ভগবান বিষ্ণুর প্রণাম মন্ত্র হল হিন্দুধর্মের অন্যতম শক্তিশালী এবং গভীর অর্থবহ স্তোত্র। এটি কেবল একটি প্রণাম জানানোর মন্ত্র নয়, এটি বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের পালনকর্তার সম্পূর্ণ রূপ, গুণ এবং দর্শনের একটি সংক্ষিপ্ত সার। এই মন্ত্রটি পাঠ করার মাধ্যমে একজন ভক্ত ভগবান বিষ্ণুর শান্ত, অনন্ত এবং মঙ্গলময় রূপকে স্মরণ করেন, যা জাগতিক ভয় থেকে মুক্তি দেয় এবং আধ্যাত্মিক শান্তি প্রদান করে। সর্বাধিক প্রচলিত এবং শাস্ত্রীয়ভাবে স্বীকৃত বিষ্ণু প্রণাম মন্ত্রটি হলো “শান্তাকারং ভুজগশয়নং…”, যা মূলত বিষ্ণু সহস্রনাম স্তোত্রম্-এর ‘ধ্যান শ্লোক’ (ধ্যানের মন্ত্র) হিসেবে পরিচিত। এই মন্ত্রটি ভগবান বিষ্ণুর পরম রূপের (Para form) একটি নিখুঁত বর্ণনা দেয়, যেখানে তিনি শেষনাগের উপর শায়িত এবং সমগ্র মহাবিশ্বকে ধারণ করে আছেন।
এই মন্ত্রের প্রতিটি শব্দ ভগবান বিষ্ণুর এক একটি দিব্য গুণাবলী এবং মহাজাগতিক কার্যকে প্রকাশ করে। এটি ভক্তকে শেখায় যে কীভাবে পরম সত্তা একইসাথে শান্ত (শান্তাকারং) এবং অনন্ত শক্তির আধার (বিশ্বাধারং) হতে পারেন। তিনি যেমন নাগরাজ বাসুকির উপর শয়ন করে যোগনিদ্রায় মগ্ন, তেমনই তিনি সমস্ত দেবতাদের প্রভু (সুরেশং) এবং ভক্তের হৃদয়ে ধ্যানের মাধ্যমে লভ্য (যোগিভির্ধ্যানগম্যম্)। হিন্দুধর্মের বিভিন্ন শাস্ত্র, বিশেষত বৈষ্ণব শাস্ত্র যেমন ‘বিষ্ণু পুরাণ’ এবং ‘ভাগবত পুরাণ’-এ এই রূপের বিশদ বর্ণনা পাওয়া যায়, যা এই মন্ত্রের মাধ্যমে সংক্ষেপে প্রকাশিত হয়েছে। এই মন্ত্রটি পাঠ করা মানে শুধু প্রণাম নয়, বরং পালনকর্তার সমগ্র সত্তাকে উপলব্ধি করার একটি গভীর আধ্যাত্মিক প্রচেষ্টা।
ভগবান বিষ্ণু: বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের পালনকর্তা
হিন্দু দর্শনে ‘ত্রিমূর্তি’ বা ত্রিত্ববাদের ধারণা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যা সৃষ্টি, স্থিতি (পালন) এবং প্রলয় (ধ্বংস)-এর মহাজাগতিক চক্রকে ব্যাখ্যা করে। এই ত্রিমূর্তির মধ্যে ভগবান বিষ্ণু হলেন ‘স্থিতি’ বা পালনের দেবতা। ব্রহ্মা যখন বিশ্বব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টি করেন এবং শিব যখন অধর্মের বিনাশ ঘটিয়ে প্রলয় আনেন, তখন ভগবান বিষ্ণু সেই সৃষ্টির ভারসাম্য রক্ষা করেন এবং ধর্মকে প্রতিস্থাপন করেন।
ত্রিমূর্তিতে বিষ্ণুর ভূমিকা
ভগবান বিষ্ণুর প্রধান কাজ হলো ‘ধর্ম’ (ধার্মিকতা বা মহাজাগতিক শৃঙ্খলা) রক্ষা করা। যখনই পৃথিবীতে অধর্ম, অত্যাচার এবং অশুভ শক্তির বাড়বাড়ন্ত হয়, তখনই তিনি বিভিন্ন অবতারে (Avatar) পৃথিবীতে আবির্ভূত হন। শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা-য় (অধ্যায় ৪, শ্লোক ৭-৮) ভগবান শ্রীকৃষ্ণ (যিনি বিষ্ণুর পূর্ণাবতার) স্বয়ং বলেছেন:
“যদা যদা হি ধর্মস্য গ্লানির্ভবতি ভারত।
অভ্যুত্থানমধর্মস্য তদাত্মানং সৃজাম্যহম্।।
পরিত্রাণায় সাধূনাং বিনাশায় চ দুষ্কৃতাম্।
ধর্মসংস্থাপনার্থায় সম্ভবামি যুগে যুগে।।”
অর্থাৎ, “যখনই ধর্মের পতন হয় এবং অধর্মের বৃদ্ধি হয়, তখনই আমি সাধুদের রক্ষা করতে, দুষ্টদের বিনাশ করতে এবং ধর্মকে পুনরায় স্থাপন করার জন্য যুগে যুগে অবতীর্ণ হই।”
এই শ্লোকটিই ভগবান বিষ্ণুর মূল কার্য এবং গুরুত্বকে ব্যাখ্যা করে। তিনি হলেন সেই মহাজাগতিক শক্তি যা নিশ্চিত করে যে শেষ পর্যন্ত সত্য এবং ধর্মেরই জয় হবে।
বৈকুণ্ঠ এবং লক্ষ্মী: পরম আবাসের অধিপতি
ভগবান বিষ্ণুর আবাসের নাম ‘বৈকুণ্ঠ’। এটি কোনো জাগতিক স্থান নয়, বরং এটি হলো পরম আধ্যাত্মিক জগত, যা সমস্ত জাগতিক দুঃখ, কষ্ট এবং ভয়ের ঊর্ধ্বে। এটি হলো মোক্ষ বা পরম মুক্তির স্থান। পুরাণ অনুযায়ী, বৈকুণ্ঠ হলো চিন্ময় আনন্দের ধাম, যেখানে ভগবান বিষ্ণু তাঁর শয্যা অনন্তনাগের উপর শায়িত থাকেন এবং তাঁর নিত্যসঙ্গী দেবী লক্ষ্মী তাঁর সেবা করেন।
দেবী লক্ষ্মী হলেন সম্পদ, সৌভাগ্য, সমৃদ্ধি এবং সৌন্দর্যের দেবী। তিনি কেবল জাগতিক সম্পদের দেবী নন, তিনি ভগবান বিষ্ণুর ‘শক্তি’। বিষ্ণু যদি পালনকর্তা হন, তবে লক্ষ্মী হলেন সেই পালনের জন্য প্রয়োজনীয় শক্তি এবং সম্পদ। বিষ্ণু এবং লক্ষ্মীর এই সম্পর্ক আদর্শ দাম্পত্য এবং অবিচ্ছেদ্য ঐশ্বরিক শক্তির প্রতীক। বিষ্ণু যখনই পৃথিবীতে অবতার গ্রহণ করেন, দেবী লক্ষ্মীও তাঁর সঙ্গিনী হিসেবে বিভিন্ন রূপে অবতীর্ণ হন (যেমন, রামের সঙ্গে সীতা, কৃষ্ণের সঙ্গে রুক্মিণী বা রাধা)। তাই বিষ্ণুর উপাসনা প্রায়শই লক্ষ্মীর উপাসনার সাথে একসাথেই করা হয়, যা ভক্তকে ধর্ম এবং সমৃদ্ধি উভয়ই প্রদান করে।
প্রধান বিষ্ণু প্রণাম মন্ত্র: এক গভীর বিশ্লেষণ
হিন্দুধর্মে বিভিন্ন দেবদেবীর একাধিক প্রণাম মন্ত্র প্রচলিত থাকলেও, ভগবান বিষ্ণুর ক্ষেত্রে যে মন্ত্রটি সর্বাধিক পরিচিত, সম্পূর্ণ এবং দার্শনিক অর্থে সমৃদ্ধ, সেটি হলো “শান্তাকারং ভুজগশয়নং”। এই মন্ত্রটি কেবল একটি প্রণাম নয়, এটি বিষ্ণুর সগুণ রূপের একটি সম্পূর্ণ চিত্রকল্প।
মন্ত্র (সংস্কৃত)
ওঁ শান্তাকারং ভুজগশয়নং পদ্মনাভং সুরেশং।
বিশ্বাধারং গগনসদৃশং মেঘবর্ণং শুভাঈম্।।
লক্ষ্মীকান্তং কমলনয়নং যোগিভির্ধ্যানগম্যম্।
বন্দে বিষ্ণুং ভবভয়হরং সর্বলোকৈকনাথম্।।
মন্ত্র (বাংলা উচ্চারণ)
ওম শান্তাকারাম ভুজাগাশায়ানাম পদ্মানাভাম সুরেশাম।
বিশ্বাধারাম গাগানাসদৃশাম মেঘাভার্নাম শুভাঙ্গাম।।
লাক্ষ্মীকান্তাম কামালানায়ানাম যোগিভির্ধ্যানাগাম্যাম।
ভান্দে বিষ্ণুম ভাবাভায়াহারাম সারভালোকায়েকানাথাম।।
মন্ত্রের প্রতিটি শব্দের অর্থ (শ্লোকার্থ)
এই মন্ত্রের গভীরতা বোঝার জন্য এর প্রতিটি শব্দের পৃথক অর্থ জানা অপরিহার্য।
| সংস্কৃত শব্দ | বাংলা অর্থ | তাৎপর্য |
| শান্তাকারং | শান্ত+আকারং = যাঁর আকার বা রূপ শান্ত | ভগবান বিষ্ণু অনন্ত শক্তির আধার হওয়া সত্ত্বেও তাঁর রূপ পরম শান্ত এবং সৌম্য। এই শান্তিই তাঁর স্থিতিশীলতার প্রতীক। |
| ভুজগশয়নং | ভুজগ+শয়নং = যিনি সর্পের (অনন্তনাগ) উপর শয়ন করে আছেন | এটি বিষ্ণুর যোগনিদ্রার প্রতীক। তিনি অনন্তকালের প্রতীক শেষনাগের উপর শায়িত থেকে সমগ্র সৃষ্টিকে অবলোকন করছেন। |
| পদ্মনাভং | পদ্ম+নাভং = যাঁর নাভি থেকে পদ্ম উৎপন্ন হয়েছে | এই নাভিপদ্ম থেকেই সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মার উৎপত্তি। এটি প্রমাণ করে যে বিষ্ণুই হলেন এই সৃষ্টির মূল উৎস। |
| সুরেশং | সুর+ঈশং = যিনি সুর বা দেবতাদেরও ঈশ্বর | তিনি সকল দেবতার ঊর্ধ্বে, পরমেশ্বর। ইন্দ্র, বরুণ, অগ্নি প্রমুখ দেবতারাও তাঁরই আরাধনা করেন। |
| বিশ্বাধারং | বিশ্ব+আধারং = যিনি বিশ্বের আধার বা ভিত্তি | সমগ্র মহাবিশ্ব তাঁকেই আশ্রয় করে আছে। তিনি এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের ধারক। |
| গগনসদৃশং | গগন+সদৃশং = যিনি গগন বা আকাশের মতো সর্বত্র ব্যাপ্ত | আকাশের যেমন কোনো সীমা নেই, ভগবান বিষ্ণুর রূপও তেমনই অসীম, অনন্ত এবং সর্বত্র বিরাজমান। |
| মেঘবর্ণং | মেঘের মতো যাঁর বর্ণ (শ্যামবর্ণ) | তাঁর বর্ণ গভীর নীল বা মেঘের মতো। এই নীল বর্ণ অসীমতার প্রতীক, যা আকাশের বা গভীর সমুদ্রের বর্ণের মতো। |
| শুভাঈম্ | শুভ+অঙ্গম্ = যাঁর অঙ্গ বা দেহ অত্যন্ত শুভ ও মঙ্গলময় | তাঁর রূপ দর্শন মাত্রই মঙ্গল হয়। তিনি পরম সুন্দর এবং তাঁর প্রতিটি অঙ্গ দিব্য। |
| লক্ষ্মীকান্তং | লক্ষ্মী+কান্তং = যিনি দেবী লক্ষ্মীর কান্ত বা স্বামী | তিনি পরম সৌভাগ্য এবং সম্পদের অধিপতি দেবী লক্ষ্মীর প্রিয়তম। |
| কমলনয়নং | কমল+নয়নং = যাঁর নয়ন বা চোখ দুটি পদ্মের মতো সুন্দর | তাঁর দৃষ্টি স্নেহ, করুণা এবং সৌন্দর্যে পূর্ণ, ঠিক প্রস্ফুটিত পদ্মের মতো। |
| যোগিভির্ধ্যানগম্যম্ | যোগিভিঃ+ধ্যান+গম্যম্ = মুনি-ঋষি বা যোগীরা যাঁকে শুধু ধ্যানের মাধ্যমেই লাভ করতে পারেন | তাঁকে কেবল বাহ্যিক আড়ম্বরে পাওয়া যায় না, তাঁকে লাভ করতে হলে গভীর ধ্যান এবং আন্তরিক ভক্তির প্রয়োজন। |
| বন্দে বিষ্ণুং | বন্দনা করি সেই বিষ্ণুকে | আমি সেই পরম সত্তা ভগবান বিষ্ণুকে প্রণাম জানাই বা তাঁর বন্দনা করি। |
| ভবভয়হরং | ভব+ভয়+হরং = যিনি ভব বা সংসারের ভয় হরণ করেন | তিনি জন্ম-মৃত্যুর চক্র এবং জাগতিক জীবনের সমস্ত ভয়, দুঃখ ও কষ্ট থেকে মুক্তি প্রদান করেন। |
| সর্বলোকৈকনাথম্ | সর্ব+লোক+এক+নাথম্ = যিনি সমস্ত লোকের (বিশ্বের) একমাত্র নাথ বা প্রভু | তিনি এক এবং অদ্বিতীয় পরমেশ্বর, যিনি সমগ্র সৃষ্টির একমাত্র অধিপতি। |
মন্ত্রের সামগ্রিক ভাবার্থ
“আমি সেই ভগবান বিষ্ণুকে বন্দনা করি, যাঁর রূপ পরম শান্ত, যিনি অনন্তনাগের শয্যায় শায়িত। যাঁর নাভি থেকে পদ্ম উৎপন্ন হয়েছে (এবং তা থেকে ব্রহ্মার জন্ম), যিনি দেবতাদেরও দেবতা।
যিনি এই সমগ্র বিশ্বের আধার, যিনি আকাশের মতো অনন্ত এবং সর্বত্র ব্যাপ্ত, যাঁর বর্ণ মেঘের মতো শ্যাম এবং যাঁর অঙ্গ পরম মঙ্গলময়।
যিনি দেবী লক্ষ্মীর স্বামী, যাঁর চোখ দুটি পদ্মের মতো সুন্দর, এবং যাঁকে কেবল যোগীরাই ধ্যানের মাধ্যমে লাভ করতে পারেন।
আমি প্রণাম জানাই সেই বিষ্ণুকে, যিনি সংসারের সমস্ত ভয় হরণ করেন এবং যিনি একাই সমস্ত লোকের (বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের) একমাত্র নাথ বা স্বামী।”
এই মন্ত্রের শাস্ত্রীয় উৎস
এই বিখ্যাত মন্ত্রটি কোনো আধুনিক রচনা নয়। এর উল্লেখ পাওয়া যায় মহাভারতের ‘অনুশাসন পর্ব’-এর অন্তর্গত বিষ্ণু সহস্রনাম স্তোত্রম্-এর শুরুতে ‘ধ্যান শ্লোক’ হিসেবে। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের পর, শরশয্যায় শায়িত পিতামহ ভীষ্ম যুধিষ্ঠিরকে ধর্ম, মোক্ষ এবং রাজধর্ম সম্পর্কে জ্ঞান দিচ্ছিলেন। সেই সময়ই তিনি যুধিষ্ঠিরের প্রশ্নের উত্তরে ভগবান বিষ্ণুর হাজার নাম (সহস্রনাম) কীর্তন করেন। সেই হাজার নাম কীর্তনের আগেই ভগবান বিষ্ণুর যে রূপকে ধ্যান করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, তা-ই হলো এই “শান্তাকারং ভুজগশয়নং” মন্ত্রটি। এর রচয়িতা স্বয়ং মহর্ষি বেদব্যাস।
মন্ত্রের দর্শন: বিষ্ণুর রূপের প্রতীকী অর্থ
বিষ্ণুর প্রণাম মন্ত্রে তাঁর যে রূপের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে, তার প্রতিটি অংশ গভীর দার্শনিক অর্থে পরিপূর্ণ। এটি নিছক একটি মূর্তি নয়, এটি সমগ্র মহাবিশ্বের পরিচালনার তত্ত্ব।
চতুর্ভুজ এবং শঙ্খ, চক্র, গদা, পদ্ম
ভগবান বিষ্ণুকে সর্বদা চতুর্ভুজ (চার হাত বিশিষ্ট) রূপে দেখা যায়। তাঁর এই চারটি হাত মানব জীবনের চারটি প্রধান লক্ষ্য বা ‘পুরুষার্থ’-এর প্রতীক: ধর্ম (ধার্মিকতা), অর্থ (সম্পদ), কাম (বাসনা) এবং মোক্ষ (মুক্তি)।
তাঁর চার হাতে থাকা চারটি দিব্য বস্তুরও নির্দিষ্ট প্রতীকী অর্থ রয়েছে, যা Wisdom Library -এর মতো শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যার মাধ্যমে জানা যায়:
১. শঙ্খ (পাঞ্চজন্য): শঙ্খ হলো ‘ওম’ (ॐ) বা আদিম শব্দের প্রতীক। এটি সৃষ্টির ধ্বনি। এর ধ্বনি অশুভ শক্তিকে দূর করে এবং শুভ শক্তির আহ্বান জানায়। এটি পঞ্চভূতের (ক্ষিতি, অপ, তেজ, মরুৎ, ব্যোম) উপর আধিপত্যেরও প্রতীক।
২. চক্র (সুদর্শন): সুদর্শন চক্র হলো সময়ের চক্র বা ‘কালচক্র’-এর প্রতীক। এটি সূর্যের তেজ ধারণ করে। এই চক্র ধর্মের রক্ষক এবং অধর্মের বিনাশক। এটি মন এবং অহঙ্কারের বিনাশ করে আত্মাকে মুক্ত করার প্রতীক।
৩. গদা (কৌমোদকী): গদা হলো জ্ঞানের শক্তি, বুদ্ধির শক্তি বা ‘প্রাণশক্তি’-এর প্রতীক। ভগবান বিষ্ণু এই গদা দ্বারা সমস্ত আসুরিক প্রবৃত্তি (যেমন অহঙ্কার, ক্রোধ, লোভ) চূর্ণ করেন। এটি শারীরিক এবং মানসিক বলের প্রতীক।
৪. পদ্ম (পদ্মা): পদ্ম হলো পবিত্রতা, আধ্যাত্মিক জাগরণ এবং সত্যের প্রতীক। পদ্ম যেমন পাঁক বা কাদা থেকে উৎপন্ন হয়েও নির্মল এবং পবিত্র থাকে, আত্মাও তেমনই সংসারের মাঝে থেকেও মোহমুক্ত থাকতে পারে। এটিই মোক্ষের প্রতীক।
“মেঘবর্ণং” (শ্যাম বর্ণ) কেন?
ভগবান বিষ্ণু বা তাঁর অবতার রাম ও কৃষ্ণের গায়ের রং সর্বদা মেঘের মতো ঘন নীল বা শ্যামবর্ণ হিসেবে বর্ণনা করা হয়। এর কারণ হলো, ‘নীল’ বর্ণ অসীমতা বা অনন্তের প্রতীক। যা কিছু অসীম, যেমন আকাশ বা গভীর মহাসাগর, তার বর্ণ নীল। ভগবান বিষ্ণুও তেমনই অসীম, তাঁর কোনো শুরু বা শেষ নেই, তিনি সর্বত্র বিরাজমান। এই অনন্ত, নির্গুণ, নিরাকার পরব্রহ্ম যখন সগুণ রূপে প্রকাশিত হন, তখন তিনি এই অনন্তের নীল বর্ণ ধারণ করেন।
“যোগিভির্ধ্যানগম্যম্” (যোগীর ধ্যানে লভ্য)
মন্ত্রের এই অংশটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি বৈষ্ণব দর্শনের ‘ভক্তিযোগ’ এবং ‘জ্ঞানযোগ’-এর মিলন ঘটায়। এটি বলে যে, ভগবান বিষ্ণুকে কেবল মন্দির বা মূর্তিতে বাহ্যিক পূজার মাধ্যমে পাওয়া যায় না। তাঁকে লাভ করার আসল উপায় হলো ‘ধ্যান’ বা গভীর আন্তরিকতা। ভাগবত পুরাণ অনুসারে, শ্রেষ্ঠ যোগী বা মুনি-ঋষিরাও লক্ষ লক্ষ বছর তপস্যা করে তাঁদের হৃদয়ের গভীরে এই পরম সত্তারই ধ্যান করেন। এই মন্ত্রটি সাধারণ ভক্তকেও সেই ধ্যানের পথে অগ্রসর হতে অনুপ্রাণিত করে।
অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিষ্ণু মন্ত্র
“শান্তাকারং…” মন্ত্রটি প্রধান প্রণাম বা ধ্যান মন্ত্র হলেও, ভগবান বিষ্ণুর উপাসনায় আরও কয়েকটি শক্তিশালী মন্ত্র ব্যবহৃত হয়, যেগুলির প্রত্যেকটির নিজস্ব তাৎপর্য রয়েছে।
ওঁ নমো ভগবতে বাসুদেবায় (দ্বাদশাক্ষরী মন্ত্র)
এটি বিষ্ণুর অন্যতম প্রধান ‘মূল মন্ত্র’। একে ‘দ্বাদশাক্ষরী’ বা বারো অক্ষরের মন্ত্র বলা হয়। এই মন্ত্রটি ‘বিষ্ণু পুরাণ’ এবং ‘ভাগবত পুরাণ’-এ সর্বোচ্চ গুরুত্ব পেয়েছে।
- ওঁ (Om): পরব্রহ্ম বা পরম সত্তা।
- নমো (Namo): প্রণাম বা সমর্পণ।
- ভগবতে (Bhagavate): ভগবানকে (যিনি ষড়ৈশ্বর্যপূর্ণ)।
- বাসুদেবায় (Vasudevaya): বাসুদেবকে (যিনি সর্বত্র বাস করেন, অথবা বসুদেবের পুত্র শ্রীকৃষ্ণ)।
এই মন্ত্রটি ভক্ত প্রহ্লাদ এবং ধ্রুব জপ করে ভগবানকে লাভ করেছিলেন। এটি ভক্তি আন্দোলনের মূল মন্ত্র। Wikiwand এবং অন্যান্য বৈষ্ণব সূত্র অনুসারে, এটি তান্ত্রিক এবং পৌরাণিক উভয় ঐতিহ্যেই একটি শক্তিশালী মুক্তিমন্ত্র হিসেবে স্বীকৃত।
বিষ্ণু গায়ত্রী মন্ত্র
শক্তি বা জ্ঞান আহরণের জন্য যেমন গায়ত্রী মন্ত্র রয়েছে, তেমনই ভগবান বিষ্ণুর কৃপা লাভের জন্যও নির্দিষ্ট গায়ত্রী মন্ত্র রয়েছে।
“ওঁ নারায়ণায় বিদ্মহে। বাসুদেবায় ধীমহি। তন্নো বিষ্ণুঃ প্রচোদয়াৎ।।”
অর্থ: “আমরা নারায়ণকে জানতে চেষ্টা করি। আমরা বাসুদেবের ধ্যান করি। সেই বিষ্ণু আমাদের সেই ধ্যানে এবং জ্ঞানে অনুপ্রাণিত করুন।”
এই মন্ত্রটি জপ করলে বুদ্ধি তীক্ষ্ণ হয়, মন শুদ্ধ হয় এবং ভগবান বিষ্ণুর প্রতি ভক্তিভাব জাগ্রত হয়।
প্রণাম মন্ত্র বনাম জপ মন্ত্র: পার্থক্য
ভক্তদের প্রায়শই প্রণাম মন্ত্র এবং জপ মন্ত্রের মধ্যে বিভ্রান্তি দেখা দেয়। দুটির উদ্দেশ্য এবং ব্যবহার ভিন্ন।
| বৈশিষ্ট্য | প্রণাম মন্ত্র (যেমন, শান্তাকারং…) | জপ মন্ত্র (যেমন, ওঁ নমো ভগবতে…) |
| উদ্দেশ্য | দেবতাকে সম্মান জানানো, তাঁর রূপ ও গুণের স্মরণ বা ধ্যান করা। | মন্ত্রের ধ্বনি-তরঙ্গের মাধ্যমে আধ্যাত্মিক শক্তি জাগ্রত করা, চিত্তশুদ্ধি করা। |
| ব্যবহার | পূজা শুরু বা শেষে, মন্দির দর্শনে, বা ধ্যানের শুরুতে পাঠ করা হয়। | নির্দিষ্ট সংখ্যায় (যেমন ১০৮ বার) মালা জপ করা হয়, সাধারণত প্রতিদিন। |
| মনোভাব | সমর্পণ এবং শ্রদ্ধার ভাব প্রধান। | একাগ্রতা এবং আবৃত্তির ভাব প্রধান। |
| উদাহরণ | “শান্তাকারং ভুজগশয়নং…”, “নমো ব্রহ্মণ্য দেবায়…” | “ওঁ নমো ভগবতে বাসুদেবায়”, “হরে কৃষ্ণ মহামন্ত্র” |
মন্ত্র পাঠের উপকারিতা: কেন এই মন্ত্র এত শক্তিশালী?
“শান্তাকারং…” মন্ত্রটি কেবল একটি স্তুতি নয়, এর নিয়মিত পাঠ এবং ধ্যানের মাধ্যমে মানসিক ও আধ্যাত্মিক স্তরে বহুবিধ উপকার পাওয়া যায়, যা বিভিন্ন শাস্ত্র এবং আধ্যাত্মিক গুরুরা বর্ণনা করেছেন।
১. ভবভয়হরং (ভয় থেকে মুক্তি): মন্ত্রের শেষেই বলা হয়েছে, তিনি “ভবভয়হরং”। এই মন্ত্রের নিয়মিত পাঠ জাগতিক ভয়, উদ্বেগ, মানসিক চাপ এবং মৃত্যুভয় দূর করে। এটি মনকে শান্ত করে এবং আত্মবিশ্বাস জোগায়।
২. মানসিক শান্তি (শান্তাকারং): মন্ত্রের শুরুই হয় ‘শান্ত’ শব্দটি দিয়ে। যিনি পরম শান্ত, তাঁর ধ্যান করলে ধ্যাতাকারীর মনও শান্ত এবং স্থির হয়। এটি অস্থির মনকে কেন্দ্রীভূত করতে সাহায্য করে।
৩. বাধা বিপত্তি দূর হয়: ভগবান বিষ্ণু হলেন পালনকর্তা এবং রক্ষাকর্তা। তাঁর সুদর্শন চক্র যেমন অশুভকে বিনাশ করে, তেমনই তাঁর এই মন্ত্র ভক্তের জীবনের বাধা, শত্রু এবং নেতিবাচক শক্তিকে দূর করে।
৪. জ্ঞান এবং একাগ্রতা বৃদ্ধি: “যোগিভির্ধ্যানগম্যম্” অংশটি প্রমাণ করে যে এই মন্ত্র ধ্যানের জন্য শ্রেষ্ঠ। ছাত্রছাত্রী বা যে কোনো ব্যক্তি মানসিক একাগ্রতা বাড়াতে চাইলে এই মন্ত্র প্রভূত সাহায্য করে।
৫. মোক্ষ প্রাপ্তি: এই মন্ত্রের চূড়ান্ত ফল হলো মোক্ষ বা মুক্তি। ভগবান বিষ্ণুর এই পরম রূপের ধ্যান করলে ভক্ত জন্ম-মৃত্যুর চক্র থেকে মুক্ত হয়ে বৈকুণ্ঠ ধাম লাভ করেন, যা হিন্দুধর্মের চূড়ান্ত লক্ষ্য।
আধুনিক বিশ্বে বিষ্ণু উপাসনা এবং বৈষ্ণব ধর্ম
ভগবান বিষ্ণুর উপাসনা কেবল প্রাচীন ভারতেই সীমাবদ্ধ নয়, এটি আজ একটি বিশ্বব্যাপী আধ্যাত্মিক আন্দোলন। বৈষ্ণব ধর্ম, যা বিষ্ণু বা তাঁর অবতারদের (বিশেষত কৃষ্ণ ও রাম) সর্বোচ্চ ঈশ্বর হিসেবে উপাসনা করে, তা হিন্দুধর্মের অন্যতম প্রধান শাখা।
বৈষ্ণব ধর্মের পরিসংখ্যান
যদিও হিন্দুধর্মের মধ্যে নির্দিষ্ট করে বৈষ্ণবদের সংখ্যা গণনা করা কঠিন, তবে কিছু তথ্য এর ব্যাপ্তি সম্পর্কে ধারণা দেয়:
- বিশ্বব্যাপী হিন্দু: এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা (Britannica) অনুসারে, একবিংশ শতকের শুরুতে বিশ্বব্যাপী হিন্দু ধর্মাবলম্বীর সংখ্যা প্রায় এক বিলিয়ন (১০০ কোটি), যা ভারতের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৮০ শতাংশ। এর মধ্যে একটি বিশাল অংশ বৈষ্ণব মতাদর্শী।
- গৌড়ীয় বৈষ্ণববাদ: শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু (১৬শ শতক) প্রবর্তিত গৌড়ীয় বৈষ্ণববাদ (বিশেষত হরে কৃষ্ণ আন্দোলন) বিশ্বব্যাপী বৈষ্ণব ভক্তিবাদের প্রচারে অভূতপূর্ব ভূমিকা রেখেছে।
- ইসকন (ISKCON): ইন্টারন্যাশনাল সোসাইটি ফর কৃষ্ণ কনসাসনেস (ISKCON), যা ১৯৬৬ সালের ১৩ই জুলাই এ. সি. ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ নিউইয়র্কে প্রতিষ্ঠা করেন, তার বিশ্বব্যাপী সদস্য সংখ্যা প্রায় এক মিলিয়ন (১০ লক্ষ)। এই সংস্থাটি ভাগবত পুরাণের দর্শন এবং ‘ওঁ নমো ভগবতে বাসুদেবায়’ ও ‘হরে কৃষ্ণ মহামন্ত্র’-এর প্রচারে প্রধান ভূমিকা পালন করেছে।
এই পরিসংখ্যান দেখায় যে, ভগবান বিষ্ণুর প্রণাম মন্ত্র এবং তাঁর দর্শন লক্ষ লক্ষ মানুষকে আজও আধ্যাত্মিক শান্তি এবং জীবনের দিশা প্রদান করছে।
ভগবান বিষ্ণুর প্রণাম মন্ত্র “শান্তাকারং ভুজগশয়নং…” কেবল একটি স্তোত্র নয়, এটি একটি সম্পূর্ণ দর্শন। এটি এমন এক ঈশ্বরের চিত্র তুলে ধরে যিনি একই সাথে অসীম (গগনসদৃশং), আবার ভক্তের হৃদয়ে ধ্যানের মাধ্যমে লভ্য (যোগিভির্ধ্যানগম্যম্)। তিনি যেমন শান্ত (শান্তাকারং), তেমনই তিনি অধর্মের বিনাশক (চক্রধারী)।
এই মন্ত্রটি আমাদের শেখায় যে প্রকৃত শক্তি শান্তভাব, পবিত্রতা এবং ধর্মের মধ্যেই নিহিত। যখনই কোনো ভক্ত সম্পূর্ণ সমর্পণ এবং শুদ্ধ চিত্তে এই মন্ত্র উচ্চারণ করে ভগবান বিষ্ণুর সেই মেঘবর্ণ, কমলনয়ন, মঙ্গলময় রূপকে স্মরণ করেন, তখন তিনি জাগতিক ভয় থেকে মুক্ত হন এবং পরম শান্তির পথে এক ধাপ এগিয়ে যান।











