অবশেষে দীর্ঘ ৯ মাসের প্রতীক্ষার অবসান ঘটলো। পরিবেশগত সুরক্ষার কারণে টানা বন্ধ থাকার পর, বাংলাদেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্ট মার্টিন ২০২৫-এর পর্যটন মৌসুমের জন্য আবার উন্মুক্ত হচ্ছে। তবে এবারের ভ্রমণ আগের মতো নয়। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড (Bangladesh Tourism Board) দ্বীপের ভঙ্গুর জীববৈচিত্র্য রক্ষার জন্য বেশ কিছু কঠোর এবং বাধ্যতামূলক নতুন নিয়ম চালু করেছে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দ্বীপটি ১ নভেম্বর, ২০২৫ থেকে পর্যটকদের জন্য খুলছে এবং এই মৌসুম চলবে মাত্র তিন মাস (জানুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত)। সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে রাত্রিযাপন এবং পর্যটক সংখ্যার ওপর। প্রতিদিন মাত্র ২,০০০ পর্যটক দ্বীপে প্রবেশের অনুমতি পাবেন এবং এই সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটি একটি নতুন অনলাইন কিউআর কোড (QR Code) ভিত্তিক টিকিট সিস্টেমের মাধ্যমে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হবে।
কেন এবারের সেন্ট মার্টিন ভ্রমণ সম্পূর্ণ আলাদা?
সেন্ট মার্টিন দ্বীপের প্রবাল এবং সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য অতিরিক্ত পর্যটকের চাপে মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছিল। দ্বীপটিকে তার প্রাকৃতিক ভারসাম্য ফিরে পেতে ফেব্রুয়ারি ২০২৫ থেকে অক্টোবর ২০২৫ পর্যন্ত দীর্ঘ ৯ মাস পর্যটকদের জন্য সম্পূর্ণ বন্ধ রাখা হয়েছিল। এই ‘বিশ্রাম’-এর পর, সরকার অত্যন্ত সতর্কতার সাথে দ্বীপটি পুনরায় খোলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
মূলত, ২০২৫-২০২৬ মৌসুমটি একটি ‘পরীক্ষামূলক’ মৌসুম। এই তিন মাসের কার্যকারিতা পর্যালোচনা করে ভবিষ্যতের সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। পর্যটকদের জন্য এটি একটি মিশ্র খবর—একদিকে দ্বীপটি খোলার আনন্দ, অন্যদিকে কঠোর নিয়ম এবং সীমিত সময়ের চ্যালেঞ্জ।
২০২৫-২৬ মৌসুমের সংক্ষিপ্ত সময়সূচী: যা অবশ্যই জানতে হবে
এবারের পরিকল্পনা গতানুগতিক নয়। প্রতিটি মাসের জন্য আলাদা নিয়ম ঠিক করা হয়েছে, যা আগে কখনো দেখা যায়নি।
- নভেম্বর ২০২৫: এই মাসে পর্যটকরা সেন্ট মার্টিন ভ্রমণ করতে পারবেন, তবে শুধুমাত্র দিনের বেলার জন্য (Day Trip)। অর্থাৎ, সকালে গিয়ে বিকেলের মধ্যেই ফিরে আসতে হবে। নভেম্বর মাসে দ্বীপে কোনো পর্যটকের রাত্রিযাপনের অনুমতি নেই।
- ডিসেম্বর ২০২৫ এবং জানুয়ারি ২০২৬: এই দুই মাস পর্যটকদের রাত্রিযাপনের অনুমতি দেওয়া হবে। তবে, প্রতিদিনের ২,০০০ পর্যটকের কোটা কঠোরভাবে বজায় রাখা হবে।
- ফেব্রুয়ারি ২০২৬: ফেব্রুয়ারি মাস থেকে দ্বীপটি আবারও পর্যটকদের জন্য সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া হবে।
এই সংক্ষিপ্ত সময়সীমার কারণে, যারা সেন্ট মার্টিনে রাত কাটানোর পরিকল্পনা করছেন, তাদের হাতে মাত্র দুই মাস (ডিসেম্বর ও জানুয়ারি) সময় থাকছে। তাই আশা করা হচ্ছে, এই দুই মাসে হোটেল ও রিসোর্টের চাহিদা তুঙ্গে থাকবে।
২০২৫ মৌসুমের ‘বিগ ব্রেকিং’: নতুন ১২টি বাধ্যতামূলক নিয়ম
সরকার দ্বীপের পরিবেশ অক্ষুণ্ন রাখতে মোট ১২টি কঠোর নির্দেশনা জারি করেছে। এই নিয়মগুলো অমান্য করলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। প্রতিটি পর্যটকের এই নিয়মগুলো জানা এবং মানা বাধ্যতামূলক।
১. QR কোড ভিত্তিক অনলাইন টিকিট: সেন্ট মার্টিনে যেতে ইচ্ছুক সকল পর্যটককে অবশ্যই বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের (BTB) অনুমোদিত ওয়েব পোর্টাল থেকে অনলাইনে টিকিট কাটতে হবে। প্রতিটি টিকিটে একটি ইউনিক ট্রাভেল পাস এবং QR কোড থাকবে। ঘাটে এই QR কোড স্ক্যান করেই দ্বীপে প্রবেশের অনুমতি মিলবে। QR কোড ছাড়া টিকিটকে ‘ভুয়া’ বলে গণ্য করা হবে।
২. সীমিত পর্যটক সংখ্যা: প্রতিদিন সর্বোচ্চ ২,০০০ জন পর্যটক দ্বীপে ভ্রমণ করতে পারবেন। এই সংখ্যা পূরণের সাথে সাথে সেদিনের জন্য অনলাইন পোর্টাল স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ হয়ে যাবে।
৩. রাত্রিযাপনের সময়সীমা: উপরে উল্লিখিত সময়সূচী (নভেম্বরে ‘না’, ডিসেম্বর-জানুয়ারিতে ‘হ্যাঁ’) কঠোরভাবে পালন করা হবে।
৪. পরিবেশগত নিষেধাজ্ঞা: রাতে সৈকতে কোনো প্রকার আলো জ্বালানো, উচ্চ শব্দ বা বারবিকিউ পার্টি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এটি সামুদ্রিক কচ্ছপের ডিম পাড়া এবং অন্যান্য সামুদ্রিক প্রাণীর জীবনচক্র রক্ষায় সহায়তা করবে।
৫. কেয়া বন ও জীববৈচিত্র্য: কেয়া বনে প্রবেশ, কেয়া ফল সংগ্রহ বা কেনা-বেচা করা যাবে না। শামুক, ঝিনুক, প্রবাল, রাজকাঁকড়া, পাখি বা সামুদ্রিক কাছিমের কোনো ক্ষতি করা বা সংগ্রহ করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।
৬. সৈকতে যানবাহন: সৈকতে যেকোনো ধরনের মোটরচালিত যানবাহন, যেমন মোটরসাইকেল বা সি-বাইক, চালানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
৭. পলিথিন ও প্লাস্টিক: দ্বীপে পলিথিন বহন করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
৮. একবার ব্যবহার্য প্লাস্টিক (Single-use Plastic): চিপসের প্যাকেট, প্লাস্টিকের চামচ, স্ট্র, সাবান ও শ্যাম্পুর মিনিপ্যাক এবং ৫০০ বা ১০০০ মিলিলিটারের প্লাস্টিকের পানির বোতল বহন করাকে ‘নিরুৎসাহিত’ করা হয়েছে।
৯. ব্যক্তিগত পানির ফ্লাস্ক: পর্যটকদের প্লাস্টিক বোতলের পরিবর্তে নিজস্ব পানির ফ্লাস্ক বা রিফিলযোগ্য বোতল সঙ্গে রাখার জন্য পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
১০. জাহাজ অনুমোদন: বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (BIWTA) এবং পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন ছাড়া কোনো জাহাজ সেন্ট মার্টিনে পর্যটক বহন করতে পারবে না।
১১. বর্জ্য ব্যবস্থাপনা: নির্ধারিত স্থান ব্যতীত অন্য কোথাও কোনো প্রকার আবর্জনা, বিশেষ করে প্লাস্টিক বর্জ্য, ফেলা যাবে না।
১২. প্রবাল রক্ষা: কোনো অবস্থাতেই জীবন্ত বা মৃত প্রবালের উপর হাঁটা, দাঁড়ানো বা সেগুলোকে স্পর্শ করা যাবে না।
সেন্ট মার্টিন কিভাবে যাবেন? (২০২৫ আপডেট)
এবারের মৌসুমে সেন্ট মার্টিন যাওয়ার দুটি প্রধান রুট চালু থাকছে। একটি হলো ঐতিহ্যবাহী টেকনাফ রুট, এবং অন্যটি হলো নতুন ও বিলাসবহুল কক্সবাজার রুট।
রুট ১: ঢাকা থেকে টেকনাফ হয়ে সেন্ট মার্টিন (ঐতিহ্যবাহী রুট)
এটি সেন্ট মার্টিন যাওয়ার সবচেয়ে পরিচিত এবং তুলনামূলক সাশ্রয়ী রুট।
১. ঢাকা থেকে টেকনাফ: প্রথমে আপনাকে ঢাকা থেকে বাসযোগে সরাসরি টেকনাফ যেতে হবে। ঢাকার সায়দাবাদ, ফকিরাপুল, আরামবাগ ও গাবতলী থেকে হানিফ, শ্যামলী, সৌদিয়া, সেন্টমার্টিন পরিবহন, রিলাক্স পরিবহন ইত্যাদি বিভিন্ন বাস সার্ভিস টেকনাফের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়।
* ভাড়া: নন-এসি বাসের ভাড়া জনপ্রতি ১২০০ থেকে ১৫০০ টাকা। এসি (ইকোনমি) বাসের ভাড়া ১৮০০ থেকে ২২০০ টাকা এবং বিলাসবহুল স্লিপার কোচের ভাড়া ২৫০০ থেকে ৩৫০০ টাকা পর্যন্ত হতে পারে।
* বিকল্প: আপনি ঢাকা থেকে বিমানে কক্সবাজার এসে, সেখান থেকে জিপ বা বাসযোগে টেকনাফ (প্রায় ২.৫ ঘণ্টা) যেতে পারেন। এটি সময় বাঁচালেও খরচ বাড়িয়ে দেবে।
২. টেকনাফ ঘাট থেকে সেন্ট মার্টিন: টেকনাফের দমদমিয়া ঘাটে (টেকনাফ জাহাজ ঘাট) পৌঁছে আপনাকে জাহাজের টিকিট দেখাতে হবে (যা এখন অনলাইনে QR কোড সিস্টেমের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত)।
* জাহাজ: কেয়ারি সিন্দবাদ, কেয়ারি ক্রুজ অ্যান্ড ডাইন, এমভি পারিজাত, এমভি রাজহংস, আটলান্টিক ক্রুজ ইত্যাদি জাহাজ এই রুটে চলাচল করে।
* সময়: জাহাজগুলো সাধারণত সকাল ৯টা থেকে ৯:৩০ টার মধ্যে টেকনাফ থেকে সেন্ট মার্টিনের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায় এবং সেন্ট মার্টিন থেকে দুপুর ৩টা থেকে ৩:৩০ টার মধ্যে ফিরে আসে। যাত্রাপথে সময় লাগে প্রায় ২ থেকে ২.৫ ঘণ্টা।
* ভাড়া (আনুমানিক): যদিও ২০২৫ মৌসুমের টেকনাফ রুটের চূড়ান্ত ভাড়া ঘোষণা করা হয়নি, পূর্ববর্তী মৌসুমের ভাড়ার একটি ধারণা নিচে দেওয়া হলো (এটি পরিবর্তনশীল):
* মেইন ডেক (ওপেন): ১২০০ – ১৪০০ টাকা (যাওয়া-আসা)
* ওপেন ডেক (ছাদ): ১৪০০ – ১৬০০ টাকা (যাওয়া-আসা)
* বিজনেস ক্লাস/লাউঞ্জ: ১৮০০ – ২৫০০ টাকা (যাওয়া-আসা)
রুট ২: নতুন সংযোজন! কক্সবাজার থেকে সরাসরি সেন্ট মার্টিন (বিলাসবহুল রুট)
যারা টেকনাফ পর্যন্ত দীর্ঘ এবং ঝঞ্ঝাটপূর্ণ সড়ক এড়াতে চান, তাদের জন্য এটি একটি দারুণ বিকল্প। কক্সবাজার শহরের নুনিয়ারছড়ার বিআইডব্লিউটিএ ঘাট থেকেই সরাসরি সেন্ট মার্টিনের উদ্দেশ্যে জাহাজ ছেড়ে যাবে।
- জাহাজ: এমভি কর্ণফুলী এক্সপ্রেস এবং এমভি বার আউলিয়া এই রুটের জনপ্রিয় জাহাজ।
- সময়: জোয়ার-ভাটার ওপর নির্ভর করে জাহাজগুলো সকাল ৬টা থেকে ১০টার মধ্যে কক্সবাজার থেকে ছাড়ে এবং সেন্ট মার্টিন থেকে দুপুর ৩টা থেকে ৬টার মধ্যে ফিরে আসে। সমুদ্রপথে হওয়ায় এই যাত্রায় ৫ থেকে ৭ ঘণ্টা সময় লাগতে পারে।
- ভাড়া (২০২৫ মৌসুম): এই রুটটি তুলনামূলকভাবে ব্যয়বহুল। ২০২৫ মৌসুমের জন্য সর্বনিম্ন রাউন্ড ট্রিপ (যাওয়া-আসা) ভাড়া ৩৫০০ টাকা থেকে শুরু।
নিম্নে এই রুটের জাহাজগুলোর ভাড়ার একটি তালিকা দেওয়া হলো (যাওয়া-আসা):
| জাহাজের নাম | সিট/কেবিনের ধরন | ভাড়া (জনপ্রতি, টাকায়) |
| এমভি কর্ণফুলী এক্সপ্রেস | ওপেন ডেক | ৪,০০০ ৳ |
| ক্রিসান্থেমাম (ওপেন ডেক) | ৫,৬০০ ৳ | |
| সিঙ্গেল কেবিন | ৬,৫০০ ৳ | |
| টুইন বেড কেবিন (২ জন) | ১৩,০০০ ৳ | |
| ভিআইপি কেবিন (২ জন) | ১৬,০০০ ৳ | |
| ভিভিআইপি কেবিন (২ জন) | ২০,০০০ ৳ | |
| এমভি বার আউলিয়া | মোজারাত চেয়ার | ৪,৩০০ ৳ |
| বাঙ্কার বেড (২ জন) | ৮,০০০ ৳ | |
| ডিলাক্স কেবিন (২ জন) | ১৩,০০০ ৳ | |
| ফ্যামিলি বাঙ্কার কেবিন (৪ জন) | ১৬,০০০ ৳ | |
| ভিআইপি কেবিন (২ জন) | ১৬,০০০ ৳ |
গুরুত্বপূর্ণ নোট: উপরোক্ত সকল ভাড়া ‘রাউন্ড ট্রিপ’ বা যাওয়া-আসা বাবদ। ৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্য সাধারণত টিকিট প্রয়োজন হয় না (তবে জাহাজে আসন বা কেবিন নিলে প্রযোজ্য হবে)।
কোথায় থাকবেন? (বাজেট থেকে লাক্সারি হোটেল ও রিসোর্ট)
আবারও মনে করিয়ে দিচ্ছি, নভেম্বর মাসে দ্বীপে কোনো হোটেল বা রিসোর্টে পর্যটকদের থাকার অনুমতি নেই। শুধুমাত্র ডিসেম্বর ‘২৫ এবং জানুয়ারি ‘২৬ মাসের জন্য বুকিং করা যাবে। যেহেতু এই মৌসুম মাত্র দুই মাসের, তাই হোটেল-রিসোর্টগুলোতে তীব্র চাপ থাকবে। ভ্রমণের তারিখ নিশ্চিত হওয়ার সাথে সাথেই অ্যাডভান্স বুকিং করে ফেলাটা হবে বুদ্ধিমানের কাজ।
সেন্ট মার্টিনে বিভিন্ন মানের হোটেল ও রিসোর্ট রয়েছে। জেটি ঘাটের কাছাকাছি, পশ্চিম সৈকত, এবং কোণার দিকের সৈকতগুলোতে থাকার বিভিন্ন ব্যবস্থা আছে।
লাক্সারি রিসোর্ট (খরচ: ৮,০০০ – ২০,০০০+ টাকা)
১. সাইরি ইকো রিসোর্ট (Sayari Eco Resort): বর্তমানে সেন্ট মার্টিনের সবচেয়ে বিলাসবহুল এবং পরিবেশবান্ধব রিসোর্টগুলোর মধ্যে অন্যতম। এখানে আধুনিক স্থাপত্য এবং প্রকৃতির এক দারুণ সমন্বয় ঘটেছে।
২. বেলা ভিস্তা রিসোর্ট (Bela Vista Resort): পশ্চিম সৈকতে অবস্থিত এই রিসোর্টটি তার প্রিমিয়াম কটেজ এবং সেবার জন্য বিখ্যাত। ভ্রমণ গাইড অনুসারে, এর ভাড়া ১০,৬০০ থেকে ১৫,০০০ টাকা পর্যন্ত হতে পারে।
৩. মিউজিক ইকো রিসোর্ট (Music Eco Resort): দক্ষিণ-পশ্চিম বিচে অবস্থিত এই রিসোর্টটিও খুব জনপ্রিয়। ভাড়া ৩,০০০ থেকে ১৬,০০০ টাকা পর্যন্ত হতে পারে।
হিমাচল প্রদেশের শীর্ষ ১০ বিলাসবহুল হোটেল ও রিসোর্ট: স্বর্গীয় অভিজ্ঞতার নির্দেশিকা
মিড-রেঞ্জ হোটেল ও রিসোর্ট (খরচ: ৩,০০০ – ৭,০০০ টাকা)
১. নীল দিগন্ত রিসোর্ট: সেন্ট মার্টিনের দক্ষিণ কোণে, কোলাহলমুক্ত পরিবেশে অবস্থিত। যারা নিরিবিলি পরিবেশ পছন্দ করেন, তাদের জন্য এটি আদর্শ।
২. সোহাগ দ্বীপ রিসোর্ট (Shohag Deep Resort): ভ্রমণ গাইড-এর তথ্যমতে, এই রিসোর্টে থাকার খরচ ২,০০০ থেকে ৪,০০০ টাকার মধ্যে।
৩. ব্লু লেগুন রিসোর্ট (Blue Lagoon Resort): পশ্চিম বিচে অবস্থিত, সূর্যাস্ত দেখার জন্য দারুণ একটি জায়গা। ভাড়া প্রতি রাত ১৫০০ থেকে ৩৫০০ টাকার মধ্যে।
বাজেট হোটেল (খরচ: ১,৫০০ – ৩,০০০ টাকা)
১. কিংসুক ইকো রিসোর্ট
২. সী প্রবাল রিসোর্ট
৩. প্রাসাদ প্যারাডাইস
৪. সমুদ্র কুটির
বুকিং টিপস: বেশিরভাগ রিসোর্টেরই এখন ফেসবুক পেজ বা ওয়েবসাইট রয়েছে। সরাসরি ফোন করে বা অনলাইন ট্রাভেল এজেন্সির (OTA) মাধ্যমে বুকিং নিশ্চিত করা ভালো। পিক সিজনে (বিশেষ করে সাপ্তাহিক ছুটির দিনে) ডিসকাউন্ট পাওয়ার আশা না করাই ভালো।
সেন্ট মার্টিনে কি কি করবেন? (একটি পূর্ণাঙ্গ গাইড)
সেন্ট মার্টিন মানেই অলস বসে সমুদ্রের নীল জল দেখা। তবুও, এই ৮ বর্গকিলোমিটারের দ্বীপে করার মতো অনেক কিছুই আছে।
ছেঁড়া দ্বীপ: যাওয়া, না যাওয়া?
সেন্ট মার্টিনের মূল ভূখণ্ডের সর্বদক্ষিণের বর্ধিত অংশটি হলো ছেঁড়া দ্বীপ। এটি প্রবালের স্বর্গরাজ্য।
- কিভাবে যাবেন: ভাটার সময় সেন্ট মার্টিনের পশ্চিম সৈকত ধরে হেঁটে যাওয়া যায়, তবে এতে প্রায় দেড় ঘণ্টা সময় লাগে এবং প্রবালের ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। সবচেয়ে ভালো উপায় হলো স্থানীয় ছোট বোটে (লাইফবোট বা ইঞ্জিন বোট) যাওয়া। জনপ্রতি ২৫০-৩৫০ টাকা ভাড়া নিতে পারে।
- সতর্কতা: নতুন নিয়ম অনুযায়ী, প্রবালের উপর হাঁটা নিষিদ্ধ। তাই ছেঁড়া দ্বীপে গেলেও পানিতে নামার সময় বা হাঁটার সময় অত্যন্ত সতর্ক থাকতে হবে যেন প্রবালের কোনো ক্ষতি না হয়।
সাইক্লিং ও দ্বীপ ভ্রমণ
সেন্ট মার্টিনের আসল সৌন্দর্য উপভোগ করার সেরা উপায় হলো সাইক্লিং। পুরো দ্বীপটি সাইকেল চালিয়ে ঘুরতে ঘণ্টা দুয়েক সময় লাগতে পারে।
- ভাড়া: ঘণ্টা প্রতি ৬০ থেকে ১০০ টাকায় সৈকতের পাশে বা বাজারের মধ্যে অনেক দোকান থেকে সাইকেল ভাড়া পাওয়া যায়।
- অভিজ্ঞতা: পশ্চিম সৈকত ধরে সূর্যাস্ত দেখতে দেখতে সাইকেল চালানো বা ভোরের আলোয় পূর্ব সৈকত ধরে ছেঁড়া দ্বীপের দিকে এগিয়ে যাওয়ার অভিজ্ঞতা ভোলার মতো নয়।
Paris Olympics News:বিশ্বের দ্রুততম মহিলার শিরোপা সেন্ট লুসিয়ার জুলিয়েন আলফ্রেডের
স্নোরকেলিং ও স্কুবা ডাইভিং
বাংলাদেশের একমাত্র স্থান যেখানে স্নোরকেলিং বা অগভীর স্কুবা ডাইভিং করে সামুদ্রিক জীবন উপভোগ করা যায়।
- স্থান: পশ্চিম সৈকতের কোরাল ভিউ রিসোর্টের কাছের অংশটি স্নোরকেলিংয়ের জন্য জনপ্রিয়।
- ব্যবস্থা: দ্বীপে কয়েকটি স্থানীয় ডাইভিং সেন্টার রয়েছে (যেমন: ওশেনিক স্কুবা ডাইভিং) যারা প্রশিক্ষিত গাইডসহ স্নোরকেলিং বা ডাইভিং-এর ব্যবস্থা করে দেয়। খরচ প্রতি সেশনে ১৫০০ থেকে ৩৫০০ টাকা পর্যন্ত হতে পারে।
সূর্যাস্ত ও সূর্যোদয় দেখা
- সূর্যাস্ত (Sunset): সেন্ট মার্টিনের পশ্চিম সৈকত (West Beach) সূর্যাস্ত দেখার জন্য বিখ্যাত। আকাশ পরিষ্কার থাকলে এখানে সাগরের বুকে সূর্যাস্ত যাওয়ার এক অপার্থিব দৃশ্য দেখা যায়।
- সূর্যোদয় (Sunrise): সূর্যোদয় দেখার জন্য আপনাকে পূর্ব সৈকতে (East Beach) যেতে হবে, যা সাধারণত জেটি ঘাটের অপর পাশে।
স্থানীয় জীবন ও বাজার
জেটি ঘাটের কাছেই সেন্ট মার্টিনের মূল বাজার। এখানে বিভিন্ন সামুদ্রিক মাছের বারবিকিউ, স্থানীয়ভাবে তৈরি শুঁটকি মাছ এবং প্রবাল বা শামুক-ঝিনুক (কেনা বা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ) বাদ দিয়ে কাঠের তৈরি স্যুভেনিয়ার পাওয়া যায়।
সেন্ট মার্টিন ভ্রমণ বাজেট ২০২৫ (একটি আনুমানিক ধারণা)
এবারের মৌসুমে খরচ কিছুটা বাড়বে, বিশেষ করে কক্সবাজার রুট ব্যবহার করলে এবং ডিসেম্বরে-জানুয়ারিতে থাকলে। নিচে দুটি ভিন্ন বাজেট প্ল্যান দেওয়া হলো (ঢাকা থেকে):
প্ল্যান ১: সাশ্রয়ী ভ্রমণ (ডে-ট্রিপ বা ১ রাত থাকা)
- যাতায়াত:
- বাস (ঢাকা-টেকনাফ-ঢাকা, নন-এসি): ১২০০ + ১২০০ = ২,৪০০ ৳
- জাহাজ (টেকনাফ-সেন্ট মার্টিন-টেকনাফ, মেইন ডেক): ১,৩০০ ৳
- থাকা (জানুয়ারিতে ১ রাত): বাজেট হোটেল (শেয়ার করে): ১,০০০ ৳ (জনপ্রতি)
- খাওয়া (২ দিন): ১,২০০ ৳
- অন্যান্য (ছেঁড়া দ্বীপ, সাইকেল): ৫০০ ৳
- মোট (আনুমানিক): ৬,৪০০ টাকা (যদি ১ রাত থাকেন)।
- ডে-ট্রিপ হলে (নভেম্বর): থাকা ও ১ দিনের খাবার বাদ যাবে, খরচ পড়বে প্রায় ৪,৫০০ টাকা।
প্ল্যান ২: বিলাসবহুল ভ্রমণ (কক্সবাজার রুট, ২ দিন/১ রাত)
- যাতায়াত:
- বিমান (ঢাকা-কক্সবাজার-ঢাকা): ১০,০০০ ৳ (অথবা এসি বাস: ৫,০০০ ৳)
- জাহাজ (কক্সবাজার-সেন্ট মার্টিন-কক্সবাজার, ওপেন ডেক): ৫,৬০০ ৳
- থাকা (জানুয়ারিতে ১ রাত): লাক্সারি রিসোর্ট: ১০,০০০ ৳ (২ জন শেয়ার করলে, জনপ্রতি ৫,০০০ ৳)
- খাওয়া (২ দিন): ভালো মানের রেস্তোরাঁ ও বারবিকিউ: ৩,০০০ ৳
- অন্যান্য (স্কুবা ডাইভিং, স্যুভেনিয়ার): ২,০০০ ৳
- মোট (আনুমানিক, জনপ্রতি): ২৫,৬০০ টাকা (বিমান) বা ২০,৬০০ টাকা (বাস)।
একজন দায়িত্বশীল পর্যটক হোন: আপনার করণীয়
সেন্ট মার্টিন আমাদের দেশের এক অমূল্য সম্পদ। এটি রক্ষা করার দায়িত্ব আমাদের সবার। দয়া করে নতুন ১২টি নির্দেশনা অক্ষরে অক্ষরে পালন করুন।
১. প্লাস্টিককে ‘না’ বলুন: চিপসের প্যাকেট, বোতল, পলিথিন—দয়া করে দ্বীপে ফেলে আসবেন না। সম্ভব হলে নিজের ব্যাগেই তা ফিরিয়ে আনুন।
২. প্রবালকে সম্মান করুন: প্রবালের উপর দাঁড়াবেন না, বসবেন না, বা স্পর্শ করবেন না। একটি জীবন্ত প্রবাল তৈরি হতে শত শত বছর সময় লাগে।
৩. পানি সাশ্রয় করুন: দ্বীপে মিঠা পানির তীব্র সংকট রয়েছে। হোটেলে বা রিসোর্টে পানি অপচয় করা থেকে বিরত থাকুন।
৪. শব্দ দূষণ এড়িয়ে চলুন: উচ্চস্বরে গান-বাজনা বা হই-হুল্লোড় করা থেকে বিরত থাকুন। এটি স্থানীয় জীববৈচিত্র্য এবং অন্যান্য পর্যটকদের জন্য ক্ষতিকর।
৫. স্থানীয়দের সম্মান করুন: দ্বীপের স্থানীয়দের জীবনযাত্রা ও সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকুন।
প্রবাল দ্বীপটি আবার খোলার এই আনন্দ তখনই সার্থক হবে, যখন আমরা প্রত্যেকে নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করে এর সৌন্দর্যকে অটুট রাখতে সাহায্য করবো। আপনার ভ্রমণ নিরাপদ ও আনন্দময় হোক!











