বাংলাদেশের বাজারে যখনই কোনো স্টাইলিশ, নির্ভরযোগ্য এবং জ্বালানি সাশ্রয়ী কমপ্যাক্ট SUV-এর কথা আসে, তখন টয়োটা সি-এইচআর (Toyota C-HR) নামটি তালিকার প্রায় প্রথমেই থাকে। এর প্রধান কারণ হলো এর ব্যতিক্রমী ডিজাইন, টয়োটার পরীক্ষিত হাইব্রিড প্রযুক্তি এবং দুর্দান্ত রিসেল ভ্যালু। তবে, এই গাড়িটি কেনার আগে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি হলো এর দাম। বাংলাদেশে টয়োটা সি-এইচআর এর কোনো নির্দিষ্ট “ফিক্সড” মূল্য নেই, কারণ বাজারটি মূলত রিকন্ডিশনড গাড়ির উপর নির্ভরশীল। মডেল ইয়ার, প্যাকেজ, অকশন গ্রেড এবং মাইলেজের উপর ভিত্তি করে এর দাম ২৫ লক্ষ টাকা থেকে শুরু করে ৫০ লক্ষ টাকা বা তারও বেশি হতে পারে। এই আর্টিকেলে আমরা বাংলাদেশে টয়োটা সি-এইচআর এর দামের প্রতিটি দিক, কেন দামের এত পার্থক্য হয়, এবং আপনার বাজেট অনুযায়ী সেরা মডেল কোনটি হতে পারে, তার একটি বিশ্লেষণ তুলে ধরবো।
Toyota C-HR: কেন এটি বাংলাদেশের বাজারে এত সফল?
টয়োটা সি-এইচআর (C-HR), যার পূর্ণরূপ “Coupe High Rider”, প্রথম যখন বিশ্ববাজারে আসে, তখন এর ডিজাইন একটি বড় চমক ছিল। এটি সাধারণ SUV-এর মতো বক্সি না হয়ে, একটি স্পোর্টস কুপের (Sports Coupe) মতো স্লিক ডিজাইন এবং একটি SUV-এর মতো উঁচু গ্রাউন্ড ক্লিয়ারেন্সের সমন্বয়। বাংলাদেশের তরুণ ক্রেতা এবং পরিবারগুলোর কাছে এর আকর্ষণীয় চেহারাই এর জনপ্রিয়তার অন্যতম প্রধান কারণ।
এর বাইরেও কিছু বাস্তবসম্মত কারণ রয়েছে:
- হাইব্রিড প্রযুক্তি: বাংলাদেশের মতো দেশে যেখানে জ্বালানি তেলের দাম একটি বড় চিন্তার বিষয়, সেখানে টয়োটার হাইব্রিড সিস্টেম একটি আশীর্বাদ। সি-এইচআর এর ১.৮ লিটার হাইব্রিড ইঞ্জিনটি শহরে গড়ে প্রতি লিটারে ২০-২২ কিলোমিটার (বাস্তব পরিস্থিতিতে) মাইলেজ প্রদান করে, যা এই সেগমেন্টে প্রায় অপ্রতিদ্বন্দ্বী।
- টয়োটা ব্র্যান্ড ভ্যালু: “টয়োটা” নামটিই বাংলাদেশে নির্ভরযোগ্যতা এবং দীর্ঘস্থায়ী পারফরম্যান্সের প্রতীক। মানুষ জানে যে একটি টয়োটা কিনলে বছরের পর বছর নিশ্চিন্তে ব্যবহার করা যায়।
- পার্টসের সহজলভ্যতা: যদিও এটি একটি জাপানিজ মডেল, বাংলাদেশের প্রায় সব জায়গায় এর পার্টস এবং সার্ভিসিং সুবিধা পাওয়া যায়। টয়োটা বাংলাদেশ (নাভানা লিমিটেড) এর অফিসিয়াল সার্ভিস সেন্টার ছাড়াও অসংখ্য গ্যারেজ এই গাড়ি সার্ভিসিং-এ পারদর্শী।
- উচ্চ রিসেল ভ্যালু: অন্যান্য অনেক ব্র্যান্ডের গাড়ির তুলনায় টয়োটা সি-এইচআর ব্যবহারের পরও অনেক ভালো দামে বিক্রি করা যায়। ক্রেতারা একে একটি নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে দেখেন।
ভারতের সেরা ৫টি হাইব্রিড স্কুটার ২০২৫ – পরিবেশবান্ধব যাত্রার নতুন দিগন্ত
বাংলাদেশে Toyota C-HR এর রিয়েল-টাইম দাম (অক্টোবর ২০২৫ আপডেট)
যেমনটি আগেই বলা হয়েছে, বাংলাদেশের বাজারে ৯৯% টয়োটা সি-এইচআর হলো রিকন্ডিশনড বা “ব্যবহৃত” যা সরাসরি জাপান থেকে আমদানি করা হয়। “ব্র্যান্ড নিউ” সি-এইচআর বলতে সাধারণত “শূন্য মাইলেজ” বা “আনরেজিস্টার্ড” রিকন্ডিশনড গাড়িকেই বোঝানো হয়। অফিসিয়ালি নাভানা লিমিটেড এই মডেলটি আমদানি করে না, তাই সম্পূর্ণ বাজারটি আমদানিকারক এবং শোরুমগুলোর উপর নির্ভরশীল।
রিকন্ডিশনড টয়োটা সি-এইচআর এর মূল্য তালিকা (মডেল ইয়ার এবং প্যাকেজ অনুযায়ী)
এখানে একটি আনুমানিক মূল্য তালিকা দেওয়া হলো যা বিভিন্ন অনলাইন মার্কেটপ্লেস যেমন Bikroy.com এবং BDStall এর বর্তমান তালিকা এবং বাজার প্রবণতার উপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছে। মনে রাখবেন, গাড়ির কন্ডিশন, রঙ এবং অকশন গ্রেডের উপর ভিত্তি করে দামের ±২-৩ লক্ষ টাকা তারতম্য হতে পারে।
| মডেল ইয়ার | প্যাকেজ (Trim) | ইঞ্জিন | আনুমানিক দাম (বাংলাদেশী টাকায়) |
| ২০১৭ | S / S LED Package | ১.৮ লি. হাইব্রিড | ৳২৫.৫০ লক্ষ – ৳২৮.৫০ লক্ষ |
| ২০১৭ | G / G LED Package | ১.৮ লি. হাইব্রিড | ৳২৮.০০ লক্ষ – ৳৩০.৫০ লক্ষ |
| ২০১৮ | S / S LED Package | ১.৮ লি. হাইব্রিড | ৳২৮.৫০ লক্ষ – ৳৩১.০০ লক্ষ |
| ২০১৮ | G / G LED Package | ১.৮ লি. হাইব্রিড | ৳৩০.৫০ লক্ষ – ৳৩৩.৫০ লক্ষ |
| ২০১৯ | S LED Package | ১.৮ লি. হাইব্রিড | ৳৩১.৫০ লক্ষ – ৳৩৩.৫০ লক্ষ |
| ২০১৯ | G / G LED Package | ১.৮ লি. হাইব্রিড | ৳৩৩.৫০ লক্ষ – ৳৩৬.০০ লক্ষ |
| ২০১৯ | G Mode Nero (Special Edition) | ১.৮ লি. হাইব্রিড | ৳৩৫.০০ লক্ষ – ৳৩৭.৫০ লক্ষ |
| ২০২০ | G Package / G LED | ১.৮ লি. হাইব্রিড | ৳৩৭.০০ লক্ষ – ৳৩৯.৫০ লক্ষ |
| ২০২০ | G Mode Nero Safety Plus | ১.৮ লি. হাইব্রিড | ৳৩৮.৫০ লক্ষ – ৳৪১.০০ লক্ষ |
| ২০২০ | S GR Sport | ১.৮ লি. হাইব্রিড | ৳৩৯.০০ লক্ষ – ৳৪২.০০ লক্ষ |
| ২০২১ | G Mode Nero Safety Plus | ১.৮ লি. হাইব্রিড | ৳৪৩.০০ লক্ষ – ৳৪৫.৫০ লক্ষ |
| ২০২১ | S GR Sport | ১.৮ লি. হাইব্রিড | ৳৪৪.০০ লক্ষ – ৳৪৬.০০ লক্ষ |
| ২০২২ | (বিভিন্ন হাই-গ্রেড মডেল) | ১.৮ লি. হাইব্রিড | ৳৪৬.০০ লক্ষ – ৳৫০.০০ লক্ষ+ |
| ২০১৮ | S-T / G-T (Non-Hybrid) | ১.২ লি. টার্বো | ৳৩০.০০ লক্ষ – ৳৩৫.০০ লক্ষ |
দ্রষ্টব্য: এই দামগুলো রিকন্ডিশনড গাড়ির জন্য প্রযোজ্য এবং রেজিস্ট্রেশন খরচ বাদে।(অক্টোবর ২০২৫)।
নতুন (আনরেজিস্টার্ড) সি-এইচআর এর দাম
যখন কোনো আমদানিকারক একটি “ব্র্যান্ড নিউ” বা “জিরো মাইলেজ” সি-এইচআর জাপান থেকে আমদানি করেন (যা সাধারণত সেই বছরের বা পূর্ববর্তী বছরের মডেল হয়), তখন তাকে “ব্র্যান্ড নিউ রিকন্ডিশনড” বলা হয়। একটি ২০২২ বা ২০২৩ মডেলের ব্র্যান্ড নিউ (০ মাইলেজ, গ্রেড ৫ বা ৬) টয়োটা সি-এইচআর জি প্যাকেজের দাম বাংলাদেশে ৳৫০ লক্ষ থেকে ৳৫৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত হতে পারে।
কেন সি-এইচআর এর দামের এত পার্থক্য? মূল কারণগুলো
একই মডেল ইয়ারের দুটি সি-এইচআর এর দামের মধ্যে ৫-৭ লক্ষ টাকার পার্থক্যও হতে পারে। এর পেছনে কিছু সুনির্দিষ্ট কারণ রয়েছে, যা প্রতিটি ক্রেতার জানা আবশ্যক।
১. অকশন গ্রেড (Auction Grade)
রিকন্ডিশনড গাড়ি কেনার ক্ষেত্রে এটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। জাপানে প্রতিটি ব্যবহৃত গাড়ি নিলামে তোলার আগে একটি বিস্তারিত পরিদর্শন রিপোর্ট (Auction Sheet) তৈরি করা হয়। এই রিপোর্টে গাড়ির সামগ্রিক অবস্থার উপর ভিত্তি করে একটি গ্রেড দেওয়া হয়।
- গ্রেড ৫, ৬, বা S: প্রায় নতুন বা সম্পূর্ণ নতুন (০ মাইলেজ) গাড়ি। এগুলোর দাম সর্বোচ্চ থাকে।
- গ্রেড ৪.৫: খুবই ভালো কন্ডিশন, খুব সামান্য দাগ থাকতে পারে, কম মাইলেজ। বাংলাদেশের বাজারে এটিই সেরা পছন্দ হিসেবে বিবেচিত।
- গ্রেড ৪: ভালো কন্ডিশন, কিছু ছোটখাটো দাগ বা মেরামত থাকতে পারে, মাঝারি মাইলেজ।
- গ্রেড ৩.৫ বা ৩: মাঝারি কন্ডিশন, দৃশ্যমান দাগ বা রিপেয়ারের কাজ থাকতে পারে।
- গ্রেড R বা RA: এই গাড়িগুলো দুর্ঘটনায় পতিত হয়েছিল এবং পরে মেরামত করা হয়েছে। অনেক অসাধু বিক্রেতা এই গাড়িগুলো “গ্রেড ৪” বা “৪.৫” বলে বিক্রি করার চেষ্টা করে। গ্রেড R গাড়ির দাম স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক কম হয়।
পরামর্শ: গাড়ি কেনার আগে অবশ্যই বিক্রেতার কাছ থেকে আসল অকশন শিট চেয়ে নিন এবং সেটি যাচাই (Verify) করে নিন।
২. প্যাকেজ এবং ট্রিম লেভেল (S vs. G vs. GR Sport)
সি-এইচআর এর বিভিন্ন প্যাকেজ বা ট্রিমে সুযোগ-সুবিধার অনেক পার্থক্য থাকে, যা সরাসরি দামকে প্রভাবিত করে।
- S এবং S LED: এটি বেস বা এন্ট্রি-লেভেল প্যাকেজ। এতে সাধারণত ফ্যাব্রিক সিট, বেসিক হেডলাইট (S) বা এলইডি হেডলাইট (S LED) এবং বেসিক সেফটি ফিচার থাকে।
- G এবং G LED: এটি হাই-এন্ড প্যাকেজ। এতে সাধারণত লেদার বা হাফ-লেদার সিট, প্রিমিয়াম সাউন্ড সিস্টেম, ১৮-ইঞ্চি অ্যালয় রিম, সম্পূর্ণ এলইডি হেডলাইট ও ফগ লাইট, এবং টয়োটা সেফটি সেন্স (TSS) এর মতো অ্যাডভান্সড ড্রাইভার অ্যাসিস্ট্যান্স সিস্টেম (যেমন, লেন কিপিং অ্যাসিস্ট, অ্যাডাপ্টিভ ক্রুজ কন্ট্রোল) থাকে।
- Mode Nero বা GR Sport: এগুলো হলো বিশেষ বা স্পোর্টি সংস্করণ। G প্যাকেজের সকল সুবিধার পাশাপাশি এতে বিশেষ ডিজাইনের বডি কিট, স্পোর্টি সিট, ভিন্ন ডিজাইনের অ্যালয় হুইল এবং কিছু ক্ষেত্রে আপগ্রেডেড সাসপেনশন থাকে। এগুলো দেখতে বেশি আকর্ষণীয় হওয়ায় দামও বেশি হয়।
৩. মাইলেজ (Mileage)
খুবই সহজ হিসাব। যে গাড়ির মাইলেজ (কত কিলোমিটার চলেছে) যত কম, তার ইঞ্জিন এবং অন্যান্য যন্ত্রাংশের আয়ু তত বেশি থাকে। তাই কম মাইলেজের গাড়ির দাম সবসময়ই বেশি হয়। একটি ২০১৭ মডেলের ৫০,০০০ কিমি চলা গাড়ির চেয়ে একই মডেলের ৮০,০০০ কিমি চলা গাড়ির দাম ২-৩ লক্ষ টাকা কম হওয়া স্বাভাবিক।
বাংলাদেশের শুল্ক কাঠামো: সি-এইচআর কেন এত ব্যয়বহুল?
অনেকেই ভাবেন জাপানে যে গাড়ির দাম ১০-১৫ লক্ষ টাকা, সেটি বাংলাদেশে ২৫-৩০ লক্ষ টাকা হয়ে যায় কেন? এর মূল কারণ হলো বাংলাদেশের উচ্চ আমদানি শুল্ক। বাংলাদেশ সরকার গাড়ি আমদানির উপর ইঞ্জিন ক্ষমতা (সিসি) অনুযায়ী বিভিন্ন স্তরে শুল্ক (Supplementary Duty – SD) আরোপ করে।
সি-এইচআর এর দুটি প্রধান ইঞ্জিন অপশন রয়েছে:
১. ১.৮ লিটার বা ১৭৯৭ সিসি হাইব্রিড ইঞ্জিন: এই ইঞ্জিনটি ১৫০১ থেকে ১৮০০ সিসি’র ব্র্যাকেটে পড়ে। হাইব্রিড গাড়ি হওয়ায় এটি নন-হাইব্রিড গাড়ির চেয়ে কিছুটা কম শুল্ক সুবিধা পায়।
২. ১.২ লিটার বা ১১৯৭ সিসি টার্বো (নন-হাইব্রিড) ইঞ্জিন: এই ইঞ্জিনটি ১০০১ থেকে ১৫০০ সিসি’র ব্র্যাকেটে পড়ে।
বাংলাদেশের বর্তমান জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR) এর নীতি অনুযায়ী, হাইব্রিড গাড়িগুলো তাদের ইঞ্জিন সিসির নির্ধারিত শুল্কের চেয়ে কম শুল্ক প্রদান করে (হাইব্রিড টেকনোলজিকে উৎসাহিত করার জন্য)। এই শুল্ক সুবিধার কারণেই বাংলাদেশে টয়োটা প্রিয়াস বা সি-এইচআর এর মতো ১৮০০ সিসি হাইব্রিড গাড়িগুলো, অন্যান্য ১৮০০ সিসি নন-হাইব্রিড গাড়ির তুলনায় অনেক কম দামে পাওয়া যায় এবং বেশি জনপ্রিয়। তবে সব মিলিয়ে একটি গাড়ির মোট দামের অর্ধেকেরও বেশি (কখনো কখনো ৬০-৭০%) শুল্ক হিসেবেই প্রদান করতে হয়, যা গাড়ির দামকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
হাইব্রিড (1.8L) বনাম টার্বো (1.2L): কোনটি আপনার জন্য?
যদিও বাংলাদেশের বাজারে ৯৫% সি-এইচআর হাইব্রিড, কিছু ১.২ লিটার টার্বো মডেলও পাওয়া যায়। সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে এই দুটির পার্থক্য বোঝা জরুরি।
টয়োটা সি-এইচআর ১.৮ লিটার হাইব্রিড (1.8L Hybrid)
- ইঞ্জিন: 1.8L 2ZR-FXE (Atkinson Cycle) + ইলেকট্রিক মোটর।
- পারফরম্যান্স: সম্মিলিতভাবে প্রায় ১২২ হর্সপাওয়ার। এটি খুব বেশি শক্তিশালী না হলেও, শহরের ট্র্যাফিকের জন্য যথেষ্ট। ইলেকট্রিক মোটরের কারণে শুরুতে খুব ভালো টর্ক (Torque) পাওয়া যায়।
- মাইলেজ: এর প্রধান শক্তি। শহরে বাস্তব ড্রাইভিং-এ ২০-২২ কিমি/লিটার এবং হাইওয়েতে ২৪-২৬ কিমি/লিটার পর্যন্ত মাইলেজ দেয়।
- নির্ভরযোগ্যতা: টয়োটার এই হাইব্রিড সিস্টেমটি (যা প্রিয়াসেও ব্যবহৃত হয়) বিশ্বের অন্যতম নির্ভরযোগ্য এবং পরীক্ষিত হাইব্রিড সিস্টেম।
- কাদের জন্য: যারা মূলত শহরের মধ্যে বেশি গাড়ি চালান, জ্বালানি সাশ্রয় যাদের কাছে প্রধান বিবেচ্য বিষয় এবং যারা একটি মসৃণ ও শব্দহীন ড্রাইভিং অভিজ্ঞতা চান, তাদের জন্য হাইব্রিড মডেলটি সেরা।
টয়োটা সি-এইচআর ১.২ লিটার টার্বো (1.2L Turbo)
- ইঞ্জিন: 1.2L 8NR-FTS টার্বোচার্জড।
- পারফরম্যান্স: প্রায় ১১৫ হর্সপাওয়ার, কিন্তু এর টর্ক হাইব্রিডের চেয়ে ভালো এবং এটি চালাতে বেশ মজাদার (Peppy) ও রেসপন্সিভ।
- মাইলেজ: এটি একটি নন-হাইব্রিড টার্বো ইঞ্জিন। এটি হাইব্রিডের মতো সাশ্রয়ী নয়। শহরে ১০-১২ কিমি/লিটার এবং হাইওয়েতে ১৪-১৫ কিমি/লিটার মাইলেজ আশা করা যায়।
- নির্ভরযোগ্যতা: ইঞ্জিনটি নির্ভরযোগ্য হলেও টার্বো ইঞ্জিন হওয়ায় এর রক্ষণাবেক্ষণ হাইব্রিডের চেয়ে কিছুটা জটিল এবং এর জন্য উচ্চ মানের ফুয়েল (অকটেন) প্রয়োজন।
- কাদের জন্য: যারা ড্রাইভিং-এ একটু বেশি মজা বা পাঞ্চ (Punch) চান এবং যাদের মাইলেজ নিয়ে খুব বেশি দুশ্চিন্তা নেই, তারা টার্বো মডেলটি দেখতে পারেন।
তুলনামূলক টেবিল: হাইব্রিড বনাম টার্বো
| বৈশিষ্ট্য | ১.৮ লিটার হাইব্রিড | ১.২ লিটার টার্বো (নন-হাইব্রিড) |
| ইঞ্জিন ক্ষমতা | ১৭৯৭ সিসি (+ ইলেকট্রিক মোটর) | ১১৯৭ সিসি |
| গিয়ারবক্স | e-CVT (Automatic) | CVT (Automatic) |
| মাইলেজ (শহর) | ২০-২২ কিমি/লিটার (প্রায়) | ১০-১২ কিমি/লিটার (প্রায়) |
| মাইলেজ (হাইওয়ে) | ২৪-২৬ কিমি/লিটার (প্রায়) | ১৪-১৫ কিমি/লিটার (প্রায়) |
| প্রধান সুবিধা | অবিশ্বাস্য জ্বালানি সাশ্রয়, মসৃণ রাইড | রেসপন্সিভ পারফরম্যান্স, চালাতে মজাদার |
| প্রধান অসুবিধা | পারফরম্যান্স কিছুটা দুর্বল | তুলনামূলক কম মাইলেজ, ভালো অকটেন প্রয়োজন |
মালিকানার খরচ (Running Costs) এবং রক্ষণাবেক্ষণ
একটি সি-এইচআর কেবল কিনলেই হবে না, এটি চালানোর খরচও বিবেচনা করতে হবে।
১. জ্বালানী খরচ (Fuel Cost)
আগেই বলা হয়েছে, হাইব্রিড মডেলটি এক্ষেত্রে অপ্রতিদ্বন্দ্বী। যদি আপনার প্রতিদিনের চলাফেরা বেশি হয়, তবে প্রতি মাসে জ্বালানী বাবদ যে টাকা সাশ্রয় হবে, তা দিয়ে গাড়ির রক্ষণাবেক্ষণের খরচ অনেকটাই উঠে আসবে।
২. রক্ষণাবেক্ষণ ও পার্টস (Maintenance & Parts)
টয়োটা হওয়ার কারণে এর সার্ভিসিং খুবই সহজ। প্রতি ৫,০০০ কিমি পর পর ইঞ্জিন অয়েল, অয়েল ফিল্টার এবং এয়ার ফিল্টার পরিবর্তন করা стандарт রক্ষণাবেক্ষণের অংশ। সেরা হাইব্রিড গাড়িগুলোর মধ্যে সি-এইচআর এর রক্ষণাবেক্ষণ খরচ সবচেয়ে কম।
হাইব্রিড ব্যাটারি: অনেকের মনে হাইব্রিড ব্যাটারির আয়ু নিয়ে প্রশ্ন থাকে। টয়োটা সি-এইচআর এ ব্যবহৃত লিথিয়াম-আয়ন বা নিকেল-মেটাল হাইডাইড ব্যাটারিগুলো সাধারণত স্বাভাবিক ব্যবহারে ৮-১০ বছর বা ১,৫০,০০০ থেকে ২,০০,০০০ কিলোমিটার পর্যন্ত স্থায়ী হয়। এরপর ব্যাটারি পরিবর্তন করতে হলেও বর্তমানে বাংলাদেশে রিকন্ডিশনড এবং নতুন (অফিসিয়াল) ব্যাটারি পাওয়া যায়, যার খরচ ৪-৫ লক্ষ টাকা হতে পারে। তাই গাড়ি কেনার সময় ব্যাটারি হেলথ (Battery Health) চেক করে নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।
সি-এইচআর এর প্রধান প্রতিযোগী কারা?
সি-এইচআর কেনার আগে এর প্রতিযোগীদের সম্পর্কেও ধারণা রাখা ভালো। বাংলাদেশের গাড়ির বাজার বেশ বৈচিত্র্যময়।
- ১. হোন্ডা ভেজেল (Honda Vezel / HR-V):এটি সি-এইচআর এর সরাসরি এবং প্রধান প্রতিযোগী। ভেজেলও একটি হাইব্রিড কমপ্যাক্ট SUV। সি-এইচআর এর চেয়ে ভেজেলের ভেতরের স্পেস, বিশেষ করে পেছনের সিট এবং বুট স্পেস কিছুটা বেশি। তবে ডিজাইনের দিক থেকে সি-এইচআর বেশি আকর্ষণীয়। হোন্ডা ভেজেলের দাম এবং সি-এইচআর এর দাম প্রায় কাছাকাছি।
- ২. নিসান কিকস (Nissan Kicks):এটি আরেকটি জনপ্রিয় কমপ্যাক্ট SUV। এটি হাইব্রিড (e-Power) এবং নন-হাইব্রিড দুই মডেলেই পাওয়া যায়। কিকস এর ডিজাইনও বেশ আকর্ষণীয় এবং ভেতরের স্পেস ভালো।
- ৩. এমজি জেডএস (MG ZS):যারা রিকন্ডিশনড গাড়ির ঝামেলায় না গিয়ে “ব্র্যান্ড নিউ” গাড়ি কিনতে চান, তাদের জন্য এমজি জেডএস একটি দুর্দান্ত বিকল্প। এটি দামে সি-এইচআর এর রিকন্ডিশনড মডেলগুলোর কাছাকাছি এবং ব্র্যান্ড নিউ হওয়ায় ওয়ারেন্টিসহ পাওয়া যায়।
- ৪. টয়োটা করোলা ক্রস (Toyota Corolla Cross):এটি টয়োটার নিজের ঘরেরই প্রতিযোগী। সি-এইচআর এর চেয়ে করোলা ক্রস কিছুটা বড়, বেশি প্র্যাকটিক্যাল (বেশি বুট স্পেস ও রিয়ার সিট স্পেস) এবং এটিও হাইব্রিড ইঞ্জিনে পাওয়া যায়। তবে এর দাম সি-এইচআর এর চেয়ে কিছুটা বেশি।
সি-এইচআর কেনার আগে যে বিষয়গুলো অবশ্যই দেখবেন (Buying Guide)
একটি রিকন্ডিশনড সি-এইচআর কেনা একটি বড় বিনিয়োগ। তাই কিছু বিষয়ে সতর্ক থাকা জরুরি:
১. অকশন শিট যাচাই: যেমনটি আগেই বলা হয়েছে, বিক্রেতার দেওয়া অকশন শিটটি আসল কিনা তা কোনো বিশ্বস্ত সোর্সের মাধ্যমে যাচাই করে নিন। এটি আপনাকে গাড়ির আসল কন্ডিশন এবং মাইলেজ সম্পর্কে নিশ্চিত করবে।
২. হাইব্রিড সিস্টেম চেক: গাড়িটি কেনার আগে একজন অভিজ্ঞ মেকানিক দিয়ে এর হাইব্রিড ব্যাটারি হেলথ এবং ইনভার্টার সিস্টেমটি পরীক্ষা করিয়ে নিন।
৩. টেস্ট ড্রাইভ: অবশ্যই গাড়িটি নিজে চালিয়ে দেখুন। এর ইঞ্জিন সাউন্ড, সাসপেনশন, গিয়ার শিফটিং (CVT) এবং ব্রেকিং সিস্টেম ঠিক আছে কিনা তা পরীক্ষা করুন।
৪. কাগজপত্র যাচাই: গাড়িটির রেজিস্ট্রেশন পেপারস, ফিটনেস, ট্যাক্স টোকেন—সবকিছু আপ-টু-ডেট আছে কিনা তা বিআরটিএ (BRTA) থেকে যাচাই করে নিন।
আপনার কি সি-এইচআর কেনা উচিত?
টয়োটা সি-এইচআর নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের বাজারের অন্যতম সেরা কমপ্যাক্ট SUV। এর আকর্ষণীয় ডিজাইন, অবিশ্বাস্য জ্বালানি সাশ্রয় এবং টয়োটার নির্ভরযোগ্যতা একে একটি পরিপূর্ণ প্যাকেজ করে তুলেছে।
তবে এর কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। এর পেছনের সিটের লেগ-রুম এবং হেড-রুম কিছুটা কম (বিশেষ করে লম্বা মানুষের জন্য) এবং এর বুট স্পেসও সেগমেন্টের অন্যান্য গাড়ির (যেমন ভেজেল বা করোলা ক্রস) তুলনায় কম।
যদি আপনার পরিবার ছোট হয় (২-৪ জন), আপনি মূলত শহরের মধ্যেই বেশি ড্রাইভ করেন, আপনার কাছে স্টাইল এবং মাইলেজ প্রধান বিবেচ্য বিষয় হয়, এবং আপনি এমন একটি গাড়ি চান যা বছরের পর বছর ব্যবহারেও ভালো রিসেল ভ্যালু দেবে—তবে টয়োটা সি-এইচআর আপনার জন্য একটি আদর্শ পছন্দ হতে পারে। ২৫ লক্ষ থেকে ৫০ লক্ষ টাকার বাজেটে, বিভিন্ন মডেল ইয়ার এবং প্যাকেজের মধ্যে আপনি অবশ্যই আপনার পছন্দের সি-এইচআর খুঁজে পাবেন।
FZ-S Fi Hybrid: ভারতের প্রথম ১৫০ সিসি হাইব্রিড বাইকের দুর্দান্ত স্পেসিফিকেশন ও দাম জানুন!
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQs):
প্রশ্ন: টয়োটা সি-এইচআর এর এস (S) এবং জি (G) প্যাকেজের মধ্যে মূল পার্থক্য কী?
উত্তর: মূল পার্থক্যগুলো হলো সিটের ধরণ (G-তে হাফ-লেদার বা ফুল-লেদার, S-এ ফ্যাব্রিক), হেডলাইট (G-তে ফুল এলইডি প্রজেক্টর, S-এ হ্যালোজেন বা বেসিক এলইডি), অ্যালয় হুইলের ডিজাইন ও সাইজ (G-তে ১৮-ইঞ্চি, S-এ ১৭-ইঞ্চি), এবং সেফটি ফিচারস (G-তে সাধারণত টয়োটা সেফটি সেন্স থাকে)।
প্রশ্ন: সি-এইচআর হাইব্রিড এর বাস্তব মাইলেজ কত?
উত্তর: ড্রাইভিং স্টাইল এবং রাস্তার অবস্থার উপর নির্ভর করে। তবে সাধারণত ঢাকা শহরের ট্র্যাফিকের মধ্যে প্রতি লিটারে ১৮-২২ কিমি এবং হাইওয়েতে প্রতি লিটারে ২৪-২৬ কিমি মাইলেজ পাওয়া যায়।
প্রশ্ন: সি-এইচআর এর হাইব্রিড ব্যাটারির দাম কত?
উত্তর: টয়োটা সি-এইচআর এর হাইব্রিড ব্যাটারি প্যাক পরিবর্তন করতে ব্র্যান্ড নিউ হলে প্রায় ৪-৫ লক্ষ টাকা এবং রিকন্ডিশনড (জাপানি) হলে ২-৩ লক্ষ টাকা খরচ হতে পারে। তবে এগুলো সাধারণত ৮-১০ বছর স্থায়ী হয়।
প্রশ্ন: বাংলাদেশে সি-এইচআর এর ১.২ লিটার টার্বো মডেলটি কেমন?
উত্তর: এটি একটি ভালো পারফরম্যান্স-ভিত্তিক ইঞ্জিন, তবে এটি হাইব্রিড মডেলের মতো জ্বালানি সাশ্রয়ী নয়। এর মাইলেজ প্রতি লিটারে ১০-১৪ কিমি। বাংলাদেশে এই মডেলটি তুলনামূলকভাবে কম জনপ্রিয়।











