মুক্তিযুদ্ধের ছেঁড়া পাতা: আশীষগুপ্ত, রাহুল ভাই ও চাঁপাবালার মতো লক্ষ লক্ষ বিস্মৃত নায়কের খোঁজে

বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম কেবল নয় মাসের একটি যুদ্ধ ছিল না; এটি ছিল একটি জাতির আত্মপরিচয় খোঁজার রক্তাক্ত মহাকাব্য। ১৯৭১ সালের এই মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লক্ষ শহীদের আত্মত্যাগ এবং লক্ষ লক্ষ মানুষের…

Chanchal Sen

 

বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম কেবল নয় মাসের একটি যুদ্ধ ছিল না; এটি ছিল একটি জাতির আত্মপরিচয় খোঁজার রক্তাক্ত মহাকাব্য। ১৯৭১ সালের এই মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লক্ষ শহীদের আত্মত্যাগ এবং লক্ষ লক্ষ মানুষের অকল্পনীয় বীরত্বের কথা আমরা জানি। কিন্তু ইতিহাসের এই সুবিশাল ক্যানভাসে এমন অসংখ্য নাম রয়েছে, যারা পাদপ্রদীপের আলোয় আসেননি। আশীষগুপ্ত, ‘রাহুল ভাই’ বা চাঁপাবালার মতো নামগুলি সেই বিস্মৃত ইতিহাসের নীরব সাক্ষী। এঁরা কোনো জেনারেল ছিলেন না, হয়তো কোনো খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাও নন; এঁরা ছিলেন সেই সাধারণ মানুষ—ছাত্র, কৃষক, শ্রমিক, সীমান্তপারের বন্ধু বা গ্রাম্য বধূ—যাদের সম্মিলিত আত্মত্যাগের ভিত্তির ওপর আজ একটি স্বাধীন রাষ্ট্র দাঁড়িয়ে আছে। এই নিবন্ধের উদ্দেশ্য হলো, ইতিহাসের সেই ছেঁড়া পাতাগুলি উল্টে দেখা এবং এই নামহীন নায়কদের অবদানকে স্মরণ করা, যা আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের পূর্ণাঙ্গ আখ্যান বোঝার জন্য অপরিহার্য।

মুক্তিযুদ্ধের সুবিশাল প্রেক্ষাপট: বিস্মৃতির সূচনা

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ ছিল বিংশ শতাব্দীর অন্যতম ভয়াবহ একটি মানবিক বিপর্যয় ও গৌরবময় জনযুদ্ধ। এর ব্যাপ্তি ছিল অপরিমেয়। ২৫শে মার্চের কালরাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর অপারেশন সার্চলাইট (Operation Searchlight) নামক গণহত্যার মধ্য দিয়ে যে বর্বরতার সূচনা হয়, তার পরবর্তী নয় মাসে প্রায় ৩০ লক্ষ বাঙালিকে হত্যা করা হয় এবং দুই থেকে চার লক্ষ নারী পরিকল্পিতভাবে নির্যাতিত হন। জাতিসংঘের একটি প্রতিবেদন (UN Report) অনুযায়ী, এই  সময়ের মধ্যে এত ব্যাপক হত্যাকাণ্ড ও নির্যাতন সমসাময়িক ইতিহাসে বিরল। এই প্রলয়ের মুখে প্রায় ১ কোটি মানুষ শরণার্থী হিসেবে প্রতিবেশী দেশ ভারতে আশ্রয় নেয়, যা UNHCR (জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থা)-এর মতে তৎকালীন বিশ্বের বৃহত্তম শরণার্থী সংকট তৈরি করেছিল।

এই বিশাল ক্যানভাসে যখন ইতিহাস লেখা হয়, তখন স্বাভাবিকভাবেই মূল আখ্যানে চলে আসেন প্রধান রাজনৈতিক নেতারা, সামরিক কমান্ডাররা (যেমন সেক্টর কমান্ডারগণ) এবং প্রতিষ্ঠিত বীরেরা। কিন্তু যুদ্ধ কেবল সেনাপতিরা করেননি; যুদ্ধ করেছিল সমগ্র জনপদ। এই জনযুদ্ধের প্রতিটি স্তরে ছিলেন অগণিত মানুষ, যাদের নাম কোনো সরকারি নথিতে ওঠেনি, যুদ্ধের পর যাদের কথা কেউ জানতে চায়নি।

কেন এই বিস্মৃতি?

ইতিহাস রচনার একটি সাধারণ প্রবণতা হলো ‘বৃহৎ আখ্যান’ (Grand Narrative)-এর প্রতি মনোযোগ দেওয়া। একটি নতুন জাতির জন্মের ইতিহাসে, স্থপতিদের এবং সামরিক বিজয়গুলিকে প্রাধান্য দেওয়া হয়। এর ফলে, যুদ্ধের যে অগণিত ‘ছোট ছোট’ কিন্তু অপরিহার্য অংশগুলি ছিল, সেগুলি আড়ালে চলে যায়।

  1. নথিপত্রের অভাব: মুক্তিযুদ্ধ ছিল একটি চরম বিশৃঙ্খল ও আকস্মিক জনযুদ্ধ। বিশেষ করে প্রাথমিক প্রতিরোধ এবং গ্রামীণ গেরিলা যুদ্ধের কোনো কেন্দ্রীয় নথিভুক্তিকরণ ব্যবস্থা ছিল না। বহু মুক্তিযোদ্ধা যুদ্ধক্ষেত্রেই শহীদ হয়েছেন, তাদের সহযোদ্ধারাও হয়তো পরবর্তী সময়ে মারা গেছেন। ফলে তাদের বীরত্বের কথা বলার মতো কেউ অবশিষ্ট থাকেনি।
  2. সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট: যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা, পুনর্গঠনের চ্যালেঞ্জ এবং পরবর্তীকালে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ইতিহাসের নিরপেক্ষ চর্চাকে ব্যাহত করেছে। অনেক সময়, নির্দিষ্ট রাজনৈতিক মতাদর্শের বাইরের যোদ্ধাদের অবদানকে ইচ্ছাকৃতভাবে উপেক্ষা করা হয়েছে বা ছোট করে দেখা হয়েছে।
  3. সামাজিক ট্যাবু: বিশেষত নারী যোদ্ধাদের ক্ষেত্রে, সামাজিক রক্ষণশীলতা একটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক নারী যারা সরাসরি যুদ্ধ করেছেন বা পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে নির্যাতিত হয়েছেন, তারা সামাজিক লোকলজ্জার ভয়ে নিজেদের অভিজ্ঞতা আড়াল করে রেখেছেন।

আশীষগুপ্ত, রাহুল ভাই বা চাঁপাবালা—এই নামগুলি সেই বিস্মৃত অধ্যায়েরই প্রতীক। তারা নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তি হতে পারেন, অথবা হতে পারেন লক্ষ লক্ষ নামহীন যোদ্ধার প্রতিনিধি।

আশীষগুপ্ত: সীমান্তের ওপারের সেই বিস্মৃত বন্ধু

মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে ভারতের অবদান কেবল সামরিক হস্তক্ষেপ বা শরণার্থীদের আশ্রয়দানের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। ১৯৭১ সালে পূর্ব পাকিস্তান থেকে প্রায় এক কোটি শরণার্থী যখন ভারতে প্রবেশ করে, তখন ভারত সরকার ও তার জনগণের ওপর এক অভাবনীয় চাপ সৃষ্টি হয়। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের (Ministry of External Affairs, India) নথি অনুযায়ী, এই শরণার্থীদের আশ্রয়, খাদ্য ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করা ছিল এক বিশাল কর্মযজ্ঞ। এই যজ্ঞে ভারত সরকারের পাশাপাশি অসংখ্য সাধারণ ভারতীয় নাগরিক নিঃস্বার্থভাবে এগিয়ে এসেছিলেন।

‘আশীষগুপ্ত’ নামটি সেই লক্ষ লক্ষ ভারতীয় নাগরিকের প্রতীক, যারা ধর্ম, বর্ণ বা জাতীয়তার ঊর্ধ্বে উঠে মানবিকতাকে সর্বোচ্চ স্থান দিয়েছিলেন।

সাধারণ মানুষের অসাধারণ ভূমিকা

পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা, আসাম ও মেঘালয়ের সীমান্তবর্তী গ্রামগুলির সাধারণ মানুষ প্রথম এই শরণার্থীদের ঢেউ প্রত্যক্ষ করেন। তাদের অনেকেই নিজেদের সামান্য সঞ্চয়, ঘরের খাবার এবং থাকার জায়গা ভাগ করে নিয়েছিলেন বাংলাদেশি ভাই-বোনদের সাথে।

  • স্বেচ্ছাসেবক ও ছাত্রসমাজ: কলকাতা, দিল্লি এবং ভারতের অন্যান্য শহরের ছাত্র-ছাত্রীরা শরণার্থী শিবিরগুলোতে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে দিনরাত কাজ করেছেন। তারা খাবার বিতরণ, চিকিৎসা সহায়তা এবং শিশুদের জন্য অস্থায়ী স্কুল পরিচালনায় অংশ নেন। কলকাতার কলেজ স্ট্রিট কফি হাউসে বা যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের করিডোরে চলত শরণার্থীদের জন্য অর্থ ও রক্ত সংগ্রহের নিরন্তর প্রচেষ্টা। ‘আশীষগুপ্ত’ হতে পারতেন সেই ছাত্রনেতা, যিনি নিজের পড়াশোনা ছেড়ে শরণার্থী শিবিরে একটি মেডিকেল ক্যাম্প পরিচালনা করেছিলেন।
  • চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী: শরণার্থী শিবিরগুলোতে কলেরা, আমাশয় ও নানা সংক্রামক ব্যাধি মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়েছিল। ভারতীয় চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা নিজেদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে লক্ষ লক্ষ মানুষের চিকিৎসা করেছেন। বহু তরুণ ডাক্তার, যেমন ‘আশীষগুপ্ত’ নামের কেউ, হয়তো পশ্চিমবঙ্গের কোনো এক প্রত্যন্ত সীমান্তবর্তী হাসপাতালে টানা ৭২ ঘণ্টাও ডিউটি করেছেন।
  • বুদ্ধিজীবী ও শিল্পীরা: ভারতের শিল্পী, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবীরা বাংলাদেশের পক্ষে বিশ্বজনমত তৈরিতে এক ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছিলেন। পণ্ডিত রবিশঙ্করের ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’ (Concert for Bangladesh)-এর কথা আমরা জানলেও, এমন হাজারো ‘আশীষগুপ্ত’ ছিলেন যারা হয়তো ছোট ছোট পত্রিকা সম্পাদনা করেছেন, গণহত্যার আলোকচিত্র ধারণ করে তা বিশ্বের দরবারে পৌঁছে দিয়েছেন, অথবা মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য গোপনে অর্থ সংগ্রহ করেছেন।

এই মানুষগুলোর অবদান কোনো দেশের সরকারের খাতায় লেখা নেই। তারা কোনো পদক বা স্বীকৃতি পাননি। কিন্তু এই ‘আশীষগুপ্ত’রা না থাকলে, শরণার্থীদের একটা বড় অংশ হয়তো বেঁচে থাকত না, অথবা বিশ্বজনমত এতটা দ্রুত বাংলাদেশের পক্ষে আসত না। তারা ছিলেন সেই নিঃশব্দ বন্ধু, যাদের ঋণ বাংলাদেশের ইতিহাসে অমোচনীয়।

‘রাহুল ভাই’: গেরিলা যুদ্ধের নামহীন সেনানী

মুক্তিযুদ্ধ ছিল একটি ক্লাসিক গেরিলা যুদ্ধের উদাহরণ। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর মতো একটি সুসজ্জিত ও আধুনিক বাহিনীর বিরুদ্ধে এই যুদ্ধ জয়ের প্রধান শক্তি ছিল ‘গণবাহিনী’ বা সাধারণ গেরিলা যোদ্ধারা। বাংলাপিডিয়া (Banglapedia) অনুযায়ী, মুক্তিযোদ্ধাদের দুটি প্রধান ভাগ ছিল: নিয়মিত বাহিনী (সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা) এবং গণবাহিনী (বেসামরিক নাগরিক, ছাত্র, কৃষক, শ্রমিক)। ‘রাহুল ভাই’ নামটি সেই লক্ষ লক্ষ গণবাহিনীর যোদ্ধার প্রতীক, যারা কোনো আনুষ্ঠানিক সামরিক প্রশিক্ষণ ছাড়াই দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে মরণপণ যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন।

‘রাহুল ভাই’ নামটি হয়তো তার আসল নাম নয়। গেরিলা যুদ্ধে যোদ্ধারা প্রায়শই ছদ্মনাম ব্যবহার করতেন নিজেদের পরিবারকে রক্ষা করার জন্য অথবা শত্রুকে বিভ্রান্ত করার জন্য।

গণবাহিনীর রণকৌশল ও আত্মত্যাগ

গণবাহিনীর সদস্যরা ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের প্রাণ। তারা গ্রামীণ জনপদের সাথে মিশে থেকে ‘হিট অ্যান্ড রান’ (Hit and Run) পদ্ধতিতে পাকিস্তানি বাহিনী এবং তাদের দেশীয় দোসর (রাজাকার, আল-বদর, আল-শামস)-দের ব্যতিব্যস্ত রাখতেন।

  • দুঃসাহসিক অভিযান: ‘রাহুল ভাই’রা ছিলেন সেই যোদ্ধা, যারা হয়তো রাতের অন্ধকারে একটি কালভার্ট উড়িয়ে দিয়ে পাকিস্তানি বাহিনীর রসদ সরবরাহের পথ বন্ধ করে দিয়েছেন। অথবা, একটি থানা আক্রমণ করে অস্ত্র সংগ্রহ করেছেন। তারা ছিলেন সেই সব দুঃসাহসী তরুণ, যারা ঢাকায় অপারেশন জ্যাকপট (Operation Jackpot)-এর মতো সফল অভিযান চালিয়ে বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন, প্রমাণ করেছিলেন যে বাংলাদেশ হার মানেনি।
  • তথ্য সংগ্রাহক: যুদ্ধের জন্য সবচেয়ে জরুরি ছিল সঠিক তথ্য। এই ‘রাহুল ভাই’রাই হয়তো সাধারণ কৃষকের ছদ্মবেশে পাকিস্তানি ক্যাম্পের বাইরে ঘোরাফেরা করে তাদের সৈন্যসংখ্যা ও অস্ত্রের তথ্য সংগ্রহ করে মূল বাহিনীর কাছে পৌঁছে দিতেন। এই কাজে ধরা পড়ার শাস্তি ছিল অবধারিত মৃত্যু।
  • রাজনৈতিক মতাদর্শের ঊর্ধ্বে: মুক্তিযুদ্ধে কেবল আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন যোদ্ধারাই ছিলেন না, বিভিন্ন বামপন্থী রাজনৈতিক দল যেমন ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) ও কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)-এর নিজস্ব গেরিলা স্কোয়াড ছিল। তারাও দেশের স্বাধীনতার জন্য সমানভাবে রক্ত দিয়েছেন। ‘রাহুল ভাই’ হতে পারতেন সেই রকম কোনো বামপন্থী গেরিলা নেতা, যার অবদান যুদ্ধের পর রাজনৈতিক বিভাজনের কারণে মূলধারার ইতিহাসে সেভাবে স্থান পায়নি।

কেন ‘রাহুল ভাই’রা হারিয়ে গেলেন?

যুদ্ধের পর, রাষ্ট্র বীরত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ খেতাব প্রদান করেছে। এই প্রক্রিয়ায় স্বাভাবিকভাবেই প্রাধান্য পেয়েছেন নিয়মিত বাহিনীর সদস্যরা এবং বৃহৎ অভিযানগুলির নেতৃত্বদানকারীরা। কিন্তু যে অগণিত গেরিলা যোদ্ধা নামহীন ছোট ছোট অসংখ্য আক্রমণে অংশ নিয়েছিলেন, তাদের সবার হিসাব রাখা সম্ভব হয়নি।

যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে যখন মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা প্রণয়ন শুরু হয়, তখন অনেকেই হয়তো জীবিকার তাগিদে গ্রামে ফিরে গিয়ে কৃষিকাজ বা অন্য পেশায় যুক্ত হয়েছেন। তাদের কাছে ঢাকায় এসে নাম তালিকাভুক্ত করার সুযোগ বা মানসিকতা ছিল না। অনেকে আবার অভিমান বা আদর্শগত কারণে নিজেদের প্রচারের আলোয় আনেননি। এই ‘রাহুল ভাই’রাই ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ‘আনসাং হিরো’ (Unsung Hero), যাদের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে আছে আজকের স্বাধীনতা।

চাঁপাবালা: মুক্তিযুদ্ধের নীরব সাক্ষী ও যোদ্ধা

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে নারীর অবদানকে প্রায়শই কেবল ‘নির্যাতিতা’ বা ‘বীরাঙ্গনা’ পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে ফেলা হয়। পাকিস্তানি বাহিনীর দ্বারা দুই থেকে চার লক্ষ নারীর পরিকল্পিত ধর্ষণ ও নির্যাতন গণহত্যার (Genocide) এক ভয়াবহ অধ্যায়। এই নির্যাতিত নারীদের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ‘বীরাঙ্গনা’ (War Heroine) খেতাবে ভূষিত করে তাদের সর্বোচ্চ সম্মান দিয়েছিলেন। কিন্তু ‘চাঁপাবালা’ নামটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, নারীদের ভূমিকা কেবল নির্যাতিতার ছিল না; তারা ছিলেন সক্রিয় যোদ্ধা, সহযোগী, গুপ্তচর এবং মুক্তিযুদ্ধের নীরব সংগঠক।

‘চাঁপাবালা’ নামটি একটি সাধারণ গ্রামীণ বাঙালি নারীর প্রতিচ্ছবি। তিনি হতে পারেন সেই নারী, যিনি যুদ্ধের ডামাডোলে নিজের সম্ভ্রম হারিয়েছেন, অথবা তিনি হতে পারেন সেই নারী, যিনি অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করেছেন, কিংবা তিনি হতে পারেন সেই মা, যিনি মুক্তিযোদ্ধাদের নিজের সন্তানের মতো আশ্রয় দিয়েছেন।

‘বীরাঙ্গনা’-র বাইরেও নারীশক্তি

১৯৭১ সালে নারীরা একাধিক ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন। তারামন বিবি বা সেতারা বেগমের মতো খেতাবপ্রাপ্ত নারী মুক্তিযোদ্ধাদের কথা আমরা জানলেও, লক্ষ লক্ষ ‘চাঁপাবালা’ ছিলেন পর্দার আড়ালে।

  1. সরাসরি যুদ্ধে অংশগ্রহণ: বহু নারী সরাসরি যুদ্ধের প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন এবং পুরুষদের পাশাপাশি যুদ্ধক্ষেত্রে লড়াই করেছেন। তারা শত্রুঘাঁটিতে আক্রমণ, সেতু ধ্বংস এবং সম্মুখ যুদ্ধে অংশ নিয়েছেন।
  2. গুপ্তচরবৃত্তি ও তথ্য সরবরাহ: নারীরা সন্দেহ এড়িয়ে সহজে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যেতে পারতেন। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে অগণিত নারী মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য গুপ্তচরের কাজ করেছেন। তারা পাকিস্তানি বাহিনীর অবস্থান, তাদের পরিকল্পনা ইত্যাদি সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহ করে মুক্তিবাহিনীর ক্যাম্পে পৌঁছে দিতেন। ‘চাঁপাবালা’ হয়তো শাড়ির ভাঁজে করে একটি গ্রেনেড বা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বহন করে নিয়ে গেছেন মাইলের পর মাইল।
  3. আশ্রয় ও সেবা (লজিস্টিক সাপোর্ট): মুক্তিযুদ্ধকে একটি জনযুদ্ধে পরিণত করার পেছনে গ্রামীণ নারীদের অবদান ছিল অপরিসীম। যখন গ্রামের পুরুষেরা যুদ্ধে বা আত্মগোপনে, তখন এই ‘চাঁপাবালা’রাই মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য রান্না করেছেন, তাদের লুকিয়ে রেখেছেন, আহতদের সেবা-শুশ্রূষা করেছেন। পাকিস্তানি বাহিনীর কাছে এই কাজের শাস্তি ছিল মৃত্যু অথবা পাশবিক নির্যাতন। তবু তারা পিছু হটেননি।

চাঁপাবালার নীরবতা: সামাজিক বাস্তবতা

যুদ্ধের পর এই বীর নারীদের এক ভিন্ন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়।

  • সামাজিক ট্যাবু: যে নারীরা সরাসরি যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন, তাদের অনেকেই যুদ্ধপরবর্তী পুরুষতান্ত্রিক সমাজে ‘স্বাভাবিক’ জীবনে ফিরতে গিয়ে বাধার সম্মুখীন হন। তাদের বীরত্বকে ছাপিয়ে তাদের ‘নারীত্ব’ বড় হয়ে ওঠে।
  • নির্যাতনের যন্ত্রণা: যারা পাকিস্তানি বাহিনীর ক্যাম্পে নির্যাতিত হয়েছিলেন, সেই ‘বীরাঙ্গনা’দের অনেকেই সামাজিক কলঙ্কের ভয়ে নিজেদের পরিচয় গোপন রাখতে বাধ্য হন। এমনকি অনেক পরিবারও তাদের গ্রহণ করতে চায়নি। রাষ্ট্র তাদের ‘বীরাঙ্গনা’ বললেও, সমাজ তাদের সেই সম্মান দিতে কার্পণ্য করেছে।

এই ‘চাঁপাবালা’রা তাদের আত্মত্যাগ ও বীরত্বের কথা কোনোদিন জনসমক্ষে হয়তো বলেননি। তারা নীরবে একটি নতুন দেশ গড়ার সংগ্রামে মিশে গেছেন। তাদের এই নীরবতাই মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের সবচেয়ে করুণ অথচ শক্তিশালী অধ্যায়।

বিস্মৃতির রাজনীতি ও ইতিহাসের দায়: কেন এদের মনে রাখা জরুরি?

ইতিহাস কেবল অতীতের ঘটনাপঞ্জি নয়; এটি একটি জাতির বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নির্মাণের ভিত্তি। যখন আশীষগুপ্ত, রাহুল ভাই বা চাঁপাবালার মতো অগণিত মানুষের অবদান ইতিহাসের মূল স্রোত থেকে হারিয়ে যায়, তখন সেই ইতিহাস অসম্পূর্ণ থেকে যায়।

তথ্য ও উপাত্ত: গণনার বাইরে যারা

মুক্তিযুদ্ধের পর মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা প্রণয়ন নিয়ে বিভিন্ন সময়ে বিতর্ক হয়েছে। সরকারিভাবে গেজেটভুক্ত মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা এবং প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা নিয়ে ফারাক রয়েছে। এর মূল কারণ হলো, যারা কোনো সেক্টরের অধীনে বা কোনো নিবন্ধিত সংগঠনের বাইরে থেকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে যুদ্ধ করেছেন, তাদের অনেকেই তালিকার বাইরে রয়ে গেছেন।

মুক্তিযোদ্ধাদের পরিসংখ্যানগত একটি সংক্ষিপ্ত সারণি (আনুমানিক)

বিভাগের নাম আনুমানিক সংখ্যা
নিয়মিত বাহিনী (মুক্তিবাহিনী) প্রায় ৩০,০০০ (সেনা, নৌ, বিমান)
গণবাহিনী (গেরিলা) প্রায় ১,০০,০০০ বা ততোধিক
ভারতীয় শরণার্থী (মার্চ-ডিসেম্বর ১৯৭১) প্রায় ১ কোটি
শহীদ (গণহত্যা) ৩০ লক্ষ (আনুমানিক)
নির্যাতিত নারী (বীরাঙ্গনা) ২ লক্ষ থেকে ৪ লক্ষ

এই সারণিটি দেখায় যে, গণবাহিনীর সংখ্যা বা নির্যাতিত নারীর সংখ্যা সবসময়ই ‘আনুমানিক’। এই আনুমানিক সংখ্যার ভেতরেই হারিয়ে গেছেন লক্ষ লক্ষ ‘রাহুল ভাই’ ও ‘চাঁপাবালা’।

ইতিহাসের দায় শোধ

আজ, স্বাধীনতার পাঁচ দশক পর, আমাদের দায়িত্ব হলো এই বিস্মৃত ইতিহাসকে খুঁজে বের করা। এই কাজটি অত্যন্ত জরুরি কারণ:

  1. পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস রচনা: একটি দেশের স্বাধীনতার পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস রচনার জন্য সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষের অবদানকে স্বীকৃতি দেওয়া প্রয়োজন।
  2. নতুন প্রজন্মের কাছে সঠিক বার্তা: নতুন প্রজন্মকে যখন আমরা বলি স্বাধীনতা ‘সবার’ ত্যাগের বিনিময়ে এসেছে, তখন সেই ‘সবার’ মধ্যে আশীষগুপ্ত, রাহুল ভাই ও চাঁপাবালাদের গল্প থাকা আবশ্যক। এটি তাদের দেশপ্রেম ও মানবিক মূল্যবোধে উদ্বুদ্ধ করবে।
  3. ঐতিহাসিক ন্যায়বিচার: যারা দেশের জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করেও কোনো স্বীকৃতি পাননি, তাদের ইতিহাস জনসমক্ষে আনা এক ধরনের ঐতিহাসিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করে।

বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর (Liberation War Museum) এবং ১৯৭১: গণহত্যা-নির্যাতন আর্কাইভ ও জাদুঘর (1971: Genocide-Torture Archive & Museum))-এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলো মৌখিক ইতিহাস (Oral History) সংগ্রহের মাধ্যমে এই বিস্মৃত আখ্যানগুলি সংরক্ষণের অমূল্য কাজ করে যাচ্ছে। তারা সেই সব সাধারণ মানুষের সাক্ষাৎকার রেকর্ড করছে, যারা যুদ্ধের সাক্ষী ছিলেন বা সরাসরি অংশ নিয়েছিলেন।

 ছেঁড়া পাতা জোড়া লাগানোর সময়

আশীষগুপ্ত, রাহুল ভাই এবং চাঁপাবালা—এই তিনটি নাম কেবল প্রতীক নয়। তারা আমাদের জাতীয় ইতিহাসের সেই ছেঁড়া পাতা, যা ছাড়া আমাদের স্বাধীনতার আখ্যান অসম্পূর্ণ। আশীষগুপ্ত আমাদের শেখান যে মানবিকতা কোনো সীমান্ত মানে না। রাহুল ভাই আমাদের দেখান যে দেশপ্রেম কোনো সামরিক পদ বা পদের তোয়াক্কা করে না। আর চাঁপাবালা প্রমাণ করেন যে, নারী কেবল নির্যাতিতা নয়, সে বিজয়ী এবং যোদ্ধা।

মুক্তিযুদ্ধ ছিল একটি জনযুদ্ধ। এই যুদ্ধের প্রতিটি ধূলিকণায় মিশে আছে নাম না জানা লক্ষ লক্ষ মানুষের রক্ত, ঘাম এবং অশ্রু। আজ যখন আমরা স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পার করে এসেছি, তখন আমাদের প্রধান দায়িত্ব হলো ইতিহাসের এই ছেঁড়া পাতাগুলি সযত্নে খুঁজে বের করা এবং তাদের জোড়া লাগিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ, পক্ষপাতহীন এবং মানবিক ইতিহাস পরবর্তী প্রজন্মের হাতে তুলে দেওয়া। এই বিস্মৃত নায়কদের প্রতি সম্মান জানানোই হবে স্বাধীনতার প্রকৃত উদযাপন।

About Author
Chanchal Sen

চঞ্চল সেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতক। তিনি একজন অভিজ্ঞ লেখক এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষক, যিনি পলিটিক্স নিয়ে লেখালিখিতে পারদর্শী। চঞ্চলের লেখায় রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের গভীর বিশ্লেষণ এবং সমসাময়িক ঘটনাবলীর সঠিক উপস্থাপন পাঠকদের মুগ্ধ করে। তার নিবন্ধ এবং মতামতমূলক লেখা বস্তুনিষ্ঠতা ও বিশ্লেষণধর্মিতার কারণে পাঠকমহলে ব্যাপকভাবে সমাদৃত। চঞ্চল সেনের তীক্ষ্ণ দৃষ্টিভঙ্গি এবং গভীর গবেষণা তাকে রাজনৈতিক সাংবাদিকতার জগতে একটি স্বতন্ত্র স্থান প্রদান করেছে। তিনি তার লেখনীর মাধ্যমে পাঠকদের রাজনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধি করতে এবং সমাজে পরিবর্তন আনতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে চলেছেন।

আরও পড়ুন