ভারতের রাজনীতির মঞ্চে সম্পত্তির হিসেব এক অদ্ভুত গল্প বলে। কখনো কোটিপতি নেতারা আলোচনায় আসেন, কখনো সাধারণ জীবনযাপনের প্রতীক হয়ে ওঠেন কেউ। আজ আমরা এমনই এক গল্প নিয়ে এসেছি, যেখানে দেশের দরিদ্রতম বিধায়ক এবং ধনীতম বিধায়ক দুজনেই এসেছেন একই দল থেকে—ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। আরও মজার বিষয়, দরিদ্রতম এই নেতা পশ্চিমবঙ্গের, যিনি সর্বসাকুল্যে মাত্র ১৭০০ টাকার সম্পত্তির মালিক। অন্যদিকে ধনীতম বিধায়কের সম্পত্তি ৩৪০০ কোটি টাকারও বেশি! কে এই দুই ব্যক্তি? কীভাবে তাঁরা এই জায়গায় পৌঁছলেন? চলুন, জেনে নিই তাঁদের পরিচয় ও গল্প।
‘অ্যাসোসিয়েশন অফ ডেমোক্র্যাটিক রিফর্মস’ (ADR)-এর সাম্প্রতিক রিপোর্টে ভারতের ২৮টি রাজ্য ও ৩টি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের ৪০৯২ জন বিধায়কের সম্পত্তির বিবরণ প্রকাশিত হয়েছে। এই রিপোর্টে চমকপ্রদ তথ্য উঠে এসেছে—দেশের সবচেয়ে দরিদ্র বিধায়ক হলেন পশ্চিমবঙ্গের বাঁকুড়া জেলার ইন্দাসের বিজেপি বিধায়ক নির্মল ধারা, যাঁর সম্পত্তি মাত্র ১৭০০ টাকা। অন্যদিকে, সবচেয়ে ধনী বিধায়ক হলেন মহারাষ্ট্রের ঘাটকোপার পূর্বের বিজেপি বিধায়ক পরাগ শাহ, যাঁর সম্পত্তির পরিমাণ ৩৪০০ কোটি টাকা। এই দুই ব্যক্তি একই দলের সদস্য হলেও তাঁদের জীবনযাপনের ধরন যেন দুই বিপরীত মেরুতে অবস্থান করছে। এই বৈপরীত্যই আমাদের কৌতূহল জাগায়—কীভাবে এমনটা সম্ভব?
পশ্চিমবঙ্গের বাঁকুড়া জেলার ইন্দাস বিধানসভা কেন্দ্র থেকে ২০২১ সালে বিধায়ক নির্বাচিত হন নির্মল ধারা। তিনি বিজেপির হয়ে তৃণমূল কংগ্রেসের প্রার্থীকে হারিয়ে জয়ী হন। নির্বাচনের আগে মনোনয়ন জমা দেওয়ার সময় প্রার্থীদের যে হলফনামা দিতে হয়, তাতেই উঠে আসে তাঁর সম্পত্তির হিসেব। সেই হলফনামায় নির্মল ধারা জানান, তাঁর কাছে মোট সম্পত্তি হলো মাত্র ১৭০০ টাকা। কোনো জমি, বাড়ি, গাড়ি বা ব্যাঙ্কে জমানো টাকার উল্লেখ নেই। এই তথ্য প্রকাশ্যে আসতেই রাজনৈতিক মহলে শুরু হয় আলোচনা।
নির্মল ধারার জীবনযাপন অত্যন্ত সাধারণ। তিনি গ্রামের একজন সাধারণ মানুষ হিসেবেই পরিচিত। তাঁর এলাকার মানুষ বলেন, তিনি সবসময় সাধারণ জীবনযাপন করেন এবং স্থানীয় সমস্যা নিয়ে কথা বলেন। তাঁর এই সরলতা এবং জনগণের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগই তাঁকে বিধায়কের আসনে বসিয়েছে। তবে অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন, এত কম সম্পত্তি নিয়ে তিনি কীভাবে জীবন চালান? এর উত্তরে নির্মল ধারার ঘনিষ্ঠরা জানান, তিনি কৃষিকাজের সঙ্গে যুক্ত এবং পরিবারের সঙ্গে মিলে সংসার চালান। তাঁর জীবনযাপনই প্রমাণ করে যে রাজনীতিতে সম্পদই সব নয়, জনগণের ভালোবাসাও অনেক কিছু জয় করে দিতে পারে।
অন্যদিকে, মহারাষ্ট্রের ঘাটকোপার পূর্বের বিধায়ক পরাগ শাহ একেবারে ভিন্ন জগতের মানুষ। তিনি ২০১৯ সালে বিজেপির টিকিটে বিধায়ক নির্বাচিত হন। ADR-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, তাঁর সম্পত্তির পরিমাণ ৩৪০০ কোটি টাকা। তিনি ‘ম্যান ইনফ্রাকনস্ট্রাকশন লিমিটেড’ নামে একটি সংস্থার মালিক, যা রিয়েল এস্টেট এবং নির্মাণ ক্ষেত্রে ব্যবসা করে। তাঁর সম্পত্তির মধ্যে রয়েছে বিলাসবহুল বাড়ি, জমি, এবং বিভিন্ন ব্যবসায়িক সম্পদ। আশ্চর্যের বিষয়, গত দুই বছরে তাঁর সম্পত্তি প্রায় সাত গুণ বেড়েছে, যা তাঁর ব্যবসায়িক সাফল্যের প্রমাণ।
পরাগ শাহের জীবনযাত্রা বিলাসবহুল। তিনি মহারাষ্ট্রের একজন প্রভাবশালী ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিত ছিলেন, তারপর রাজনীতিতে এসে আরও আলোচনায় এসেছেন। তাঁর এলাকার মানুষ বলেন, তিনি উন্নয়নের জন্য অনেক কাজ করেছেন, যার মধ্যে রয়েছে রাস্তাঘাট ও অবকাঠামোর উন্নতি। তবে তাঁর বিপুল সম্পত্তি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে—এত সম্পদ কীভাবে এত দ্রুত বাড়ল? এর উত্তরে তাঁর সমর্থকরা বলেন, তিনি একজন সফল ব্যবসায়ী এবং তাঁর ব্যবসার প্রসারই এর কারণ।
নির্মল ধারা এবং পরাগ শাহ—দুজনেই বিজেপির সদস্য, কিন্তু তাঁদের জীবনের গল্প একেবারে আলাদা। নির্মল ধারার সম্পত্তি যেখানে ১৭০০ টাকা, সেখানে পরাগ শাহের সম্পত্তি ৩৪০০ কোটি টাকা। এই বিপুল পার্থক্যই প্রমাণ করে যে রাজনীতিতে সবাই একই পথে হাঁটেন না। ADR-এর রিপোর্টে আরও দেখা গেছে, ভারতের বিধায়কদের গড় সম্পত্তি অনেক বেশি, কিন্তু নির্মল ধারার মতো ব্যতিক্রমও আছে। অন্যদিকে, পরাগ শাহের মতো ধনী বিধায়করাও রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করছেন।
রাজনীতিতে সম্পত্তি একটি বড় বিষয়। অনেকে মনে করেন, বেশি টাকা থাকলে ভোটে জেতা সহজ হয়। কিন্তু নির্মল ধারার উদাহরণে দেখা যায়, জনগণের সমর্থন থাকলে টাকা ছাড়াও জয় সম্ভব। আবার পরাগ শাহ প্রমাণ করেন, ব্যবসায়িক সাফল্য এবং সম্পদও রাজনীতিতে সাফল্য এনে দিতে পারে। এই দুই ব্যক্তির গল্প থেকে আমরা বুঝতে পারি, রাজনীতি একটি বৈচিত্র্যময় ক্ষেত্র, যেখানে সব ধরনের মানুষের জায়গা আছে।
নির্মল ধারার সরল জীবন মানুষের মনে আশা জাগায়। তিনি যেন সেই পুরনো দিনের নেতাদের কথা মনে করিয়ে দেন, যাঁরা জনগণের জন্য কাজ করতেন। অন্যদিকে, পরাগ শাহের গল্প আমাদের দেখায়, আধুনিক রাজনীতিতে ব্যবসা এবং টাকার প্রভাবও কম নয়। এই দুই চরিত্র জনগণের কাছে দুটি ভিন্ন ছবি তুলে ধরে—একজন সাধারণ মানুষের প্রতিনিধি, আরেকজন শক্তিশালী ব্যবসায়ী।
নির্মল ধারা এবং পরাগ শাহ—দুজনেই বিজেপির সদস্য, কিন্তু তাঁদের জীবনের গল্প দুটি ভিন্ন পৃথিবীর ছবি এঁকে দেয়। নির্মল ধারা আমাদের দেখান, সৎ ও সাধারণ জীবন দিয়েও রাজনীতিতে জায়গা করে নেওয়া যায়। অন্যদিকে, পরাগ শাহ প্রমাণ করেন, সম্পদ ও ব্যবসায়িক দক্ষতাও রাজনীতিতে সাফল্যের চাবিকাঠি হতে পারে। এই দুই বিধায়কের গল্প থেকে আমরা শিখতে পারি যে, রাজনীতি শুধু টাকার খেলা নয়, এখানে মানুষের ভালোবাসা এবং কাজের প্রতি নিষ্ঠাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
আপনি কী মনে করেন? দরিদ্রতম বিধায়ক নির্মল ধারার সরলতা না পরাগ শাহের বিলাসিতা—কোনটি রাজনীতির আসল ছবি? আপনার মতামত জানান এবং এই গল্পটি শেয়ার করুন আপনার বন্ধুদের সঙ্গে।