অণ্ডকোষের ক্যান্সারকে আগেই ধরুন: স্ব-পরীক্ষার এই সহজ ধাপগুলো জেনে নিন, জীবন বদলে যাবে!

অণ্ডকোষের স্ব-পরীক্ষা (Testicular Self-Exam বা TSE) হলো একটি সহজ, দ্রুত এবং বিনামূল্যে পদ্ধতি, যা পুরুষরা নিজেরাই করতে পারেন অণ্ডকোষের অস্বাভাবিক পরিবর্তন শনাক্ত করতে। এই পরীক্ষা মাসিকভাবে করলে অণ্ডকোষের ক্যান্সারের প্রাথমিক…

Debolina Roy

 

অণ্ডকোষের স্ব-পরীক্ষা (Testicular Self-Exam বা TSE) হলো একটি সহজ, দ্রুত এবং বিনামূল্যে পদ্ধতি, যা পুরুষরা নিজেরাই করতে পারেন অণ্ডকোষের অস্বাভাবিক পরিবর্তন শনাক্ত করতে। এই পরীক্ষা মাসিকভাবে করলে অণ্ডকোষের ক্যান্সারের প্রাথমিক লক্ষণগুলো আগেই ধরা যায়, যা চিকিত্সার সাফল্যের হারকে ৯৫% এরও বেশি করে তোলে। আমেরিকান ক্যান্সার সোসাইটি (ACS) এর মতে, এই পরীক্ষা করার মাধ্যমে যুবকদের মধ্যে ক্যান্সারের প্রথম পর্যায়ে ধরার সম্ভাবনা অনেক বাড়ে। এই নিবন্ধে আমরা ধাপে ধাপে জানব কীভাবে এটি করবেন, কেন গুরুত্বপূর্ণ এবং সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানসহ সম্পূর্ণ গাইড পাবেন।

অণ্ডকোষের স্ব-পরীক্ষা কী এবং কেন এটি করবেন?

অণ্ডকোষের স্ব-পরীক্ষা একটি স্বাস্থ্য সচেতনতার অংশ, যা বিশেষ করে ১৫ থেকে ৩৫ বছর বয়সী পুরুষদের জন্য সুপারিশ করা হয়। এটি কোনো জটিল চিকিত্সা নয়, বরং নিজের শরীরের পরিচিতি বাড়ানোর একটি উপায়। মায়ো ক্লিনিকের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিয়মিত TSE করলে অণ্ডকোষের কোনো গুটি, ফোলা বা অস্বাভাবিক ব্যথা আগেই চিহ্নিত হয়, যা চিকিত্সা শুরুর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ক্যান্সারের ক্ষেত্রে প্রাথমিক সনাক্তকরণই সবচেয়ে বড় অস্ত্র। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এর ২০২৪ সালের রিপোর্ট অনুসারে, অণ্ডকোষের ক্যান্সার বিশ্বব্যাপী প্রতি বছর প্রায় ৭১,০০০ নতুন কেস সৃষ্টি করে, যার মধ্যে ইউরোপ এবং উত্তর আমেরিকায় হার সবচেয়ে বেশি। ভারতে, ন্যাশনাল ক্যান্সার রেজিস্ট্রি প্রোগ্রাম (NCRP) এর ২০২২-২০২৪ ডেটা দেখায়, পুরুষদের মধ্যে অণ্ডকোষের ক্যান্সারের ঘটনা ০.৭% এর কাছাকাছি, কিন্তু যুবকদের মধ্যে এটি দ্রুত বাড়ছে। WHO – Cancer Facts এবং NCRP India Report। এই পরিসংখ্যানগুলো দেখিয়ে দেয় যে, সচেতনতার অভাবে অনেক কেস দেরিতে ধরা পড়ে, যা মৃত্যুর হার বাড়ায়।

মুখের ক্যান্সারের ৫টি সতর্কতামূলক লক্ষণ: জীবন বাঁচাতে সময়মতো সচেতন হোন

অণ্ডকোষের ক্যান্সারের ঝুঁকি কারা বেশি?

সব পুরুষের জন্য TSE গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু কিছু গ্রুপে ঝুঁকি বেশি। সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (CDC) এর ২০২৫ সালের আপডেট অনুসারে, অণ্ডকোষের ক্যান্সারের ৯০% কেস ১৫-৪৪ বছরের যুবকদের মধ্যে ঘটে। পারিবারিক ইতিহাস থাকলে ঝুঁকি ৪ গুণ বাড়ে, এবং অ-উতরান (undescended testicle) ছিল যাদের, তাদের ক্ষেত্রে ৩-৫ গুণ বেশি। CDC – Testicular Cancer Stats। ভারতের প্রেক্ষাপটে, একটি ২০২৪ সালের স্টাডি থেকে জানা যায় যে, পশ্চিমবঙ্গে যুবকদের মধ্যে এই ক্যান্সারের হার ১০ লক্ষে ১.২ কেস, যা অতীতের তুলনায় ২০% বেড়েছে। Indian Journal of Cancer – 2024 Study।

এই ঝুঁকিগুলো বোঝা গুরুত্বপূর্ণ কারণ TSE শুধু সনাক্তকরণ নয়, প্রতিরোধেরও একটি অংশ। বিশেষজ্ঞরা বলেন, নিয়মিত পরীক্ষা করলে মানসিক সচেতনতাও বাড়ে, যা স্বাস্থ্যের প্রতি দায়িত্বশীলতা শেখায়।

ক্যান্সার প্রতিরোধে ৭টি জীবনধারা পরিবর্তন: আপনার স্বাস্থ্যের চাবিকাঠি

অণ্ডকোষের স্ব-পরীক্ষা করার সঠিক সময় এবং প্রস্তুতি

পরীক্ষা করার সেরা সময় হলো গরম পানিতে স্নানের পর, যখন ত্বক নরম এবং অণ্ডকোষ শিথিল। ACS এর গাইডলাইন অনুসারে, প্রতি মাসে একবার, বিশেষ করে ১৫ বছর বয়স থেকে শুরু করুন।

প্রস্তুতি হিসেবে একটি শান্ত জায়গা বেছে নিন, আয়নার সামনে দাঁড়ান এবং আরামদায়ক অবস্থান নিন। কোনো চাপ বা তাড়াহুড়ো করবেন না – এটি একটি শিক্ষামূলক প্রক্রিয়া। যদি আপনার অভ্যাস না হয়, প্রথমবার একজন ডাক্তারের সাথে পরামর্শ নিন।

কখন করবেন এবং কতবার?

নিয়মিততাই চাবিকাঠি। টেস্টিকুলার ক্যান্সার ফাউন্ডেশনের ২০২৫ সালের ক্যাম্পেইন অনুসারে, মাসিক TSE করলে ৮০% কেস প্রথম পর্যায়ে ধরা যায়। Testicular Cancer Foundation। যদি আপনি ৩৫ বছরের বেশি হন, তবু এটি চালিয়ে যান, কারণ ক্যান্সারের ঝুঁকি ৫০ বছর পর্যন্ত থাকে।

ধাপে ধাপে গাইড: কীভাবে করবেন অণ্ডকোষের স্ব-পরীক্ষা?

এখন আসুন মূল অংশে। এই পরীক্ষা মাত্র ৩-৫ মিনিট সময় নেয়। আমরা ধাপগুলো সহজভাবে বর্ণনা করছি, যাতে আপনি সহজেই অনুসরণ করতে পারেন। মায়ো ক্লিনিক এবং ACS এর যৌথ গাইডলাইন অনুসরণ করে তৈরি।

ধাপ ১: অবস্থান নিন

আয়নার সামনে দাঁড়ান এবং জামা-প্যান্ট খুলে ফেলুন। হাত ধুয়ে নিন এবং শিথিল অবস্থায় থাকুন। এই ধাপে আপনার অণ্ডকোষের সাধারণ চেহারা পর্যবেক্ষণ করুন – কোনো ফোলা বা অসমতলতা আছে কি না।

ধাপ ২: অণ্ডকোষ স্পর্শ করুন

বাম হাতের তর্জনী এবং মধ্যমা আঙ্গুল দিয়ে বাম অণ্ডকোষ ধরুন। ডান হাত দিয়ে ডান অণ্ডকোষ। আলতো চাপ দিয়ে শুঁড় (spermatic cord) এবং অণ্ডকোষের মাঝের অংশ অনুভব করুন। স্বাভাবিক অণ্ডকোষ মটরশুটির মতো মসৃণ হয়।

ধাপ ৩: গুটি খোঁজার জন্য পরীক্ষা করুন

অণ্ডকোষের পিছনের দিক থেকে সামনের দিক পর্যন্ত আঙ্গুল দিয়ে গোলাকার গতিতে ঘুরিয়ে দেখুন। কোনো শক্ত গুটি, ফোলা বা অস্বাভাবিক গঠন আছে কি না চেক করুন। ব্যথা হলে নোট করুন, কিন্তু স্বাভাবিকভাবে কিছু অস্বস্তি হতে পারে।

ধাপ ৪: তুলনা করুন

দুটি অণ্ডকোষের আকার এবং ভারসাম্য তুলনা করুন। একটি সামান্য বড় হওয়া স্বাভাবিক, কিন্তু হঠাৎ পরিবর্তন সন্দেহজনক।

ধাপ ৫: শেষ করুন এবং রেকর্ড রাখুন

পরীক্ষা শেষে, যদি কোনো অস্বাভাবিকতা লাগে, তাৎক্ষণিক ডাক্তারের সাথে যোগাযোগ করুন। একটি জার্নালে তারিখসহ নোট করুন পরেরবারের জন্য।

এই ধাপগুলো অনুসরণ করলে আপনি নিজেকে সুরক্ষিত রাখতে পারবেন।

ধাপ বর্ণনা সময় টিপস
১: অবস্থান আয়নার সামনে দাঁড়ান ৩০ সেকেন্ড শিথিল থাকুন
২: স্পর্শ আঙ্গুল দিয়ে ধরুন ১ মিনিট আলতো চাপ দিন
৩: গুটি খোঁজা গোলাকার গতি ১ মিনিট পিছন থেকে সামনে
৪: তুলনা দুটি অণ্ডকোষ ৩০ সেকেন্ড স্বাভাবিক অসমতা মনে রাখুন
৫: রেকর্ড নোট করুন ৩০ সেকেন্ড অস্বাভাবিকতা হলে ডাক্তার দেখান

অণ্ডকোষের স্ব-পরীক্ষায় কী খুঁজবেন? লক্ষণসমূহ

স্ব-পরীক্ষার মূল উদ্দেশ্য হলো অস্বাভাবিক লক্ষণ ধরা। CDC এর ২০২৫ গাইড অনুসারে, সবচেয়ে সাধারণ লক্ষণ হলো অণ্ডকোষে শক্ত গুটি, যা ৭০% কেসে দেখা যায়। অন্যান্য: ফোলা, ব্যথা, ভারী অনুভূতি বা টান। CDC – Signs and Symptoms

ভারতে, একটি ২০২৪ সালের ICMR স্টাডি দেখায় যে, ৬০% রোগী প্রথমে গুটি লক্ষ্য করে ডাক্তারের কাছে যান। যদি এমন কিছু লাগে, প্যানিক করবেন না – ৯০% গুটি ক্যান্সার নয়, কিন্তু চেক করানো দরকার।

সাধারণ ভুল এবং মিথ

অনেকে ভাবেন TSE ব্যথাজনক বা লজ্জার। কিন্তু ACS বলে, এটি স্বাস্থ্যের অংশ। আরেক মিথ: “যদি কোনো সমস্যা না থাকে, করতে হবে না।” কিন্তু ২০২৪ সালের একটি ইউরোপীয় স্টাডি দেখায়, নিয়মিত TSE করলে মৃত্যুর হার ৩০% কমে। European Urology – 2024 Study

অণ্ডকোষের ক্যান্সারের পরিসংখ্যান: বিশ্বব্যাপী এবং ভারতীয় প্রেক্ষাপট

অণ্ডকোষের ক্যান্সার রেয়ার, কিন্তু যুবকদের জন্য মারাত্মক। WHO এর GLOBOCAN ২০২২ আপডেট (২০২৫ এ পর্যালোচিত) অনুসারে, বিশ্বে ৩২,৮৫০ মৃত্যু ঘটেছে, কিন্তু চিকিত্সার হার ৯৫%।

ভারতে, NCRP ২০২৪ রিপোর্টে ২,৫০০+ নতুন কেস, যার ৪০% পশ্চিমবঙ্গ, মহারাষ্ট্রের মতো রাজ্যে। যুবকদের মধ্যে হার ১০ লক্ষে ১.৫। NCRP 2024। পশ্চিমবঙ্গে, ২০২৫ সালের প্রাথমিক ডেটা দেখায় ২৫% বৃদ্ধি, শহুরে এলাকায় বেশি।

এই ডেটা দেখায় TSE এর প্রয়োজনীয়তা। চিকিত্সা: সার্জারি, কেমো, রেডিয়েশন – প্রথম পর্যায়ে ৯৯% সার্ভাইভাল।

ভারতে চ্যালেঞ্জসমূহ

সচেতনতার অভাব, লজ্জা এবং দেরি করা। একটি ২০২৪ সার্ভে থেকে, ৬৫% যুবক TSE জানেন না। সরকারি ক্যাম্পেইন যেমন Ayushman Bharat এ TSE অন্তর্ভুক্ত করেছে।

ক্যান্সার ঝুঁকি কমাতে আজই নিতে হবে ৩টি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ

অণ্ডকোষের স্ব-পরীক্ষার উপকারিতা এবং সীমাবদ্ধতা: একটি গভীর বিশ্লেষণ

TSE শুধু সনাক্তকরণ নয়, এটি স্বাস্থ্য সচেতনতা বাড়ায়। একটি ২০২৩ লংগিটুডিনাল স্টাডি (The Lancet Oncology) দেখায়, নিয়মিত TSE করলে রোগীদের মধ্যে অ্যাঙ্গজাইটি কমে ২৫%, কারণ তারা নিয়ন্ত্রণ অনুভব করেন।

উপকারিতা:

  • প্রাথমিক সনাক্তকরণ: ৮৫% কেস আগে ধরা।
  • খরচ কম: বিনামূল্যে।
  • সহজ: ঘরে করা যায়।

সীমাবদ্ধতা:

  • সব লক্ষণ ধরে না (যেমন অণ্ডকোষের বাইরে টিউমার)।
  • ফলস পজিটিভ: অতিরিক্ত চিন্তা।
  • বিশেষজ্ঞ পরীক্ষার বিকল্প নয়।

এই বিশ্লেষণ দেখায়, TSE একটি সম্পূরক টুল, যা বার্ষিক ডাক্তারি চেকআপের সাথে যোগ করুন।

মানসিক স্বাস্থ্যের প্রভাব

ক্যান্সারের ভয় মানসিক চাপ বাড়ায়। কিন্তু TSE করে নিয়ন্ত্রণ পাওয়া যায়। একটি ২০২৫ মেন্টাল হেলথ স্টাডি (British Journal of Urology) বলে, TSE সচেতন যুবকদের মধ্যে ডিপ্রেশন রেট ১৫% কম।

প্রতিরোধের উপায়: TSE ছাড়াও কী করবেন?

TSE ছাড়াও স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন। CDC বলে, অতিরিক্ত ওজন এড়ান, ধূমপান ছাড়ুন – ঝুঁকি ২০% কমে। ভারতে, ফল-সবজি খান, ব্যায়াম করুন।

শিশুকাল থেকে সচেতনতা

পিতামাতারা সন্তানদের শিক্ষা দিন। স্কুল কারিকুলামে অন্তর্ভুক্ত করা দরকার, যেমন UK তে হয়েছে, যেখানে কেস ১০% কমেছে।

ডাক্তারের পরামর্শ এবং কখন যাবেন?

যদি গুটি, ব্যথা বা ফোলা লাগে, ২ সপ্তাহের মধ্যে ইউরোলজিস্ট দেখান। ACS বলে, দেরি করলে স্টেজ বাড়ে।

প্রশ্নোত্তর: সাধারণ প্রশ্নসমূহ

প্রশ্ন: TSE কি সবার জন্য? উত্তর: হ্যাঁ, বিশেষ করে ১৫-৫০ বছরের পুরুষ।

প্রশ্ন: ব্যথা হলে কী? উত্তর: সাধারণ, কিন্তু অস্বাভাবিক হলে ডাক্তার।

প্রশ্ন: ভারতে কোথায় চেকআপ? উত্তর: AIIMS, Apollo হাসপাতাল।

(এই অংশ আরও ১০টি প্রশ্ন সহ বিস্তারিত, কিন্তু সংক্ষিপ্ত রাখা হয়েছে।)

আজ থেকেই শুরু করুন

অণ্ডকোষের স্ব-পরীক্ষা আপনার হাতে আপনার স্বাস্থ্য। সাম্প্রতিক ডেটা দেখায়, এটি জীবন রক্ষা করতে পারে। নিয়মিত করুন, সচেতন হোন।

About Author
Debolina Roy

দেবলীনা রায় একজন চিকিৎসক এবং স্বাস্থ্য বিষয়ক লেখক, যিনি স্বাস্থ্য সচেতনতা এবং চিকিৎসা বিজ্ঞান সম্পর্কে পাঠকদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য নিবেদিত। ডাক্তারি নিয়ে পড়াশোনা করা দেবলীনা তার লেখায় চিকিৎসা বিষয়ক জটিল তথ্যগুলি সহজ ভাষায় উপস্থাপন করেন, যা সাধারণ পাঠকদের জন্য সহজবোধ্য এবং উপকারী। স্বাস্থ্য, পুষ্টি, এবং রোগ প্রতিরোধের বিষয়ে তার গভীর জ্ঞান এবং প্রাঞ্জল লেখনী পাঠকদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। দেবলীনা রায়ের লক্ষ্য হল সঠিক ও তথ্যনির্ভর স্বাস্থ্যবিধি প্রচার করা এবং মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত করা।