ঋতু পরিবর্তনের দোরগোড়ায় বসন্তের থাবা: সজনে-নিমের ম্যাজিক দিয়ে থাকুন সুস্থ!

বসন্ত এলেই বাতাসে মিশে যায় ফুলের গন্ধ, তবে এর সাথে সাথে আসে অসুখ-বিসুখের একগাদা ঝামেলা। শীত থেকে গ্রীষ্মে যাওয়ার এই সন্ধিক্ষণে আমাদের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়, ফলে সংক্রমণের…

Debolina Roy

 

বসন্ত এলেই বাতাসে মিশে যায় ফুলের গন্ধ, তবে এর সাথে সাথে আসে অসুখ-বিসুখের একগাদা ঝামেলা। শীত থেকে গ্রীষ্মে যাওয়ার এই সন্ধিক্ষণে আমাদের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়, ফলে সংক্রমণের ঝুঁকি বেড়ে যায় বহুগুণ। ভারতে প্রতি বছর ফেব্রুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত বসন্তকাল চলে, আর এই সময়টা স্বাস্থ্যের জন্য বেশ চ্যালেঞ্জিং। গবেষণা বলছে, ভারতে প্রায় ২০-৩০% মানুষ বসন্তকালে অ্যালার্জিক রাইনাইটিস বা হে ফিভারে ভোগেন এবং প্রায় ১৫% মানুষ হাঁপানির সমস্যায় পড়েন। কিন্তু জানেন কি, আমাদের দেশীয় ভেষজ উপাদান সজনে আর নিম এই ঋতু পরিবর্তনের যুদ্ধে হতে পারে আপনার সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র!

বসন্তে কেন বাড়ে স্বাস্থ্য সমস্যা?

ঋতু পরিবর্তনের প্রভাব

শীত থেকে বসন্তে যাওয়ার সময় তাপমাত্রা ও আর্দ্রতার যে ওঠা-পড়া হয়, সেটা আমাদের শরীরের জন্য একটা বড় ঝাঁকুনি হয়ে যায়। এই সময় বাতাসে পরাগরেণুর পরিমাণ বেড়ে যায় প্রচুর। চণ্ডীগড়ে করা একটি গবেষণায় দেখা গেছে, বসন্তকালে বাতাসে প্রতি ঘনমিটারে ২০,০০০-এর বেশি পরাগরেণু ভাসতে থাকে। এই পরাগরেণু শ্বাসতন্ত্রে প্রবেশ করে অ্যালার্জির প্রতিক্রিয়া ঘটায়, যার ফলে হাঁচি, নাক দিয়ে জল পড়া, চোখ চুলকানো – এসব লক্ষণ দেখা দেয়।

বসন্তকালীন রোগের তালিকা

এই সময়টায় কিছু রোগের প্রকোপ বেড়ে যায় অনেকখানি। প্রথমত, শ্বাসযন্ত্রের সংক্রমণ – সাধারণ সর্দি-কাশি থেকে শুরু করে ভাইরাল জ্বর, ব্রঙ্কাইটিস এবং হাঁপানির তীব্রতা বৃদ্ধি। দ্বিতীয়ত, চিকেন পক্স বা বসন্ত রোগ – ভেরিসেল্লা ভাইরাসের সংক্রমণে হয় এই রোগ, যা বসন্তের শেষে সবচেয়ে বেশি ছড়ায়। তৃতীয়ত, পেটের নানা গোলমাল – বদহজম, অম্বল, পেট ফাঁপা এসব সমস্যা বেড়ে যায় ঋতু পরিবর্তনের সময়। চতুর্থত, ত্বকের সমস্যা – একজিমা, র‍্যাশ, চুলকানি এই সময়ে বেশি হয়।

মেডান্টা হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, বসন্তকালে ফুল এবং গাছ থেকে আসা পরাগরেণু অ্যালার্জির প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে এবং হাঁপানির লক্ষণগুলিকে আরও খারাপ করে। ভারতে বিশেষ করে নিম, গুলমোহর এবং বাবলা গাছ থেকে পরাগরেণু সবচেয়ে বেশি সমস্যা তৈরি করে।

রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কেন কমে যায়?

আয়ুর্বেদিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, বসন্তকালে আমাদের শরীরে জমে থাকা কফ তরল হয়ে যায়, যা হজমশক্তি ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। পরিবেশগত দিক থেকে বললে, পরাগরেণু, ভাইরাসের বোঝা, আর্দ্রতা এবং তাপমাত্রার পরিবর্তন – এসব মিলে আমাদের ইমিউন সিস্টেমকে অতিরিক্ত চাপে ফেলে দেয়। ফলে শরীর ভাইরাস-ব্যাকটেরিয়ার আক্রমণ সামলাতে হিমশিম খায়।

সজনে: প্রকৃতির দেওয়া মাল্টিভিটামিন

পুষ্টিগুণের ভাণ্ডার

সজনে বা মরিঙ্গা (Moringa oleifera) গাছকে “অলৌকিক গাছ” বলা হয় কারণ এর পাতা আর ডাঁটায় এত পুষ্টি ঠাসা থাকে যে একে প্রায় সুপারফুডই বলা যায়। ১০০ গ্রাম তাজা সজনে পাতায় ভিটামিন সি-এর পরিমাণ দৈনিক চাহিদার ৮৬% এবং ভিটামিন এ-র পরিমাণ ৪২%। এছাড়াও আছে প্রচুর আয়রন, ক্যালসিয়াম, পটাশিয়াম, এবং অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট। বসন্তে যখন শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়, তখন সজনের ভিটামিন সি শ্বেত রক্তকণিকা (White Blood Cell) বাড়িয়ে সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়ায়।

ঠাণ্ডা-কাশি থেকে মুক্তি

সজনে ডাটায় থাকা ভিটামিন সি এন্টি-অক্সিডেন্ট হিসেবে কাজ করে, যা সর্দি-কাশি আর ঠাণ্ডা জ্বর দূর করতে বেশ কার্যকর। আমার এক বন্ধু গত বছর বসন্তে সজনের ডাল খেয়ে দুদিনেই তার কাশি সেরে গিয়েছিল – এটা কোনো গল্প নয়, সত্যি ঘটনা! সজনে পাতা ম্যালেরিয়া, জ্বর, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস এবং পরজীবী রোগের চিকিৎসায়ও ব্যবহৃত হয়।

পেটের গোলমাল সমাধানে

বসন্তে পেটে গ্যাস, বদহজম, পেট ফাঁপা – এসব তো লেগেই থাকে। সজনে এক্ষেত্রে হজম সমস্যা সমাধানে ব্যাপকভাবে কার্যকরী। পেটে ব্যথা হলে সজনের তরকারি খেয়ে নিন, দেখবেন পেটের গোলমাল অনেকটা উপশম হয়ে যাবে। সজনে ডাটা কোষ্ঠকাঠিন্যও দূর করে, যা বসন্তকালে বেশ সাধারণ সমস্যা।

ডায়াবেটিস ও হাড়ের জন্য উপকারী

সজনে রক্তে চিনির সঠিক মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখে, তাই ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য এটা খুবই উপকারী। এছাড়াও সজনে ডাটায় প্রচুর পরিমাণে আয়রন ও ক্যালসিয়াম থাকায় হাড় শক্ত ও মজবুত করে। শরীরের রক্ত বিশুদ্ধ করতেও সজনের কোনো জুড়ি নেই।

রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিতে

সিটিজেন্স হাসপাতালের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, সজনে অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট ও পুষ্টিতে ভরপুর যা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা শক্তিশালী করে এবং প্রদাহ কমায়। সজনে পাতায় থাকা জিঙ্ক কোষীয় প্রতিরোধ ক্ষমতা বজায় রাখে এবং অসুখ থেকে দ্রুত সুস্থ হতে সাহায্য করে।

নিম: আয়ুর্বেদের জীবাণুনাশক রাজা

নিমের ঔষধি গুণ

নিম (Azadirachta indica) ভেষজ চিকিৎসায় একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। নিমে রয়েছে প্রদাহরোধী, অ্যান্টি-হাইপারগ্লাইসেমিক, অ্যান্টি-আলসার, অ্যান্টি-ম্যালেরিয়াল, অ্যান্টি-ফাঙ্গাল, অ্যান্টি-ব্যাকটেরিয়াল, অ্যান্টি-ভাইরাল, অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট বৈশিষ্ট্য। এই এত গুণ একসাথে আর কোথায় পাবেন বলুন তো!

ভাইরাস-ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে লড়াই

নিম পাতা ভাইরাস এবং ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ প্রতিরোধে অসাধারণ কাজ করে। বসন্ত রোগ বা চিকেন পক্স প্রতিরোধে নিমের ভূমিকা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ভেরিসেল্লা ভাইরাসের সঙ্গে লড়তে নিমপাতা সাহায্য করে। স্নানের সময় জলে নিম পাতা ফেলে স্নান করলে এবং পাতে নিম পাতা রাখলে এই অসুখ রোখা অনেকটা সহজ হয়ে যায়।

রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়

রেডক্লিফ ল্যাবস-এর তথ্য মতে, নিম পাতা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সহায়ক। এর অ্যান্টি-ব্যাকটেরিয়াল এবং অ্যান্টি-ইনফ্লেমেটরি গুণ শরীরকে বিভিন্ন রোগ থেকে সুরক্ষিত রাখে। সকালে নিম পাতা চিবিয়ে খাওয়া বা নিম পাতার রস পান করলে শরীরের প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে এবং সংক্রমণ প্রতিরোধ হয়।

ম্যালেরিয়া ও মশা প্রতিরোধে

নিম পাতা ম্যালেরিয়া বাহিত মশা প্রতিরোধে কার্যকর। নিম পাতা পুড়িয়ে তার ধোঁয়া ঘরে ছড়িয়ে দিলে মশা দূরে থাকে। বসন্তের শেষে যখন বৃষ্টি শুরু হয়, তখন মশার প্রকোপ বাড়ে – সেই সময় নিম বেশ কাজে দেয়।

রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণ

বিশেষজ্ঞদের মতে, রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে নিম একটি অলৌকিক ওষুধের মতো কাজ করে। প্রতিদিন নিমপাতা খেলে বা নিমপাতার ক্বাথ তৈরি করে খেলে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে থাকে।

ত্বকের জন্য প্রাকৃতিক ওষুধ

নিম পাতা ত্বকের জন্য একটি প্রাকৃতিক ওষুধ। এটি ত্বকের প্রদাহ কমাতে এবং ত্বককে উজ্জ্বল করতে সাহায্য করে। নিম পাতার অ্যান্টি-ব্যাকটেরিয়াল গুণ ত্বকের ব্রণ এবং ফুসকুড়ি প্রতিরোধে কার্যকর। নিম পাতার পেস্ট ক্ষতস্থানে লাগালে ক্ষত দ্রুত শুকিয়ে যায় এবং সংক্রমণ থেকে রক্ষা করে।

সজনে + নিম: দুর্দান্ত কম্বিনেশন!

বৈজ্ঞানিক গবেষণা কী বলে?

২০২২ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে, সজনে এবং নিম পাতা একসাথে ব্যবহার করলে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা, রক্তের প্রোফাইল এবং অন্ত্রের মাইক্রোফ্লোরা উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, ৫% সজনে ও ১% নিম একসাথে খাওয়ালে লিম্ফোসাইট শতাংশ বৃদ্ধি পায় এবং H/L অনুপাত কমে যায়, যা শক্তিশালী রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার লক্ষণ।

কীভাবে একসাথে ব্যবহার করবেন?

সকালে খালি পেটে ২-৩টি নিম পাতা চিবিয়ে খান, তারপর এক গ্লাস হালকা গরম জলে সজনে পাতার রস বা গুঁড়ো মিশিয়ে পান করুন। দুপুরের খাবারে সজনের ডাল বা তরকারি রাখুন। সন্ধ্যায় নিম পাতা ফুটিয়ে সেই পানি পান করতে পারেন। তবে মনে রাখবেন, অতিরিক্ত কিছুই ভালো নয় – পরিমিত মাত্রায় খাবেন।

সতর্কতা

গর্ভবতী মহিলাদের নিম পাতা খাওয়া এড়িয়ে চলা উচিত। যাদের লো ব্লাড প্রেশারের সমস্যা আছে, তাদের অতিরিক্ত সজনে খাওয়া ঠিক নয়। কোনো গুরুতর অসুখ থাকলে বা নিয়মিত ওষুধ খেলে, এসব ভেষজ ব্যবহারের আগে ডাক্তারের পরামর্শ নিন।

বসন্তকালে খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাত্রা

কী খাবেন?

বসন্তকালে পুরনো যব, গম, ও চাল খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয় আয়ুর্বেদে। ডাল হিসেবে মুগডাল ভালো। ঝাল, তেতো এবং কষাকষ বা অ্যাস্ট্রিঞ্জেন্ট স্বাদের খাবার বেশি করে খান। মধু এই সময়ে বিশেষ উপকারী। লালপাথ ল্যাবস-এর পরামর্শ অনুযায়ী, সবুজ শাকসবজি, মৌসুমী ফল, আদা, রসুন, হলুদ, গোলমরিচ – এসব রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়।

কী এড়িয়ে চলবেন?

ভারী, ঠাণ্ডা, টক এবং মিষ্টি খাবার কম খান। বাইরের কাঁচা সালাদ, স্ট্রিট ফুড, ফ্রিজের ঠাণ্ডা পানীয় এড়িয়ে চলুন। অতিরিক্ত তৈলাক্ত এবং ভাজা খাবার হজমে সমস্যা তৈরি করতে পারে।

জীবনযাত্রার পরিবর্তন

নিয়মিত ব্যায়াম করুন – সকালে হাঁটা, যোগব্যায়াম, প্রাণায়াম খুবই উপকারী। পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করুন – কমপক্ষে ৭-৮ ঘণ্টা। প্রচুর পরিমাণে ফুটানো বা ফিল্টার করা পানি পান করুন। পরাগরেণু থেকে বাঁচতে বাইরে যাওয়ার সময় মাস্ক পরুন। ঘরের জানালা সকালে খোলা রাখবেন না যখন পরাগের পরিমাণ বেশি থাকে।

বসন্তকালীন সাধারণ রোগ ও ঘরোয়া প্রতিকার

অ্যালার্জিক রাইনাইটিস (হে ফিভার)

লক্ষণগুলো হলো – হাঁচি, নাক বন্ধ হয়ে যাওয়া, নাক দিয়ে জল পড়া, চোখ চুলকানো। প্রতিকার হিসেবে, হলুদ-মধু মিশিয়ে খান, গরম পানির ভাপ নিন, তুলসী পাতার চা পান করুন, নিম পাতা ফুটানো জলে গার্গল করুন।

ভাইরাল জ্বর

লক্ষণ: জ্বর, শরীর ব্যথা, মাথা ব্যথা, দুর্বলতা। প্রতিকার: সজনের সুপ খান, আদা-লেবু-মধুর চা পান করুন, তুলসী পাতা চিবিয়ে খান, পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিন।

হজমের সমস্যা

পেট ফাঁপা, বদহজম, অম্বল – এসব সমস্যায় সজনের ডাল, পুদিনা পাতার রস, জিরা জল, দই খান। ভারী খাবার এড়িয়ে চলুন।

চিকেন পক্স প্রতিরোধ

স্নানের জলে নিম পাতা ফোটান, নিম পাতা চিবিয়ে খান, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখুন, ভ্যাকসিন নিয়ে নিন।

বসন্তে সুস্থ থাকার ১০টি টিপস

১. সকালে নিয়মিত নিম পাতা খান – এটা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় এবং রক্ত পরিষ্কার করে

২. সপ্তাহে অন্তত ৩-৪ দিন সজনের ডাল/তরকারি খান – পুষ্টি ও রোগ প্রতিরোধের জন্য

৩. হাইড্রেটেড থাকুন – দিনে কমপক্ষে ৮-১০ গ্লাস পানি পান করুন

৪. হালকা ব্যায়াম করুন – সকালে হাঁটা বা যোগব্যায়াম রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে

৫. মৌসুমী ফল ও সবজি খান – এগুলো শরীরের চাহিদা মেটায়

৬. রাতে ভালো ঘুম নিশ্চিত করুন – ৭-৮ ঘণ্টা ঘুম জরুরি

৭. পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখুন – নিয়মিত হাত ধোয়া, পরিষ্কার কাপড় পরা

৮. পরাগরেণু থেকে বাঁচতে মাস্ক ব্যবহার করুন – বিশেষ করে সকালে বাইরে গেলে

৯. ধূমপান ও অ্যালকোহল এড়িয়ে চলুন – এগুলো রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমায়

১০. স্ট্রেস কমান – মেডিটেশন, প্রাণায়াম করুন, নিজের পছন্দের কাজ করুন

বিশেষ পরামর্শ: কখন ডাক্তার দেখাবেন?

ঘরোয়া উপায় ভালো, কিন্তু কিছু ক্ষেত্রে ডাক্তার দেখানো জরুরি। যদি জ্বর ১০৩ ডিগ্রি ফারেনহাইটের বেশি হয় এবং ৩ দিনের বেশি থাকে, শ্বাসকষ্ট হয়, বুকে ব্যথা হয়, ডিহাইড্রেশনের লক্ষণ দেখা দেয়, বারবার বমি হয়, চামড়ায় র‍্যাশ বা ফুসকুড়ি বাড়তে থাকে – তাহলে দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

ভারতের স্বাস্থ্য মন্ত্রকের ইন্টিগ্রেটেড ডিজিজ সার্ভিল্যান্স প্রোগ্রামের (IDSP) তথ্য অনুযায়ী, ভারতে প্রতি বছর জানুয়ারি থেকে মার্চ এবং বর্ষার পরে সিজনাল ইনফ্লুয়েন্জার দুটি পিক দেখা যায়। তাই এই সময়গুলোতে বিশেষ সতর্ক থাকুন।

আধুনিক বিজ্ঞান কী বলছে?

ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অফ হেলথ (NIH)-এর একটি গবেষণায় দেখা গেছে, মরিঙ্গা অলিফেরা (সজনে) ইমিউন সংক্রান্ত রোগে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। গবেষণায় দেখা গেছে, সজনের মেথানলিক এক্সট্র্যাক্ট সি-রিঅ্যাক্টিভ প্রোটিন, প্রোস্টাগ্ল্যান্ডিন E2, এবং TNFα-এর সিরাম কনসেন্ট্রেশন উল্লেখযোগ্যভাবে কমায়। এটি NF-κB, PGE2, COX-2, এবং IL-1β-এর মাত্রা কমায় এবং IL-4 ও IL-10 বাড়ায়, যা প্রদাহরোধী।

চণ্ডীগড়ে পোস্ট গ্র্যাজুয়েট ইন্সটিটিউট অফ মেডিকেল এডুকেশন অ্যান্ড রিসার্চ (PGIMER)-এ করা গবেষণা অনুযায়ী, ঋতু পরিবর্তনের সময় সংক্রামক রোগের প্রকোপ বাড়ে। শীতে শ্বাসযন্ত্রের সংক্রমণ (৭৬.৫%) এবং নিউমোনিয়া (৩.০৯%) বেশি, গ্রীষ্মে অ্যাকিউট ডায়রিয়াল ডিজিজ (৩৮.৮৯%) এবং পালমোনারি টিউবারকুলোসিস (৪.৬৮%) বেশি, আর বর্ষায় টাইফয়েড (১.৫৭%) এবং ভাইরাল হেপাটাইটিস (১.২৩%) বেশি দেখা যায়।

সজনে-নিম কীভাবে ব্যবহার করবেন: প্র্যাক্টিক্যাল গাইড

সজনের রেসিপি

সজনের ডাল: মুগডাল বা মসুর ডালের সাথে সজনে ডাঁটা সেদ্ধ করুন, হলুদ, নিমক, সামান্য তেলে পঞ্চফোড়ন দিয়ে ফোড়ন দিন। এটা খেতে সুস্বাদু এবং পুষ্টিকর।

সজনে পাতার চা: শুকনো সজনে পাতার গুঁড়ো এক চামচ গরম পানিতে মিশিয়ে ৫ মিনিট রেখে পান করুন। সকালে খালি পেটে খেলে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে।

সজনে সুপ: সজনে ডাঁটা, টমেটো, গাজর, রসুন, আদা দিয়ে সুপ বানান। ভাইরাল জ্বরে এটা দারুণ কাজ করে।

নিমের ব্যবহার

নিম পাতা চিবিয়ে খাওয়া: সকালে খালি পেটে ২-৩টি তাজা নিম পাতা ধুয়ে চিবিয়ে খান। প্রথম কয়েকদিন তেতো লাগবে, কিন্তু আস্তে আস্তে অভ্যস্ত হয়ে যাবেন।

নিম পাতার ক্বাথ: এক মুঠো নিম পাতা দুই কাপ পানিতে ফুটিয়ে এক কাপ করে নিন। ছেঁকে সকালে আধা কাপ পান করুন।

নিম পাতা স্নান: গরম পানিতে এক মুঠো নিম পাতা ফুটিয়ে ছেঁকে স্নানের পানিতে মিশিয়ে স্নান করুন। ত্বকের সংক্রমণ ও চুলকানি দূর হবে।

সাধারণ প্রশ্নোত্তর

প্রশ্ন: প্রতিদিন কতটা সজনে খাওয়া নিরাপদ?

উত্তর: দিনে ৫০-১০০ গ্রাম সজনে ডাঁটা বা এক চামচ (প্রায় ৫-১০ গ্রাম) সজনে পাতার গুঁড়ো নিরাপদ। তবে শুরুতে অল্প পরিমাণ দিয়ে শুরু করুন।

প্রশ্ন: নিম পাতা খেলে কি কোনো সাইড এফেক্ট আছে?

উত্তর: পরিমিত মাত্রায় খেলে সাধারণত কোনো সমস্যা হয় না। তবে অতিরিক্ত খেলে পেট খারাপ, বমি বমি ভাব হতে পারে। গর্ভবতী মহিলা ও ছোট শিশুদের এড়িয়ে চলা উচিত।

প্রশ্ন: বসন্তকালে কত দিন এই রুটিন ফলো করতে হবে?

উত্তর: পুরো বসন্তকাল জুড়ে (ফেব্রুয়ারি থেকে এপ্রিল/মে) এবং আদর্শভাবে সারা বছর নিয়মিত মেনে চললে সবচেয়ে ভালো ফল পাবেন।

প্রশ্ন: সজনে ও নিম কি একসাথে খাওয়া যাবে?

উত্তর: হ্যাঁ, গবেষণা অনুযায়ী একসাথে খাওয়া বেশি কার্যকর। তবে অতিরিক্ত খাবেন না।

বসন্তের হাওয়া যতই মিষ্টি হোক, এই ঋতু পরিবর্তনের সময়টা স্বাস্থ্যের জন্য বেশ চ্যালেঞ্জিং হতে পারে। কিন্তু আমাদের দেশীয় ভেষজ সম্পদ – সজনে আর নিম – এই যুদ্ধে আমাদের পাশে আছে। সজনের পুষ্টিগুণ আর নিমের জীবাণুনাশক ক্ষমতা একসাথে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়, সংক্রমণ থেকে রক্ষা করে। তবে মনে রাখবেন, ভেষজ উপাদানগুলো নিয়মিত ও পরিমিত মাত্রায় ব্যবহার করতে হয়। একদিন খেলেই যে অলৌকিক ফল পাবেন, তা নয়। নিয়মিত খাদ্যাভ্যাস, জীবনযাত্রা এবং এসব প্রাকৃতিক উপাদান মিলে আপনি বসন্তকালে সুস্থ থাকতে পারবেন। তাই এই বসন্তে সজনে-নিমের ম্যাজিক ট্রাই করে দেখুন, এবং সুস্থ থাকুন, আনন্দে থাকুন!

About Author
Debolina Roy

দেবলীনা রায় একজন চিকিৎসক এবং স্বাস্থ্য বিষয়ক লেখক, যিনি স্বাস্থ্য সচেতনতা এবং চিকিৎসা বিজ্ঞান সম্পর্কে পাঠকদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য নিবেদিত। ডাক্তারি নিয়ে পড়াশোনা করা দেবলীনা তার লেখায় চিকিৎসা বিষয়ক জটিল তথ্যগুলি সহজ ভাষায় উপস্থাপন করেন, যা সাধারণ পাঠকদের জন্য সহজবোধ্য এবং উপকারী। স্বাস্থ্য, পুষ্টি, এবং রোগ প্রতিরোধের বিষয়ে তার গভীর জ্ঞান এবং প্রাঞ্জল লেখনী পাঠকদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। দেবলীনা রায়ের লক্ষ্য হল সঠিক ও তথ্যনির্ভর স্বাস্থ্যবিধি প্রচার করা এবং মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত করা।

আরও পড়ুন