প্রযুক্তিপ্রেমীদের জন্য ভিভোর ‘V’ সিরিজের ফোনগুলো বরাবরই আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে, যার মূল কারণ এর ক্যামেরা এবং স্টাইলিশ ডিজাইন। সম্প্রতি বাজারে আসা ভিভো V29e 5G এবং তার পূর্বসূরি ভিভো V27 5G মডেল দুটিকে ঘিরে গ্রাহকদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা চলছে। অনেকেই ভাবছেন পুরনো মডেল থেকে নতুন মডেলে আপগ্রেড করাটা কতটা লাভজনক হবে, অথবা নতুন ক্রেতাদেরই বা কোনটি বেছে নেওয়া উচিত। এই নিবন্ধে আমরা দুটি ফোনের ক্যামেরা, পারফরম্যান্স, ডিসপ্লে, ব্যাটারি এবং দামের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করে একটি স্বচ্ছ চিত্র তুলে ধরব, যা আপনাকে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করবে। দুটি ফোনের মধ্যে মূল পার্থক্যগুলো প্রথম নজরে খুব বেশি মনে না হলেও, কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন রয়েছে যা আপনার ব্যবহারের অভিজ্ঞতাকে প্রভাবিত করতে পারে।
ভিভো V29e এবং ভিভো V27
ভিভো তাদের ব্যবহারকারীদের চাহিদার কথা মাথায় রেখে ক্রমাগত নতুন নতুন স্মার্টফোন বাজারে নিয়ে আসে। ভিভো V27 5G একটি পরীক্ষিত এবং সফল মডেল যা তার ক্যামেরা এবং পারফরম্যান্সের জন্য ব্যবহারকারীদের কাছে জনপ্রিয়তা পেয়েছে। অন্যদিকে, ভিভো V29e 5G হলো এই সিরিজের নতুন সংযোজন, যা ডিজাইন এবং কিছু বিশেষ ফিচারের উপর বেশি জোর দিয়েছে। দুটি ফোনই মধ্যম বাজেটের মধ্যে দুর্দান্ত স্পেসিফিকেশন অফার করে, কিন্তু তাদের মধ্যেকার সূক্ষ্ম পার্থক্যগুলোই একজনকে অপরের থেকে এগিয়ে রাখে। এই বিশদ আলোচনায় আমরা প্রতিটি বিভাগের চুলচেরা বিশ্লেষণ করব।
ডিজাইন ও ডিসপ্লে: কে বেশি আকর্ষণীয়?
ডিজাইনের ক্ষেত্রে ভিভো বরাবরই অন্যদের থেকে এক ধাপ এগিয়ে থাকে। এই দুটি মডেলের ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি।
ভিভো V29e 5G: এই ফোনটির সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো এর ‘আর্টিস্টিক ডিজাইন’। বিশেষ করে এর লাল (Artistic Red) রঙের ভেরিয়েন্টটি সূর্যের আলো বা UV রশ্মির সংস্পর্শে এলে রঙ পরিবর্তন করে কালো হয়ে যায়, যা এককথায় অনবদ্য। এই কালার চেঞ্জিং গ্লাস টেকনোলজি ফোনটিকে একটি প্রিমিয়াম লুক দেয়। ফোনটির ওজন প্রায় ১৮০.৫ গ্রাম এবং এটি ৭.৫৭ মিমি পাতলা, যা হাতে ধরে রাখার জন্য বেশ আরামদায়ক। এতে রয়েছে একটি ৬.৭৮ ইঞ্চির ফুল HD+ AMOLED 3D কার্ভড ডিসপ্লে, যা 120Hz রিফ্রেশ রেট এবং 1300 নিটস পর্যন্ত পিক ব্রাইটনেস সমর্থন করে। ফলে মাল্টিমিডিয়া বা গেমিংয়ের ক্ষেত্রে একটি মসৃণ এবং প্রাণবন্ত অভিজ্ঞতা পাওয়া যায়।
ভিভো V27 5G: ভিভো V27-এর ডিজাইনও যথেষ্ট আকর্ষণীয় এবং এতেও কালার চেঞ্জিং গ্লাস প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে, বিশেষ করে ম্যাজিক ব্লু ভেরিয়েন্টটিতে। এটি V29e-এর থেকে কিছুটা পাতলা (৭.৩৬ মিমি) এবং হালকা (১৮০ গ্রাম), যা এটিকে আরও বেশি কমপ্যাক্ট করে তোলে। এই মডেলেও রয়েছে একটি ৬.৭৮ ইঞ্চির ফুল HD+ AMOLED 3D কার্ভড ডিসপ্লে এবং 120Hz রিফ্রেশ রেট। দুটি ফোনের ডিসপ্লের মধ্যে খুব বেশি পার্থক্য না থাকলেও, V29e-এর ডিসপ্লে সামান্য উজ্জ্বলতর এবং রঙের স্যাচুরেশন কিছুটা উন্নত মানের।
| ফিচার | ভিভো V29e 5G | ভিভো V27 5G |
| ডিসপ্লে | ৬.৭৮ ইঞ্চি AMOLED 3D কার্ভড | ৬.৭৮ ইঞ্চি AMOLED 3D কার্ভড |
| রিফ্রেশ রেট | 120Hz | 120Hz |
| পিক ব্রাইটনেস | 1300 নিটস | 1300 নিটস |
| ডিজাইন | রঙ পরিবর্তনকারী গ্লাস | রঙ পরিবর্তনকারী গ্লাস |
| ওজন | ১৮০.৫ গ্রাম | ১৮০ গ্রাম |
| পুরুত্ব | ৭.৫৭ মিমি | ৭.৩৬ মিমি |
পারফরম্যান্স: গতির লড়াইয়ে কে এগিয়ে?
যেকোনো স্মার্টফোনের পারফরম্যান্স তার প্রসেসরের উপর অনেকাংশে নির্ভরশীল। এখানেই দুটি ফোনের মধ্যে সবচেয়ে বড় পার্থক্যটি দেখা যায়।
ভিভো V27 5G: এই ফোনটিতে ব্যবহার করা হয়েছে MediaTek Dimensity 7200 প্রসেসর, যা ৪ ন্যানোমিটার আর্কিটেকচারে তৈরি। এটি একটি অত্যন্ত শক্তিশালী এবং শক্তি-সাশ্রয়ী চিপসেট যা দৈনন্দিন কাজ থেকে শুরু করে হাই-গ্রাফিক্স গেমিং পর্যন্ত সবকিছু সহজেই সামলাতে পারে। AnTuTu বেঞ্চমার্ক স্কোর অনুযায়ী, এর স্কোর ৬ লক্ষের উপরে, যা এই বাজেটের ফোনের জন্য চমৎকার। এর সাথে LPDDR5 RAM এবং UFS 3.1 স্টোরেজ থাকায় অ্যাপ লোডিং এবং ডেটা ট্রান্সফারের গতি অনেক বেশি।
ভিভো V29e 5G: অন্যদিকে, ভিভো V29e-তে রয়েছে Qualcomm Snapdragon 695 প্রসেসর। এটি একটি নির্ভরযোগ্য ৬ ন্যানোমিটার চিপসেট, তবে পারফরম্যান্সের দিক থেকে এটি Dimensity 7200-এর থেকে বেশ কিছুটা পিছিয়ে। এর AnTuTu স্কোর প্রায় ৪ লক্ষের কাছাকাছি। সাধারণ ব্যবহার, যেমন সোশ্যাল মিডিয়া, ব্রাউজিং বা হালকা গেমিংয়ের জন্য এটি যথেষ্ট হলেও, ভারী গেমিং বা মাল্টিটাস্কিংয়ের ক্ষেত্রে V27 deutlich এগিয়ে থাকবে। এতে LPDDR4x RAM এবং UFS 2.2 স্টোরেজ ব্যবহার করা হয়েছে, যা V27-এর তুলনায় ধীর।
সুতরাং, আপনি যদি একজন পাওয়ার ইউজার বা গেমার হন, তবে নিঃসন্দেহে ভিভো V27 5G আপনার জন্য সেরা বিকল্প হবে।
ক্যামেরা: ছবির জগতে সেরা কে?
ভিভোর ‘V’ সিরিজের প্রধান আকর্ষণ হলো এর ক্যামেরা। দুটি ফোনেই দুর্দান্ত ক্যামেরা সেটআপ রয়েছে, তবে তাদের মধ্যে কিছু মৌলিক পার্থক্য রয়েছে।
ভিভো V29e 5G: এই ফোনের পিছনে রয়েছে ডুয়াল ক্যামেরা সেটআপ। মূল ক্যামেরাটি হলো ৬৪ মেগাপিক্সেলের একটি প্রাইমারি সেন্সর, যাতে অপটিক্যাল ইমেজ স্ট্যাবিলাইজেশন (OIS) রয়েছে। এর ফলে কম আলোতেও স্থিতিশীল এবং পরিষ্কার ছবি তোলা সম্ভব হয়। এর সাথে রয়েছে একটি ৮ মেগাপিক্সেলের আলট্রা-ওয়াইড অ্যাঙ্গেল লেন্স। তবে এর প্রধান আকর্ষণ হলো এর ৫০ মেগাপিক্সেলের ‘আই অটোফোকাস’ সেলফি ক্যামেরা। যারা সেলফি তুলতে ভালোবাসেন, তাদের জন্য এটি একটি অসাধারণ ফিচার।
ভিভো V27 5G: ভিভো V27-এর পিছনে রয়েছে ট্রিপল ক্যামেরা সেটআপ। মূল সেন্সরটি হলো ৫০ মেগাপিক্সেলের Sony IMX766V সেন্সর, যা OIS সমর্থন করে। এটি ছবির গুণমান এবং ডিটেলিংয়ের ক্ষেত্রে V29e-এর ৬৪ মেগাপিক্সেল সেন্সরের চেয়েও ভালো পারফর্ম করে, বিশেষ করে কম আলোতে। এর সাথে রয়েছে একটি ৮ মেগাপিক্সেলের আলট্রা-ওয়াইড লেন্স এবং একটি ২ মেগাপিক্সেলের ম্যাক্রো সেন্সর। সামনেও রয়েছে একটি ৫০ মেগাপিক্সেলের সেলফি ক্যামেরা। ভিভো V27-এর ‘Aura Light’ ফ্ল্যাশ পোর্ট্রেট ফটোগ্রাফির জন্য একটি অনন্য সংযোজন, যা স্টুডিও-এর মতো আলোর প্রভাব তৈরি করে।
ক্যামেরার লড়াইয়ে, বিশেষ করে রিয়ার ক্যামেরার ক্ষেত্রে, উন্নত সেন্সর এবং Aura Light-এর জন্য ভিভো V27 5G এগিয়ে থাকবে। তবে সেলফির জন্য V29e-এর আই অটোফোকাস প্রযুক্তি এটিকে একটি শক্তিশালী প্রতিযোগী করে তুলেছে।
ব্যাটারি এবং চার্জিং
ভিভো V29e 5G: এই ফোনে রয়েছে একটি বড় ৫০০০ mAh ব্যাটারি, যা সারাদিনের সাধারণ ব্যবহারে সহজেই টিকে থাকতে পারে। এর সাথে রয়েছে ৪৪ ওয়াটের ফ্ল্যাশ চার্জার, যা ফোনটিকে দ্রুত চার্জ করতে সক্ষম।
ভিভো V27 5G: এতে রয়েছে একটি ৪৬০০ mAh ব্যাটারি, যা V29e-এর তুলনায় কিছুটা ছোট। তবে শক্তি-সাশ্রয়ী প্রসেসরের কারণে এর ব্যাটারি ব্যাকআপ প্রায় সমান। চার্জিংয়ের ক্ষেত্রে এটি ৬৬ ওয়াটের ফ্ল্যাশ চার্জার সমর্থন করে, যা V29e-এর তুলনায় অনেক দ্রুত ফোনটিকে ০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত চার্জ করতে পারে মাত্র ১৯ মিনিটে, যেমনটি ভিভোর অফিশিয়াল ওয়েবসাইট-এ দাবি করা হয়েছে।
সুতরাং, দ্রুত চার্জিং আপনার অগ্রাধিকার হলে ভিভো V27 একটি ভালো বিকল্প।
সফটওয়্যার এবং অন্যান্য ফিচার
দুটি ফোনেই অ্যান্ড্রয়েড ১৩ ভিত্তিক Funtouch OS 13 রয়েছে। ভিভোর এই কাস্টম স্কিনটি ব্যবহারকারীদের একটি ক্লিন এবং ফিচার-রিচ অভিজ্ঞতা প্রদান করে। কানেক্টিভিটির জন্য দুটি ফোনেই 5G, Wi-Fi, ব্লুটুথ ৫.২, এবং USB Type-C পোর্ট রয়েছে। তবে V27-এ Wi-Fi 6-এর সাপোর্ট থাকলেও V29e-তে নেই।
চূড়ান্ত রায়: আপগ্রেড করা কি উচিত?
এখন মূল প্রশ্নে আসা যাক। আপনার যদি ইতিমধ্যে একটি ভিভো V27 5G থাকে, তবে ভিভো V29e 5G-তে আপগ্রেড করার তেমন কোনো জোরালো কারণ নেই। V27 পারফরম্যান্স এবং রিয়ার ক্যামেরার দিক থেকে এখনও একটি শক্তিশালী প্রতিযোগী এবং কিছু ক্ষেত্রে V29e-এর চেয়েও এগিয়ে রয়েছে।
কখন ভিভো V29e 5G কিনবেন?
- যদি আপনার প্রধান অগ্রাধিকার হয় একটি অনন্য এবং আকর্ষণীয় ডিজাইন।
- যদি আপনি একজন সেলফিপ্রেমী হন এবং উন্নত ফ্রন্ট ক্যামেরা চান।
- যদি আপনার বাজেট কিছুটা কম থাকে এবং আপনি একটি নির্ভরযোগ্য দৈনন্দিন ব্যবহারের ফোন খুঁজছেন।
কখন ভিভো V27 5G কিনবেন?
- যদি আপনার জন্য শক্তিশালী পারফরম্যান্স এবং গেমিং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়।
- যদি আপনি সেরা রিয়ার ক্যামেরা পারফরম্যান্স এবং পোর্ট্রেট ফটোগ্রাফি চান।
- যদি দ্রুত চার্জিং আপনার জন্য একটি প্রয়োজনীয় ফিচার হয়।
নতুন ক্রেতাদের জন্য, সিদ্ধান্তটি তাদের ব্যবহারের ধরনের উপর নির্ভর করবে। যারা পারফরম্যান্সকে ডিজাইনের উপরে স্থান দেন, তাদের জন্য ভিভো V27 5G একটি সুস্পষ্ট বিজয়ী। অন্যদিকে, যারা একটি স্টাইলিশ ফোন এবং চমৎকার সেলফি ক্যামেরা চান, তারা ভিভো V29e 5G বেছে নিতে পারেন। দুটি ফোনের দামের মধ্যে খুব বেশি তফাৎ না থাকায়, প্রয়োজন অনুযায়ী সঠিক মডেলটি বেছে নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ হবে।











