আপনি কি ভাবছেন পাউরুটি খেলে ওজন বাড়বে? তাহলে আজকের এই লেখাটি আপনার ধারণাকে পুরোপুরি পাল্টে দেবে! সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, সঠিক পদ্ধতিতে পাউরুটি কীভাবে খেলে ওজন কমবে সেটা জানলে আপনিও পারবেন স্বাস্থ্যকর উপায়ে মেদ কমাতে। অবাক লাগছে? কিন্তু এটাই সত্যি!
পুষ্টিবিদদের মতে, কার্বোহাইড্রেট থাকলেও পাউরুটি ওজন কমাতে অত্যন্ত উপকারী হতে পারে। আসল কথা হলো—সব পাউরুটি এক নয়, আর খাওয়ার পদ্ধতিতেই লুকিয়ে আছে সাফল্যের চাবি। তাহলে চলুন জেনে নিই কীভাবে পাউরুটি হতে পারে আপনার ওজন কমানোর সবচেয়ে ভালো সঙ্গী।
কেন সাদা পাউরুটি ওজন বাড়ায়?
সাদা পাউরুটির সমস্যাটা বুঝতে হলে প্রথমেই জানতে হবে এটি তৈরি হয় কী দিয়ে। সাদা পাউরুটি তৈরি হয় ময়দা দিয়ে, যা একটি রিফাইনড কার্বোহাইড্রেট। এতে ফাইবারের মাত্রা খুবই কম থাকে।
এই ধরনের পাউরুটি দ্রুত শরীরে শর্করার মাত্রা বৃদ্ধি করে। পুষ্টিগুণ তেমন না থাকায় অল্প সময়েই আবার ক্ষুধা পায়। ফলে বার বার খাওয়ার প্রবণতা বেড়ে যায় এবং ওজন বৃদ্ধি পায়।
কোন ধরনের পাউরুটি ওজন কমায়?
সমস্যা আসলে পাউরুটিতে নয়, রয়েছে উপকরণে। সব ধরনের পাউরুটি ওজনবৃদ্ধির কারণ হয় না। আধুনিক পুষ্টিবিজ্ঞান বলছে নানা রকম দানাশস্য দিয়ে তৈরি পাউরুটি স্বাস্থ্যের জন্য অনেক ভালো।
হোল গ্রেইন বা আস্ত শস্যের পাউরুটি
ব্রাউন ব্রেড বা হোল গ্রেইন পাউরুটি ওজন কমাতে সবচেয়ে বেশি সাহায্য করে। এতে ফাইবারের পরিমাণ সাধারণ রুটির থেকেও বেশি থাকে। গ্লাইসেমিক রেটও অনেক কম, যার ফলে রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে থাকে।
ওটসের পাউরুটি
ওটস থেকে তৈরি পাউরুটিতে থাকে প্রচুর পরিমাণে ফাইবার, ম্যাগনেশিয়াম, ভিটামিন বি, আয়রন এবং জিঙ্ক। এতে থাকা ফাইবার রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে এবং কোলেস্টেরলের মাত্রাও নিয়ন্ত্রণ করে।
মাল্টিগ্রেইন পাউরুটি
বিভিন্ন দানাশস্য মিশিয়ে তৈরি মাল্টিগ্রেইন পাউরুটি ওজন নিয়ন্ত্রণের জন্য আদর্শ। এতে উচ্চ ফাইবার এবং কমপ্লেক্স কার্বোহাইড্রেট থাকে যা দীর্ঘ সময় পেট ভরিয়ে রাখে এবং অপ্রয়োজনীয় খাবার খাওয়ার ইচ্ছা কমায়।
রাগি ও বাজরার পাউরুটি
রাগি এবং বাজরা দিয়ে তৈরি পাউরুটি ওজন কমানোর জন্য অসাধারণ। এতে প্রচুর আয়রন, ক্যালশিয়াম এবং ফাইবার থাকে। রাগি রক্তে শর্করার মাত্রা প্রাকৃতিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করে এবং হাড়ের স্বাস্থ্য ভালো রাখে।
পাউরুটি কীভাবে খেলে ওজন কমবে—সঠিক পদ্ধতি
শুধু সঠিক পাউরুটি বাছাই করলেই হবে না, জানতে হবে কীভাবে খেতে হবে। পুষ্টিবিদরা বলছেন, পাউরুটি কতটা খাচ্ছেন এবং কী দিয়ে খাচ্ছেন তার উপর নির্ভর করে এটি ওজন কমাতে সাহায্য করবে নাকি বাড়াবে।
স্বাস্থ্যকর টপিং ব্যবহার করুন
পাউরুটির সঙ্গে পিনাট বাটার বা বাদামের মাখন খেলে শরীরে প্রোটিনের জোগান থাকে। অ্যাভোকাডো, ডিম সেদ্ধ বা পোচ খেলে কার্বোহাইড্রেটের পাশাপাশি প্রোটিন এবং স্বাস্থ্যকর ফ্যাটের জোগান থাকবে।
সালাদ যোগ করুন
পাউরুটির সঙ্গে তাজা সালাদ রাখলে ভিটামিন ও খনিজ পাবেন। এতে ফাইবারের পরিমাণও বেড়ে যাবে যা পেট ভরিয়ে রাখবে দীর্ঘ সময়।
এড়িয়ে চলুন এই জিনিসগুলো
পাউরুটির সঙ্গে চিজ বা মেয়োনিজ খাবেন না। এতে ক্যালোরির পরিমাণ অনেক বেড়ে যাবে এবং ওজনও বাড়বে। মাখনও এড়িয়ে চলার চেষ্টা করুন।
বৈজ্ঞানিক গবেষণায় পাউরুটি ও ওজন নিয়ন্ত্রণ
সাম্প্রতিক একটি সুইডিশ গবেষণা অবাক করা তথ্য দিয়েছে। RyeWeight নামে এই গবেষণায় দেখা গেছে, রিফাইনড গমের পরিবর্তে উচ্চ ফাইবারযুক্ত রাই জাতীয় পাউরুটি ক্যালোরি-নিয়ন্ত্রিত খাদ্যতালিকায় রাখলে শরীরের ওজন এবং মেদ বেশি কমে।
আরেকটি গবেষণায় দেখা গেছে, ১৬ সপ্তাহের একটি গবেষণায় কম ক্যালোরি খাদ্যতালিকায় পাউরুটি রাখা এবং না রাখা গ্রুপের মধ্যে ওজন কমানোর ক্ষেত্রে কোনো পার্থক্য পাওয়া যায়নি। তবে, যারা হোল গ্রেইন পাউরুটি খেয়েছেন তারা বেশি পেটের মেদ কমিয়েছেন।
কখন এবং কতটুকু পাউরুটি খাবেন?
সকালের নাস্তায়
সকালের নাস্তায় ১-২ স্লাইস মাল্টিগ্রেইন পাউরুটি আদর্শ। এর সাথে প্রোটিন এবং স্বাস্থ্যকর ফ্যাট যোগ করুন।
দুপুরের খাবারে
দুপুরে পাউরুটি খেলে এক স্লাইসই যথেষ্ট। তবে সেটা যেন হোল গ্রেইন বা মাল্টিগ্রেইন হয়।
রাতের খাবারে এড়িয়ে চলুন
রাতে পাউরুটি খাওয়া এড়িয়ে চলাই ভালো। কারণ রাতে কার্বোহাইড্রেট বেশি খেলে মেদ জমার সম্ভাবনা থাকে।
কোন পাউরুটি কিনবেন? কেনার সময় যা দেখবেন
বাজারে পাউরুটি কেনার সময় লেবেল ভালো করে পড়ুন। যেসব পাউরুটিতে “100% Whole Grain” বা “Multi-grain” লেখা আছে সেগুলো বেছে নিন।
ইনগ্রেডিয়েন্ট লিস্টে প্রথমে যদি “refined flour” বা “maida” লেখা থাকে তাহলে সেটা এড়িয়ে চলুন। পরিবর্তে এমন পাউরুটি খুঁজুন যেখানে প্রথমেই “whole wheat flour” বা বিভিন্ন গ্রেইনের নাম লেখা আছে।
নিজে বাড়িতে স্বাস্থ্যকর পাউরুটি বানানোর উপায়
বাড়িতে নিজেই স্বাস্থ্যকর পাউরুটি বানানো সম্ভব। আটা, ওটস পাউডার, রাগি ফ্লাওয়ার মিশিয়ে দারুণ পুষ্টিগুণ সম্পন্ন পাউরুটি তৈরি করতে পারেন। এতে কোনো প্রিজারভেটিভ বা ক্ষতিকর রাসায়নিক থাকবে না।
অন্যান্য টিপস: পাউরুটি খাওয়ার সময় যা মনে রাখবেন
পাউরুটি খাওয়ার সাথে সাথেই জল খাবেন না, এতে অ্যাসিডিটির সমস্যা হতে পারে। পাউরুটি সেঁকে খাওয়াই ভালো, কাঁচা পাউরুটি হজমের সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে।
নিয়মিত ব্যায়ামের সাথে সঠিক পাউরুটি খেলে ওজন কমানো আরও সহজ হয়ে যায়। মনে রাখবেন, শুধু খাবার দিয়ে ওজন কমানো সম্ভব নয়, জীবনযাত্রার সামগ্রিক পরিবর্তন দরকার।
পাউরুটি কীভাবে খেলে ওজন কমবে এই প্রশ্নের উত্তর এখন আপনার জানা হয়ে গেছে। মূল কথা হলো, সঠিক ধরনের পাউরুটি বেছে নিন, স্বাস্থ্যকর উপায়ে খান এবং পরিমাণমতো খান। তাহলেই পাউরুটি আপনার ওজন কমানোর যাত্রায় শক্তিশালী সহায়ক হয়ে উঠবে। মনে রাখবেন, স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের জন্য কোনো খাবারই সম্পূর্ণ বাদ দেওয়ার দরকার নেই, দরকার সঠিক পদ্ধতিতে খাওয়ার।










