বদঅভ্যাসে ভয়াবহ গতিতে কমছে শুক্রাণুর সংখ্যা, পুরুষত্বহীনতা এড়াতে পুরুষদের জানা জরুরি কী খেতে হবে

আধুনিক জীবনযাত্রার নেতিবাচক প্রভাবে বিশ্বব্যাপী পুরুষদের শুক্রাণুর সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে হ্রাস পাচ্ছে। ১৯৭৩ সাল থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে পুরুষদের শুক্রাণুর ঘনত্ব ৫১.৬% কমে গেছে এবং এই হ্রাসের গতি প্রতি…

Debolina Roy

 

আধুনিক জীবনযাত্রার নেতিবাচক প্রভাবে বিশ্বব্যাপী পুরুষদের শুক্রাণুর সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে হ্রাস পাচ্ছে। ১৯৭৩ সাল থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে পুরুষদের শুক্রাণুর ঘনত্ব ৫১.৬% কমে গেছে এবং এই হ্রাসের গতি প্রতি বছর ত্বরান্বিত হচ্ছে । বিশেষভাবে উদ্বেগের বিষয় হলো, ২০০০ সালের পর এই হ্রাসের হার প্রতি বছর ২.৬৪%-এ উন্নীত হয়েছে, যা পূর্ববর্তী দশকগুলির তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি । পশ্চিমবঙ্গের পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ—এক জাতীয় সমীক্ষায় দেখা গেছে যে রাজ্যের ৮৬% পুরুষের শুক্রাণুতে অস্বাভাবিকতা রয়েছে, যা সারা ভারতে সর্বোচ্চ ।

শুক্রাণু সংকট: একটি বৈশ্বিক জনস্বাস্থ্য সমস্যা

হিব্রু ইউনিভার্সিটি অফ জেরুজালেম এবং মাউন্ট সিনাই মেডিকেল সেন্টারের গবেষকদের একটি ব্যাপক মেটা-অ্যানালাইসিস অনুসারে, উত্তর আমেরিকা, ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়া সহ দক্ষিণ এশিয়া, আফ্রিকা এবং মধ্য আমেরিকার পুরুষদের মধ্যেও শুক্রাণুর সংখ্যায় উল্লেখযোগ্য হ্রাস লক্ষ্য করা গেছে । ২০১৮ সালে বিশ্বব্যাপী গড় শুক্রাণু ঘনত্ব ছিল প্রতি মিলিলিটারে ৪৯ মিলিয়ন, যেখানে ১৯৭৩ সালে এটি ছিল ১০১.২ মিলিয়ন । চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের মতে, শুক্রাণুর সংখ্যা প্রতি মিলিলিটারে ৪৫ মিলিয়নের নিচে নামলে গর্ভধারণের ক্ষমতা নাটকীয়ভাবে হ্রাস পায় ।

পশ্চিমবঙ্গে পরিস্থিতি

ইন্দিরা আইভিএফ কেন্দ্র দ্বারা ২০১৮ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে পরিচালিত এক জাতীয় সমীক্ষায় ১৭টি রাজ্যের ৬৪,৪৫২ দম্পতির উপর গবেষণা করা হয়েছিল । এই গবেষণায় দেখা গেছে যে পশ্চিমবঙ্গের ৮৬% পুরুষ শুক্রাণুর তিনটি প্রধান সমস্যার মধ্যে অন্তত একটি থেকে ভুগছেন—শুক্রাণুর সংখ্যা, গতিশীলতা এবং আকৃতিগত অস্বাভাবিকতা । ২০২১ সালে রাজ্যের ১০.৮% পুরুষ রোগীর শুক্রাণু সম্পূর্ণভাবে অনুপস্থিত ছিল । বার্থ আইভিএফ ক্লিনিকের বিশেষজ্ঞদের মতে, পুরুষ বন্ধ্যাত্ব ২০% ক্ষেত্রে একমাত্র কারণ এবং ৩০-৪০% ক্ষেত্রে অবদানকারী উপাদান ।

বদঅভ্যাস যা শুক্রাণুর সংখ্যা ধ্বংস করছে

ধূমপান এবং মদ্যপান

ধূমপান শুক্রাণুর ডিএনএ-তে ক্ষতি সাধন করে, শুক্রাণুর সংখ্যা এবং গতিশীলতা উভয়ই হ্রাস করে । সিগারেট এবং মারিজুয়ানা উভয়ই পুরুষ প্রজনন ক্ষমতার জন্য ক্ষতিকর । অতিরিক্ত অ্যালকোহল সেবন টেস্টোস্টেরনের মাত্রা হ্রাস করে, ইরেকশন সমস্যা সৃষ্টি করে এবং শুক্রাণু উৎপাদন কমিয়ে দেয় ।

স্থূলতা এবং অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস

বডি মাস ইনডেক্স (BMI) ৩০ kg/m² বা তার বেশি হলে শুক্রাণুর সমস্ত পরামিতি উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায় । স্থূলতা হরমোনের ভারসাম্যে ব্যাঘাত ঘটায়, যা শুক্রাণুর সংখ্যা এবং গুণমান হ্রাস করতে পারে । চিনি, সয়া পণ্য, প্রক্রিয়াজাত মাংস, লাল মাংস, স্যাচুরেটেড এবং ট্রান্স ফ্যাটি অ্যাসিড, আলু, এবং অত্যধিক ক্যাফেইন ও অ্যালকোহল গ্রহণ পুরুষ বন্ধ্যাত্বের সাথে গভীরভাবে সম্পর্কিত ।

তাপ এবং বিকিরণ

অণ্ডকোষের চারপাশে দীর্ঘক্ষণ তাপ (হট টাব, সনা, বা এমনকি টাইট অন্তর্বাস থেকে) শুক্রাণু উৎপাদন হ্রাস করতে পারে । কোলে ল্যাপটপ রাখা, দীর্ঘ সময় বসে থাকা এবং মোবাইল ফোনের অত্যধিক ব্যবহার শুক্রাণুর স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর ।

মানসিক চাপ এবং ঘুমের অভাব

মানসিক চাপ এবং অপর্যাপ্ত ঘুম হরমোনের ভারসাম্যে বিঘ্ন ঘটায় এবং শুক্রাণুর সংখ্যা কমায় । পুরুষদের প্রতি রাতে ৭ থেকে ৭.৫ ঘণ্টা ঘুমানো উচিত । শিফট কাজ এবং অনিয়মিত সময়সূচী হরমোনের ভারসাম্য ব্যাহত করে এবং শুক্রাণুর সংখ্যা হ্রাস করতে পারে ।

সামগ্রিক প্রভাব

মেটা-অ্যানালাইসিসগুলি অনুসারে, অস্বাস্থ্যকর অভ্যাসের সামগ্রিক প্রভাব পরিমাপ করলে দেখা যায় যে একজন সুস্থ যুবকের শুক্রাণুর ঘনত্ব ১০ মিলিয়ন/মিলি, শুক্রাণুর আকৃতি ৩%, শুক্রাণু কোষের জীবনীশক্তি ৮% এবং শুক্রাণু কোষের গতিশীলতা ১২% হ্রাস পায় ।

পুরুষ প্রজনন ক্ষমতা বৃদ্ধির খাদ্য তালিকা

ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড সমৃদ্ধ খাবার

ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড শুক্রাণুর ঘনত্ব বৃদ্ধিতে সর্বোচ্চ কার্যকারিতা দেখিয়েছে । ওমেগা-৩ শুক্রাণুর অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ক্ষমতা বৃদ্ধি করে এবং লিপিড পারঅক্সিডেশনের কারণে ডিএনএ ক্ষতি প্রতিরোধ করে । EPA এবং DHA-এর মাত্রা বৃদ্ধি করে, যা সুপারঅক্সাইড ডিসমিউটেজের মতো অ্যান্টিঅক্সিডেন্টের মাত্রা বাড়ায় ।

সেরা উৎস:

  • পাবদা, রুই, কাতলা মাছ

  • আখরোট (walnuts)

  • তিসি বীজ (flaxseeds)

জিঙ্ক সমৃদ্ধ খাবার

জিঙ্ক শুক্রাণু কোষ উৎপাদনে বিশাল ভূমিকা পালন করে । জিঙ্কের ঘাটতি শুক্রাণুর গতিশীলতা হ্রাস করতে পারে এবং প্রজনন ক্ষমতা কমায় । যব, মটরশুটি এবং লাল মাংস জিঙ্কের সমৃদ্ধ উৎস  ।

জিঙ্ক সমৃদ্ধ খাবার:

  • কুমড়ার বীজ

  • পোস্তদানা

  • ছোলা এবং ডাল

  • পনির

অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ খাবার

ভিটামিন C, E এবং সেলেনিয়াম সমৃদ্ধ খাবার শুক্রাণুর স্বাস্থ্যকর বিকাশে সহায়তা করে । L-কার্নিটিন শুক্রাণুর গতিশীলতা এবং আকৃতিতে প্রথম স্থানে রয়েছে । কোএনজাইম-Q10 শুক্রাণুর গতিশীলতা এবং ঘনত্বের উপর উন্নত কার্যকর চিকিৎসা রয়েছে ।

অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ খাবার:

  • পালং শাক এবং অন্যান্য শাক

  • অ্যাস্পারাগাস

  • টমেটো (লাইকোপিন)

  • বেরি জাতীয় ফল

প্রোটিন এবং ফলিক অ্যাসিড

ডিম চমৎকার প্রোটিন এবং ভিটামিন E-এর উৎস, যা শুক্রাণুকে মুক্ত র‍্যাডিক্যাল ক্ষতি থেকে রক্ষা করে । পালং শাকে উচ্চ মাত্রার ফলেট এবং আয়রন রয়েছে, যা স্বাস্থ্যকর শুক্রাণু গঠনের জন্য অপরিহার্য ।

মাকা রুট এবং বিশেষ খাবার

মাকা রুট শুক্রাণুর সংখ্যা এবং প্রজনন ক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য পরিচিত । যে পুরুষরা এই ভেষজটি সম্পূরক হিসাবে গ্রহণ করেন, তাদের বীর্যের পরিমাণ বৃদ্ধি পায় এবং শুক্রাণুর উন্নত গতিশীলতা থাকে ।

শুক্রাণু বৃদ্ধির সম্পূর্ণ খাদ্য তালিকা

খাবার উপকারিতা
আখরোট ওমেগা-৩, শুক্রাণুর ঘনত্ব এবং গতিশীলতা বৃদ্ধি করে
ডিম প্রোটিন এবং ভিটামিন E, শুক্রাণুকে ক্ষতি থেকে রক্ষা করে
পাবদা মাছ ওমেগা-৩, শুক্রাণুর গতিশীলতা এবং সংখ্যা বাড়ায়
পালং শাক ফলেট এবং আয়রন, শুক্রাণু গঠনে অপরিহার্য
কুমড়ার বীজ জিঙ্ক এবং ওমেগা-৩, রক্ত সঞ্চালন এবং বীর্যের পরিমাণ বৃদ্ধি
পোস্তদানা জিঙ্ক এবং ম্যাগনেসিয়াম, হরমোন নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে
কিশমিশ অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, শুক্রাণুর স্বাস্থ্য উন্নত করে
দই প্রোবায়োটিক, প্রজনন স্বাস্থ্য সমর্থন করে
কলা ব্রোমেলাইন এবং ভিটামিন B6, হরমোন নিয়ন্ত্রণ করে
অ্যাস্পারাগাস ভিটামিন C, শুক্রাণু গুণমান এবং গতিশীলতা বৃদ্ধি করে

জীবনযাত্রায় ইতিবাচক পরিবর্তন

নিয়মিত ব্যায়াম এবং ওজন নিয়ন্ত্রণ

নিয়মিত শারীরিক কার্যকলাপ উন্নত শুক্রাণুর গতিশীলতা এবং সামগ্রিক শুক্রাণুর গুণমানের সাথে যুক্ত । সুস্থ বডি মাস ইনডেক্স বজায় রাখতে সক্রিয় থাকুন । তবে অতিরিক্ত প্রশিক্ষণ বা পারফরম্যান্স বর্ধক সাপ্লিমেন্টের অত্যধিক ব্যবহান বিপরীত প্রভাব ফেলতে পারে ।

তাপ এড়ানো

ঘন ঘন সনা বা হট টাব ব্যবহার সাময়িকভাবে শুক্রাণু উৎপাদন হ্রাস করে । টাইট পোশাক এড়িয়ে চলুন এবং কোলে ল্যাপটপ রাখা থেকে বিরত থাকুন, কারণ এটি অণ্ডকোষের তাপমাত্রা বাড়ায় ।

মানসিক চাপ কমানো

মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন নিন এবং চাপ কমাতে ধ্যান, যোগব্যায়াম বা অন্যান্য শিথিলকরণ কৌশল অনুশীলন করুন । পর্যাপ্ত এবং নিয়মিত ঘুম নিশ্চিত করুন ।

ক্ষতিকর পদার্থ এড়ানো

ধূমপান এবং মদ্যপান সম্পূর্ণ বন্ধ করুন বা সীমিত করুন । অ্যানাবলিক স্টেরয়েড, কোকেন এবং মারিজুয়ানা অণ্ডকোষের সংকোচন এবং শুক্রাণু উৎপাদন হ্রাস করে ।

৭-দিনের খাদ্য পরিকল্পনা

পুরুষ প্রজনন ক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, প্রোটিন, জিঙ্ক, ফলেট এবং প্রয়োজনীয় ফ্যাটি অ্যাসিড সমৃদ্ধ খাবারের উপর মনোনিবেশ করুন । প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় অন্তর্ভুক্ত করুন:

সকালের নাস্তা: ডিম, দই, কলা এবং আখরোট
দুপুরের খাবার: পাবদা মাছ বা মুরগির মাংস, পালং শাক, বাদামী চাল
সন্ধ্যার স্ন্যাক্স: কুমড়ার বীজ, কিশমিশ
রাতের খাবার: ডাল, সবজি, পোস্ত দিয়ে রান্না, পনির

নিয়মিত তাজা ফল, বিশেষ করে বেরি জাতীয় ফল এবং সবুজ শাকসবজি খান ।

চিকিৎসা পরামর্শ কখন নেবেন

যদি দম্পতি এক বছর বা তার বেশি সময় ধরে অরক্ষিত যৌন মিলনের পরেও গর্ভধারণ করতে না পারেন, তবে উভয় অংশীদারেরই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত । আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতি যেমন IVF, হরমোন চিকিৎসা বা ইন্ট্রাসাইটোপ্লাজমিক স্পার্ম ইনজেকশন সহায়ক হতে পারে । মনে রাখবেন, পুরুষ এবং মহিলা উভয়ের কারণই প্রায়শই একসাথে বিদ্যমান থাকে, তাই উভয়েরই পরীক্ষা করা গুরুত্বপূর্ণ ।

বিশ্বব্যাপী শুক্রাণু সংখ্যার ক্রমাগত হ্রাস একটি গুরুতর জনস্বাস্থ্য উদ্বেগ হিসাবে স্বীকৃত । পশ্চিমবঙ্গে পরিস্থিতি বিশেষভাবে উদ্বেগজনক, যেখানে ৮৬% পুরুষ শুক্রাণু সম্পর্কিত সমস্যায় ভুগছেন । তবে আশার কথা হলো, জীবনযাত্রার পরিবর্তন এবং সঠিক খাদ্যাভ্যাসের মাধ্যমে এই সমস্যা অনেকাংশে প্রতিরোধ এবং নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব । ধূমপান ও মদ্যপান বন্ধ, স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখা, ওমেগা-৩, জিঙ্ক এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ খাবার নিয়মিত গ্রহণ এবং মানসিক চাপ কমানো পুরুষ প্রজনন ক্ষমতা রক্ষায় অত্যন্ত কার্যকর । প্রজনন স্বাস্থ্য শুধুমাত্র ব্যক্তিগত নয়, বরং সামাজিক এবং জাতীয় গুরুত্বেরও বিষয়, তাই এই বিষয়ে সচেতনতা এবং তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ অত্যাবশ্যক ।

About Author
Debolina Roy

দেবলীনা রায় একজন চিকিৎসক এবং স্বাস্থ্য বিষয়ক লেখক, যিনি স্বাস্থ্য সচেতনতা এবং চিকিৎসা বিজ্ঞান সম্পর্কে পাঠকদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য নিবেদিত। ডাক্তারি নিয়ে পড়াশোনা করা দেবলীনা তার লেখায় চিকিৎসা বিষয়ক জটিল তথ্যগুলি সহজ ভাষায় উপস্থাপন করেন, যা সাধারণ পাঠকদের জন্য সহজবোধ্য এবং উপকারী। স্বাস্থ্য, পুষ্টি, এবং রোগ প্রতিরোধের বিষয়ে তার গভীর জ্ঞান এবং প্রাঞ্জল লেখনী পাঠকদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। দেবলীনা রায়ের লক্ষ্য হল সঠিক ও তথ্যনির্ভর স্বাস্থ্যবিধি প্রচার করা এবং মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত করা।

আরও পড়ুন