ভারতের ডিজিটাল লেনদেন ব্যবস্থা ইউনিফায়েড পেমেন্টস ইন্টারফেস (ইউপিআই) এক নতুন ঐতিহাসিক মাইলফলক স্থাপন করেছে। এই প্রথমবার, এক মাসে ইউপিআই-এর মাধ্যমে লেনদেনের সংখ্যা ২০ বিলিয়ন অতিক্রম করেছে। ন্যাশনাল পেমেন্টস কর্পোরেশন অফ ইন্ডিয়া (এনপিসিআই) দ্বারা প্রকাশিত সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের আগস্ট মাসে মোট ২০.০১ বিলিয়ন লেনদেন নথিভুক্ত হয়েছে, যা ভারতের ডিজিটাল অর্থনীতির দ্রুতগতিতে এগিয়ে যাওয়ার একটি সুস্পষ্ট প্রমাণ।
আগস্ট মাসে লেনদেনের এই বিপুল সংখ্যা ভারতের ডিজিটাল পরিকাঠামোর শক্তি এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে এর ক্রমবর্ধমান গ্রহণযোগ্যতাকে তুলে ধরেছে। যদিও লেনদেনের মোট আর্থিক মূল্য জুলাই মাসের তুলনায় সামান্য কমে ২৪.৮৫ লক্ষ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে, কিন্তু বার্ষিক বৃদ্ধির হার এখনও অত্যন্ত শক্তিশালী। গত বছর, অর্থাৎ ২০২৪ সালের আগস্ট মাসের তুলনায় লেনদেনের পরিমাণে ৩৪ শতাংশ এবং মূল্যে ২১ শতাংশ বৃদ্ধি লক্ষ্য করা গেছে।
অভূতপূর্ব বৃদ্ধি এবং তার চালিকাশক্তি
ইউপিআই-এর এই অসাধারণ সাফল্যের পিছনে একাধিক কারণ বর্তমান। প্রথমত, শহরাঞ্চলের পাশাপাশি গ্রামীণ ভারতেও ডিজিটাল লেনদেনের ব্যাপক প্রসার ঘটেছে। স্মার্টফোনের সহজলভ্যতা এবং ইন্টারনেট সংযোগের উন্নতির ফলে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও মানুষ এখন অনায়াসে ইউপিআই ব্যবহার করছেন। মুদি দোকান থেকে শুরু করে বড় শপিং মল, সর্বত্রই কিউআর কোড স্ক্যান করে পেমেন্টের সুবিধা থাকায় নগদ টাকার ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
দ্বিতীয়ত, উৎসবের মরসুম শুরু হওয়ার সাথে সাথে কেনাকাটা এবং অন্যান্য আর্থিক লেনদেন বৃদ্ধি পাওয়ায় ইউপিআই-এর ব্যবহারও বেড়েছে। রাখি বন্ধন এবং অন্যান্য আঞ্চলিক উৎসবের সময়ে মানুষ উপহার কেনা এবং অন্যান্য খরচের জন্য ডিজিটাল পেমেন্টকেই বেশি প্রাধান্য দিয়েছেন।
তৃতীয়ত, বিভিন্ন ইউপিআই অ্যাপ, যেমন – গুগল পে, ফোনপে, পেটিএম ইত্যাদির ব্যবহারকারী-বান্ধব ইন্টারফেস এবং আকর্ষণীয় ক্যাশব্যাক অফার সাধারণ মানুষকে ডিজিটাল লেনদেনে উৎসাহিত করেছে। এই অ্যাপগুলির মাধ্যমে খুব সহজেই টাকা পাঠানো, বিল পেমেন্ট করা, বা অনলাইন কেনাকাটা করা সম্ভব হওয়ায় এর জনপ্রিয়তা আকাশচুম্বী।
ইউপিআই-এর অগ্রগতি
ইউপিআই-এর এই সাফল্যকে আরও ভালোভাবে বোঝার জন্য কিছু গাণিতিক তথ্য বিশ্লেষণ করা যেতে পারে:
- আগস্ট ২০২৫-এর মোট লেনদেন: ২০.০১ বিলিয়ন
- আগস্ট ২০২৫-এর মোট আর্থিক মূল্য: ₹২৪.৮৫ লক্ষ কোটি
- জুলাই ২০২৫-এর মোট আর্থিক মূল্য: ₹২৫.০৮ লক্ষ কোটি
- আগস্ট ২০২৪-এর মোট লেনদেন: ১৪.৯ বিলিয়ন
- আগস্ট ২০২৪-এর মোট আর্থিক মূল্য: ₹২০.৬০ লক্ষ কোটি
এ থেকে স্পষ্ট যে, এক বছরের ব্যবধানে লেনদেনের সংখ্যা প্রায় ৫.১১ বিলিয়ন বেড়েছে, যা ৩৪ শতাংশ বৃদ্ধির সমতুল্য। অর্থাৎ, প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ০.৪২ বিলিয়ন নতুন লেনদেন যুক্ত হয়েছে।
আগস্ট মাসে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৬৪৫ মিলিয়ন লেনদেন হয়েছে, যার আর্থিক মূল্য ছিল প্রায় ৮০,১৭৭ কোটি টাকা। এই পরিসংখ্যান প্রমাণ করে যে, ইউপিআই এখন আর শুধুমাত্র বড় অঙ্কের লেনদেনের জন্য ব্যবহৃত হয় না, বরং দৈনন্দিন ছোটখাটো কেনাকাটার ক্ষেত্রেও এটি একটি অপরিহার্য মাধ্যম হয়ে উঠেছে।
গ্রামীণ ভারতে ডিজিটাল বিপ্লব
একসময় ডিজিটাল পেমেন্ট মূলত শহরাঞ্চলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু সরকারের ডিজিটাল ইন্ডিয়া অভিযানের ফলে এবং ফিনটেক সংস্থাগুলির নিরন্তর প্রচেষ্টায় আজ গ্রামীণ ভারতেও এর সুফল পৌঁছে গেছে। স্পাইস মানি-র সিইও দিলীপ মোদী সংবাদসংস্থা পিটিআই-কে জানিয়েছেন, “ইউপিআই লেনদেনের সংখ্যা ২০ বিলিয়ন অতিক্রম করা ভারতের ডিজিটাল অর্থনীতির স্থিতিস্থাপকতা এবং গভীরতার পরিচায়ক। এই বৃদ্ধি প্রমাণ করে যে ডিজিটাল পেমেন্ট এখন আর শুধুমাত্র শহরের প্রবণতা নয়, বরং গ্রামীণ ভারতের লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবনযাত্রার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে।”
বিশ্ব দরবারে ভারতের ইউপিআই
ইউপিআই-এর সাফল্য শুধু ভারতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, বিশ্বজুড়ে এর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছে। বর্তমানে ভারত ছাড়াও সংযুক্ত আরব আমিরশাহী, সিঙ্গাপুর, ভুটান, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, ফ্রান্স এবং মরিশাসের মতো দেশগুলিতেও ইউপিআই পরিষেবা চালু হয়েছে। এটি ভারতের প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ এবং উদ্ভাবনী শক্তির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। বিশেষজ্ঞদের মতে, ইউপিআই খুব শীঘ্রই একটি বিশ্বব্যাপী পেমেন্ট স্ট্যান্ডার্ড হিসাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে।
ভারতের মোট ডিজিটাল লেনদেনের প্রায় ৮৫ শতাংশই এখন ইউপিআই-এর মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। শুধু তাই নয়, বিশ্বের মোট রিয়েল-টাইম ডিজিটাল পেমেন্টের প্রায় ৫০ শতাংশই ভারতের ইউপিআই দ্বারা চালিত হয়। এই পরিসংখ্যান ভারতের ডিজিটাল অর্থনীতিকে এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে এবং আগামী দিনে এর আরও বিস্তারের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
ইউপিআই-এর এই ঐতিহাসিক সাফল্য শুধুমাত্র একটি সংখ্যা নয়, এটি ডিজিটাল ক্ষমতায়নের মাধ্যমে এক নতুন ভারত গড়ে তোলার প্রতীক। যেভাবে দেশের প্রতিটি কোণায় মানুষ ডিজিটাল লেনদেনকে আপন করে নিচ্ছেন, তাতে একথা বলাই যায় যে, আগামী দিনে ভারত বিশ্বের ডিজিটাল অর্থনীতির নেতৃত্বে থাকবে।











