How Sugar Causes Inflammation and Increases Arthritis Pain: বাঙালি মানেই মিষ্টিপ্রেমী। উৎসব-অনুষ্ঠানে এক টুকরো মিষ্টি ছাড়া আমাদের চলেই না। কিন্তু যারা আর্থ্রাইটিস বা বাতের ব্যথায় কষ্ট পান, তাদের মনে প্রায়শই একটি প্রশ্ন উঁকি দেয় – “মিষ্টি খেলে কি বাতের ব্যথা বাড়ে?” এই ধারণাটি কি শুধুই প্রচলিত কথা, নাকি এর পেছনে কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি আছে? সাম্প্রতিক গবেষণা এবং পুষ্টিবিজ্ঞান কিন্তু এই প্রশ্নের একটি জোরালো উত্তর দিচ্ছে। বিশ্বজুড়ে লক্ষ লক্ষ মানুষ আর্থ্রাইটিসে আক্রান্ত এবং শুধুমাত্র ভারতেই এই সংখ্যাটা নেহাত কম নয়। ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশন (WHO) এর তথ্যমতে, বিশ্বব্যাপী প্রায় ৩৫৫ মিলিয়ন মানুষ আর্থ্রাইটিসে আক্রান্ত। এই বিশাল সংখ্যক মানুষের জন্য ব্যথা নিয়ন্ত্রণ একটি দৈনন্দিন চ্যালেঞ্জ। আজকের এই প্রবন্ধে আমরা গভীরভাবে বিশ্লেষণ করব চিনি বা মিষ্টিজাতীয় খাবারের সাথে বাতের ব্যথার সম্পর্ক, অর্থাৎ Sugar and Arthritis Pain এর যোগসূত্র এবং জানব কীভাবে খাদ্যাভ্যাসের সামান্য পরিবর্তন আপনার জীবনযাত্রার মান উন্নত করতে পারে।
বাত (Arthritis) এবং প্রদাহ (Inflammation): সম্পর্কটা ঠিক কোথায়?
আর্থ্রাইটিস মূলত জয়েন্ট বা অস্থিসন্ধির প্রদাহজনিত একটি রোগ। এর বিভিন্ন প্রকারভেদ রয়েছে, যার মধ্যে অস্টিওআর্থ্রাইটিস (Osteoarthritis) এবং রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস (Rheumatoid Arthritis) সবচেয়ে সাধারণ।
- অস্টিওআর্থ্রাইটিস: এক্ষেত্রে জয়েন্টের কার্টিলেজ বা তরুণাস্থি সময়ের সাথে সাথে ক্ষয় হয়ে যায়, ফলে হাড়ে হাড়ে ঘর্ষণ লেগে ব্যথা এবং আড়ষ্টতা দেখা দেয়।
- রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস: এটি একটি অটোইমিউন ডিজিজ, যেখানে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা ভুলবশত নিজের জয়েন্টগুলোকে আক্রমণ করে এবং তীব্র প্রদাহ সৃষ্টি করে।
উভয় ক্ষেত্রেই ‘প্রদাহ’ বা ‘Inflammation’ একটি মূল সমস্যা। আর এখানেই চিনির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। শরীরের যেকোনো প্রদাহ বাতের উপসর্গকে আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে।
চিনি কীভাবে শরীরে প্রদাহ সৃষ্টি করে? (The Science Behind Sugar and Arthritis Pain)
যখন আমরা অতিরিক্ত পরিমাণে পরিশোধিত চিনি (Refined Sugar) বা উচ্চ-গ্লাইসেমিক ইনডেক্সযুক্ত খাবার খাই, তখন আমাদের শরীর বিভিন্ন জৈব-রাসায়নিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যায় যা প্রদাহকে আমন্ত্রণ জানায়।
১. সাইটোকাইন (Cytokines) নিঃসরণ: অতিরিক্ত চিনি খেলে শরীরে অ্যাডিপোকাইনস (Adipokines) এবং সাইটোকাইনস (Cytokines) নামক প্রদাহ সৃষ্টিকারী প্রোটিনের মাত্রা বেড়ে যায়। আর্থ্রাইটিস ফাউন্ডেশন (Arthritis Foundation) এর মতে, এই সাইটোকাইনগুলো শরীরের প্রদাহ বাড়িয়ে তোলে, যা রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিসের মতো রোগের তীব্রতা বাড়াতে পারে।
২. অ্যাডভান্সড গ্লাইকেশন এন্ড প্রোডাক্টস (AGEs): রক্তে চিনির পরিমাণ বেশি হলে তা প্রোটিন বা ফ্যাটের সাথে মিশে অ্যাডভান্সড গ্লাইকেশন এন্ড প্রোডাক্টস (Advanced Glycation End products – AGEs) নামক ক্ষতিকারক যৌগ তৈরি করে। এই AGEs যৌগগুলো শরীরে অক্সিডেটিভ স্ট্রেস এবং প্রদাহ সৃষ্টি করার জন্য পরিচিত। একটি গবেষণায় দেখা গেছে, আর্থ্রাইটিস রোগীদের জয়েন্টে সাধারণ মানুষের তুলনায় অনেক বেশি পরিমাণে AGEs পাওয়া যায়।
৩. ওজন বৃদ্ধি এবং জয়েন্টের উপর চাপ: মিষ্টি বা চিনিযুক্ত খাবারে ক্যালোরি অনেক বেশি থাকে, যা দ্রুত ওজন বাড়াতে সাহায্য করে। শরীরের অতিরিক্ত ওজন, বিশেষ করে হাঁটু, কোমর এবং গোড়ালির মতো ওজন বহনকারী জয়েন্টগুলোর ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করে। এর ফলে অস্টিওআর্থ্রাইটিসের ব্যথা এবং ক্ষয় দুটোই দ্রুতগতিতে বাড়তে থাকে। সেন্টার্স ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (CDC) স্থূলতাকে আর্থ্রাইটিসের একটি অন্যতম প্রধান ঝুঁকির কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
সাম্প্রতিক গবেষণা ও পরিসংখ্যান কী বলছে?
Sugar and Arthritis Pain নিয়ে বিশ্বজুড়ে গবেষণা চলছে। The American Journal of Clinical Nutrition-এ প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে, যে সমস্ত মহিলারা নিয়মিত চিনিযুক্ত পানীয় (যেমন সোডা বা কোল্ড ড্রিঙ্কস) পান করেন, তাদের রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস হওয়ার ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো খাদ্যাভ্যাসের সামগ্রিক প্রভাব। ২০২৩ সালের একটি সমীক্ষায় বলা হয়েছে, পশ্চিমা খাদ্যাভ্যাস (Western Diet), যেখানে লাল মাংস, প্রক্রিয়াজাত খাবার এবং পরিশোধিত চিনির পরিমাণ বেশি থাকে, তা শরীরে দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ (chronic inflammation) তৈরি করে, যা আর্থ্রাইটিসের মতো রোগের পথ প্রশস্ত করে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) তাদের নির্দেশিকায় দৈনিক ক্যালোরির মাত্র ১০% এর কম “ফ্রি সুগার” (খাবারে যোগ করা চিনি বা ফলের রসে থাকা প্রাকৃতিক চিনি) থেকে গ্রহণ করার পরামর্শ দিয়েছে এবং সম্ভব হলে তা ৫% এর নিচে নামিয়ে আনার কথা বলেছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, প্রক্রিয়াজাত খাবারের যুগে আমরা প্রায়শই এর চেয়ে অনেক বেশি চিনি গ্রহণ করি, যা আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য নীরব ঘাতক হিসেবে কাজ করে।
বিশেষজ্ঞের মতামত: কী খাবেন এবং কী এড়িয়ে চলবেন?
বিশিষ্ট রিউমাটোলজিস্ট এবং পুষ্টিবিদরা আর্থ্রাইটিস রোগীদের খাদ্যতালিকা থেকে কিছু খাবার বাদ দেওয়ার এবং কিছু খাবার যোগ করার পরামর্শ দেন।
যেসব মিষ্টি বা চিনিযুক্ত খাবার এড়িয়ে চলা উচিত:
- চিনিযুক্ত পানীয়: সোডা, প্যাকেটজাত ফলের রস, এনার্জি ড্রিঙ্কস।
- বেকারি পণ্য: কেক, পেস্ট্রি, কুকিজ, ডোনাট।
- মিঠাই: ক্যান্ডি, চকলেট (ডার্ক চকলেট ব্যতীত), সন্দেশ, রসগোল্লা (পরিমিত পরিমাণে)।
- প্রক্রিয়াজাত খাবার: ব্রেকফাস্ট সিরিয়াল, সস, কেচাপ, সালাদ ড্রেসিং (এগুলোতে প্রচুর পরিমাণে লুকানো চিনি থাকে)।
- সাদা কার্বোহাইড্রেট: সাদা রুটি, সাদা ভাত, পাস্তা, যা শরীরে দ্রুত চিনিতে রূপান্তরিত হয়।
বিকল্প হিসেবে কী গ্রহণ করবেন?
প্রদাহ কমাতে এবং জয়েন্টের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে একটি অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি ডায়েট অনুসরণ করা অত্যন্ত কার্যকর।
- ফল: বেরি জাতীয় ফল (স্ট্রবেরি, ব্লুবেরি, রাস্পবেরি), চেরি, আপেল। এগুলিতে প্রাকৃতিক চিনি থাকলেও প্রচুর পরিমাণে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও ফাইবার থাকে যা প্রদাহরোধী।
- গাঢ় সবুজ শাকসবজি: পালং শাক, কেল, ব্রকলি।
- ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড: সামুদ্রিক মাছ (স্যামন, টুনা), আখরোট, ফ্ল্যাক্সসিড।
- স্বাস্থ্যকর ফ্যাট: অ্যাভোকাডো, অলিভ অয়েল।
- মসলা: হলুদ, আদা, দারুচিনি। এগুলি প্রাকৃতিক প্রদাহরোধী হিসেবে কাজ করে।
জীবনযাত্রায় পরিবর্তন: ব্যথা নিয়ন্ত্রণের চাবিকাঠি
শুধুমাত্র চিনি ত্যাগ করলেই যে আর্থ্রাইটিস পুরোপুরি সেরে যাবে, তা নয়। কিন্তু এটি ব্যথা ব্যবস্থাপনার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ। খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তনের পাশাপাশি নিম্নলিখিত বিষয়গুলোও জরুরি:
- নিয়মিত ব্যায়াম: হালকা ব্যায়াম, যেমন হাঁটা, সাঁতার বা যোগব্যায়াম জয়েন্টের সচলতা বাড়ায় এবং পেশিকে শক্তিশালী করে।
- পর্যাপ্ত ঘুম: ঘুমের সময় শরীর নিজেকে মেরামত করে, যা প্রদাহ কমাতে সাহায্য করে।
- মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ: মেডিটেশন বা রিলাক্সেশন কৌশল মানসিক চাপ কমিয়ে ব্যথার অনুভূতি কমাতে পারে।
অতএব, “মিষ্টি খেলে কি বাতের ব্যথা বাড়ে?” – এই প্রশ্নের উত্তর হলো, হ্যাঁ, বাড়তে পারে। যদিও মিষ্টি এবং বাতের ব্যথার সম্পর্ক ( Sugar and Arthritis Pain) প্রতিটি ব্যক্তির ক্ষেত্রে ভিন্ন হতে পারে, তবে বৈজ্ঞানিক প্রমাণ এবং বিশেষজ্ঞরা একমত যে অতিরিক্ত পরিশোধিত চিনি শরীরে প্রদাহ বাড়িয়ে তোলে, যা আর্থ্রাইটিসের উপসর্গকে আরও গুরুতর করে তুলতে পারে। এর অর্থ এই নয় যে আপনাকে মিষ্টি জীবন থেকে পুরোপুরি বাদ দিতে হবে। বরং পরিমিতিবোধ এবং সঠিক খাদ্যাভ্যাসই হলো মূল চাবিকাঠি। প্রক্রিয়াজাত চিনির পরিবর্তে প্রাকৃতিক উৎস থেকে আসা মিষ্টি বেছে নিন এবং একটি প্রদাহরোধী বা অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি ডায়েট অনুসরণ করে আপনি আপনার বাতের ব্যথাকে নিয়ন্ত্রণে রেখে একটি সুস্থ ও সক্রিয় জীবনযাপন করতে পারেন।
সাধারণ জিজ্ঞাস্য (FAQ Section)
১. চিনি খাওয়া পুরোপুরি বন্ধ করে দিলে কি বাত সেরে যাবে?
উত্তর: না, চিনি খাওয়া বন্ধ করলে বাত পুরোপুরি সেরে যাবে না। আর্থ্রাইটিস একটি জটিল রোগ। তবে চিনি ত্যাগ করলে শরীরের প্রদাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসে, যা ব্যথার তীব্রতা কমাতে এবং রোগের অগ্রগতিকে ধীর করতে সাহায্য করতে পারে।
২. কৃত্রিম মিষ্টি (Artificial Sweeteners) কি বাতের রোগীদের জন্য নিরাপদ?
উত্তর: এই বিষয়ে মিশ্র মতামত রয়েছে। কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, অ্যাসপার্টেম (Aspartame) এর মতো কিছু কৃত্রিম মিষ্টিও শরীরে প্রদাহ সৃষ্টি করতে পারে। তাই প্রাকৃতিক মিষ্টি, যেমন স্টিভিয়া (Stevia) পরিমিত পরিমাণে ব্যবহার করা যেতে পারে, তবে সবচেয়ে ভালো হয় মিষ্টির ওপর নির্ভরশীলতা কমানো।
৩. মধু বা গুড় কি পরিশোধিত চিনির চেয়ে ভালো বিকল্প?
উত্তর: মধু এবং গুড়ে কিছু অতিরিক্ত পুষ্টিগুণ থাকলেও, এগুলিও মূলত চিনি। শরীর এগুলোকে প্রায় একই ভাবে প্রক্রিয়া করে। তাই এগুলিও পরিমিত পরিমাণে গ্রহণ করা উচিত। পরিশোধিত চিনির তুলনায় সামান্য ভালো হলেও, অতিরিক্ত খেলে একই রকম প্রদাহ সৃষ্টি করতে পারে।
৪. চিনি কমানোর পর খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন লক্ষ্য করতে কতদিন সময় লাগে?
উত্তর: এটি ব্যক্তিভেদে নির্ভর করে। তবে অনেকেই খাদ্যাভ্যাস থেকে অতিরিক্ত চিনি বাদ দেওয়ার কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই জয়েন্টের ব্যথা, আড়ষ্টতা এবং ফোলাভাব কমার মতো ইতিবাচক পরিবর্তন লক্ষ্য করেন।
৫. কোন ফলগুলো বাতের ব্যথার জন্য সবচেয়ে উপকারী?
উত্তর: অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট এবং অ্যান্থোসায়ানিন সমৃদ্ধ ফল, যেমন – চেরি, ব্লুবেরি, স্ট্রবেরি, এবং আনারস (যাতে ব্রোমেলিন নামক প্রদাহরোধী এনজাইম আছে) বাতের রোগীদের জন্য বিশেষভাবে উপকারী।











