পশ্চিমবঙ্গে এবার কাগজ ছাড়াই মিলবে ৫ লক্ষ টাকা ঋণ, ১০% টাকা ফেরতও দিতে হবে না – জানুন সরকারের নতুন প্রকল্প

পশ্চিমবঙ্গের তরুণ প্রজন্মের জন্য রাজ্য সরকার এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। স্বনির্ভর হওয়ার স্বপ্ন দেখেন কিন্তু আর্থিক সংকটের কারণে পিছিয়ে পড়ছেন, এমন লক্ষ লক্ষ যুবক-যুবতীর পাশে দাঁড়াতে চালু হয়েছে ভবিষ্যৎ…

Avatar

 

পশ্চিমবঙ্গের তরুণ প্রজন্মের জন্য রাজ্য সরকার এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। স্বনির্ভর হওয়ার স্বপ্ন দেখেন কিন্তু আর্থিক সংকটের কারণে পিছিয়ে পড়ছেন, এমন লক্ষ লক্ষ যুবক-যুবতীর পাশে দাঁড়াতে চালু হয়েছে ভবিষ্যৎ ক্রেডিট কার্ড প্রকল্প (Bhabishyat Credit Card Scheme)। এই প্রকল্পের আওতায় রাজ্যের ১৮ থেকে ৫৫ বছর বয়সী উদ্যোগপতিরা নিজেদের নতুন ব্যবসা শুরু করার জন্য ৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত ঋণ পেতে পারেন, এবং সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো এর জন্য কোনো গ্যারান্টার বা জামানত লাগবে না । শুধু তাই নয়, প্রকল্পের খরচের উপর সরকার ১০% পর্যন্ত ভর্তুকি বা মার্জিন মানি দেবে, যা আবেদনকারীকে ফেরত দিতে হবে না । এই পদক্ষেপ রাজ্যের ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (MSME) ক্ষেত্রকে এক নতুন দিশা দেখাবে এবং প্রায় ২ লক্ষ কর্মসংস্থান তৈরি করবে বলে আশা করা হচ্ছে ।

ভবিষ্যৎ ক্রেডিট কার্ড প্রকল্প (Bhabishyat Credit Card Scheme) আসলে কী?

পশ্চিমবঙ্গের ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি উদ্যোগ এবং বস্ত্র দপ্তরের উদ্যোগে ‘কর্মসাথী প্রকল্প’-এর পরিবর্তে এই নতুন এবং উন্নত প্রকল্পটি চালু করা হয়েছে । রাজ্যের অসংখ্য শিক্ষিত এবং দক্ষ যুবক-যুবতী আছেন যারা নিজেদের উদ্যোগে ব্যবসা শুরু করে স্বাবলম্বী হতে চান, কিন্তু ব্যাঙ্কের ঋণের জটিল প্রক্রিয়া এবং জামানতের অভাবে সেই স্বপ্ন পূরণ করতে পারেন না। এই সমস্যার সমাধান করতেই রাজ্য সরকার ‘ভবিষ্যৎ ক্রেডিট কার্ড’ প্রকল্পটি নিয়ে এসেছে।

এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হলো রাজ্যের শহরাঞ্চল এবং গ্রামাঞ্চলের তরুণ-তরুণীদের ছোট ব্যবসা, পরিষেবা, ট্রেডিং বা কৃষিভিত্তিক উদ্যোগ স্থাপনে উৎসাহিত করা । সরকার নিজে গ্যারান্টার হয়ে ব্যাঙ্কগুলিকে ঋণ দিতে উৎসাহিত করছে, যার ফলে আবেদনকারীদের উপর থেকে চাপ অনেকটাই কমে যাচ্ছে। এর মাধ্যমে রাজ্যে আয় বৃদ্ধি, সম্পদ সৃষ্টি এবং নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করাই সরকারের প্রধান উদ্দেশ্য ।

 প্রকল্পের মূল আকর্ষণ ও সুবিধাগুলি কী কী?

এই প্রকল্পের বেশ কিছু আকর্ষণীয় বৈশিষ্ট্য রয়েছে যা এটিকে সাধারণ ঋণের থেকে আলাদা করে তুলেছে। নিচে একটি টেবিলের মাধ্যমে এর প্রধান সুবিধাগুলি তুলে ধরা হলো:

বৈশিষ্ট্য (Feature) বিবরণ (Description)
ঋণের পরিমাণ আবেদনকারীরা সর্বোচ্চ ₹৫ লক্ষ পর্যন্ত ঋণ পেতে পারেন।
জামানত (Collateral) এটি সম্পূর্ণ জামিনবিহীন ঋণ (Collateral-free)। সরকার নিজেই গ্যারান্টার হিসেবে কাজ করে।
সরকারি ভর্তুকি (Subsidy) প্রকল্পের মোট খরচের উপর সরকার ১০% মার্জিন মানি হিসেবে ভর্তুকি দেবে, যার সর্বোচ্চ সীমা ₹২৫,০০০
সুদের হার (Interest Rate) বার্ষিক মাত্র ৪% সরল সুদে এই ঋণ পাওয়া যায়, যা অত্যন্ত ভর্তুকিযুক্ত।
আবেদনকারীর বয়স ১৮ থেকে ৫৫ বছর বয়সী পশ্চিমবঙ্গের যেকোনো বাসিন্দা আবেদন করতে পারবেন।
পারিবারিক নিয়ম একটি পরিবার থেকে केवल একজন সদস্যই এই প্রকল্পের সুবিধা নিতে পারবেন।
ঋণের উদ্দেশ্য উৎপাদন, পরিষেবা, ব্যবসা, ট্রেডিং এবং কৃষিভিত্তিক যেকোনো নতুন উদ্যোগের জন্য এই ঋণ নেওয়া যাবে।
প্রক্রিয়াকরণ আবেদন প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ অনলাইন এবং সরল, যা দ্রুত ঋণ অনুমোদনে সাহায্য করে।

কারা এই প্রকল্পের জন্য যোগ্য? (Eligibility Criteria)

এই প্রকল্পে আবেদন করার জন্য কিছু নির্দিষ্ট যোগ্যতা পূরণ করতে হবে। সেগুলি নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।

 বয়স ও বাসিন্দা

আবেদনকারীকে অবশ্যই পশ্চিমবঙ্গের একজন স্থায়ী বাসিন্দা হতে হবে এবং তার বয়স হতে হবে ১৮ থেকে ৫৫ বছরের মধ্যে ।

 শিক্ষাগত যোগ্যতা

এই প্রকল্পে আবেদনের জন্য কোনো ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতার উল্লেখ নেই। তবে, কোনো বিশেষ ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত আবেদনকারীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হতে পারে ।

 পারিবারিক শর্ত

একটি পরিবার পিছু শুধুমাত্র একজন ব্যক্তিই এই ভবিষ্যৎ ক্রেডিট কার্ডের জন্য আবেদন করতে পারবেন।

উদ্যোগের ধরন

আবেদনকারীকে অবশ্যই একটি নতুন উদ্যোগ শুরু করতে হবে। উৎপাদন, পরিষেবা, ট্রেডিং বা কৃষি সম্পর্কিত যেকোনো ছোট বা মাঝারি আকারের ব্যবসার জন্য এই ঋণ প্রযোজ্য। পুরনো ব্যবসা বাড়ানোর জন্য এই ঋণ নয়।

 কিভাবে আবেদন করবেন? (Application Process)

ভবিষ্যৎ ক্রেডিট কার্ড প্রকল্পের আবেদন প্রক্রিয়া অত্যন্ত সহজ এবং ডিজিটাল। আবেদনকারীকে কোনো সরকারি দপ্তরে বারবার ছোটাছুটি করতে হবে না।

  1. অফিসিয়াল পোর্টালে যান: প্রথমে আপনাকে ভবিষ্যৎ ক্রেডিট কার্ডের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে (https://bccs.wb.gov.in) যেতে হবে ।

  1. রেজিস্ট্রেশন করুন: ওয়েবসাইটে গিয়ে নিজের মোবাইল নম্বর এবং অন্যান্য প্রাথমিক তথ্য দিয়ে রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে।

  2. আবেদনপত্র পূরণ: এরপর লগইন করে আবেদনপত্রটি যত্ন সহকারে পূরণ করতে হবে। এখানে আপনার ব্যক্তিগত তথ্য, ব্যবসার বিবরণ, প্রকল্পের খরচ এবং ঋণের পরিমাণ উল্লেখ করতে হবে।

  3. নথি আপলোড: প্রয়োজনীয় নথিগুলির স্ক্যান কপি (যেমন আধার কার্ড, ঠিকানার প্রমাণপত্র, প্রকল্পের রিপোর্ট ইত্যাদি) আপলোড করতে হবে।

  4. আবেদন জমা দিন: সব তথ্য এবং নথি ঠিকভাবে দেওয়ার পর আবেদনপত্রটি জমা (Submit) করতে হবে।

আপনার আবেদন জমা হওয়ার পর, সেটি যাচাইকরণের জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠানো হবে এবং সেখান থেকে অনুমোদনের পর আপনার পছন্দের ব্যাঙ্কের শাখায় ঋণ মঞ্জুর করার জন্য পাঠিয়ে দেওয়া হবে ।

 ১০% ভর্তুকির বিষয়টি আসলে কী?

অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগতে পারে যে “১০% টাকা ফেরত দিতে হবে না” কথাটির আসল অর্থ কী। এটি আসলে ঋণের উপর কোনো ছাড় নয়, বরং এটি হলো সরকারের পক্ষ থেকে দেওয়া মার্জিন মানি ভর্তুকি (Margin Money Subsidy)

বিষয়টি একটি উদাহরণের মাধ্যমে বোঝা যাক। ধরুন, আপনি একটি নতুন ব্যবসা শুরু করার জন্য একটি প্রজেক্ট রিপোর্ট তৈরি করেছেন যার মোট খরচ (Project Cost) হলো ৩ লক্ষ টাকা। এক্ষেত্রে, সরকার আপনাকে প্রকল্পের খরচের ১০%, অর্থাৎ ৩০,০০০ টাকার মধ্যে ২৫,০০০ টাকা পর্যন্ত ভর্তুকি দেবে । এর ফলে আপনাকে ব্যাঙ্কের কাছে বাকি ২,৭৫,০০০ টাকার জন্য ঋণের আবেদন করতে হবে। এই ২৫,০০০ টাকা আপনাকে আর ফেরত দিতে হবে না, যা আপনার ব্যবসার শুরুর মূলধনের চাপ অনেকটাই কমিয়ে দেবে। এটিই এই প্রকল্পের অন্যতম সেরা সুবিধা।

 পশ্চিমবঙ্গের অর্থনীতিতে এই প্রকল্পের সম্ভাব্য প্রভাব

এই প্রকল্পটি শুধুমাত্র ব্যক্তিগত স্তরে উদ্যোগপতিদের সাহায্য করবে না, বরং পশ্চিমবঙ্গের সামগ্রিক অর্থনীতিতেও এর সুদূরপ্রসারী ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে মনে করা হচ্ছে।

  • MSME সেক্টরের বৃদ্ধি: পশ্চিমবঙ্গ সরকার বরাবরই ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের প্রসারে জোর দিয়ে এসেছে। রাজ্যের প্রায় ৯৯% শিল্প উদ্যোগই MSME সেক্টরের অন্তর্গত । এই প্রকল্পের মাধ্যমে নতুন উদ্যোগপতিরা সহজে ঋণ পেলে এই ক্ষেত্রটি আরও শক্তিশালী হবে।

  • কর্মসংস্থান সৃষ্টি: সরকার এই প্রকল্পের মাধ্যমে প্রায় ২ লক্ষ নতুন কর্মসংস্থান তৈরির লক্ষ্যমাত্রা রেখেছে । প্রতিটি নতুন উদ্যোগ কমবেশি কিছু মানুষের কাজের সুযোগ তৈরি করে, যা রাজ্যের বেকারত্ব সমস্যা কমাতে সাহায্য করবে।

  • আর্থিক অন্তর্ভুক্তি: জামানত ছাড়া ঋণের সুবিধা থাকায়, সমাজের দুর্বলতর অংশ এবং যারা এতদিন ব্যাঙ্কিং পরিষেবা থেকে দূরে ছিলেন, তারাও ঋণের আওতায় আসবেন। এটি রাজ্যের আর্থিক অন্তর্ভুক্তির (Financial Inclusion) হার বাড়াতে সাহায্য করবে ।

  • রপ্তানি বৃদ্ধি: রাজ্যের MSME সেক্টর থেকে রপ্তানি বাড়ানোর জন্য সরকার ইতিমধ্যেই একাধিক পদক্ষেপ নিয়েছে। নতুন উদ্যোগগুলি ভবিষ্যতে রপ্তানিমুখী হয়ে উঠলে রাজ্যের অর্থনীতি আরও মজবুত হবে।

এই প্রকল্পের মাধ্যমে পশ্চিমবঙ্গ সরকার ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষে রাজ্যের যুবসমাজকে স্বনির্ভর করার পথে এক নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে। সঠিক পরিকল্পনা এবং পরিশ্রমের মাধ্যমে এই সুযোগকে কাজে লাগাতে পারলে রাজ্যের অর্থনৈতিক চিত্র বদলে যেতে পারে।

About Author
Avatar

আমাদের স্টাফ রিপোর্টারগণ সর্বদা নিষ্ঠার সাথে কাজ করে যাচ্ছেন যাতে আপনি বিশ্বের যেকোনো প্রান্তের সর্বশেষ ও গুরুত্বপূর্ণ খবর পেতে পারেন। তাঁদের অক্লান্ত পরিশ্রম ও প্রতিশ্রুতি আমাদের ওয়েবসাইটকে একটি বিশ্বস্ত তথ্যের উৎস হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।তারা নিরপেক্ষ ও বস্তুনিষ্ঠ রিপোর্টিংয়ে বিশ্বাসী, দ্রুত পরিবর্তনশীল পরিস্থিতিতে তাৎক্ষণিক প্রতিবেদন তৈরিতে সক্ষম

আরও পড়ুন