দুনিয়ার সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তিও যে ৭টি কাজ করতে পারেন না — মার্কিন প্রেসিডেন্টের লুকানো সীমাবদ্ধতা

Things US President Cannot Do: পৃথিবীর মানচিত্রে একটি দেশ আছে, যার নেতার একটি মাত্র সিদ্ধান্ত গোটা বিশ্বের অর্থনীতি বদলে দিতে পারে। সেই দেশটি হলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, এবং সেই নেতা হলেন…

Avatar

 

Things US President Cannot Do: পৃথিবীর মানচিত্রে একটি দেশ আছে, যার নেতার একটি মাত্র সিদ্ধান্ত গোটা বিশ্বের অর্থনীতি বদলে দিতে পারে। সেই দেশটি হলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, এবং সেই নেতা হলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। বিশ্বের বৃহত্তম সামরিক শক্তির কমান্ডার-ইন-চিফ, পারমাণবিক অস্ত্রের চাবিকাঠির মালিক, বিশ্বের এক নম্বর অর্থনীতির শীর্ষ কর্তা — প্রেসিডেন্টের পরিচয় দিতে গেলে এই বিশেষণগুলো যথেষ্ট মনে হয়। কিন্তু সত্যিটা হলো, এই অসীম ক্ষমতার আড়ালে লুকিয়ে আছে সুনির্দিষ্ট কিছু সাংবিধানিক সীমাবদ্ধতা, যেগুলো তিনি কখনোই অতিক্রম করতে পারেন না। মার্কিন সংবিধানের দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ (Article II) এবং চেকস অ্যান্ড ব্যালেন্স সিস্টেম নিশ্চিত করে যে, শুধু একজন মানুষের হাতে যেন সব ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত না হয়।

আজকের এই বিশ্লেষণধর্মী আর্টিকেলে আমরা জানবো, ঠিক কোন সেই ৭টি কাজ যা মার্কিন প্রেসিডেন্ট — চাইলেও — করতে পারেন না। এই তথ্যগুলো শুধু রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ছাত্রছাত্রীদের জন্য নয়, বরং যেকোনো সচেতন নাগরিকের জানা দরকার, কারণ এই নিয়মগুলোই গণতন্ত্রকে স্বৈরতন্ত্র থেকে আলাদা করে রাখে।

মার্কিন শাসনব্যবস্থার মূলভিত্তি: ক্ষমতার ভারসাম্য

চেকস অ্যান্ড ব্যালেন্স: গণতন্ত্রের প্রহরী

১৭৮৭ সালে মার্কিন সংবিধান রচনার সময় প্রতিষ্ঠাতারা সচেতনভাবেই একটি ব্যবস্থা তৈরি করেছিলেন, যাতে এককেন্দ্রিক ক্ষমতা না জন্মায়। এই ব্যবস্থাকে বলা হয় “Separation of Powers” বা ক্ষমতার পৃথকীকরণ। মার্কিন সরকারকে তিনটি স্বতন্ত্র শাখায় ভাগ করা হয়েছে — আইন বিভাগ (Congress), নির্বাহী বিভাগ (President) এবং বিচার বিভাগ (Supreme Court)। প্রতিটি শাখা অন্য শাখাকে নজরদারি করে, যাতে কোনো একটি শাখা বেপরোয়া না হয়ে উঠতে পারে।

মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট ১৯৫২ সালে ঐতিহাসিক Youngstown Sheet & Tube Co. v. Sawyer মামলায় রায় দিয়েছিল যে, প্রেসিডেন্ট তাঁর সাংবিধানিক সীমার বাইরে যেতে পারবেন না — এমনকি জাতীয় সংকটের সময়েও নয়। এই রায়টি আজও প্রেসিডেন্টের ক্ষমতার সীমা নির্ধারণে মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত।

৭টি কাজ যা মার্কিন প্রেসিডেন্ট করতে পারেন না

১. আইন তৈরি করতে পারেন না

মার্কিন সংবিধানের Article I স্পষ্টভাবে বলে দেয়, আইন প্রণয়নের ক্ষমতা শুধুমাত্র কংগ্রেসের — অর্থাৎ প্রতিনিধি পরিষদ (House of Representatives) এবং সিনেটের হাতে। প্রেসিডেন্ট নতুন আইনের প্রস্তাব দিতে পারেন, কংগ্রেসকে আইন পাসের জন্য অনুরোধ করতে পারেন, কিন্তু নিজে কোনো আইন তৈরি করতে পারেন না।

প্রেসিডেন্টের হাতে Executive Order বা নির্বাহী আদেশ দেওয়ার ক্ষমতা আছে বটে, কিন্তু সেটি আইনের বিকল্প নয়। যদি কোনো নির্বাহী আদেশ সংবিধান বা বিদ্যমান আইনের বিরুদ্ধে যায়, তাহলে আদালত সেটি বাতিল করে দিতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, ২০২৫ সালে ট্রাম্প প্রশাসনের কিছু নির্বাহী আদেশ ফেডারেল আদালতে আটকে যায়।

বাস্তব উদাহরণ: ২০২৫ সালে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নতুন শুল্ক (Tariff) আরোপ করতে গেলে ফেডারেল আপিল আদালত রায় দেয় — কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া প্রেসিডেন্ট একা কর আরোপ করতে পারেন না।

২. আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধ ঘোষণা করতে পারেন না

এটি হয়তো অনেকের কাছে অবাক করা তথ্য — মার্কিন প্রেসিডেন্ট পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক বাহিনীর নেতা, কিন্তু আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধ ঘোষণা করার অধিকার তাঁর নেই। মার্কিন সংবিধানের Article I, Section 8 অনুযায়ী, যুদ্ধ ঘোষণার ক্ষমতা শুধুমাত্র কংগ্রেসের।

প্রেসিডেন্ট সামরিক বাহিনীকে মোতায়েন করতে পারেন, কিন্তু আনুষ্ঠানিক যুদ্ধ ঘোষণার জন্য কংগ্রেসের ভোট লাগবে। মার্কিন ইতিহাসে শুধুমাত্র ৫টি যুদ্ধ আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়েছে — সর্বশেষ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে, ১৯৪১ সালে। কোরিয়া, ভিয়েতনাম বা ইরাক যুদ্ধ — কোনোটিতেই আনুষ্ঠানিক যুদ্ধ ঘোষণা ছিল না, বরং ছিল কংগ্রেসের “Authorization for Use of Military Force।”

৩. সংবিধান বা আইন ব্যাখ্যা করতে পারেন না

সংবিধান বা আইনের মানে কী, তা ব্যাখ্যা করার একক ক্ষমতা রয়েছে সুপ্রিম কোর্টের। এই ক্ষমতাকে বলা হয় Judicial Review। প্রেসিডেন্ট নিজে থেকে সংবিধানের কোনো ধারার নিজস্ব ব্যাখ্যা দিয়ে সেটি প্রয়োগ করতে পারেন না।

Marbury v. Madison (১৮০৩) মামলায় সুপ্রিম কোর্ট এই নীতি প্রতিষ্ঠিত করে যে, সংবিধানের চূড়ান্ত ব্যাখ্যার অধিকার শুধু বিচার বিভাগের। সাম্প্রতিক কালে Trump v. United States (২০২৪) মামলায় সুপ্রিম কোর্ট যদিও প্রেসিডেন্টের কিছু কাজে ইমিউনিটি দিয়েছে, তবুও সংবিধান ব্যাখ্যার ক্ষমতা প্রেসিডেন্টের নয়।

৪. সিনেটের অনুমোদন ছাড়া গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগ দিতে পারেন না

প্রেসিডেন্ট মন্ত্রিসভার সদস্য, সুপ্রিম কোর্টের বিচারক এবং বড় কূটনৈতিক পদে যাঁকে খুশি তাঁকে নিয়োগ দিতে পারেন না। সংবিধানের Article II, Section 2 অনুযায়ী, এই সব নিয়োগে সিনেটের “Advice and Consent” অর্থাৎ অনুমোদন বাধ্যতামূলক।

সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি নিয়োগ একটি বিশেষ উদাহরণ — প্রেসিডেন্ট যাকেই মনোনীত করুন না কেন, সিনেটের সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে অনুমোদন না পেলে সে নিয়োগ বাতিল হয়ে যায়। ২০১৬ সালে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ওবামার মনোনীত বিচারপতি Merrick Garland-কে সিনেট রিপাবলিকানরা ৩০০ দিনেরও বেশি সময় ধরে আটকে রেখেছিল।

নিয়োগ সিনেটের অনুমোদন প্রয়োজন?
সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি হ্যাঁ, বাধ্যতামূলক
মন্ত্রিসভার সদস্য হ্যাঁ, বাধ্যতামূলক
রাষ্ট্রদূত হ্যাঁ, বাধ্যতামূলক
ফেডারেল বিচারক হ্যাঁ, বাধ্যতামূলক
হোয়াইট হাউস স্টাফ না, প্রেসিডেন্ট একাই নিয়োগ দেন

৫. ফেডারেল বাজেট ও অর্থ ব্যয়ের সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না

মার্কিন প্রেসিডেন্ট যত শক্তিশালীই হোন না কেন, সরকারের টাকা কোথায় খরচ হবে সেটা তিনি একা ঠিক করতে পারেন না। সংবিধানের Article I, Section 9 অনুযায়ী, ফেডারেল অর্থ বরাদ্দের ক্ষমতা কংগ্রেসের। প্রেসিডেন্ট বাজেটের প্রস্তাব দিতে পারেন, কিন্তু কংগ্রেস সেটি গ্রহণ, পরিবর্তন বা বাতিল করার সম্পূর্ণ ক্ষমতা রাখে।

এই কারণে কখনো কখনো “Government Shutdown” হয় — যখন কংগ্রেস এবং প্রেসিডেন্ট বাজেট নিয়ে একমত হতে পারেন না। সবচেয়ে দীর্ঘ শাটডাউনটি হয়েছিল ২০১৮-২০১৯ সালে, ৩৫ দিন ধরে, যা মার্কিন ইতিহাসের রেকর্ড। এই সময় ৮ লক্ষেরও বেশি ফেডারেল কর্মচারী বিনা বেতনে কাজ করতে বাধ্য হয়েছিলেন বা ছুটিতে থেকেছিলেন।

৬. তৃতীয়বার প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচিত হতে পারেন না

মার্কিন সংবিধানের ২২তম সংশোধনী (২২nd Amendment), যা ১৯৫১ সালে কার্যকর হয়, স্পষ্ট ভাষায় বলে: “কোনো ব্যক্তি দুইবারের বেশি প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচিত হতে পারবেন না।” এই নিয়মটি আসে ফ্র্যাংকলিন ডি. রুজভেল্টের টানা চারবার প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর — যা আগে কেউ করেননি।

বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ২০১৭-২০২১ এবং ২০২৫ থেকে বর্তমান পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। সাংবিধানিকভাবে, এই দুটি মেয়াদ (মাঝে বিরতি থাকলেও) তাঁর জন্য সর্বোচ্চ — তিনি আর তৃতীয়বার প্রার্থী হতে পারবেন না।

৭. বিদ্যমান আইন বাতিল বা স্থগিত করতে পারেন না

মার্কিন প্রেসিডেন্ট যদি কোনো আইন পছন্দ না করেন, তিনি সেটি নিজে থেকে বাতিল বা স্থগিত করতে পারেন না। সংবিধানের “Take Care Clause” (Article II, Section 3) বলে প্রেসিডেন্টকে “faithfully execute the laws” অর্থাৎ আইনের বিশ্বস্ত প্রয়োগকারী হতে হবে।

আইন বাতিল করতে হলে কংগ্রেসে নতুন আইন পাস করাতে হবে। প্রেসিডেন্ট কোনো আইন প্রয়োগ বন্ধ করার চেষ্টা করলে সেটা আদালতে চ্যালেঞ্জ করা যায়। উদাহরণস্বরূপ, ওবামাকেয়ার (Affordable Care Act) বাতিলের বিষয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের একাধিক নির্বাহী পদক্ষেপ আদালতে আটকে গিয়েছিল, কারণ আইন বাতিলের ক্ষমতা প্রেসিডেন্টের নেই।

৭টি সীমাবদ্ধতার তুলনামূলক একনজরে

ক্রম সীমাবদ্ধতা কারণ কার হাতে ক্ষমতা?
আইন তৈরি করা Article I কংগ্রেস
যুদ্ধ ঘোষণা Article I, Sec. 8 কংগ্রেস
সংবিধান ব্যাখ্যা Judicial Review সুপ্রিম কোর্ট
স্বাধীন উচ্চপদে নিয়োগ Article II, Sec. 2 প্রেসিডেন্ট + সিনেট
ফেডারেল বাজেট নির্ধারণ Article I, Sec. 9 কংগ্রেস
তৃতীয়বার নির্বাচন ২২তম সংশোধনী সংবিধান
আইন বাতিল বা স্থগিত Take Care Clause কংগ্রেস + আদালত
সাম্প্রতিক প্রাসঙ্গিকতা: ট্রাম্প যুগে প্রেসিডেন্সির সীমা পরীক্ষা

২০২৫-২০২৬ সালের বিতর্ক

বর্তমান সময়ে মার্কিন প্রেসিডেন্টের ক্ষমতার সীমা নিয়ে তীব্র বিতর্ক চলছে। ২০২৫ সালে সুপ্রিম কোর্ট Trump v. CASA মামলায় এমন একটি রায় দিয়েছে যা প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা প্রসারিত করার পথ খুলে দিয়েছে বলে অনেকে মনে করছেন, যদিও সমালোচকরা বলছেন এটি চেকস অ্যান্ড ব্যালেন্সের ওপর আঘাত।

হার্ভার্ড ল রিভিউ (২০২৫) এর একটি বিশ্লেষণে বলা হয়েছে: ট্রাম্প প্রশাসন সুপ্রিম কোর্টের “exclusive presidential powers” তত্ত্বকে কাজে লাগিয়ে নির্বাহী ক্ষমতার পরিধি বাড়ানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু মূল সাংবিধানিক সীমাবদ্ধতাগুলো এখনো বহাল রয়েছে।

এই বিতর্কগুলো প্রমাণ করে যে, শুধু আইন জানা নয়, আইনের প্রয়োগ নিশ্চিত করাটাও সমান গুরুত্বপূর্ণ — এবং এই কাজটি করে থাকে স্বাধীন বিচার বিভাগ, সংসদ এবং নাগরিক সমাজ।

 ক্ষমতার সীমাই গণতন্ত্রের শক্তি

মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাশালী ব্যক্তি হতে পারেন, কিন্তু তাঁর সেই ক্ষমতা সংবিধানের কঠোর বেড়ার মধ্যে আবদ্ধ। উপরে আলোচিত ৭টি সীমাবদ্ধতা আসলে দুর্বলতার চিহ্ন নয়, বরং এগুলো মার্কিন গণতন্ত্রের শক্তির উৎস। যে কোনো একজন মানুষ যখন অসীম ক্ষমতার অধিকারী হন, তখন ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে যে তা স্বৈরাচারের দিকে যায়। ১৭৮৭ সালে সংবিধান প্রণেতারা সেই ভবিষ্যত ঝুঁকি বুঝেছিলেন বলেই এই চেকস অ্যান্ড ব্যালেন্স ব্যবস্থা তৈরি করেছিলেন। আজ, ২০২৬ সালে, যখন সারা বিশ্বে গণতন্ত্র চাপের মুখে, তখন এই সীমাবদ্ধতাগুলো আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। মনে রাখতে হবে, আইনের শাসন মানে শুধু সাধারণ নাগরিকের জন্য আইন নয় — রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদে থাকা ব্যক্তিও সেই আইনের ঊর্ধ্বে নন।

About Author
Avatar

আমাদের স্টাফ রিপোর্টারগণ সর্বদা নিষ্ঠার সাথে কাজ করে যাচ্ছেন যাতে আপনি বিশ্বের যেকোনো প্রান্তের সর্বশেষ ও গুরুত্বপূর্ণ খবর পেতে পারেন। তাঁদের অক্লান্ত পরিশ্রম ও প্রতিশ্রুতি আমাদের ওয়েবসাইটকে একটি বিশ্বস্ত তথ্যের উৎস হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।তারা নিরপেক্ষ ও বস্তুনিষ্ঠ রিপোর্টিংয়ে বিশ্বাসী, দ্রুত পরিবর্তনশীল পরিস্থিতিতে তাৎক্ষণিক প্রতিবেদন তৈরিতে সক্ষম

আরও পড়ুন