দেবশিল্পী বিশ্বকর্মা পূজা পদ্ধতি: ঐশ্বর্য ও সৃজনশীলতার আকর সনাতনী আরাধনা

 কর্মই ধর্মের অমৃত বাণী শিল্প ও কারিগরি বিদ্যার দেবতা বিশ্বকর্মা শুধু একজন পৌরাণিক দেবতা নন, তিনি আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ভাদ্র মাসের সংক্রান্তির দিন অর্থাৎ প্রতি বছর ১৭ সেপ্টেম্বর…

Srijita Chattopadhay

 

 কর্মই ধর্মের অমৃত বাণী

শিল্প ও কারিগরি বিদ্যার দেবতা বিশ্বকর্মা শুধু একজন পৌরাণিক দেবতা নন, তিনি আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ভাদ্র মাসের সংক্রান্তির দিন অর্থাৎ প্রতি বছর ১৭ সেপ্টেম্বর যখন দেবশিল্পীর আরাধনা করা হয়, তখন কোটি মানুষের হৃদয়ে প্রতিধ্বনিত হয় ‘কর্মই ধর্ম’ এই মহামন্ত্র। বিশ্বকর্মা পূজা পদ্ধতি আমাদের সেই পথ দেখায়, যেখানে আত্মনিষ্ঠা আর কর্মপ্রেমের মধ্য দিয়ে আমরা জীবনে সিদ্ধি লাভ করতে পারি।

বিশ্বকর্মা: দেবলোকের মহান স্থপতি

দেবতার পরিচয় ও মহিমা

হিন্দু শাস্ত্রে বিশ্বকর্মা ব্রহ্মার সপ্তম পুত্র হিসেবে পরিচিত। ঋগ্বেদের দশম মণ্ডলে ৮১ ও ৮২ সূক্তে তাঁর উল্লেখ রয়েছে। তিনি পরম সত্যের প্রতিরূপ এবং সৃষ্টিশক্তির দেবতা। বিশ্বকর্মার চারটি হাত, মাথায় রাজার মুকুট, হাতে জলের কলস, বই, দড়ির ফাঁস ও বিশেষ যন্ত্র রয়েছে। তাঁর বাহন হাতি এবং বৃহস্পতির ভগিনী যোগসিদ্ধা তাঁর মাতা।

অমর স্থাপত্যকীর্তি

বিশ্বকর্মার সৃজনশীলতার নিদর্শনগুলি যুগে যুগে মানুষকে মুগ্ধ করেছে:

সত্যযুগের স্বর্গলোক: দেবতাদের প্রাসাদ ও দেবরাজ ইন্দ্রের রাজধানী

ত্রেতাযুগের সোনার লঙ্কা: রাবণের অপরূপ রাজধানী ও পার্বতী-মহাদেবের স্বর্ণপ্রাসাদ

দ্বাপরযুগের দ্বারকা নগরী: ভগবান কৃষ্ণের রাজধানী এবং পাণ্ডবদের মায়াসভা

কলিযুগের হস্তিনাপুর ও ইন্দ্রপ্রস্থ: মহাভারতের কাহিনিতে বর্ণিত এই নগরগুলি

এছাড়াও তিনি নির্মাণ করেছেন বিষ্ণুর সুদর্শন চক্র, শিবের ত্রিশূল, ইন্দ্রের বজ্র, কুবেরের অস্ত্র এবং পুরীর জগন্নাথ মূর্তি।

বিশ্বকর্মা পূজার তারিখ ও শুভ সময়

২০২৫ সালের পূজা তারিখ

পঞ্জিকা অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বিশ্বকর্মা পূজা অনুষ্ঠিত হবে ১৭ সেপ্টেম্বর, বুধবার। এই দিনে সূর্য রাত ১টা ৫৪ মিনিটে সিংহ থেকে কন্যা রাশিতে প্রবেশ করবে, যার ফলে কন্যা সংক্রান্তি শুরু হবে।

শুভ পূজার সময়

বিশ্বকর্মা পূজার জন্য শুভ সময় থাকবে সকাল ৬টা ০৭ মিনিট থেকে দুপুর ১২টা ২১ মিনিট পর্যন্ত। এই সময়ে অমৃত সিদ্ধি যোগ, রবি যোগ ও সর্বার্থ সিদ্ধি যোগ থাকবে। বিজয় মুহূর্ত হবে দুপুর ২টা ১৮ মিনিট থেকে ৩টা ০৭ মিনিট পর্যন্ত।

বিশ্বকর্মা পূজার সম্পূর্ণ পদ্ধতি

প্রস্তুতিপর্ব: পবিত্রতা অর্জন

১. আচমন ও বিষ্ণু স্মরণ
সকালে স্নান সেরে পরিষ্কার বস্ত্র পরিধান করুন। অনামিকা আঙুলে গঙ্গাজল স্পর্শ করে তিনবার মুখে ছিটিয়ে বলুন: “ওঁ বিষ্ণু ওঁ বিষ্ণু ওঁ বিষ্ণু”

২. পূজার স্থান প্রস্তুতি
পূজার স্থান গঙ্গাজল দিয়ে পরিষ্কার করে খড়িমাটি দিয়ে আলপনা আঁকুন। একটি পাটের বোরের ওপর মাটির ঘট রাখুন। ঘটে গঙ্গাজল ভরে ওপরে আমপাতা সহ ডাবের শীষ রাখুন।

মূল পূজা পদ্ধতি

৩. সংকল্প উচ্চারণ
উত্তর বা পূর্ব মুখে আসনে বসে কুশের ত্রিপত্র, কৃষ্ণতিল, হরিতকী, জল, গন্ধ ও পুষ্প নিয়ে সংকল্প করুন:

“ওঁ ভগবান বিষ্ণু, আজ ভাদ্র মাসের সংক্রান্তিতে সর্বসিদ্ধি কামনায় শ্রীশ্রীবিশ্বকর্মা পূজা করিব”

৪. আসন শুদ্ধি ও গুরুপঙ্তি
আসনের নিচে জল দিয়ে মণ্ডল এঁকে পুষ্প দিয়ে পূজা করুন। মন্ত্র: “ওঁ হ্রীং আধার শক্তয়ে কমল আসনায় নমঃ”

বিশ্বকর্মার মূর্তি স্থাপনা ও আরাধনা

৫. মূর্তি প্রতিষ্ঠা
বিশ্বকর্মার মূর্তি বা ছবি লাল কাপড়ে মুড়ে পূজার আসনে প্রতিষ্ঠা করুন। প্রথমে গঙ্গাজল দিয়ে মূর্তি স্নান করান, তারপর চন্দন, কুমকুম, অক্ষত ও পুষ্প নিবেদন করুন।

৬. ধ্যান মন্ত্র উচ্চারণ
“ওঁ দংশপাল মহাবীর সুচিত্রকর্ম্ম কারকঃ।
বিশ্বকৃৎ বিশ্বধৃক ত্বং চ বাসনামান দণ্ডধৃক্।।”

৭. প্রণাম মন্ত্র
“দেবশিল্পীন্ মহাভাগ দেবানাং কার্যসাধকঃ।
বিশ্বকর্মন্নমস্তুভ্যং সর্বাভীষ্টপ্রদায়ক।।”

নৈবেদ্য ও প্রসাদ

৮. ভোগ নিবেদন
আতপ চাল, পঞ্চমেব, পঞ্চামৃত, মিষ্টি, খীর, দই ও মৌসুমী ফল নিবেদন করুন। বিশেষভাবে মুগ ডাল খিচুড়ি, বুন্দিয়ার লাড্ডু, নারকেল লাড্ডু এবং রসগোল্লা প্রিয় ভোগ হিসেবে নিবেদন করতে পারেন।

যন্ত্রপাতি পূজা

৯. মেশিন ও যন্ত্রাংশ পূজা
কারখানার মেশিন, গাড়ি, ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি, সূতা-মিস্ত্রিদের হাতিয়ার পরিষ্কার করে সিঁদুর, অক্ষত ও ফুল দিয়ে পূজা করুন। মন্ত্র উচ্চারণ করুন:

“ওঁ পৃথিবয় নমঃ ওঁ অনন্তম নমঃ ওঁ কূর্মায় নমঃ ওঁ শ্রী সৃষ্টনায় সর্বসিদ্ধায় বিশ্বকর্মায় নমো নমঃ”

পূজা সমাপনী

১০. হোম ও আরতি
ধূপ-দীপ জ্বালিয়ে আরতি করুন। পূজার শেষে বিশ্বকর্মা চালিশা পাঠ করুন এবং সবশেষে প্রসাদ বিতরণ করুন।

পূজার উপকরণ ফর্দ: প্রয়োজনীয় সামগ্রী

অত্যাবশ্যকীয় পূজা সামগ্রী

১. বিশ্বকর্মার মূর্তি বা ছবি
২. মাটির ঘট ও আমপাতা
৩. গঙ্গাজল ও পঞ্চামৃত
৪. সাদা ও হলুদ ফুল (বিশেষভাবে সাদা ফুল পছন্দনীয়)
৫. চন্দন, সিঁদুর ও কুমকুম
৬. অক্ষত (আতপ চাল)
৭. ধূপ, দীপ ও ঘৃত
৮. লাল কাপড় ও পৈতা
৯. কলা, আম, নারকেল ও অন্যান্য ফল
১০. মিষ্টি ও খীর

ভোগের বিশেষ পদ

১. মুগ ডাল খিচুড়ি (ঘৃত সহ)
২. বুন্দিয়ার লাড্ডু
৩. নারকেল লাড্ডু
৪. রসগোল্লা ও সন্দেশ
৫. পায়েস বা খীর[৫ৣ]

পূজার বিশেষ নিয়মাবলি ও সতর্কতা

করণীয় বিষয়সমূহ

১. যন্ত্রপাতির যত্ন
পূজার দিন সকল যন্ত্রপাতি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখুন। ইলেকট্রিক সরঞ্জাম তেল দিয়ে মুছে নিন।

২. গাড়ির পূজা
গাড়িতে ফুল-মালা দিয়ে পূজা করার সময় একবার ইঞ্জিন স্টার্ট দিয়ে বিশ্বকর্মার কাছে নিরাপত্তার প্রার্থনা করুন।

৩. টিকার গুরুত্ব
কপালে সিঁদুরের টিকা লাগানো বাধ্যতামূলক, যা দেবতার প্রতি নিরাপত্তা ও আত্মনিবেদনের প্রতীক।

বর্জনীয় কাজসমূহ

১. যন্ত্রপাতি ব্যবহার নিষেধ
পূজার দিন লোহার যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা নিষেধ। কারখানার মেশিন বন্ধ রাখুন।

২. অচেনাদের খাবার গ্রহণ নিষেধ
পূজার দিন অপরিচিত ব্যক্তির কাছ থেকে খাবার নিয়ে ঘরে রাখবেন না, এতে নেতিবাচক শক্তি প্রবেশ করতে পারে।

৩. যন্ত্রাংশ ধার দেওয়া নিষেধ
বাড়ির যন্ত্রপাতি, রান্নাঘরের সরঞ্জাম কাউকে দিবেন না।

পূজার আধ্যাত্মিক তাৎপর্য ও সিদ্ধি

কর্মযোগের মূল শিক্ষা

বিশ্বকর্মা পূজা কেবল আনুষ্ঠানিকতা নয়, এটি কর্মযোগের গভীর তত্ত্ব শেখায়। প্রতিটি কাজকে পূজা ভেবে করলে জীবনে সিদ্ধি আসে। যারা ইঞ্জিনিয়ারিং, প্রযুক্তি, নির্মাণ, কারিগরি বিদ্যা বা যন্ত্রাংশের সাথে যুক্ত, তাদের জন্য এই পূজা অত্যন্ত ফলপ্রসূ।

পূজার ফলাফল

ব্যবসায়িক সমৃদ্ধি: কারখানা ও ব্যবসায় উন্নতি হয়

দক্ষতা বৃদ্ধি: নিজ ক্ষেত্রে পারদর্শিতা লাভ হয়

নিরাপত্তা: কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা পাওয়া যায়

বাস্তুদোষ নিবারণ: বাস্তুশাস্ত্রের আদিপুরুষ বিশ্বকর্মার কৃপায় বাস্তুদোষ কেটে যায়

ঐতিহ্যবাহী রান্নাপূজা ও ঘুড়ি উড়ানো

ভাদ্র সংক্রান্তির রান্নাপূজা

বিশ্বকর্মা পূজার আগের দিন বিশেষ রান্নাপূজা হয়। এদিন ইলিশ মাছ, চিংড়ি, ওল ভাজা, কচুশাকের তরকারি রান্না করে সারারাত জলে ভিজিয়ে রাখা হয়। পরদিন পান্তাভাতের সাথে এসব খাওয়া হয়।

ঘুড়ি উড়ানোর ঐতিহ্য

বিশ্বকর্মা পূজার দিন ঘুড়ি উড়ানোর চল রয়েছে। এটি আকাশের দেবতাদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের প্রতীক এবং মানুষের আনন্দ প্রকাশের মাধ্যম।

বিশেষ টোটকা ও প্রতিকার

বাস্তুদোষ নিবারণ

পেরেক পুঁতে দেওয়া: পূজার আসনের নিচে দুটো পেরেক রেখে পূজা শেষে একটি দোকানের সামনে ও অন্যটি পিছনে পুঁতে দিন।

দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে পদ্ম আঁকা: রাত ১০-১১টায় দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে আঙুল দিয়ে পদ্মফুল এঁকে প্রদীপ জ্বালিয়ে একটি রুমালে ফল, লোহার জিনিস ও ঘৃত রেখে ৮ দিন রাখুন।

আধুনিক যুগে প্রাচীন প্রজ্ঞা

বিশ্বকর্মা পূজা পদ্ধতি আমাদের শেখায় যে প্রতিটি কাজেই ভগবানের উপস্থিতি রয়েছে। আজকের যন্ত্রনির্ভর যুগে এই পূজার প্রাসঙ্গিকতা আরও বেড়েছে। কম্পিউটার থেকে গাড়ি, কারখানার মেশিন থেকে রান্নাঘরের যন্ত্রপাতি – সবকিছুতেই বিশ্বকর্মার আশীর্বাদ কামনা করি আমরা। এই পূজার মধ্য দিয়ে আমরা শ্রমের মর্যাদা, কর্মের পবিত্রতা এবং সৃজনশীলতার গুরুত্ব অনুধাবন করি। তাই সহজ ও সরল নিয়মে বিশ্বকর্মা পূজা পদ্ধতি অনুসরণ করে আমরা জীবনে সফলতা, সমৃদ্ধি ও আধ্যাত্মিক উন্নতি লাভ করতে পারি।

About Author
Srijita Chattopadhay

সৃজিতা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় স্নাতক। তিনি একজন প্রতিশ্রুতিশীল লেখক এবং সাংবাদিক, যিনি তার লেখা দ্বারা বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির সমৃদ্ধি তুলে ধরতে সদা উদ্যমী। সৃজিতার লেখার ধারা মূলত সাহিত্য, সমাজ এবং সংস্কৃতির বিভিন্ন দিককে ঘিরে আবর্তিত হয়, যেখানে তিনি তার গভীর পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা ও বিশ্লেষণী দক্ষতার পরিচয় দেন। তাঁর নিবন্ধ ও প্রতিবেদনগুলি পাঠকদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে, যা তার বস্তুনিষ্ঠতা ও সংবেদনশীলতার পরিচয় বহন করে। সৃজিতা তার কর্মজীবনে ক্রমাগত নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে বদ্ধপরিকর, যা তাকে বাংলা সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে একটি উজ্জ্বল ভবিষ্যতের দিকে নিয়ে যাচ্ছে।

আরও পড়ুন