ভেনেজুয়েলায় মার্কিন সামরিক হামলা: মাদুরোকে গ্রেপ্তার, বিশ্বজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া ও আন্তর্জাতিক আইনের প্রশ্ন

২০২৬ সালের ৩ জানুয়ারি, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলায় একটি বড় আকারের সামরিক হামলা পরিচালনা করে এবং দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে গ্রেপ্তার করে। "অপারেশন অ্যাবসলিউট রিজলভ" নামে পরিচিত এই সামরিক অভিযানে স্থানীয়…

Avatar

 

২০২৬ সালের ৩ জানুয়ারি, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলায় একটি বড় আকারের সামরিক হামলা পরিচালনা করে এবং দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে গ্রেপ্তার করে। “অপারেশন অ্যাবসলিউট রিজলভ” নামে পরিচিত এই সামরিক অভিযানে স্থানীয় সময় ভোর ২টার দিকে কারাকাসের বিভিন্ন স্থানে বিমান হামলা চালানো হয় এবং ১৫০টিরও বেশি যুদ্ধবিমান ব্যবহার করা হয়। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শুক্রবার রাত ১০:৪৬ মিনিটে এই মিশনের চূড়ান্ত অনুমোদন দেন এবং পরবর্তীতে ঘোষণা করেন যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলা “পরিচালনা” করবে যতক্ষণ না একটি নিরাপদ এবং যথাযথ ক্ষমতা হস্তান্তর সম্ভব হয়। এই ঘটনা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ে তীব্র বিতর্ক এবং নিন্দার ঝড় তুলেছে, যেখানে লাতিন আমেরিকা থেকে ইউরোপ এবং এশিয়া পর্যন্ত বিভিন্ন দেশ তাদের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে।

সামরিক অভিযানের বিস্তারিত তথ্য

মার্কিন সামরিক বাহিনী কর্তৃক পরিচালিত এই অভিযান ভেনেজুয়েলার উত্তরাঞ্চলীয় বিভিন্ন এলাকায় বিমান হামলার মাধ্যমে শুরু হয়। কারাকাসের রাজধানী এলাকা এবং ফুয়ের্তে তিউনা সামরিক ঘাঁটি প্রধান লক্ষ্যবস্তু ছিল। স্থানীয় বাসিন্দারা প্রথম বিস্ফোরণের শব্দ শোনেন এবং কয়েক ঘণ্টা ধরে আকাশে যুদ্ধবিমানের উড়ানের রিপোর্ট করেন। এই অভিযানে কতজন নিহত বা আহত হয়েছেন তার সঠিক সংখ্যা এখনো অজানা। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার সংবাদ সম্মেলনে বলেন, “প্রথম হামলা এতটাই সফল ছিল যে আমাদের সম্ভবত দ্বিতীয়টি করতে হবে না। কিন্তু আমরা দ্বিতীয় তরঙ্গের জন্য প্রস্তুত – আসলে অনেক বড় একটি তরঙ্গ।”

জয়েন্ট চিফস চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন সাংবাদিকদের জানান যে ট্রাম্প শুক্রবার রাতে মিশনের চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছিলেন। মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেছেন যে মাদুরো মার্কিন হেফাজতে রয়েছেন এবং তাকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বিচারের মুখোমুখি করা হবে বলে আশা করা হচ্ছে। মার্কিন ফেডারেল এভিয়েশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন ভেনেজুয়েলার আকাশসীমায় মার্কিন বিমান চলাচল নিষিদ্ধ করে একটি নোটিশ জারি করেছে।

মাদুরোর বিশাল সেনা ও জনমিলিশিয়া মার্কিন নৌবহরের মোকাবিলায় তৈরি

ট্রাম্পের ভেনেজুয়েলা “পরিচালনা” করার ঘোষণা

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার সংবাদ সম্মেলনে স্পষ্টভাবে বলেন, “আমরা দেশটি পরিচালনা করতে যাচ্ছি যতক্ষণ না আমরা একটি নিরাপদ, যথাযথ এবং বিচক্ষণ ক্ষমতা হস্তান্তর করতে পারি।” তিনি আরও ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে এই উদ্দেশ্যে মার্কিন সৈন্য মোতায়েন করা হতে পারে। ট্রাম্প দাবি করেন যে রুবিও ভেনেজুয়েলার ভাইস প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজের সাথে যোগাযোগ করেছেন এবং তিনি নাকি বলেছেন, “আমরা যা প্রয়োজন তা করব।” তবে রদ্রিগেজ লাইভ টেলিভিশনে মাদুরোকে ভেনেজুয়েলার “একমাত্র প্রেসিডেন্ট” বলে অভিহিত করেছেন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে তাকে এবং তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে মুক্তি দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।

ট্রাম্প আরও বলেন যে মার্কিন তেল কোম্পানিগুলো ভেনেজুয়েলায় গিয়ে “বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ব্যয় করবে, ভগ্ন অবকাঠামো, তেল অবকাঠামো মেরামত করবে এবং দেশের জন্য অর্থ উপার্জন শুরু করবে।” এই বক্তব্য ভেনেজুয়েলার তেল সম্পদের ওপর মার্কিন নিয়ন্ত্রণের স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয়, যা অনেক আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক এবং দেশের কাছে উদ্বেগজনক।

আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ

ওয়াশিংটন অফিস অন লাতিন আমেরিকা (WOLA) তাদের বিবৃতিতে স্পষ্টভাবে বলেছে যে “এই একতরফা মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপ আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে।” ট্রাম্প প্রশাসন কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়াই এই হামলা পরিচালনা করেছে, যা রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক যুদ্ধ ক্ষমতার সীমা লঙ্ঘন করে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে আত্মরক্ষার কোনো বৈধ দাবি নেই বলে মনে হচ্ছে।

জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস মার্কিন পদক্ষেপকে “একটি বিপজ্জনক নজির” হিসেবে অভিহিত করেছেন। তার মুখপাত্র স্তেফান দুজারিক একটি বিবৃতিতে বলেন যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জাতিসংঘ সনদ লঙ্ঘন করেছে, যাতে বলা হয়েছে: “সকল সদস্যরা তাদের আন্তর্জাতিক সম্পর্কে কোনো রাষ্ট্রের আঞ্চলিক অখণ্ডতা বা রাজনৈতিক স্বাধীনতার বিরুদ্ধে শক্তি ব্যবহার বা হুমকি থেকে বিরত থাকবে।” জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ এই বিষয়ে সোমবার একটি জরুরি বৈঠক করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর তীব্র প্রতিক্রিয়া

ব্রাজিলের নিন্দা

লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর মধ্যে ব্রাজিল সবচেয়ে কঠোর বিবৃতি দিয়েছে। প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা বলেছেন যে এই অভিযান একটি অগ্রহণযোগ্য সীমা অতিক্রম করেছে এবং এটি “সমগ্র আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য আরেকটি অত্যন্ত বিপজ্জনক নজির।” এক্সে (পূর্বে টুইটার) একটি পোস্টে লুলা মন্তব্য করেন, “এই পদক্ষেপ লাতিন আমেরিকা এবং ক্যারিবিয়ান অঞ্চলের রাজনীতিতে হস্তক্ষেপের সবচেয়ে অন্ধকারময় দিনগুলোর কথা মনে করিয়ে দেয় এবং শান্তির অঞ্চল হিসাবে এই অঞ্চলের খ্যাতির জন্য ঝুঁকি তৈরি করে।”

কলম্বিয়ার উদ্বেগ

প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রো কলম্বিয়ার জাতীয় নিরাপত্তা বৈঠক আহ্বান করেন এবং প্রতিবেশী ভেনেজুয়েলা থেকে “শরণার্থীদের ব্যাপক আগমনের” সম্ভাবনার জন্য প্রস্তুতি নিতে সীমান্তে নিরাপত্তা বাহিনী পাঠান। তিনি বলেন যে তিনি জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদকে “ভেনেজুয়েলা এবং লাতিন আমেরিকার সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে আগ্রাসন” বিবেচনা করার জন্য আহ্বান জানাবেন। ব্রাজিল, রাশিয়া এবং মেক্সিকো এই প্রস্তাবকে সমর্থন দিয়েছে।

মেক্সিকো ও কিউবার প্রতিক্রিয়া

মেক্সিকো মার্কিন সামরিক পদক্ষেপ প্রত্যাখ্যান করেছে এবং জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের জরুরি বৈঠকের পক্ষে সমর্থন দিয়েছে। কিউবার প্রেসিডেন্ট মিগুয়েল দিয়াজ-ক্যানেল মার্কিন পদক্ষেপকে “অপরাধমূলক হামলা” হিসাবে নিন্দা করেছেন এবং অবিলম্বে আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপের আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি মার্কিন অভিযানকে “রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসবাদ” হিসাবে বর্ণনা করেছেন যা শুধুমাত্র ভেনেজুয়েলা নয়, সমগ্র লাতিন আমেরিকাকে লক্ষ্য করে। বিশ্বব্যাপী কিউবান দূতাবাসগুলো সামরিক পদক্ষেপের নিন্দা জানিয়ে এবং জরুরি বৈশ্বিক প্রতিক্রিয়া দাবি করে বিবৃতি জারি করেছে।

চিলির বক্তব্য

চিলির প্রেসিডেন্ট গ্যাব্রিয়েল বরিক লুলার বক্তব্যের প্রতিধ্বনি করেছেন। তিনি বলেছেন, “আজ ভেনেজুয়েলা। আগামীকাল এটি যে কেউ হতে পারে।” এই বক্তব্য লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর মধ্যে গভীর উদ্বেগ প্রতিফলিত করে যে এই ধরনের হস্তক্ষেপ একটি নজির তৈরি করতে পারে।

বৈশ্বিক শক্তিগুলোর অবস্থান

রাশিয়ার নিন্দা

রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তার টেলিগ্রাম চ্যানেলে একটি বিবৃতিতে মার্কিন “সশস্ত্র আগ্রাসনের” কাজ হিসাবে নিন্দা করেছে। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, “ভেনেজুয়েলাকে অবশ্যই কোনো ধ্বংসাত্মক, আরো সামরিক, বাইরের হস্তক্ষেপ ছাড়াই নিজের ভাগ্য নির্ধারণের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।” মন্ত্রণালয় আরও বৃদ্ধি রোধ করতে সংলাপের আহ্বান জানিয়েছে এবং বলেছে যে এটি ভেনেজুয়েলার জনগণ এবং সরকারের সাথে তার “সংহতি” পুনর্ব্যক্ত করে। রাশিয়া জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের জরুরি বৈঠকের আহ্বানকে সমর্থন করেছে।

চীনের তীব্র সমালোচনা

চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্র বলেছেন যে দেশটি “একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র এবং তার রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রকাশ্য শক্তি ব্যবহারকে দৃঢ়ভাবে নিন্দা করে।” চীন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে ভেনেজুয়েলার সরকারকে “উৎখাত করা বন্ধ” করতে এবং মাদুরোকে মুক্তি দিতে আহ্বান জানিয়েছে। চীন ও রাশিয়া উভয়ই ভেনেজুয়েলার দীর্ঘদিনের মিত্র এবং বাণিজ্যিক অংশীদার, তবে এখন পর্যন্ত কোনো দেশই ভেনেজুয়েলার সরকারকে সরাসরি সমর্থন করার জন্য কোনো সামরিক বা অন্যান্য সরাসরি পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলেনি।

ভেনিজুয়েলায় ‘অপারেশন সাউদার্ন স্পিয়ার’: সস্ত্রীক প্রেসিডেন্ট মাদুরোকে বন্দি করল আমেরিকা, ভারতীয়দের সতর্কবার্তা বিদেশ মন্ত্রকের

ইরানের প্রতিক্রিয়া

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও এই হামলার নিন্দা করেছে। ভেনেজুয়েলার মাদুরো সরকারের একজন সমর্থক এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের প্রতিপক্ষ হিসাবে, ইরান এই সামরিক পদক্ষেপকে আন্তর্জাতিক আইন এবং সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন হিসাবে দেখছে।

ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ইউরোপীয় দেশগুলোর সতর্ক অবস্থান

ইউরোপীয় ইউনিয়নের বক্তব্য

ইউরোপীয় নেতারা সতর্কতার সাথে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। ইইউর পররাষ্ট্র নীতি প্রধান কাজা কাল্লাস ইঙ্গিত দিয়েছেন যে তিনি পররাষ্ট্র মন্ত্রী মার্কো রুবিওর সাথে ভেনেজুয়েলার ঘটনাবলী সম্পর্কে যোগাযোগ করেছেন। সোশ্যাল মিডিয়ায় তিনি উল্লেখ করেছেন, “ইইউ পরিস্থিতি মনোযোগ সহকারে পর্যবেক্ষণ করছে। ইইউ বারবার নিশ্চিত করেছে যে মাদুরোর বৈধতা নেই এবং শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তরকে সমর্থন করেছে। সকল পরিস্থিতিতে, আন্তর্জাতিক আইন এবং জাতিসংঘ সনদের নীতিগুলো অবশ্যই মেনে চলতে হবে। আমরা সংযম এবং অঞ্চলে ইইউ নাগরিকদের নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার পক্ষে।”

ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট আন্তোনিও কস্তা বলেছেন যে ইইউ ভেনেজুয়েলায় উত্তেজনা হ্রাস চায় এবং “শান্তিপূর্ণ, গণতান্ত্রিক এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাধানকে” সমর্থন অব্যাহত রাখবে।

স্পেনের মধ্যস্থতার প্রস্তাব

স্পেন, লাতিন আমেরিকার সাথে তার শক্তিশালী সম্পর্কের কারণে, সংকট নিরসনে মধ্যস্থতা করার প্রস্তাব দিয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একটি বিবৃতিতে বলেছে, “স্পেন উত্তেজনা হ্রাস এবং সংযম আহ্বান করে।” বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে যে স্পেন “বর্তমান সংকটের শান্তিপূর্ণ, আলোচনামূলক সমাধান অর্জনের জন্য তার ভালো অফিস প্রদান করতে প্রস্তুত।” স্প্যানিশ প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ বলেছেন যে এটি আন্তর্জাতিক আইনি মান লঙ্ঘন করে।

যুক্তরাজ্য, জার্মানি ও ফ্রান্সের অবস্থান

যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কেয়ার স্টারমার বলেছেন যে তার দেশ মাদুরোর ক্ষমতাচ্যুতির জন্য “কোনো অশ্রুপাত করবে না” তবে আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছেন, যদিও তিনি স্পষ্ট করেননি যে সেই সমর্থনের অর্থ কী। জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মার্জ অভিযানটিকে “জটিল” হিসাবে বর্ণনা করেছেন, ইঙ্গিত দিয়েছেন যে জার্মানি এটি বিশ্লেষণ করতে সময় নেবে। ফরাসি পররাষ্ট্র মন্ত্রী জ্যঁ-নোয়েল বারট বলেছেন যে সামরিক অভিযান আন্তর্জাতিক আইনের ভিত্তিগত শক্তি ব্যবহার না করার নীতির বিরোধী।

অনেক ইউরোপীয় মিত্র একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করছে, আন্তর্জাতিক আইন স্বীকার করার পাশাপাশি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে উত্তেজিত করা এড়াতে স্পষ্ট ভিন্নমত থেকে বিরত থাকছে।

বিভিন্ন দেশের প্রতিক্রিয়া: তুলনামূলক সারণী

দেশ/সংস্থা প্রতিক্রিয়ার ধরন মূল বক্তব্য
ব্রাজিল তীব্র নিন্দা “অগ্রহণযোগ্য সীমা অতিক্রম”, “বিপজ্জনক নজির”
কলম্বিয়া নিন্দা ও প্রস্তুতি জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠক আহ্বান, শরণার্থী সংকটের প্রস্তুতি
চীন দৃঢ় নিন্দা “সার্বভৌম রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে শক্তি ব্যবহার”, মাদুরো মুক্তির দাবি
রাশিয়া নিন্দা ও সংহতি “সশস্ত্র আগ্রাসন”, ভেনেজুয়েলার সাথে সংহতি
কিউবা তীব্র নিন্দা “অপরাধমূলক হামলা”, “রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসবাদ”
মেক্সিকো নিন্দা জাতিসংঘ বৈঠক সমর্থন
চিলি উদ্বেগ ও নিন্দা “আগামীকাল যে কেউ হতে পারে”
স্পেন সতর্ক সমালোচনা মধ্যস্থতার প্রস্তাব, আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন
ইউরোপীয় ইউনিয়ন সতর্ক সংযমের আহ্বান, আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলার জোর
যুক্তরাজ্য মিশ্র মাদুরোর জন্য “কোনো অশ্রুপাত নয়”, কিন্তু আন্তর্জাতিক আইনের সমর্থন
ফ্রান্স সমালোচনা শক্তি ব্যবহার না করার নীতি লঙ্ঘন
জার্মানি সতর্ক “জটিল” পরিস্থিতি, বিশ্লেষণের প্রয়োজন
ইরান নিন্দা আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন
জাতিসংঘ গভীর উদ্বেগ “বিপজ্জনক নজির”, জাতিসংঘ সনদ লঙ্ঘন

 

জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের জরুরি বৈঠক

জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ সোমবার ভেনেজুয়েলায় মার্কিন পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা করার জন্য একটি জরুরি বৈঠকের আয়োজন করবে। কলম্বিয়া, রাশিয়া এবং চীন এই বৈঠকের অনুরোধ করেছে। জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস সতর্ক করে দিয়েছেন যে এই পদক্ষেপ একটি বিপজ্জনক নজির স্থাপন করে এবং আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করতে পারে।

মার্কিন সামরিক পদক্ষেপের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে কারণ ট্রাম্প প্রশাসন কংগ্রেসকে অগ্রিম জানায়নি। ট্রাম্প প্রশাসনের সদস্যরা এবং রিপাবলিকান আইনপ্রণেতারা হামলা এবং গ্রেপ্তারের বৈধতা রক্ষা করে বলেছেন যে এটি সামরিক সহায়তা সহ একটি আইন প্রয়োগকারী পদক্ষেপ, যার জন্য রাষ্ট্রপতির “অন্তর্নিহিত সাংবিধানিক কর্তৃত্ব” রয়েছে।

ভেনেজুয়েলার সরকার ও জনগণের প্রতিক্রিয়া

মার্কিন বোমা হামলার প্রতিক্রিয়ায়, মাদুরোর প্রশাসন পদক্ষেপগুলোকে “অত্যন্ত গুরুতর সামরিক আগ্রাসন” হিসাবে চিহ্নিত করেছে। ভেনেজুয়েলা সরকার একটি বিবৃতিতে প্রকাশ করেছে, “ভেনেজুয়েলা প্রত্যাখ্যান করে, অস্বীকার করে এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান সরকারের ভেনেজুয়েলার ভূখণ্ড এবং জনগণের বিরুদ্ধে অত্যন্ত গুরুতর সামরিক আগ্রাসনের আন্তর্জাতিক নিন্দা করে।”

বিবৃতিতে আরও বলা হয় যে মাদুরো “সমস্ত জাতীয় প্রতিরক্ষা পরিকল্পনা বাস্তবায়নের” আদেশ দিয়েছিলেন এবং “বাহ্যিক ঝামেলার অবস্থা” ঘোষণা করেছিলেন। বিবৃতিতে “দেশের সকল সামাজিক ও রাজনৈতিক শক্তিকে সংগঠন পরিকল্পনা সক্রিয় করতে এবং এই সাম্রাজ্যবাদী আক্রমণের নিন্দা করার” আহ্বান জানানো হয়েছে। কারাকাসের দক্ষিণাঞ্চলে বিদ্যুৎ বিভ্রাট ঘটেছে বলে জানা গেছে।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: লাতিন আমেরিকায় মার্কিন হস্তক্ষেপ

এটি লাতিন আমেরিকায় মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপের প্রথম ঘটনা নয়। ঐতিহাসিকভাবে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই অঞ্চলে বহুবার সামরিক পদক্ষেপ নিয়েছে। ১৯৮৯ সালে প্রেসিডেন্ট জর্জ এইচ.ডব্লিউ. বুশ পানামায় সৈন্য পাঠিয়েছিলেন এবং ম্যানুয়েল নরিয়েগাকে গ্রেপ্তার করেছিলেন। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন যে ভেনেজুয়েলার পরিস্থিতি ভিন্ন কারণ দেশটি অনেক বড় এবং জটিল।

অনেক লাতিন আমেরিকার নেতা এবং বিশ্লেষক এই পদক্ষেপকে “সাম্রাজ্যবাদী হস্তক্ষেপ” হিসাবে দেখছেন এবং উদ্বেগ প্রকাশ করছেন যে এটি অঞ্চলে আরও অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করতে পারে। লুলার বক্তব্য, “এই পদক্ষেপ লাতিন আমেরিকা এবং ক্যারিবিয়ান রাজনীতিতে হস্তক্ষেপের সবচেয়ে অন্ধকার দিনগুলোর কথা মনে করিয়ে দেয়,” এই ঐতিহাসিক উদ্বেগকে প্রতিফলিত করে।

তেল সম্পদের প্রশ্ন

ভেনেজুয়েলায় বিশ্বের সবচেয়ে বড় প্রমাণিত তেল মজুদ রয়েছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের মন্তব্য যে মার্কিন তেল কোম্পানিগুলো “বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ব্যয় করবে” এবং তেল অবকাঠামো মেরামত করবে, এটি স্পষ্ট করে দেয় যে তেল সম্পদ এই হস্তক্ষেপের একটি প্রধান উদ্দেশ্য হতে পারে।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার তেল শিল্পকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করছে, যা দশকের বেশি সময় ধরে দুর্ব্যবস্থাপনা এবং অর্থনৈতিক সংকটের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে এই পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক আইন এবং সার্বভৌমত্বের নীতির সাথে সাংঘর্ষিক কিনা তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে।

রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাটদের মতামত

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে, এই পদক্ষেপ নিয়ে বিভক্তি রয়েছে। রিপাবলিকান সিনেটর মাইক লি বলেছেন যে পররাষ্ট্র মন্ত্রী মার্কো রুবিও “মাদুরো মার্কিন হেফাজতে থাকায় ভেনেজুয়েলায় আর কোনো পদক্ষেপের প্রত্যাশা করেন না।” তিনি আরও বলেছেন যে মাদুরো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বিচারের মুখোমুখি হবেন বলে আশা করা হচ্ছে।

তবে ডেমোক্র্যাট সদস্য এবং কিছু রিপাবলিকানও কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়াই এই পদক্ষেপ নেওয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। সাংবিধানিক আইনবিদরা বলছেন যে রাষ্ট্রপতির যুদ্ধ ক্ষমতার সীমা রয়েছে এবং এই ধরনের বড় সামরিক অভিযানের জন্য কংগ্রেসের অনুমোদন প্রয়োজন।

ভবিষ্যতের সম্ভাবনা ও উদ্বেগ

বিশ্লেষকরা এই পদক্ষেপের দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব নিয়ে উদ্বিগ্ন। প্রশ্ন উঠছে যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কতদিন ভেনেজুয়েলা “পরিচালনা” করবে এবং একটি “নিরাপদ ক্ষমতা হস্তান্তর” কীভাবে হবে। ভেনেজুয়েলায় সৈন্য মোতায়েন করা হলে এটি একটি দীর্ঘস্থায়ী দখলদারিতে পরিণত হতে পারে কিনা তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের একজন সিনিয়র ফেলো মন্তব্য করেছেন যে ইউরোপীয় দেশগুলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নির্দিষ্ট আচরণের ওপর নির্ভর করত যা এখন আর কার্যকর নাও হতে পারে। ডেনমার্ক সতর্ক প্রতিক্রিয়া দিয়েছে কারণ তারা মার্কিন স্বার্থের প্রেক্ষাপটে গ্রীনল্যান্ডের কৌশলগত গুরুত্ব স্বীকার করে।

কলম্বিয়ার শরণার্থী সংকটের প্রস্তুতি ইঙ্গিত দেয় যে অঞ্চলটি বড় ধরনের মানবিক সংকটের জন্য প্রস্তুত হচ্ছে। ভেনেজুয়েলা থেকে ইতিমধ্যে লক্ষ লক্ষ মানুষ গত কয়েক বছরে অর্থনৈতিক সংকটের কারণে পালিয়েছে, এবং এই সামরিক পদক্ষেপ আরও বেশি মানুষকে বাস্তুচ্যুত করতে পারে।

আন্তর্জাতিক আইনি বিশেষজ্ঞদের মতামত

আন্তর্জাতিক আইনি বিশেষজ্ঞরা বলছেন যে এই পদক্ষেপ জাতিসংঘ সনদের স্পষ্ট লঙ্ঘন। সনদের ২(৪) অনুচ্ছেদ স্পষ্টভাবে বলে যে সদস্য রাষ্ট্রগুলো “তাদের আন্তর্জাতিক সম্পর্কে কোনো রাষ্ট্রের আঞ্চলিক অখণ্ডতা বা রাজনৈতিক স্বাধীনতার বিরুদ্ধে শক্তি ব্যবহার বা হুমকি থেকে বিরত থাকবে।”

জাতিসংঘ সনদ শুধুমাত্র দুটি পরিস্থিতিতে শক্তি ব্যবহারের অনুমতি দেয়: (১) আত্মরক্ষার জন্য, বা (২) জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদনে। এই ক্ষেত্রে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আত্মরক্ষার কোনো বৈধ দাবি করতে পারে না কারণ ভেনেজুয়েলা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আক্রমণ করেনি, এবং জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের কোনো অনুমোদনও ছিল না।

ভেনেজুয়েলায় মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপ এবং প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর গ্রেপ্তার আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এবং আন্তর্জাতিক আইনের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় চিহ্নিত করেছে। লাতিন আমেরিকা থেকে এশিয়া এবং ইউরোপ পর্যন্ত বিশ্বের প্রতিক্রিয়া গভীর বিভাজন প্রকাশ করে – লাতিন আমেরিকার দেশগুলো এবং চীন ও রাশিয়ার মতো বৈশ্বিক শক্তিগুলো তীব্র নিন্দা জানালেও ইউরোপীয় মিত্ররা আরও সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। জাতিসংঘ মহাসচিব এটিকে “বিপজ্জনক নজির” হিসাবে চিহ্নিত করেছেন এবং জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের জরুরি বৈঠক আহ্বান করা হয়েছে। ট্রাম্পের ভেনেজুয়েলা “পরিচালনা” করার ঘোষণা এবং মার্কিন তেল কোম্পানিগুলোর সম্পৃক্ততার ইঙ্গিত এই হস্তক্ষেপের প্রকৃত উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। এই ঘটনা শুধুমাত্র ভেনেজুয়েলার জন্যই নয়, সমগ্র আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার জন্য দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলতে পারে, যেখানে সার্বভৌমত্ব এবং আন্তর্জাতিক আইনের নীতিগুলো চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে

 

About Author
Avatar

আন্তর্জাতিক খবরের সর্বশেষ আপডেট, গভীর বিশ্লেষণ এবং বিশ্বের প্রভাবশালী ঘটনাবলীর বিস্তারিত প্রতিবেদন পেতে আমাদের International Desk-এ আসুন। বিশ্বের প্রতিটি প্রান্তের গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ, রাজনৈতিক গতিবিধি, অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং সাংস্কৃতিক ঘটনাবলী সম্পর্কে জানতে এই পাতাটি আপনার একমাত্র গন্তব্য।

আরও পড়ুন