Starlink internet packages BD: বাংলাদেশের ইন্টারনেট পরিষেবার ক্ষেত্রে নতুন যুগের সূচনা হতে চলেছে। এলন মাস্কের SpaceX কোম্পানির স্যাটেলাইট ইন্টারনেট পরিষেবা “স্টারলিংক” বাংলাদেশের বাজারে প্রবেশের প্রস্তুতি নিচ্ছে। প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সাথে এলন মাস্কের ভিডিও আলোচনার পর, আশা করা হচ্ছে যে ২০২৫ সালের প্রথম দিকেই বাংলাদেশে স্টারলিংক পরিষেবা চালু হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হল – এই হাই-স্পিড ইন্টারনেট পরিষেবার দাম কত হবে এবং সাধারণ বাংলাদেশীরা এটি ব্যবহার করতে পারবেন কি না?
Starlink হল SpaceX কর্তৃক পরিচালিত একটি স্যাটেলাইট ইন্টারনেট পরিষেবা, যা পৃথিবীর নিম্ন-কক্ষপথে (Low Earth Orbit) হাজার হাজার ছোট স্যাটেলাইট স্থাপন করে উচ্চ-গতির, কম-লেটেন্সি সম্পন্ন ইন্টারনেট সংযোগ প্রদান করে। এই স্যাটেলাইটগুলি পৃথিবী থেকে প্রায় ৫৫০ কিলোমিটার উপরে অবস্থিত, যা প্রচলিত জিওস্টেশনারি স্যাটেলাইটের তুলনায় অনেক কম দূরত্বে থাকে।
২০২৫ সালের এপ্রিল পর্যন্ত, বাংলাদেশে Starlink এর অবস্থা চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস ঘোষণা করেছেন যে আগামী তিন মাসের মধ্যে স্টারলিংকের সাথে একটি বাণিজ্যিক চুক্তি সম্পন্ন হবে।২০২৩ সালের জুলাই মাসে স্টারলিংক বাংলাদেশে তাদের প্রযুক্তির পরীক্ষা চালিয়েছিল, যেখানে ১৫০ Mbps পর্যন্ত ডাউনলোড স্পিড দেখা গিয়েছিল।
বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন রেগুলেটরি কমিশন (BTRC) ইতিমধ্যে “নন-জিওস্টেশনারি অরবিট (NGSO) স্যাটেলাইট সার্ভিসেস অপারেটর” শীর্ষক একটি গাইডলাইন প্রস্তুত করেছে, যা স্পেসএক্স-এর মতো বিদেশী কোম্পানিগুলিকে বাংলাদেশে লাইসেন্স পাওয়ার অনুমতি দেবে।
বাংলাদেশে স্টারলিংকের সম্ভাব্য মূল্য নিয়ে এখনো চূড়ান্ত ঘোষণা না থাকলেও, বর্তমান বিশ্বব্যাপী মূল্য কাঠামো এবং অন্যান্য দেশের অভিজ্ঞতা থেকে আমরা একটি ধারণা পেতে পারি।
স্টারলিংক ব্যবহার করতে হলে প্রথমে একটি স্টারলিংক কিট কিনতে হয়, যার মধ্যে একটি স্যাটেলাইট ডিশ ও একটি রাউটার থাকে। বিশ্বব্যাপী এই কিটের দাম প্রায় $৫৯৯, যা বর্তমান বিনিময় হারে প্রায় ৭৩,০৮৫ বাংলাদেশী টাকার সমতুল্য। এছাড়াও শিপিং ও হ্যান্ডলিং ফি বাবদ অতিরিক্ত খরচ হতে পারে।
BSNL-এর Satellite-to-Device পরিষেবা: ভারতের দুর্গম এলাকায় যোগাযোগের নতুন যুগ
স্টারলিংকের মাসিক ব্যবহার ফি বিশ্বব্যাপী প্রায় $১২০, যা বাংলাদেশী টাকায় প্রায় ১৪,৬২৭ টাকা। তুলনামূলকভাবে, বাংলাদেশের স্থানীয় ইন্টারনেট সেবা প্রদানকারীরা ৫ Mbps ব্রডব্যান্ড মাত্র ৫০০ টাকায় প্রদান করে থাকে, এবং মোবাইল ইন্টারনেট প্যাকেজে ৩০ GB ডাটা ৪০০-৫০০ টাকার মধ্যে পাওয়া যায়।
তবে আশার কথা, আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে স্টারলিংক গ্রামীণ এলাকার জন্য কম দামে পরিষেবা দিয়ে থাকে, যা মাসিক $১০ থেকে $৩০ এর মধ্যে।টেলিকম ও প্রযুক্তি বিশ্লেষক মুস্তাফা মাহমুদ হোসেন জানিয়েছেন, “স্টারলিংক আফ্রিকার কিছু গ্রামীণ এলাকায় খুব কম দামে সেবা দেয়, যা $১০ থেকে $৩০ এর মধ্যে। কোন সন্দেহ নেই যে বাংলাদেশের প্রত্যন্ত ও অসংযুক্ত এলাকার শেষ ব্যবহারকারীরা স্টারলিংকের আগমনের পরে উপকৃত হবেন।”
ফ্রিল্যান্সারদের মধ্যে করা একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে যে, তারা যদি স্টারলিংকের মূল্য প্রায় ৫,০০০ টাকার আশেপাশে থাকে, তবে তারা এই পরিষেবা গ্রহণ করতে আগ্রহী হতে পারেন।
২০২৫ সালের মার্চ পর্যন্ত আফ্রিকায় স্টারলিংকের মূল্য দেশভেদে ভিন্ন ভিন্ন। উদাহরণস্বরূপ:
আফ্রিকার অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায় যে, স্টারলিংক বিভিন্ন দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা ও প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ বিবেচনায় নিয়ে তাদের মূল্য কাঠামো সমন্বয় করে থাকে। বাংলাদেশেও অনুরূপ ভাবে মূল্য সমন্বয় দেখা যেতে পারে।
স্টারলিংকের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হল এর উচ্চ গতি ও কম লেটেন্সি। বাংলাদেশে করা পরীক্ষায় ১৫০ Mbps পর্যন্ত ডাউনলোড স্পিড দেখা গিয়েছে।বিশ্বব্যাপী স্টারলিংকের ডাউনলোড স্পিড সাধারণত ২৫ থেকে ২২০ Mbps এর মধ্যে থাকে, এবং বেশিরভাগ ব্যবহারকারী ১০০ Mbps-এর বেশি গতি অনুভব করেন। আপলোড স্পিড সাধারণত ৫ থেকে ২০ Mbps এর মধ্যে থাকে।
লেটেন্সির ক্ষেত্রে, স্টারলিংক ৩০-৪০ মিলিসেকেন্ডের মধ্যে থাকে, যা অনলাইন গেমিং, ভিডিও কনফারেন্সিং এবং স্ট্রিমিং-এর জন্য উপযুক্ত।প্রচলিত জিওস্টেশনারি স্যাটেলাইট ইন্টারনেটের তুলনায় এটি অনেক কম, যেখানে লেটেন্সি ৬০০ মিলিসেকেন্ড বা তার বেশি হতে পারে।
তবে কিছু বিষয় স্টারলিংকের পারফরম্যান্সকে প্রভাবিত করতে পারে:
স্টারলিংকের আগমন বাংলাদেশের ডিজিটাল অবকাঠামোকে অনেক দিক থেকে সমৃদ্ধ করতে পারে।
বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল, দ্বীপ এবং চর এলাকায় যেখানে পারম্পরিক ইন্টারনেট অবকাঠামো পৌঁছাতে পারেনি, সেখানে স্টারলিংক সহজেই উচ্চ-গতির ইন্টারনেট পৌঁছে দিতে পারে। এটি গ্রামীণ ও প্রত্যন্ত এলাকার মানুষকে অনলাইন শিক্ষা, টেলিমেডিসিন এবং ই-কমার্স সুবিধা নিতে সাহায্য করবে।
প্রধান উপদেষ্টা ইউনূসের মতে, “যদি স্টারলিংক চালু হয়, তবে কোনো সরকারের ইন্টারনেট অ্যাক্সেস বন্ধ করার বা নাগরিকদের ডিজিটাল বিশ্ব থেকে লক আউট করার ক্ষমতা থাকবে না।”২০২৪ সালের জুলাই মাসে, দেশব্যাপী বিক্ষোভের সময় কর্তৃপক্ষ ইন্টারনেট ও টেক্সট মেসেজিং পরিষেবা স্থগিত করেছিল, যা ব্যবসা ও ফ্রিল্যান্সারদের কাজে ব্যাপক বিঘ্ন ঘটিয়েছিল।
স্টারলিংকের স্যাটেলাইট-ভিত্তিক প্রযুক্তি আবহাওয়া বিঘ্ন, বিদ্যুৎ বিভ্রাট এবং ভৌত ক্ষতির প্রতি অধিক সহনশীল। বাংলাদেশের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগপ্রবণ দেশে, বন্যা বা ঘূর্ণিঝড়ের সময় যখন পারম্পরিক নেটওয়ার্ক ব্যর্থ হয়, তখন স্টারলিংক গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ চ্যানেল চালু রাখতে সাহায্য করতে পারে।
ফ্রিল্যান্সারদের জন্য স্থিতিশীল ও উচ্চ-গতির ইন্টারনেট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ঢাকা ট্রিবিউনের সাথে কথা বলে, আপওয়ার্কে ভার্চুয়াল অ্যাসিস্ট্যান্স প্রদানকারী মোঃ শামীম রেজা বলেন, “বেশিরভাগ সময়, বিশেষ করে রাতে আমরা ইন্টারনেট গতির সমস্যায় ভুগি। যেহেতু স্টারলিংকের এই সমস্যা নেই, আমরা আশা করি এই সমস্যার মুখোমুখি হব না।”
গাজীপুরের একজন ফ্রিল্যান্সার মনির হাসান জানিয়েছেন, “যদি স্টারলিংকের মূল্য প্রায় ৫,০০০ টাকার আশেপাশে থাকে, তবে ফ্রিল্যান্সাররা এই পরিষেবা নিতে পারেন।”
ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে, বিশেষ করে দূরবর্তী অঞ্চলে অবস্থিত ব্যবসাগুলির জন্য, স্টারলিংক নির্ভরযোগ্য উচ্চ-গতির ইন্টারনেট প্রদান করতে পারে, যা কৃষি (রিমোট মনিটরিং) এবং পর্যটন (অনলাইন বুকিং) ইত্যাদি শিল্পের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
স্টারলিংকের সম্ভাবনা অপার হলেও, বাংলাদেশে এর সফল বাস্তবায়নের সামনে কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে:
সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হল স্টারলিংকের উচ্চ মূল্য। বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের জন্য ৭৩,০০০+ টাকার হার্ডওয়্যার এবং মাসিক ১৪,০০০+ টাকার সাবস্ক্রিপশন খরচ বহন করা কঠিন। এর ফলে, স্টারলিংক সীমিত সংখ্যক উচ্চ-আয়ের ব্যক্তি, ব্যবসা এবং প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে।
স্টারলিংক ব্যবহারের জন্য আকাশের দিকে একটি অবাধ দৃষ্টিরেখা প্রয়োজন। ঘন জনবসতিপূর্ণ শহরাঞ্চলে, উঁচু ভবন বা অন্যান্য বাধা স্যাটেলাইট সংযোগকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। এছাড়া, বাংলাদেশের মৌসুমি আবহাওয়া, বিশেষ করে ভারী বর্ষা ও ঝড়, স্যাটেলাইট সংকেতকে প্রভাবিত করতে পারে।
ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ISPAB) এর সভাপতি মো: এমদাদুল হক স্টারলিংকের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন, যেহেতু স্থানীয় প্রদানকারীরা ইতিমধ্যে দেশের অধিকাংশ অঞ্চলে সেবা প্রসারিত করেছে। তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন যে স্টারলিংকের প্রবেশ তাদের বিনিয়োগকে বিপন্ন করতে পারে।
তবে, রবি আক্সিয়াটা লিমিটেডের চিফ কর্পোরেট অ্যান্ড রেগুলেটরি অফিসার শাহেদ আলম উদ্যোগটিকে স্বাগত জানিয়েছেন এবং নিয়ামক সংস্থাগুলিকে সকল পরিষেবা প্রদানকারীদের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন।
২০২৫ সালে মহাকাশে ভারতের অভিযান: ISRO-র সাহসী পদক্ষেপ ও চন্দ্র থেকে মঙ্গল পর্যন্ত
২০২৫ সালে বাংলাদেশে স্টারলিংকের আগমন দেশের ডিজিটাল অবকাঠামোয় একটি যুগান্তকারী পরিবর্তন নিয়ে আসতে পারে। যদিও উচ্চ মূল্য একটি বড় প্রতিবন্ধকতা, তবে আফ্রিকার দেশগুলোর অভিজ্ঞতা থেকে আশা করা যায় যে, স্টারলিংক বাংলাদেশের বাজারের অবস্থার সাথে সামঞ্জস্য রেখে তাদের মূল্য কাঠামো সমন্বয় করতে পারে।
প্রকৃত সুবিধা পেতে হলে স্টারলিংকের মূল্য বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে হওয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষ, ফ্রিল্যান্সার, ছোট ব্যবসায়ী এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য স্টারলিংক একটি গেম-চেঞ্জার হতে পারে যদি তা সাশ্রয়ী মূল্যে উপলব্ধ করা যায়।
সবশেষে, স্টারলিংকের সফল বাস্তবায়ন সরকার, নিয়ামক সংস্থা এবং SpaceX-এর মধ্যে সহযোগিতার উপর নির্ভর করবে। বাংলাদেশে স্টারলিংকের সম্ভাব্য মূল্য ২০২৫ সালে কীভাবে নির্ধারিত হবে তা দেখার জন্য আমাদের আরও কিছু সময় অপেক্ষা করতে হবে, তবে সমগ্র বিশ্বের অভিজ্ঞতা থেকে আশা করা যায় যে, এটি দেশের ডিজিটাল রূপান্তরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।