২০২৬ সালের ৩রা জানুয়ারি—দিনটি সম্ভবত লাতিন আমেরিকার ইতিহাসে, তথা বিশ্ব ভূ-রাজনীতির পাতায় এক নজিরবিহীন দিন হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। শনিবার ভোরের আলো ফোটার আগেই ভেনিজুয়েলার মাটি কেঁপে উঠল মার্কিন বোমারু বিমানের গর্জনে। কারাকাসের আকাশে তখন আগুনের ফুলকি, আর মাটিতে চলছিল এক শ্বাসরুদ্ধকর কমান্ডো অপারেশন। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ওয়াশিংটন থেকে এল সেই বার্তা, যা শুনে স্তম্ভিত গোটা বিশ্ব। ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো এবং তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে গ্রেফতার করেছে মার্কিন স্পেশাল ফোর্স।
পানামায় ম্যানুয়েল নরিয়েগাকে গ্রেফতারের ঘটনার পর লাতিন আমেরিকার কোনো ক্ষমতাসীন রাষ্ট্রপ্রধানকে এভাবে ভিনদেশি বাহিনীর হাতে বন্দি হতে দেখা—এক কথায় আধুনিক ইতিহাসে বিরল। এই ঘটনার ঠিক পরেই ভারতীয় বিদেশ মন্ত্রক (MEA) ভেনিজুয়েলায় থাকা ভারতীয়দের জন্য জারি করেছে জরুরি সতর্কতা।
এই বিশেষ প্রতিবেদনে আমরা বিশ্লেষণ করব এই ঘটনার আদ্যপান্ত, কেন এই অপারেশন, কীভাবে তা বাস্তবায়িত হলো, এবং ভারত ও বিশ্ব অর্থনীতির ওপর এর কী প্রভাব পড়তে চলেছে।
মধ্যরাতের অপারেশন: কারাকাসে ঠিক কী ঘটেছিল?
শনিবার ভোররাতে যখন কারাকাসের সাধারণ মানুষ ঘুমের ঘোরে, তখন শহরের আকাশসীমায় প্রবেশ করে মার্কিন ডেল্টা ফোর্সের একাধিক চপার এবং যুদ্ধবিমান। পেন্টাগন সূত্রে খবর, এই অভিযানের নাম দেওয়া হয়েছিল ‘অপারেশন সাউদার্ন স্পিয়ার’ (Operation Southern Spear)।
প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, কারাকাসের মিরাফ্লোরেস প্যালেস (প্রেসিডেন্সিয়াল প্যালেস) এবং ফোর্ট টিউনা মিলিটারি বেসের আশেপাশে ব্যাপক বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ (Truth Social) এক বিবৃতিতে জানান, মার্কিন বাহিনী সফলভাবে একটি বড়সড় সামরিক অভিযান চালিয়েছে।
মাদুরোর বিশাল সেনা ও জনমিলিশিয়া মার্কিন নৌবহরের মোকাবিলায় তৈরি
অপারেশন ডিটেইলস:
-
লক্ষ্যবস্তু: নিকোলাস মাদুরো এবং ভেনিজুয়েলার ‘ফার্স্ট কমব্যাট্যান্ট’ (ফার্স্ট লেডি) সিলিয়া ফ্লোরেস।
-
সময়: শনিবার ভোররাত (স্থানীয় সময়)।
-
বাহিনী: ইউএস ডেল্টা ফোর্স এবং নেভি সিলস-এর যৌথ দল।
-
ফলাফল: মাদুরো এবং তাঁর স্ত্রীকে তাদের বাসভবন থেকে আটক করে হেলিকপ্টারে করে মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ‘ইউএসএস ইও জিমা’ (USS Iwo Jima)-তে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখান থেকে তাঁদের নিউ ইয়র্কে নিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি চলছে।
হোয়াইট হাউসের তরফে প্রকাশিত ছবিতে দেখা গেছে, এক সময়ের দোর্দণ্ডপ্রতাপ সমাজতান্ত্রিক নেতা মাদুরোকে হাতকড়া পরানো অবস্থায় যুদ্ধজাহাজে বসিয়ে রাখা হয়েছে, তাঁর চোখে বাঁধা রয়েছে কাপড়।
কেন এই গ্রেফতার? ‘নারকো-টেররিজম’ ও মার্কিন অভিযোগ
এই গ্রেফতারি কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, বরং দীর্ঘদিনের মার্কিন নিষেধাজ্ঞার চূড়ান্ত পরিণতি। ২০২০ সাল থেকেই নিকোলাস মাদুরোর মাথার ওপর ১৫ মিলিয়ন ডলারের পুরস্কার ঘোষণা করে রেখেছিল আমেরিকা। মার্কিন বিচার বিভাগ বা ডিপার্টমেন্ট অফ জাস্টিস (DOJ) মাদুরো এবং তাঁর ঘনিষ্ঠদের বিরুদ্ধে ‘নারকো-টেররিজম’ বা মাদক-সন্ত্রাসবাদের অভিযোগ এনেছিল।
প্রধান অভিযোগসমূহ:
১. মাদক পাচার: অভিযোগ, মাদুরো কলম্বিয়ার ফার্ক (FARC) বিদ্রোহীদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে ভেনিজুয়েলা হয়ে আমেরিকায় কোকেন পাচারের এক বিশাল সিন্ডিকেট চালাচ্ছিলেন। একে বলা হয় ‘কার্টেল অফ দ্য সানস’ (Cartel of the Suns)।
২. সন্ত্রাসবাদে মদত: হিজবুল্লাহ এবং অন্যান্য কট্টরপন্থী গোষ্ঠীকে আশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ।
৩. মানবাধিকার লঙ্ঘন: বিরোধীদের দমন, বিচারবহির্ভূত হত্যা এবং নির্বাচনে কারচুপি।
মার্কিন অ্যাটর্নি জেনারেল প্যাম বন্ডি (Pam Bondi) জানিয়েছেন, মাদুরো এবং সিলিয়া ফ্লোরেসকে নিউ ইয়র্কের সাউদার্ন ডিস্ট্রিক্ট কোর্টে বিচার করা হবে। ফ্লোরেস, যিনি ভেনিজুয়েলার রাজনীতিতে অত্যন্ত প্রভাবশালী এবং মাদুরোর ‘ডান হাত’ হিসেবে পরিচিত, তাঁর বিরুদ্ধেও মাদক পাচার এবং অর্থ পাচারের গুরুতর অভিযোগ রয়েছে।
ভারতের প্রতিক্রিয়া ও বিদেশ মন্ত্রকের জরুরি সতর্কতা
এই অস্থির পরিস্থিতির মধ্যে নয়াদিল্লির সাউথ ব্লকে দেখা গেছে চরম তৎপরতা। ভেনিজুয়েলায় এই মুহূর্তে খুব বেশি ভারতীয় না থাকলেও, যারা আছেন তাঁদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন ভারত সরকার। শনিবার রাতেই বিদেশ মন্ত্রক (MEA) একটি জরুরি নির্দেশিকা জারি করে।
বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্রের তরফে বলা হয়েছে:
“ভেনিজুয়েলার সাম্প্রতিক পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে, ভারতীয় নাগরিকদের পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত দেশটিতে সমস্ত রকম অপ্রয়োজনীয় ভ্রমণ এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।”
নির্দেশিকায় ভারতীয়দের জন্য করণীয়:
-
ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা: একান্ত প্রয়োজন না হলে ভেনিজুয়েলা যাত্রা বাতিল করতে বলা হয়েছে।
-
সীমাবদ্ধ চলাচল: যারা ইতিমধ্যেই ভেনিজুয়েলায় আছেন, তাঁদের বাড়ির বাইরে বের হতে বারণ করা হয়েছে এবং নিরাপদ আশ্রয়ে থাকতে বলা হয়েছে।
-
যোগাযোগ: কারাকাসের ভারতীয় দূতাবাসের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতে বলা হয়েছে। বিদেশ মন্ত্রক একটি জরুরি হেল্পলাইন নম্বর (+58-412-9584288) এবং ইমেল আইডি (cons.caracas@mea.gov.in) চালু করেছে।
ভারতে ভেনিজুয়েলার তেলের একটি বড় বাজার রয়েছে এবং বেশ কিছু ভারতীয় পেশাদার ভেনিজুয়েলার তেল শিল্পে কর্মরত। ওএনজিসি বিদেশ লিমিটেড (OVL)-এর বিনিয়োগও রয়েছে সেখানে। ফলে, মাদুরোর পতন এবং পরবর্তী অরাজকতা ভারতের স্বার্থে আঘাত হানতে পারে কি না, সেদিকে কড়া নজর রাখছে নয়াদিল্লি।
ভেনিজুয়েলার অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি: ক্ষমতার শূন্যতা ও গৃহযুদ্ধের আশঙ্কা
মাদুরোর গ্রেফতারের পর ভেনিজুয়েলায় এক অদ্ভুত শূন্যতা তৈরি হয়েছে। ভাইস প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ (Delcy Rodríguez) রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে এসে এই ঘটনাকে ‘অপহরণ’ বলে অভিহিত করেছেন এবং মাদুরোর ‘প্রুফ অফ লাইফ’ বা তিনি যে জীবিত আছেন, তার প্রমাণ দাবি করেছেন।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, এখন দেশটির শাসনভার কার হাতে?
-
মার্কিন পরিকল্পনা: ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, একটি “নিরাপদ ও গণতান্ত্রিক পরিবর্তন” না হওয়া পর্যন্ত আমেরিকা ভেনিজুয়েলার নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রাখবে।
-
সেনাবাহিনীর ভূমিকা: ভেনিজুয়েলার সেনাবাহিনী এতকাল মাদুরোর অনুগত ছিল। এখন তারা মার্কিন নির্দেশ মেনে ব্যারাকে ফিরে যাবে, নাকি পাল্টা লড়াই করবে—তার ওপর নির্ভর করছে দেশটির ভবিষ্যৎ। ইতিমধ্যেই কারাকাসের রাস্তায় বিক্ষিপ্ত সংঘর্ষের খবর পাওয়া গেছে।
বিরোধী নেত্রী মারিয়া করিনা মাচাদো, যিনি দীর্ঘকাল মাদুরোর বিরুদ্ধে লড়াই করছেন, তিনি এই ঘটনাকে “মুক্তির মুহূর্ত” বলে অভিহিত করেছেন। তবে মাচাদো বা অন্য কোনো বিরোধী নেতা এখনই ক্ষমতা গ্রহণ করতে পারবেন কি না, তা স্পষ্ট নয়।
বিশ্ব রাজনীতির দাবার চাল: রাশিয়া ও চিনের প্রতিক্রিয়া
মাদুরোর ভেনিজুয়েলা ছিল লাতিন আমেরিকায় রাশিয়া ও চিনের সবচেয়ে বড় ঘাঁটি। ভেনিজুয়েলার তেল শিল্পে চিনের বিশাল ঋণ এবং রাশিয়ার সামরিক উপস্থিতি আমেরিকার জন্য বরাবরই মাথাব্যথার কারণ ছিল।
-
রাশিয়া: ক্রেমলিন এই ঘটনাকে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন বলে তীব্র নিন্দা করেছে। মস্কো হুঁশিয়ারি দিয়েছে যে, ভেনিজুয়েলায় স্থিতিশীলতা নষ্ট হলে তার ফল ভালো হবে না।
-
চিন: বেজিং সংযত প্রতিক্রিয়া দিলেও, তাদের বিপুল বিনিয়োগের ভবিষ্যৎ নিয়ে তারা চিন্তিত।
ফ্রান্সের চাঞ্চল্যকর দাবি: স্ট্যাচু অব লিবার্টি ফেরত চাইলেন ফরাসি এমপি
বিশ্লেষকদের মতে, ইউক্রেন এবং গাজার পর এবার ভেনিজুয়েলা হতে পারে পরাশক্তিগুলোর নতুন সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দু। আমেরিকা চাইবে দ্রুত সেখানে একটি পশ্চিম-পন্থী সরকার বসাতে, যাতে তারা ভেনিজুয়েলার বিপুল তেল ভাণ্ডারের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারে এবং ওই অঞ্চল থেকে রুশ-চিনা প্রভাব মুছে ফেলতে পারে।
অর্থনৈতিক প্রভাব: তেলের বাজার ও ভারত
ভেনিজুয়েলায় বিশ্বের বৃহত্তম অপরিশোধিত তেলের ভাণ্ডার রয়েছে। মাদুরোর জমানায় মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে এই তেল বিশ্ব বাজারে ঠিকমতো আসতে পারছিল না।
ভারতের ওপর প্রভাব: ১. তেলের দাম: যদি আমেরিকা দ্রুত ভেনিজুয়েলার তেলের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয় এবং নতুন সরকারের মাধ্যমে তেল উৎপাদন বাড়ায়, তবে বিশ্ব বাজারে তেলের দাম কমতে পারে। এটি ভারতের মতো তেল আমদানিকারক দেশের জন্য সুখবর হতে পারে। ২. বিনিয়োগ ফেরত: ভেনিজুয়েলায় আটকে থাকা ভারতের প্রায় ৫০০ মিলিয়ন ডলারের ডিভিডেন্ড (OVL-এর পাওনা) ফেরত পাওয়ার একটি রাস্তা খুলতে পারে যদি নতুন সরকার আমেরিকার সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখে।
তবে স্বল্পমেয়াদে, যুদ্ধের পরিস্থিতি এবং অস্থিতিশীলতার কারণে তেলের দামে সাময়িক অস্থিরতা দেখা দিতে পারে।
লাতিন আমেরিকার নতুন ভোর নাকি দীর্ঘ অন্ধকার?
নিকোলাস মাদুরোর গ্রেফতার লাতিন আমেরিকার রাজনীতিতে ‘বলিভারিয়ান বিপ্লব’-এর কফিনে শেষ পেরেক হতে পারে। হুগো চাভেজের তৈরি করা সমাজতান্ত্রিক দুর্গ আজ মার্কিন বুটের তলায়।
আমেরিকা একে ‘গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার’ বললেও, ইতিহাস সাক্ষী—ইরাক বা লিবিয়ায় বা লিবিয়ায় সরকার পরিবর্তনের ফলাফল সবসময় সুখকর হয়নি। ভেনিজুয়েলার সাধারণ মানুষ, যারা গত এক দশক ধরে মুদ্রাস্ফীতি, অনাহার এবং ওষুধের অভাবে ধুঁকছে, তাদের জন্য এই পরিবর্তন কি সত্যিই মুক্তি আনবে, নাকি দেশকে ঠেলে দেবে দীর্ঘস্থায়ী গৃহযুদ্ধের দিকে?
ভারতের জন্য এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—সেখানে আটকে থাকা নাগরিকদের নিরাপদে দেশে ফেরানো এবং পরিবর্তিত ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে নিজেদের শক্তির ভারসাম্য বজায় রাখা। আগামী কয়েক সপ্তাহ কারাকাসের অলিতে-গলিতে যে ইতিহাস লেখা হবে, তার দিকে তাকিয়ে থাকবে গোটা বিশ্ব।











