সোশ্যাল মিডিয়ার স্বাস্থ্য পরামর্শদাতা বনাম প্রকৃত চিকিৎসা বিজ্ঞান: বিশ্বাসের সংকটে আমরা

সোশ্যাল মিডিয়ায় স্বাস্থ্য বিষয়ক তথ্যের বিস্ফোরণ ঘটেছে, কিন্তু এর বেশিরভাগই বিভ্রান্তিকর এবং বিজ্ঞানসম্মত নয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এটিকে একটি "ইনফোডেমিক" হিসেবে চিহ্নিত করেছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য গুরুতর হুমকি। সাম্প্রতিক…

Srijita Chattopadhay

 

সোশ্যাল মিডিয়ায় স্বাস্থ্য বিষয়ক তথ্যের বিস্ফোরণ ঘটেছে, কিন্তু এর বেশিরভাগই বিভ্রান্তিকর এবং বিজ্ঞানসম্মত নয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এটিকে একটি “ইনফোডেমিক” হিসেবে চিহ্নিত করেছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য গুরুতর হুমকি। সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে যে ৫৩ জন সোশ্যাল মিডিয়া “সুপার-স্প্রেডার” প্রায় ২.৪ কোটি দুর্বল ব্যবহারকারীদের ক্ষতিকর স্বাস্থ্য পরামর্শ দিচ্ছেন, যাদের অর্ধেকেরও বেশি কোনো স্বাস্থ্য-সম্পর্কিত যোগ্যতা নেই। এই নিবন্ধে আমরা জানব কীভাবে সোশ্যাল মিডিয়ার স্বাস্থ্য পরামর্শদাতা এবং প্রকৃত চিকিৎসা বিজ্ঞানের মধ্যে পার্থক্য করা যায় এবং কাদের বিশ্বাস করা উচিত।

স্বাস্থ্য ভুল তথ্যের ভয়াবহ বাস্তবতা

স্বাস্থ্য সম্পর্কিত ভুল তথ্য শুধুমাত্র বিভ্রান্তিকর নয়, এটি প্রাণঘাতীও হতে পারে। ক্যানাডিয়ান মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের ২০২৫ সালের একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে যে ৩৫ শতাংশ কানাডিয়ান স্বাস্থ্য ভুল তথ্যের কারণে কার্যকর চিকিৎসা এড়িয়ে গেছেন, যা আগের বছরের তুলনায় ৬ পয়েন্ট বৃদ্ধি পেয়েছে। আরও উদ্বেগজনকভাবে, ২৩ শতাংশ মানুষ অনলাইনে পাওয়া স্বাস্থ্য পরামর্শ অনুসরণ করে প্রতিকূল প্রতিক্রিয়া অনুভব করেছেন।

ECRI (একটি স্বীকৃত রোগী সুরক্ষা সংস্থা) তাদের ২০২৫ সালের বার্ষিক রোগী সুরক্ষা তালিকায় ব্যাপক চিকিৎসা ভুল তথ্যকে তৃতীয় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এই ভুল তথ্যের ফলে রোগীরা চিকিৎসা নিতে দেরি করছেন, প্রমাণ-ভিত্তিক চিকিৎসা প্রত্যাখ্যান করছেন এবং চিকিৎসক-রোগী সম্পর্কে বিশ্বাসের অভাব তৈরি হচ্ছে।

ভারতেও এই সমস্যা গুরুতর রূপ নিয়েছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে প্রকাশিত “হেলথ মিসইনফরমেশন ভেক্টরস ইন ইন্ডিয়া” রিপোর্টে দেখা গেছে যে প্রজনন স্বাস্থ্য, ক্যান্সার, টিকা এবং ডায়াবেটিস ও স্থূলতার মতো জীবনযাত্রা-সম্পর্কিত রোগ সম্পর্কে সবচেয়ে বেশি ভুল তথ্য ছড়ানো হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভারতে ডিজিটাল প্রবেশাধিকার বেশি থাকলেও স্বাস্থ্য তথ্যের বিষয়ে সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনা কম, যা প্রাণঘাতী পরিণতি ডেকে আনতে পারে।

সোশ্যাল মিডিয়া: স্বাস্থ্য তথ্যের নতুন উৎস

সোশ্যাল মিডিয়া আজকের যুগে স্বাস্থ্য তথ্যের একটি প্রধান উৎস হয়ে উঠেছে। ২০২৪ সালের একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে যে ৫২ শতাংশেরও বেশি রোগী তাদের চিকিৎসকের পরামর্শের চেয়ে সোশ্যাল মিডিয়া এবং অনলাইন সম্পদকে বেশি বিশ্বাস করেন। যারা গত ১২ মাসে নতুন স্বাস্থ্য বা সুস্থতার প্রবণতা গ্রহণ করেছেন, তাদের ৫২ শতাংশ সোশ্যাল মিডিয়া থেকে এই অভ্যাসগুলি শিখেছেন।

ইউটিউব স্বাস্থ্য তথ্যের একটি মূল প্রদানকারী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে, পুরুষদের এক-তৃতীয়াংশ এই প্ল্যাটফর্ম থেকে স্বাস্থ্য এবং সুস্থতার সরঞ্জাম বা প্রবণতা সম্পর্কে জানেন বলে জানিয়েছেন। তরুণ প্রজন্মের মধ্যে এই প্রবণতা আরও স্পষ্ট – প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ জেন জেড (৬৭ শতাংশ) এবং মিলেনিয়াল (৬৩ শতাংশ) রোগী সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করে স্বাস্থ্য সম্পর্কিত তথ্য পেয়েছেন।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, ২০২৫ সালের Edelman-এর সমীক্ষায় দেখা গেছে যে ১৮ থেকে ৩৪ বছর বয়সী ৪৫ শতাংশ মানুষ তাদের স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীর সুপারিশ উপেক্ষা করে বন্ধু বা পরিবারের পরামর্শ নিয়েছেন – যা আগের বছরের তুলনায় ১৩ পয়েন্ট বৃদ্ধি। এছাড়া ৩৮ শতাংশ তরুণ প্রাপ্তবয়স্করা তাদের চিকিৎসকের পরামর্শের চেয়ে সোশ্যাল মিডিয়ার পরামর্শ পছন্দ করেছেন, যা আগের বছরের তুলনায় ১২ পয়েন্ট বৃদ্ধি।

স্বাস্থ্য ইনফ্লুয়েন্সারদের ভয়াবহ সত্য

সাম্প্রতিক গবেষণা স্বাস্থ্য ইনফ্লুয়েন্সারদের সম্পর্কে চমকপ্রদ তথ্য প্রকাশ করেছে। ২০২৫ সালের মে মাসে প্রকাশিত একটি রিপোর্টে দেখা গেছে যে সোশ্যাল মিডিয়ায় স্বাস্থ্য ভুল তথ্যের “সুপার-স্প্রেডার”দের ৯৬ শতাংশ ভুল তথ্য প্রচার করে আর্থিকভাবে লাভবান হন। এদের মধ্যে ৮৭ শতাংশ চিকিৎসা চিকিৎসক নন, তবে পাঁচজনের মধ্যে একজন নিজেকে প্রমাণিত বিশেষজ্ঞ হিসেবে উপস্থাপন করেন।

University of Sydney-এর নেতৃত্বে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে JAMA Network Open-এ প্রকাশিত একটি বৈশ্বিক গবেষণায় দেখা গেছে যে Instagram এবং TikTok-এ ইনফ্লুয়েন্সাররা চিকিৎসা পরীক্ষা সম্পর্কে “অপ্রতিরোধ্যভাবে” বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচার করছেন। গবেষকরা প্রায় ১০০০টি পোস্ট বিশ্লেষণ করেছেন যা ৫টি বিতর্কিত চিকিৎসা স্ক্রিনিং পরীক্ষা সম্পর্কে প্রায় ২০ কোটি ফলোয়ারের কাছে প্রচার করা হয়েছিল। এদের বেশিরভাগ পোস্টে বৈজ্ঞানিক প্রমাণের কোনো উল্লেখ ছিল না, এগুলো প্রচারমূলক ছিল, স্পষ্ট আর্থিক স্বার্থ ছিল এবং সম্ভাব্য ক্ষতির উল্লেখ করতে ব্যর্থ হয়েছিল।

Dr. Brooke Nickel, যিনি এই গবেষণার নেতৃত্ব দিয়েছেন, বলেছেন, “এই পোস্টগুলির বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠতা অপ্রতিরোধ্যভাবে বিভ্রান্তিকর ছিল। এগুলো প্রাথমিক স্ক্রিনিংয়ের ছদ্মবেশে প্রচার করা হচ্ছে, যাতে আপনি আপনার নিজের স্বাস্থ্যের নিয়ন্ত্রণ নিতে পারেন। সমস্যা হলো এগুলো বেশিরভাগ মানুষের জন্য অপ্রয়োজনীয় এবং কিছু ক্ষেত্রে তাদের কার্যকারিতা সমর্থনকারী বিজ্ঞান দুর্বল।”

ভুল তথ্যের পিছনে চারটি প্রধান কারণ

BMJ Group-এর ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সারদের চিকিৎসা পরামর্শে চারটি প্রধান পক্ষপাতের উৎস চিহ্নিত করা হয়েছে:

১. চিকিৎসা দক্ষতা বা প্রাসঙ্গিক জ্ঞানের অভাব: বেশিরভাগ স্বাস্থ্য ইনফ্লুয়েন্সারদের প্রকৃত চিকিৎসা শিক্ষা নেই।

২. শিল্প প্রভাব: অনেকেই নির্দিষ্ট পণ্য বা ব্র্যান্ড প্রচারের জন্য অর্থ পান।

৩. উদ্যোক্তা স্বার্থ: তারা তাদের নিজস্ব পণ্য বা পরিষেবা বিক্রয় করে।

৪. ব্যক্তিগত বিশ্বাস: বৈজ্ঞানিক প্রমাণের চেয়ে ব্যক্তিগত মতামত প্রাধান্য পায়।

একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হলো সেলিব্রিটি Kim Kardashian, যিনি তার ৩৬ কোটি Instagram ফলোয়ারদের MRI দিয়ে সম্পূর্ণ শরীর স্ক্রিনিং করার জন্য উৎসাহিত করেছিলেন – একটি পরীক্ষা যার প্রমাণিত সুবিধা নেই এবং অতিরিক্ত নির্ণয়, অপ্রয়োজনীয় হস্তক্ষেপ এবং খরচের সাথে যুক্ত।

ভুল তথ্যের ধরন এবং প্রভাব

ভুল তথ্যের ধরন প্রভাব প্রধান প্ল্যাটফর্ম
প্রজনন স্বাস্থ্য সম্পর্কিত অনিরাপদ গর্ভপাত পদ্ধতি, লিঙ্গ নির্বাচন Instagram,
ক্যান্সার চিকিৎসা প্রমাণিত চিকিৎসা প্রত্যাখ্যান, বিকল্প থেরাপি YouTube, Facebook
ভ্যাক্সিন বিরোধী টিকা নিতে অস্বীকার, রোগের পুনরুত্থান Facebook, X (Twitter)
জীবনযাত্রা রোগ ডায়াবেটিস, স্থূলতা সম্পর্কে ভুল পরামর্শ Instagram, YouTube

একটি TikTok গবেষণায় দেখা গেছে যে স্বাস্থ্য ভুল তথ্য সম্পর্কিত ভিডিওগুলি প্রায় ৫ বিলিয়ন ভিউ এবং ১.৪৬ কোটি লাইক পেয়েছে। এটি দেখায় যে অ্যালগরিদম এমন কন্টেন্টকে প্রচার করছে যা প্রচুর এনগেজমেন্ট তৈরি করছে কিন্তু অগত্যা সঠিক বা নির্ভরযোগ্য নয়।

বিশ্বাসযোগ্য স্বাস্থ্য তথ্য কীভাবে চিনবেন

National Academy of Medicine (NAM) সোশ্যাল মিডিয়ায় বিশ্বাসযোগ্য স্বাস্থ্য তথ্যের উৎস চিহ্নিত করার জন্য কিছু নীতি এবং বৈশিষ্ট্য তৈরি করেছে। ২০২১ সালে প্রকাশিত এবং ২০২২ সালে WHO দ্বারা সমর্থিত এই নীতিগুলি হলো:

বিজ্ঞান-ভিত্তিক তথ্য

উৎসগুলি এমন তথ্য প্রদান করবে যা সেই সময়ে উপলব্ধ সর্বোত্তম বৈজ্ঞানিক প্রমাণের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তথ্যে উদ্ধৃতি (citations) ব্যবহার করা হয়েছে কিনা তা পরীক্ষা করুন। PubMed, Google Scholar বা Science.gov-এ প্রকাশিত বড় আকারের, পিয়ার-রিভিউড বৈজ্ঞানিক গবেষণা বিশ্বাসযোগ্য উৎস।

নিরপেক্ষতা এবং স্বার্থের দ্বন্দ্ব প্রকাশ

উৎসগুলি আর্থিক এবং অন্যান্য ধরনের স্বার্থের দ্বন্দ্বের প্রভাব কমাতে পদক্ষেপ নেবে। যদি কোনো সৃষ্টিকর্তা কোনো পণ্য বিক্রি করে বা ব্র্যান্ড প্রচার করে, তবে তাদের পরামর্শ পক্ষপাতদুষ্ট হতে পারে। Eric Berg-এর মতো ব্যক্তিরা, যিনি একজন মার্কিন chiropractor এবং YouTube-এ ১.৪ কোটি সাবস্ক্রাইবার রয়েছে, উচ্চ মাত্রায় সাপ্লিমেন্ট প্রচার করেন এবং তার নিজস্ব ভিটামিন ডি এবং অন্যান্য সাপ্লিমেন্ট বিক্রয় করেন।

যোগ্যতা এবং লাইসেন্স যাচাই

যদি কোনো সৃষ্টিকর্তা লাইসেন্সপ্রাপ্ত চিকিৎসা পেশাদার হন, তবে আপনি তাদের শংসাপত্র অনলাইনে খুঁজে পেতে পারেন। যদি তাদের চিকিৎসা শংসাপত্র প্রত্যাহার করা হয়ে থাকে বা চিকিৎসা কেলেঙ্কারিতে জড়িত থাকে, তবে তারা চিকিৎসা তথ্যের জন্য ভালো উৎস নন।

তথ্যের উৎস পরীক্ষা করুন

সবসময় দেখুন তথ্যদাতা তাদের উৎস শেয়ার করছেন কিনা। তাদের উৎস বা তথ্য যদি প্রতিষ্ঠিত, বিশ্বস্ত উৎসগুলির সাথে বিরোধিতা করে, তবে এটি একটি লাল পতাকা। নির্ভরযোগ্য উৎসের মধ্যে রয়েছে:

  • পেশাদার চিকিৎসা সংস্থা (American Academy of Pediatrics, American Medical Association)

  • জনস্বাস্থ্য সংস্থা (WHO, CDC, ভারতীয় চিকিৎসা গবেষণা পরিষদ)

  • সরকারি স্বাস্থ্য বিভাগ

চিকিৎসক বনাম ইনফ্লুয়েন্সার: কাকে বিশ্বাস করবেন

যদিও কিছু চিকিৎসক সোশ্যাল মিডিয়ায় সক্রিয়ভাবে স্বাস্থ্য তথ্য শেয়ার করছেন, তবুও সতর্ক থাকা প্রয়োজন। গবেষণায় দেখা গেছে যে চিকিৎসা যোগ্যতাসম্পন্ন ইনফ্লুয়েন্সাররাও বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রদান করতে পারেন, বিশেষত যদি তারা তাদের নিজস্ব পণ্য বিক্রয় করেন বা নির্দিষ্ট জীবনযাত্রা বা খাদ্যতালিকা প্রচার করেন।

Healthline Media-এর প্রধান চিকিৎসা কর্মকর্তা Dr. Jenny Yu বলেছেন, “মানুষের স্বভাবতই সবচেয়ে সম্পর্কিত উৎস থেকে পরামর্শ নেওয়া হয়, অগত্যা সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য নয়, যা ভুল তথ্য ছড়ানোর উপায়।”

আপনার চিকিৎসকের সাথে সরাসরি যোগাযোগ সবসময় সর্বোত্তম। তারা আপনার ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য ইতিহাস, বর্তমান অবস্থা এবং প্রয়োজন বোঝেন। সোশ্যাল মিডিয়ায় পাওয়া যেকোনো তথ্য আপনার চিকিৎসকের সাথে আলোচনা করুন, বিশেষত যদি এটি আপনার বর্তমান চিকিৎসা পরিকল্পনার সাথে বিরোধিতা করে।

ভারতে স্বাস্থ্য ভুল তথ্যের প্রভাব

ভারতে স্বাস্থ্য সাক্ষরতা কম এবং ডিজিটাল ব্যবহার বেশি, যা একটি বিপজ্জনক সমন্বয় তৈরি করছে। “হেলথ মিসইনফরমেশন ভেক্টরস ইন ইন্ডিয়া” রিপোর্ট অনুযায়ী, অক্টোবর ২০২৩ থেকে নভেম্বর ২০২৪ পর্যন্ত সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করা স্বাস্থ্য-সম্পর্কিত কন্টেন্ট বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে যে জীবন-পরিবর্তনকারী রোগ যেমন ক্যান্সার এবং প্রজনন স্বাস্থ্য সম্পর্কে ভুল তথ্য সবচেয়ে বেশি ছড়ানো হচ্ছে।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ Ankita Srivastava সতর্ক করে বলেছেন, “নিম্ন স্বাস্থ্য সাক্ষরতা ভুল তথ্যকে অনিয়ন্ত্রিতভাবে ছড়িয়ে পড়তে দেয়, যার ফলে খারাপ স্বাস্থ্য পছন্দ, বিলম্বিত চিকিৎসা হস্তক্ষেপ এবং নকল চিকিৎসার প্রতি বর্ধিত দুর্বলতা দেখা যায়। ভারতে, যেখানে ডিজিটাল অনুপ্রবেশ বেশি কিন্তু স্বাস্থ্য তথ্য সম্পর্কে সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনা কম, ভুল তথ্য প্রাণঘাতী পরিণতি ডেকে আনতে পারে।”

Indian School of Business-এর একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে যে সোশ্যাল মিডিয়া ভারতে ভুল খবরের একটি প্রধান চালক, X (পূর্বে Twitter) এবং Facebook ভুল তথ্য ছড়ানোর শীর্ষ প্ল্যাটফর্ম হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ সহ বিভিন্ন রাজ্যে স্থানীয় ভাষায় স্বাস্থ্য ভুল তথ্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে, যা গ্রামীণ এলাকায় বিশেষভাবে উদ্বেগজনক।

সমাধানের পথ

স্বাস্থ্য ভুল তথ্যের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য বহুমুখী পদ্ধতি প্রয়োজন। মার্কিন সার্জন জেনারেল সুপারিশ করেছেন যে স্বাস্থ্য পেশাদাররা রোগী-কেন্দ্রিক যোগাযোগ কৌশল গ্রহণ করুন। কিছু মূল সুপারিশ হলো:

রোগীদের সাথে সক্রিয়ভাবে জড়িত হওয়া: চিকিৎসকদের উচিত রোগীদের সাথে স্বাস্থ্য ভুল তথ্য নিয়ে আলোচনা করা এবং তাদের উদ্বেগ শোনা।

সঠিক তথ্য শেয়ার করা: জনসাধারণের সাথে সঠিক তথ্য শেয়ার করা এবং অনলাইন তথ্য সম্পর্কে আলোচনাকে স্বাভাবিক করা।

সম্প্রদায় গোষ্ঠীর সাথে অংশীদারিত্ব: স্থানীয় পর্যায়ে স্বাস্থ্য ভুল তথ্য প্রতিরোধ এবং সমাধান করতে সম্প্রদায় সংস্থাগুলির সাথে সহযোগিতা করা।

কঠোর নিয়ন্ত্রণ: ডিজিটাল মিডিয়ায় স্বাস্থ্য-সম্পর্কিত কন্টেন্ট সম্পর্কে কঠোর নিয়ম প্রয়োজন।

প্রযুক্তি এবং শিক্ষা: জনস্বাস্থ্য পাঠ্যক্রমে স্বাস্থ্য সাক্ষরতা এবং ভুল তথ্য ব্যবস্থাপনার জন্য প্রযুক্তি অন্তর্ভুক্ত করা।

অ্যালগরিদম পরিবর্তন: টেক প্ল্যাটফর্মগুলির এমন অ্যালগরিদম তৈরি করা উচিত যা বিশ্বাসযোগ্য তথ্য এবং ফ্যাক্ট-চেককে অগ্রাধিকার দেয়।

King’s College London-এর গবেষণা অনুযায়ী, সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলি যদি নিয়ন্ত্রক হস্তক্ষেপ ছাড়াই স্বাস্থ্য ভুল তথ্য থেকে লাভ করতে থাকে, তবে আমরা আরও মৃত্যু দেখব।

আপনার করণীয়

সমালোচনামূলক চিন্তা করুন: সোশ্যাল মিডিয়ায় পাওয়া যেকোনো স্বাস্থ্য পরামর্শ সমালোচনামূলকভাবে মূল্যায়ন করুন। যদি কিছু “খুব ভালো সত্য হতে” মনে হয়, তবে এটি সম্ভবত তাই।

যাচাই করুন: বিশ্বস্ত উৎসের সাথে তথ্য যাচাই করুন। WHO, CDC, ভারতীয় চিকিৎসা গবেষণা পরিষদ, এবং পেশাদার চিকিৎসা সংস্থাগুলির ওয়েবসাইট পরীক্ষা করুন।

উৎস চিহ্নিত করুন: তথ্যদাতা কে? তাদের কি যোগ্যতা আছে? তারা কি কোনো পণ্য বিক্রয় করছেন?

চিকিৎসকের সাথে কথা বলুন: যেকোনো বড় স্বাস্থ্য সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে আপনার চিকিৎসকের সাথে পরামর্শ করুন।

সতর্ক থাকুন: যদি আপনি ভুল তথ্য দেখেন, তবে এটি রিপোর্ট করুন এবং শেয়ার করবেন না।

শিক্ষিত হন: স্বাস্থ্য সাক্ষরতা উন্নত করুন এবং কীভাবে নির্ভরযোগ্য স্বাস্থ্য তথ্য চিহ্নিত করবেন তা শিখুন।

সোশ্যাল মিডিয়ায় স্বাস্থ্য তথ্যের বন্যা আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রেখেছে – আমরা কাদের বিশ্বাস করব? যদিও সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সাররা আরও সম্পর্কিত মনে হতে পারে, তবে প্রমাণ-ভিত্তিক চিকিৎসা বিজ্ঞান এবং যোগ্য স্বাস্থ্যসেবা পেশাদারদের পরামর্শই সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য। সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ৩৫ শতাংশ মানুষ ভুল তথ্যের কারণে কার্যকর চিকিৎসা এড়িয়ে যাচ্ছেন, যা একটি ক্রমবর্ধমান জনস্বাস্থ্য সংকট। আমাদের সকলের দায়িত্ব হলো সমালোচনামূলক চিন্তা করা, তথ্য যাচাই করা এবং বিশ্বস্ত উৎস থেকে স্বাস্থ্য পরামর্শ নেওয়া। সোশ্যাল মিডিয়া একটি সহায়ক সরঞ্জাম হতে পারে, কিন্তু এটি কখনই যোগ্য চিকিৎসা পেশাদারদের প্রতিস্থাপন করতে পারে না। স্বাস্থ্য ভুল তথ্যের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য সরকার, প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্ম, স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী এবং ব্যক্তিদের সম্মিলিত প্রয়াস প্রয়োজন। শুধুমাত্র তখনই আমরা একটি স্বাস্থ্যকর, আরও সচেতন সমাজ তৈরি করতে পারব যেখানে সঠিক তথ্য প্রাধান্য পায় এবং মানুষ তাদের স্বাস্থ্য সম্পর্কে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে।

About Author
Srijita Chattopadhay

সৃজিতা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় স্নাতক। তিনি একজন প্রতিশ্রুতিশীল লেখক এবং সাংবাদিক, যিনি তার লেখা দ্বারা বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির সমৃদ্ধি তুলে ধরতে সদা উদ্যমী। সৃজিতার লেখার ধারা মূলত সাহিত্য, সমাজ এবং সংস্কৃতির বিভিন্ন দিককে ঘিরে আবর্তিত হয়, যেখানে তিনি তার গভীর পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা ও বিশ্লেষণী দক্ষতার পরিচয় দেন। তাঁর নিবন্ধ ও প্রতিবেদনগুলি পাঠকদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে, যা তার বস্তুনিষ্ঠতা ও সংবেদনশীলতার পরিচয় বহন করে। সৃজিতা তার কর্মজীবনে ক্রমাগত নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে বদ্ধপরিকর, যা তাকে বাংলা সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে একটি উজ্জ্বল ভবিষ্যতের দিকে নিয়ে যাচ্ছে।

আরও পড়ুন