্টা করুন।
-
যদি কাজের জন্য স্ক্রিন ব্যবহার করতেই হয়, তবে “নাইট মোড” বা ব্লু–লাইট ফিল্টার অন রাখুন, ফন্ট সাইজ বড় করুন এবং স্ক্রিনের উজ্জ্বলতা সর্বনিম্ন আরামদায়ক অবস্থায় রাখুন।
বেডরুমের আলো নিয়ন্ত্রণ
-
শোয়ার সময় রুমের উজ্জ্বল টিউবলাইট বা LED বন্ধ রেখে, চাইলে খুব লো–ইনটেনসিটি, উষ্ণ (warm) রঙের নরম নাইট ল্যাম্প ব্যবহার করুন।
-
জানালা দিয়ে রাস্তার আলো ঢুকলে ব্ল্যাকআউট কার্টেন বা মোটা পর্দা ব্যবহার করার চেষ্টা করুন।
-
আলো একেবারে না রাখতে পারলে, বিছানা থেকে দূরে, চোখের সরাসরি লেভেলের নিচে ল্যাম্প রাখুন, যেন চোখে সরাসরি আলো না লাগে।
ঘুমের রুটিন স্থির রাখা
-
প্রতিদিন সম্ভব হলে একই সময়ে ঘুমাতে যাওয়া ও একই সময়ে ঘুম থেকে ওঠা সার্কাডিয়ান রিদমকে স্থিতিশীল করতে সাহায্য করে, যা হার্ট ও মেটাবলিক হেলথের জন্যও উপকারী।
-
রাতে ক্যাফেইন, নিকোটিন ও ভারী খাবার এড়িয়ে চলা এবং দিনের বেলা নিয়মিত শারীরিক ক্রিয়াকলাপ ঘুমের মান উন্নত করতে সহায়ক।
Blue Aadhaar Card: ৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্য নীল আধার কার্ড – জেনে নিন সুবিধা ও আবেদনের পদ্ধতি
ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য বিশেষ ঘুম–চেকলিস্ট
ডায়াবেটিস রোগীদের ক্ষেত্রে ভালো ঘুম কেবল আরাম নয়, গ্লুকোজ কন্ট্রোলের বাস্তব অংশ।
-
HbA1c, ফাস্টিং গ্লুকোজ ও ব্লাড প্রেসার রেকর্ডের সঙ্গে নিজের ঘুমের সময় ও মান লেখার চেষ্টা করুন: কত ঘণ্টা ঘুমালেন, মাঝরাতে কতবার জাগলেন, ঘরে আলো ছিল কি না ইত্যাদি।
-
যদি লক্ষ্য করেন যে খুব অল্প ঘুম বা রাত জেগে স্ক্রিন ব্যবহার করলে পরদিন গ্লুকোজ বেশি থাকে, তাহলে অগ্রাধিকার দিয়ে ঘুমের অভ্যাস পাল্টানোর চেষ্টা করুন এবং চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করুন।
-
নাইট শিফটে কাজ করলে ডায়াবেটিস–শিক্ষা (diabetes education), খাবারের টাইমিং ও ইনসুলিন/ওষুধের ডোজ প্ল্যান বিশেষজ্ঞের সঙ্গে মিলিয়ে ঠিক করুন, যাতে সার্কাডিয়ান ডিসরাপশনের প্রভাব কিছুটা হলেও কমানো যায়।
হার্ট রোগীদের জন্য নিরাপদ “স্লিপ এনভায়রনমেন্ট”
হৃদরোগীদের ক্ষেত্রে রাতে ভালো ঘুম রক্তচাপ দায়রেক্ট কমাতে, হৃৎস্পন্দন নিয়ন্ত্রণে রাখতে ও হার্ট ফেইলিওরের উপসর্গ কমাতে সহায়ক হতে পারে।
-
বেডরুমকে যতটা সম্ভব “ডার্ক, কোল্ড, কুইয়েট” রাখা – অর্থাৎ অন্ধকার, হালকা শীতল ও নীরব পরিবেশ – হার্টের জন্য আদর্শ ঘুম–পরিবেশ হিসেবে বিভিন্ন গাইডলাইনে উল্লেখ রয়েছে।
-
রাতে বাথরুমে যেতে হলে খুব উজ্জ্বল লাইটের বদলে মেঝের কাছাকাছি নরম ওয়াটের নরম আলো ব্যবহার করুন, যেন এক্সপোজার কম হয় এবং আবার ঘুমিয়ে পড়া সহজ হয়।
যাদের হার্ট ফেইলিওর, স্লিপ অ্যাপনিয়া বা অনিয়মিত হৃৎস্পন্দনের সমস্যা আছে, তাদের ক্ষেত্রে ঘন ঘন রাতে জেগে ওঠা এবং আলোতে থাকা এই কন্ডিশনগুলোকে আরও জটিল করে তুলতে পারে, তাই ঘুম ও রাতের আলো সম্পর্কে কার্ডিওলজিস্টের সঙ্গে আলাদা করে আলোচনা করা বুদ্ধিমানের কাজ।
আম খেলে ঘুম আসে কেন? রহস্যময় বিজ্ঞানের গোপন তথ্য
কখন ডাক্তার দেখাবেন?
সবাই কখনও না কখনও রাত জাগে বা আলোতে ঘুমায়; এক–দুই রাতের ঘটনা সাধারণত বড় সমস্যা তৈরি না করলেও, নিয়মিত হলে তা উদ্বেগের বিষয় হতে পারে।
ডাক্তার বা স্লিপ–স্পেশালিস্টের সঙ্গে দেখা করা উচিত যদি:
-
অন্তত তিন মাস ধরে সপ্তাহে তিন রাতের বেশি ঘুমাতে সমস্যা হয় বা মাঝরাতে ঘনঘন জেগে ওঠেন
-
দিনে অতিরিক্ত ক্লান্তি, মাথা ঝিমঝিম, ভুলে যাওয়া বা কাজের সময় ঘুম পেয়ে যায়
-
রাতে সর্দন–টানা নাক ডাকা, শ্বাস আটকে আসা বা শ্বাসরোধ হয়ে জেগে ওঠেন (স্লিপ অ্যাপনিয়ার লক্ষণ)
-
হার্টের রোগ, ডায়াবেটিস বা উচ্চ রক্তচাপ থাকা সত্ত্বেও ঘুমের সমস্যা ক্রমেই বাড়ছে
এ ধরনের ক্ষেত্রে ডাক্তার প্রয়োজনে ঘুমের স্টাডি (polysomnography), লাইফস্টাইল পরিবর্তন, আচরণগত থেরাপি বা প্রয়োজনে নিরাপদ ওষুধ–সহায়তার পরামর্শ দিতে পারেন।
ছোট অভ্যাস, বড় সুরক্ষা
রাতে আলো জ্বেলে ঘুমোনো অভ্যাস অনেকের কাছে তেমন একটা “বড় সমস্যা” মনে নাও হতে পারে, কিন্তু আধুনিক গবেষণা দেখাচ্ছে – এটি ঘুমের হরমোন মেলাটোনিনকে উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে, শরীরের প্রাকৃতিক ঘড়ি নষ্ট করে ও দীর্ঘমেয়াদে হার্ট ও ডায়াবেটিসসহ নানা ক্রনিক রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। বিশেষ করে যারা আগে থেকেই হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, স্থূলতা বা টাইপ–২ ডায়াবেটিসে ভুগছেন, তাদের জন্য রাতে অকারণে আলোতে থাকা মানে নিজের ঝুঁকিকে নীরবে আরও একটু করে বাড়িয়ে দেওয়া।
অন্যদিকে ভালো ঘুম, অন্ধকার–নিরাপদ বেডরুম, শোয়ার আগে স্ক্রিন টাইম কমিয়ে আনা, নিয়মিত ঘুম–জাগরণ রুটিন ও সুষম খাদ্যাভ্যাস মিলিয়ে খুব সাধারণ কিছু পরিবর্তনই অনেকটা সুরক্ষা দিতে পারে। প্রয়োজন হলে চিকিৎসক, কার্ডিওলজিস্ট বা এন্ডোক্রাইনোলজিস্টের সঙ্গে নিজের ঘুমের পরিস্থিতি নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করলে, ওষুধ–ব্যবস্থা থেকে শুরু করে লাইফস্টাইল প্ল্যান—সবকিছু আরও ব্যক্তিগত ও কার্যকরভাবে সাজানো সম্ভব।
নিজের ও পরিবারের জন্য “ডার্ক স্লিপ–ফ্রেন্ডলি বেডরুম” তৈরি করা, শিশুদের রাতের স্ক্রিন টাইম নিয়ন্ত্রণ করা এবং অকারণ আলোতে ঘুমানোর অভ্যাস ত্যাগ করা – এই সামান্য পদক্ষেপগুলো ভবিষ্যতের হার্ট অ্যাটাক ও ডায়াবেটিস জটিলতা কমাতে বাস্তব অবদান রাখতে পারে। আজ যে আলোটি বন্ধ করছেন, সেটিই হয়তো আপনার হৃদয়ের চাপ একটু কমিয়ে দিচ্ছে, রক্তে গ্লুকোজ নিয়ন্ত্রণকে একটু স্থিতিশীল করছে এবং পরের দিনের কর্মক্ষমতাকে আরও বাড়িয়ে তুলছে।











