Best fruits for blood sugar control: গ্রীষ্মকালে প্রচুর ফল পাওয়া যায় যা আমাদের দৈনন্দিন খাদ্যতালিকার অংশ। তবে ডায়াবেটিস রোগীদের বা যারা রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে চান, তাদের জন্য সব ফল সমান উপযোগী নয়। হার্ভার্ড টি.এইচ. চ্যান স্কুল অফ পাবলিক হেলথ অনুসারে, আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশন প্রাপ্তবয়স্ক মহিলাদের জন্য দৈনিক ১০০ ক্যালরি (২৪ গ্রাম) এবং পুরুষদের জন্য ১৫০ ক্যালরি (৩৬ গ্রাম) চিনির সুপারিশ করে। এই সীমা মেনে চলার জন্য কম চিনিযুক্ত ফল খাওয়া একটি উত্তম উপায়। এই ব্লগে আমরা জানব গ্রীষ্মকালের এমন ৫টি ফল সম্পর্কে যা খেলে আপনার blood sugar level বাড়বে না।
গ্রীষ্মের এই ফলটি অত্যন্ত জনপ্রিয় এবং জলীয় অংশ বেশি থাকায় শরীরকে হাইড্রেটেড রাখতে সাহায্য করে। অনেকে মনে করেন তরমুজের মিষ্টি স্বাদের কারণে এতে চিনির পরিমাণ বেশি। কিন্তু আসলে তরমুজে প্রতি ১০০ গ্রামে মাত্র ৬.২ গ্রাম প্রাকৃতিক চিনি থাকে, যা অন্যান্য ফলের তুলনায় অনেক কম।
নিউট্রিশনাল প্রোফাইল:
তরমুজের glycemic index (GI) 72, যা উচ্চ বলে মনে হলেও, এর জলীয় অংশ বেশি থাকায় সাধারণ 120 গ্রাম পরিবেশনে GI মাত্র 5 হয়, যা এটিকে ডায়াবেটিসের রোগীদের জন্য একটি ভালো বিকল্প করে তোলে। তরমুজে ভিটামিন A, C এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট আছে, যা শরীরকে গ্রীষ্মকালে ঠান্ডা ও হাইড্রেটেড রাখতে সাহায্য করে।
তবে মনে রাখবেন, তরমুজের জুস খাওয়া এড়িয়ে চলুন, কারণ জুসে GI উচ্চ থাকে যা রক্তে শর্করার মাত্রা বাড়াতে পারে।
ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য নিষিদ্ধ খাবারের তালিকা: সুস্থ থাকার গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশিকা
বেরি জাতীয় ফল যেমন স্ট্রবেরি, রাস্পবেরি, ব্লুবেরি, এবং ব্ল্যাকবেরি কম চিনিযুক্ত এবং ফাইবার ও ভিটামিন সমৃদ্ধ ফল। এই ফলগুলো ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য বিশেষভাবে উপযোগী।
চিনির পরিমাণ:
বেরি জাতীয় ফলে থাকা পলিফেনল এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট শরীরে প্রদাহ কমাতে সাহায্য করে। গবেষণায় দেখা গেছে, ব্লুবেরি খাওয়ার পরে রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে থাকে। এছাড়া এই ফলগুলোতে থাকা ফাইবার ধীরে ধীরে হজম হয়, যা রক্তে শর্করার মাত্রা হঠাৎ বেড়ে যাওয়া রোধ করে।
স্বাস্থ্য উপকারিতা:
বেরি জাতীয় ফল সাদা দইয়ের সাথে মিশিয়ে সকালের নাস্তা হিসেবে বা ডেজার্ট হিসেবে খেতে পারেন।
পেঁপে হল গ্রীষ্মকালীন একটি সুস্বাদু ফল যা ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য বিশেষ উপযোগী। এর glycemic index (GI) 60, যা কম থেকে মাঝারি, অর্থাৎ এটি রক্তে শর্করার মাত্রা দ্রুত বাড়াবে না।
পেঁপের পুষ্টিগুণ (এক ছোট পেঁপে):
প্রতি 100 গ্রাম কাঁচা পেঁপেতে মাত্র 7.82 গ্রাম প্রাকৃতিক চিনি থাকে। পেঁপেতে থাকা ফাইবার রক্তে শর্করা শোষণের প্রক্রিয়া ধীর করে দেয়, যা রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে।
পেঁপেতে থাকা ফ্লাভোনয়েড রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে। গবেষণায় দেখা গেছে, টাইপ-1 ডায়াবেটিস রোগীরা যারা পেঁপে এবং উচ্চ ফাইবারযুক্ত খাবার খান, তাদের রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা কম থাকে। টাইপ-2 ডায়াবেটিস রোগীদের ক্ষেত্রেও নিয়মিত পেঁপে খাওয়ার ফলে রক্তে শর্করা, লিপিড এবং ইনসুলিনের মাত্রা উন্নত হতে পারে।
আমরুদ বা গুয়াভা গ্রীষ্মকালে পাওয়া যায় এমন একটি পুষ্টিকর ফল যা ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য খুবই উপযোগী। আমরুদের glycemic index (GI) 12 থেকে 24 এর মধ্যে, যা অত্যন্ত কম, অর্থাৎ এটি রক্তে শর্করার মাত্রা হঠাৎ বাড়াবে না।
আমরুদের পুষ্টিগুণ (প্রতি 100 গ্রামে):
প্রতি 100 গ্রাম আমরুদে মাত্র 8.92 গ্রাম চিনি থাকে, যা কলার মতো অন্যান্য ফলের তুলনায় অনেক কম5। আমরুদে থাকা উচ্চ পরিমাণে ফাইবার হজমে সময় নেয় এবং রক্তে ধীরে ধীরে শোষিত হয়, যার ফলে রক্তে শর্করার মাত্রা হঠাৎ বাড়ে না।
আমরুদের স্বাস্থ্য উপকারিতা:
আমরুদে থাকা প্রোটিন এবং ফাইবার ইনসুলিন উৎপাদন বাড়াতে এবং রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে। একারণেই ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য আমরুদ একটি আদর্শ ফল।
খরমুজ বা মাস্কমেলন গ্রীষ্মকালে অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি ফল। এটি জলীয় অংশ বেশি থাকায় শরীরকে হাইড্রেটেড রাখতে সাহায্য করে। খরমুজের glycemic index (GI) 65, যা মাঝারি, কিন্তু এতে জলের পরিমাণ বেশি থাকায় রক্তে শর্করার মাত্রা খুব বেশি বাড়ায় না।
নিউট্রিশনাল প্রোফাইল:
প্রতি 100 গ্রাম খরমুজে:
খরমুজে ভিটামিন C, পটাশিয়াম, এবং বিটা-ক্যারোটিন প্রচুর পরিমাণে আছে। এতে ফাইবার আছে যা চিনি শোষণের গতি কমিয়ে দেয় এবং রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে।
খরমুজ এর স্বাদু ও জলীয় প্রকৃতি এটিকে গ্রীষ্মকালে একটি আদর্শ ফল করে তোলে। নিয়মিত খাওয়ার ফলে স্বাস্থ্যকর ত্বক এবং হৃদস্বাস্থ্য উন্নত হতে পারে। এছাড়া, খরমুজ ক্যালোরিতে কম, যা এটিকে ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে।
কম চিনিযুক্ত ফল খাওয়া ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য উপকারী হলেও, কিছু বিষয় মাথায় রাখা প্রয়োজন:
পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করুন: যেকোনো ফল মাত্রাতিরিক্ত খেলে রক্তে শর্করার মাত্রা বাড়তে পারে। তাই ফল খাওয়ার সময় পরিমাণ মনে রাখুন।
প্রাকৃতিক রূপে খান: ফল প্রক্রিয়াজাত না করে, প্রাকৃতিক অবস্থায় খাওয়া উচিত। ফলের জুস, সিরাপ বা যোগ করা চিনিযুক্ত প্রক্রিয়াজাত ফল এড়িয়ে চলুন।
প্রোটিন বা স্বাস্থ্যকর ফ্যাটের সাথে খান: ফলের সাথে বাদাম বা বীজ যেমন আখরোট, বাদাম, ফ্ল্যাক্সসিড, চিয়া সিড মিশিয়ে খেলে চিনি শোষণের হার ধীর হয়, যা ডায়াবেটিস রোগীদের রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা হঠাৎ বৃদ্ধি এড়াতে সাহায্য করে।
মদ্যপান কি ডায়াবেটিস রোগীদের রক্তে শর্করার মাত্রা বাড়ায়? জেনে নিন বিস্তারিত
বিভিন্ন রেসিপিতে ব্যবহার করুন:
কম চিনিযুক্ত ফল খাওয়া রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে, তবে একটি সামগ্রিক স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন এবং সঠিক পুষ্টির জন্য নিম্নলিখিত বিষয়গুলি মনে রাখুন:
Glycemic Index (GI) বুঝুন: GI হল একটি পরিমাপ যা খাবার কতটা দ্রুত রক্তে শর্করার মাত্রা বাড়ায় তা নির্দেশ করে। কম GI সম্পন্ন খাবার ধীরে ধীরে হজম হয় এবং রক্তে শর্করার মাত্রা ধীরে ধীরে বাড়ায়।
ফাইবার সমৃদ্ধ খাবার খান: ফাইবার হজমে সময় নেয় এবং রক্তে চিনি শোষণের গতি কমিয়ে দেয়, যা রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে।
নিয়মিত ব্যায়াম করুন: শারীরিক কার্যকলাপ ইনসুলিনের কার্যকারিতা বাড়ায় এবং রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে।
জল পান করুন: পর্যাপ্ত পরিমাণে জল পান করা হাইড্রেশন বজায় রাখতে এবং রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে।
গ্রীষ্মকালে কম চিনিযুক্ত ফল খাওয়া ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য বিশেষ উপকারী। তরমুজ, বেরি জাতীয় ফল, পেঁপে, আমরুদ এবং খরমুজ এমন কিছু ফল যা blood sugar level বাড়ায় না বরং নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে।
এই ফলগুলোতে প্রাকৃতিক চিনির পরিমাণ কম, ফাইবার বেশি এবং পুষ্টিগুণ সমৃদ্ধ। তবে যেকোনো খাবারের মতো, এই ফলগুলোও পরিমিত পরিমাণে খাওয়া উচিত। সর্বোপরি, ডায়াবেটিস রোগীদের উচিত চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী একটি সুষম খাদ্যতালিকা মেনে চলা, যাতে এই ফলগুলোও সম্মিলিত রয়েছে।পর্যাপ্ত শারীরিক কার্যকলাপ, সঠিক ওজন বজায় রাখা এবং স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস অবলম্বন করে ডায়াবেটিস ভালোভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। গ্রীষ্মকালে এই পাঁচটি কম চিনিযুক্ত ফল আপনার খাদ্যতালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে আপনি স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন করতে পারেন।