বিশ্বজুড়ে ফিলিস্তিনকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি যখন ক্রমশ জোরালো হচ্ছে, এমনকি আমেরিকার ঘনিষ্ঠ মিত্ররাও সেই পথে হাঁটছে, তখন ওয়াশিংটন তার কয়েক দশকের পুরোনো অবস্থানেই অনড়। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে বারবার ভেটো প্রয়োগ থেকে শুরু করে দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানের পক্ষে মৌখিক সমর্থন দিলেও কার্যত একতরফা স্বীকৃতিকে নিরুৎসাহিত করার এই নীতি ফিলিস্তিনি জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারকে এক দীর্ঘমেয়াদী অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলে দিয়েছে। কিন্তু কেন বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী রাষ্ট্রটি এই স্বীকৃতি দিতে এতটা দ্বিধাগ্রস্ত? এর পেছনে রয়েছে জটিল কূটনৈতিক, অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক এবং ভূ-রাজনৈতিক নানা সমীকরণ।
মূল তথ্য / কুইক টেক
- আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি: জাতিসংঘের ১৯৩টি সদস্য রাষ্ট্রের মধ্যে ১৪৭টিরও বেশি দেশ ফিলিস্তিনকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। সম্প্রতি (সেপ্টেম্বর ২০২৫) যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও পর্তুগালের মতো দেশও এই তালিকায় যোগ দিয়েছে।
- মার্কিন ভেটো: সর্বশেষ ১৮ই এপ্রিল, ২০২৪-এ জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে ফিলিস্তিনের পূর্ণ সদস্যপদের প্রস্তাবে যুক্তরাষ্ট্র ভেটো প্রয়োগ করে। প্রস্তাবের পক্ষে ১২টি দেশ ভোট দিলেও আমেরিকার একার বিরোধিতায় তা আটকে যায়। (সূত্র: UN News)
- আনুষ্ঠানিক অবস্থান: যুক্তরাষ্ট্রের ঘোষিত নীতি হলো, দ্বি-রাষ্ট্র সমাধান অবশ্যই ইসরায়েল এবং ফিলিস্তিনিদের মধ্যে সরাসরি আলোচনার মাধ্যমে আসতে হবে। একতরফা স্বীকৃতি বা জাতিসংঘের মাধ্যমে চাপিয়ে দেওয়া সমাধান স্থায়ী শান্তি আনবে না বলে তারা মনে করে।
- অভ্যন্তরীণ চাপ: মার্কিন কংগ্রেসের শক্তিশালী ইসরায়েলপন্থী লবি, বিশেষ করে ‘আমেরিকান ইসরায়েল পাবলিক অ্যাফেয়ার্স কমিটি’ (AIPAC), এবং আইনি বাধ্যবাধকতা মার্কিন বিদেশ নীতিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।
- কংগ্রেসের আইন: মার্কিন আইন অনুযায়ী, জাতিসংঘ বা তার কোনো সংস্থা যদি ফিলিস্তিনকে পূর্ণ সদস্য হিসেবে স্বীকৃতি দেয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র সেই সংস্থায় অর্থায়ন বন্ধ করে দিতে বাধ্য থাকবে।
একটি দীর্ঘমেয়াদী অচলাবস্থা
ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার বিষয়টি কয়েক দশকের পুরোনো। ১৯৯৩ সালের অসলো চুক্তির পর একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের রূপরেখা তৈরি হয়েছিল, যা ‘দ্বি-রাষ্ট্র সমাধান’ (Two-state solution) নামে পরিচিত। এই সমাধান অনুযায়ী, ১৯৬৭ সালের সীমানা অনুযায়ী ইসরায়েলের পাশাপাশি একটি স্বাধীন, সার্বভৌম ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠিত হবে, যার রাজধানী হবে পূর্ব জেরুজালেম। কিন্তু বছরের পর বছর ধরে শান্তি আলোচনা ব্যর্থ হয়েছে, অবৈধ ইহুদি বসতি স্থাপন বেড়েছে এবং দুই পক্ষের মধ্যে সহিংসতা কেবলই বেড়েছে। এই পরিস্থিতিতে, ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ আন্তর্জাতিক সমর্থনের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি আদায়ের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, যেখানে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।
মূল বাধাগুলো কোথায়?
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই অনড় অবস্থানের পেছনে একক কোনো কারণ নেই, বরং এটি বিভিন্ন দিকের চাপের ফল।
১. কূটনৈতিক অবস্থান এবং ভেটো ক্ষমতা
ওয়াশিংটনের মূল কূটনৈতিক যুক্তি হলো, একটি স্থায়ী শান্তি চুক্তি ছাড়া রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি অর্থহীন এবং তা 오히려 পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলবে। তাদের মতে, সীমানা, জেরুজালেমের মর্যাদা, শরণার্থী সমস্যা এবং নিরাপত্তার মতো মূল বিষয়গুলোর সমাধান হতে হবে দুই পক্ষের আলোচনার টেবিলে।
“মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানকে জোরালোভাবে সমর্থন করে। এই ভোট (এপ্রিল ২০২৪-এর ভেটো) ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রীয়তার বিরোধিতার প্রতিফলন নয়, বরং এটি একটি স্বীকৃতি যে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা কেবল দলগুলোর মধ্যে সরাসরি আলোচনার মাধ্যমেই আসবে।” — রবার্ট উড, জাতিসংঘে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ডেপুটি অ্যাম্বাসেডর।
এই নীতিকে কার্যকর করতে, যুক্তরাষ্ট্র জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে তার ভেটো ক্ষমতা বারবার ব্যবহার করেছে। ভেটো ক্ষমতাধর পাঁচটি স্থায়ী সদস্যের একজন হওয়ায়, আমেরিকার অসম্মতিতেই যেকোনো প্রস্তাব আটকে যায়।
জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে ফিলিস্তিনের সদস্যপদ প্রস্তাব (এপ্রিল ১৮, ২০২৪)
| ভোটের ধরণ | দেশের সংখ্যা | ফলাফল |
| পক্ষে | ১২ | – |
| বিপক্ষে (ভেটো) | ১ (যুক্তরাষ্ট্র) | প্রস্তাব বাতিল |
| বিরত | ২ (যুক্তরাজ্য, সুইজারল্যান্ড) | – |
(তথ্যসূত্র: United Nations News, এপ্রিল ১৮, ২০২৪। লিঙ্ক)
২. অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও শক্তিশালী লবিং
আমেরিকার অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ফিলিস্তিন প্রশ্নে বিদেশ নীতিকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করে।
- কংগ্রেসের ভূমিকা: মার্কিন কংগ্রেসে ইসরায়েলের পক্ষে একটি শক্তিশালী, দ্বি-দলীয় সমর্থন রয়েছে। বেশ কয়েকটি আইন পাস করা আছে যা ফিলিস্তিনিদের একতরফা রাষ্ট্র গঠনের প্রচেষ্টাকে সীমাবদ্ধ করে। উদাহরণস্বরূপ, একটি আইন অনুসারে, ফিলিস্তিনিরা যদি জাতিসংঘের মাধ্যমে একতরফাভাবে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা লাভ করে, তবে প্যালেস্টাইনিয়ান অথরিটি-কে (PA) দেওয়া মার্কিন আর্থিক সহায়তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ হয়ে যাবে।
- AIPAC-এর প্রভাব: ‘আমেরিকান ইসরায়েল পাবলিক অ্যাফেয়ার্স কমিটি’ (AIPAC) মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে প্রভাবশালী লবিং গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে অন্যতম। এই সংস্থাটি কংগ্রেস সদস্য এবং নীতিনির্ধারকদের উপর ইসরায়েলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য ক্রমাগত চাপ সৃষ্টি করে। তাদের প্রচারণার একটি বড় অংশ জুড়ে থাকে এই ধারণা যে, আলোচনার বাইরে ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেওয়া ইসরায়েলের নিরাপত্তার জন্য একটি বড় হুমকি।
৩. ইসরায়েলের নিরাপত্তা সংক্রান্ত উদ্বেগ
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্য নীতির কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ইসরায়েলের নিরাপত্তা। ওয়াশিংটন মনে করে, একটি দুর্বল, অস্থিতিশীল বা বৈরী ফিলিস্তিন রাষ্ট্র ইসরায়েলের অস্তিত্বের জন্য হুমকি সৃষ্টি করতে পারে। হামাসের মতো গোষ্ঠীর উত্থানের পর এই উদ্বেগ আরও বেড়েছে। মার্কিন নীতিনির্ধারকরা মনে করেন, একটি পূর্ণাঙ্গ শান্তি চুক্তি ছাড়া রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দিলে ফিলিস্তিনের নিরাপত্তা কাঠামোর ওপর কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকবে না, যা ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হতে পারে।
আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট ও সাম্প্রতিক পরিবর্তন
মার্কিন অবস্থান সত্ত্বেও, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে চিত্রটা দ্রুত বদলাচ্ছে।
১. বিশ্বব্যাপী স্বীকৃতির প্রবণতা:
২০২৪ এবং ২০২৫ সালে ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেওয়ার একটি নতুন ঢেউ দেখা গেছে। স্পেন, আয়ারল্যান্ড ও নরওয়ের পর সম্প্রতি যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া এবং পর্তুগালের মতো পশ্চিমা দেশগুলোও ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দিয়েছে। সেপ্টেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত, জাতিসংঘের প্রায় ৭৭% (১৪৭টির বেশি দেশ) সদস্য রাষ্ট্র ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দিয়েছে।
২. স্বীকৃতি প্রদানকারী দেশের সংখ্যা বৃদ্ধি (২০২৪-২০২৫):
এই দেশগুলোর স্বীকৃতি প্রতীকী হলেও এটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উপর একটি বড় ধরনের নৈতিক এবং কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টি করছে। এর মাধ্যমে একটি বার্তা স্পষ্ট হচ্ছে যে, দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানের জন্য অনির্দিষ্টকাল অপেক্ষা করা সম্ভব নয় এবং আলোচনার অচলাবস্থা ভাঙতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ভূমিকা রাখা প্রয়োজন।
সাধারণ মানুষের উপর প্রভাব
এই কূটনৈতিক অচলাবস্থার সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী ফিলিস্তিনের সাধারণ মানুষ। রাষ্ট্রীয় মর্যাদার অভাবে তারা পাসপোর্ট, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, এবং সার্বভৌমত্বের মতো মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত। অর্থনৈতিকভাবে তারা ইসরায়েল এবং আন্তর্জাতিক সাহায্যের ওপর নির্ভরশীল। দশকের পর দশক ধরে চলা এই অনিশ্চয়তা, দখলদারিত্ব এবং স্বাধীনতার অভাব তাদের মধ্যে হতাশা ও ক্ষোভ তৈরি করেছে, যা প্রায়শই সহিংসতাকে উস্কে দেয়।
পরবর্তী পদক্ষেপ: কী আশা করা যায়?
যতদিন ইসরায়েল এবং ফিলিস্তিনের মধ্যে একটি অর্থপূর্ণ শান্তি আলোচনা শুরু না হচ্ছে, ততদিন মার্কিন নীতির বড় ধরনের পরিবর্তনের সম্ভাবনা কম। তবে কয়েকটি বিষয় przyszłości-কে প্রভাবিত করতে পারে:
- আন্তর্জাতিক চাপ: মিত্র দেশগুলোর পক্ষ থেকে স্বীকৃতির ঢেউ যদি অব্যাহত থাকে, তবে যুক্তরাষ্ট্র কূটনৈতিকভাবে আরও একঘরে হয়ে পড়বে, যা তাদের অবস্থান পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য করতে পারে।
- মার্কিন প্রশাসনে পরিবর্তন: ডেমোক্র্যাটিক পার্টির প্রগতিশীল অংশ ফিলিস্তিনিদের অধিকারের বিষয়ে অনেক বেশি সোচ্চার। ভবিষ্যতে যদি মার্কিন নেতৃত্বে এমন কোনো পরিবর্তন আসে যা এই গোষ্ঠীর মতামতকে গুরুত্ব দেয়, তবে নীতির ক্ষেত্রেও পরিবর্তন আসতে পারে।
- ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি: ইসরায়েলের সরকার পরিবর্তনও একটি বড় প্রভাব ফেলতে পারে। যদি সেখানে এমন কোনো সরকার ক্ষমতায় আসে যা দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানে আন্তরিকভাবে বিশ্বাসী, তবে আলোচনার পথ খুলতে পারে এবং মার্কিন ভূমিকাও সহায়ক হতে পারে।
ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার ক্ষেত্রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাধা একটি সরল বিষয় নয়। এটি তাদের জাতীয় স্বার্থ, ইসরায়েলের সঙ্গে ঐতিহাসিক মৈত্রী, শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ লবির প্রভাব এবং একটি নির্দিষ্ট কূটনৈতিক দর্শনের জটিল মিশ্রণ। যদিও বিশ্ব ক্রমশ স্বীকৃতির দিকে ঝুঁকছে, ওয়াশিংটন এখনও বিশ্বাস করে যে আলোচনার মাধ্যমেই কেবল একটি টেকসই ও নিরাপদ ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা সম্ভব। কিন্তু সমালোচকদের মতে, আলোচনার এই অন্তহীন ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারকে অস্বীকার করার একটি অজুহাত মাত্র, যা মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী শান্তির সম্ভাবনাকে আরও দূরে ঠেলে দিচ্ছে।
সম্পাদকের নোট: ব্যবহৃত পরিসংখ্যান এবং দেশগুলোর স্বীকৃতির সংখ্যা সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্যের উপর ভিত্তি করে তৈরি। কূটনৈতিক পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তনশীল, তাই কিছু তথ্যের পরিবর্তন হতে পারে।











